ফুটপাতের গরম তাওয়া থেকে ফাইভ স্টারের ঝাঁ চকচকে রান্নাঘর… সব জায়গায়ই এক আলোচনা, একটাই ভয়, একটাই গুঞ্জন। শুধু মানুষের মধ্যে নয় বাংলার অন্যান্য প্রাণীরাও পুকুর পাড়, উঠোন বা বাড়ির জঞ্জাল ফেলার জায়গায় নিজেদের মধ্যে আলোচনায় ব্যস্ত। কেউ ভাবছে এবার তাদের সুখের দিন এসে গেলো, আবার কেউ চিন্তিত খবরটা সত্যি তো ! খবর খুঁজতে খুঁজতে এমনই এক আলোচনার শরিক হলাম আমি। খুব যত্ন করে ওদের কথা শুনে সেটাকে আরও যত্ন করে বাংলায় অনুবাদ করে সম্পাদককে পাঠালাম। সম্পাদক তো হেসেই খুন, বললেন এসব সত্যি ? বললাম, আমি তো জানি সত্যি, আমি ওদের কথাটাই লিখেছি এখন আপনি ছাপবেন কিনা সেটা আপনার ব্যাপার। লুকিয়ে শোনা সেই কথোপকথন সম্পাদককে লুকিয়ে এখানে আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করলাম, আপনারা দেখুন তো এসব সত্যি কিনা ! !    

স্থান – হাঁসের ঘরের সামনে ।। সময় সকাল ৬টা ।।

মুরগি হন্তদন্ত হয়ে এসে হাঁসকে ডাকছে, আমি হাঁসের ঘরের পিছনে লুকিয়ে…।   

মুরগি – হাঁসিবৌদি  …ও হাঁসিবৌদি…হাঁসিবৌদি …

(ঘর থেকে হেলতে দুলতে বেরিয়ে আসে হাঁস)

হাঁস – ওমা… তুই ! কী হয়েছে ? এরকম হাঁপাচ্ছিস কেন ? আয়, এখানে বোস, একটু ঠাণ্ডা হয়ে বোস। জল খাবি ?

মুরগি – না, না, কিচ্ছু খাব না। টেনশনে ব্রেকফাস্টও করি নি। তুমি শুনেছো, আমাদের পাড়া ডিম মানুষের আর দরকার নেই।

হাঁস – দরকার নেই মানে ! কী বলছিস বলতো ? গ্যাস হয়ে যায় নি তো ? রাতে ঘুমিয়েছিলি ?

মুরগি – আর ঘুম…উত্তেজনায় আমার খাওয়া ঘুম সব চলে গেছে গো হাঁসি বউদি। আচ্ছা, তুমি সত্যিই কি কিছু শোনো নি ?

হাঁস – কী শুনবো ? কী হয়েছে আমাকে একটু খুলে বল…আমার খুব টেনশন হচ্ছে রে, জানিস তো আমার আবার হাই প্রেশার।

মুরগি – না, না, তুমি একদম টেনশন করো না আমি তোমায় সব বলছি। জানো হাঁসিবৌদি, আমাদের সুখের দিন এসে গেছে গো। আমরা আবার আমাদের মত করে বাঁচতে পারবো। গব গব করে খুদ কুঁড়ো খাব, হুড়হুড় করে ডিম পাড়বো, মনের আনন্দে ‘তা’ দোবো, পিল পিল করে পিলে হবে…।  চোখের সামনে হাজার হাজার পিলে মনের আনন্দে খেলে বেড়াবে। আচ্ছা হাঁসিবৌদি কতদিন আমরা ডিমে ‘তা’ দিইনি বলতো ?

আরও পড়ুন:  পবিত্র ভ্রমণ : পবিত্র সরকার

হাঁস – আচ্ছা, তোর মাথাটা কি গেছে নাকি চালানে যাওয়ার সময় এসে গেছে ? সক্কালবেলা যত সব উল্টোপাল্টা বকছিস ? নিজের মনে হুড়পাড় করে কী সব বকে যাচ্ছিস…এসবের এক বর্ণও আমি বুঝতে পারছি না। শোন তুই বরং এখন যা,পরে আসিস কেমন…আমি আবার কাল রাতে কিছু গেঁড়ি-গুগলি রেখে দিয়েছিলাম…এখন না খেলে ওগুলো এবার পচে যাবে, আমি যাচ্ছি…

মুরগি – ও হাঁসিবৌদি, হাসিবৌদি গো, আমার কথাটা একবার মন দিয়ে শোনো, তোমাকে আর বিরক্ত করবো না।

হাঁস – ঠিক আছে, যা বলার তাড়াতাড়ি বলবি, বেশি হ্যাজাবি না…

মুরগি – হ্যাঁ, শোন…মানুষ এখন থেকে আর আমাদের পাড়া ডিম খাবে না ঠিক করেছে। ওরা ওদের মত ডিম বানিয়ে নিয়েছে।

হাঁস – ডিম বানিয়ে নিয়েছে মানে ! ডিম আবার বানানো যায় নাকি ? ডিম তৈরির মেশিন হয় নাকি ? ডিম তো হয় পেটে।  তোর যত সব উদ্ভট গপ্পো।

মুরগি – না গো , উদ্ভট নয়, সত্যিই…মানুষ ডিম তৈরির মেশিন তৈরি করেছে। সবাই জানে আর তুমি জানো না ?

হাঁস – সে কী রে  ! মা গো, কি যুগ পড়লো ! ডিম তৈরিরও মেশিন ! তা কীসের ডিম বানালো ?

মুরগি – কেন ? প্লাস্টিকের… সাদা ধবধবে  প্লাস্টিকের ডিম ।  

হাঁস – প্লাস্টিকের ! মানুষ প্লাস্টিকের ডিম বানালো ? আর সেটা আবার মানুষই খাবে ? তুই একেবারে গাধা হয়ে যাচ্ছিস… 

মুরগি – ( একটু রেগে যায় ) কেন ? মানুষ প্লাস্টিক খেতে পারবে না কেন ? একমাত্র ওরাই তো সব খায়। দেখো এই পৃথিবীতে মানুষ ছাড়া আর যারা আছে তাদের খাবার কিন্তু একেবারে বাঁধাধরা। কেউ গাছপাতা, ঘাস খায়, কেউ আবার শুধুই মাংস খায়, কেউ পোকামাকড় খায়, কেউ শুধু জল খায়, কিন্তু তুমি মানুষদের দেখো, ওরা গাছ, পাতা, পোকামাকড়, মাছ, মাংস, ডিম সব খায়…তাহলে প্লাস্টিক খেতে সমস্যা কোথায় ?

আরও পড়ুন:  দাঙ্গার জেরে এক সময় স্ত্রী'র গয়না বেচে দিন চালাতে হয়েছিল কিংবদন্তি 'প্রাণ'কে!

হাঁস – হুম, এটা তুই ঠিক বলেছিস। কিন্তু প্লাস্টিকের ডিম…! !  তা হ্যাঁরে, ওগুলো কি একেবারে আমাদের ডিমের মতই দেখতে ?

মুরগি – শুধু দেখতে কী গো… খেতেও নাকি একেবারে আমাদেরই মত। ওরা নিজেরাই নাকি ধরতে পারছে না, গুলিয়ে ফেলছে।

হাঁস – ওমা, কী হবে গো… সত্যিই আমাদের সুখের দিন এসে গেছে রে… (বেশ গুছিয়ে বসে )।  দ্যাখ, আমার মনে হয়, মানুষ একবার যখন প্লাস্টিকের ডিম তৈরি করে ফেলেছে তখন ওরা আর থেমে থাকবে না। এবার ওরা সব প্লাস্টিকের করে ফেলবে…হাঁস, মুরগি, ছাগল, গোরু, শুয়োর… সব। ব্যস, আমাদের কেল্লা ফতে, আমরা আবার আমাদের নিজেদের মত করে বাঁচতে পারবো, নিজেদের মত করে জীবন কাটাতে পারবো, ঘুরবো, ফিরবো… এ দিঘি থেকে ও দিঘি, খাল বিল নদী…

মুরগি – জঙ্গল, পাহাড়, আগান, বাগান…

হাঁস – মানুষরা আমাদের দিকে আর ফিরেও তাকাবে না। আমাদের চালানে পাঠাবে না। ওফফ ভাবলেই…দ্যাখ পাখনায় কীরকম কাঁটা দিয়ে উঠছে…  

মুরগি – হ্যাঁ গো…আমারও হচ্ছে। দেখ হাঁসিবৌদি আমাদের ওপর থেকে যদি মানুষদের চোখ একবার সরে যায় তাহলে আমাদের আর পায় কে ? এই পৃথিবীতে ওদেরই তো সব চেয়ে ভয় লাগে। আমরা বাঘ ভাল্লুক, কুকুর, শেয়ালদের সামলে নিতে পারি কিন্তু মানুষ…ওরেবাব্বা, ওরা পারে না এমন কোন কাজ নেই

হাঁস – জানিস, আজ তোর হাঁসাদার কথা খুব মনে পড়ছে। ও খুব বলতো, ‘দেখো একটা সময় আসবে যখন আমরাও এই পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবো, সেদিন আমরাও বুঝিয়ে দোব শুধুমাত্র কারুর রসনা তৃপ্ত করার জন্য আমাদের জীবন নয় ’।

( পাখনার ডগা দিয়ে চোখের জল মোছে ) ।

মুরগি – কেঁদো না বউদি কেঁদো না। সবাইকেই একদিন না একদিন চালানে যেতে হয়, এটাই তো আমাদের জীবন। হাঁসাদা যেখানেই থাকুক নিশ্চই ভাল থাকবে, তার আত্মা শান্তিতেই আছে, কিন্তু এতকিছুর পরেও একটা কথা আমার মাথায় ঢুকছে না জানো …

আরও পড়ুন:  মেগা সিরিয়ালে উত্তম, সুচিত্রা, সুপ্রিয়া, ছবি ......।।

হাঁস – কী কথা রে ?

মুরগি- দেখো এই প্লাস্টিকের ডিম নিয়ে এত কথা, এত আলোচনা, এত কিছু…, আমাদের ডিমের বিক্রি পর্যন্ত হু হু করে কমে গেলো, কিন্তু একটা প্লাস্টিকের ডিমও চোখে দেখা গেলো না।

হাঁস –মানে ! চোখে দেখা গেল না মানে ?

মুরগি- মানে একটা মানুষও নাকি প্লাস্টিকের ডিম দেখে নি, সবাই শুধু খুঁজছে, হন্যে হয়ে খুঁজছে কিন্তু কোথাও একটাও পাওয়া যায় নি।

হাঁস – অ্যাঁ ! সে কী রে !

মুরগি – হ্যাঁ, তবে আর বলছি কী… বাজার, দোকান, ঘর রান্নাঘরে সবাই শুধু এখন প্লাস্টিকের ডিম খুঁজতেই ব্যস্ত।

হাঁস – (একটু বিরক্ত ) ও…আচ্ছা, এবার বুঝে গেছি…যা, তুই খাঁচায় যা। এই কথাটা আগে বললে আমি এতক্ষন তোর সঙ্গে বকবক করে সময় নষ্ট করতাম না। শুধু শুধু এতক্ষন ধরে খালিপেটে বকবক… শোন তোকে একটা কথা বলি মরার আগে পর্যন্ত মনে রাখিস… ওরা হল মানুষ, এই পৃথিবীর দণ্ডমুন্ডের কর্তা। আমাদের রাখলে ওরাই রাখবে আর চালানে দিলে ওরাই দেবে…। আর এই প্লাস্টিকের ডিম, গনেশের দুধ খাওয়া এসব হল ওদের লীলাখেলা, দুষ্টুমি, টাইমপাস। এসব ব্যাপার কি আমরা বুঝবো ? মানুষ এত বোকা নয় যে আমাদের ডিম ছেড়ে প্লাস্টিকের ডিম খাবে। তাই, যে কটা দিন এই পৃথিবীতে আছিস খেয়ে, নেচে কাটিয়ে দে । যা, খাঁচায় যা… এই জন্যেই মানুষরা তোর নাম মুরগি দিয়েছে … যত্তসব।

হাঁস প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে চলে যায়। মুরগি মনমরা হয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকে।

- Might Interest You

NO COMMENTS