বাংলালাইভ রেটিং -

হেডিংটা পড়ে অবাক হবেন না প্লিজ। আমার সঙ্গে ফেরত চলুন বছর ১৫ আগের সেই দিনটায়। ২০০২ সালের ২৪ মার্চ তারিখ। রবিবার। ঘটনাস্থল আমেরিকার লস এঞ্জেলস শহর।

কোনদিন যে ভারতবর্ষে ‘দঙ্গল’-এর মতো একটা সিনেমা তৈরি হবে, সেটা ঠিক হয়ে গেছিল সম্ভবত ১৫ বছর আগের সেই দিনটাতেই। আমেরিকার ওই শহরটাতেই।

এখনও ধাঁধায় পড়ে ভাবছেন তো, যে আমেরিকায় আবার সেদিন কী হয়েছিল রে বাবা। যে ‘দঙ্গল’ সিনেমাটায় গল্প কখনো দেশের গণ্ডী ছেড়ে বিদেশের মাটিতে পা-ই রাখল না, সেটার সঙ্গে ১৫ বছর আগের আমেরিকার লস এঞ্জেলস শহর জুড়েই বা গেল কী করে!

যে গীতা ফোগটের সোনা জেতার গল্প শোনাল ‘দঙ্গল’, সোনা জেতা তো দূরের কথা, ২০০২ সালে সেই গীতা ফোগট তো মোটে ১৩ বছরের মেয়ে!

বেশ, আরেকটু খুলেই লিখছি তাহলে। আসলে হলিউডের কোডাক থিয়েটারে ওই দিন সন্ধেবেলাতেই ছিল অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার অনুষ্ঠান। দুনিয়ার লোকে যেটাকে ‘অস্কার’ নামে চেনে। আর নিমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে সেদিন ছিলেন ভারত থেকে যাওয়া এক অভিনেতা। টিভি স্ক্রিনে কিছু বোঝা না গেলেও নিশ্চিত ধুকপুক করছিল তাঁর বুক। করবে নাই বা কেন? তিনি তো শুধু অভিনেতা নন, সে বছর তিনি ফার্স্ট টাইম প্রোডিউসারও বটে। আর প্রোডিউসার হিসেবে প্রথম যে ছবিটা বানিয়েছেন, সেটাই যে সটান পৌঁছে গেছে অস্কার জেতার দোরগোড়ায়।

সেরা পাঁচ বিদেশি ভাষার ছবির নমিনেশনে সেবার ভারত থেকে ‘লগান’ পেয়েছে ঠাঁই।

ফাইনালি যখন বিজয়ী ছবির নাম পড়া হবে, তখন বোধহয় পুরো ভারত দম বন্ধ করে ‘স্টার মুভিজ’ খুলে বসে। সেবার সেদিন কী হয়েছিল, সেই ইতিহাস এখন সবাই জানেন। শুধু কেউ কখনো খুঁড়ে বোধহয় দেখতে যান নি যে, জীবনের অমন একটা আশা হঠাৎ করে নিভে যাওয়ার পর সে দিন বাকি রাতটা পারফেকশনিস্ট খান কাটিয়েছিলেন কী ভাবে!

21আজকে ‘দঙ্গল’ দেখার পর মনে হচ্ছে, সেই রাতটা বোধহয় আমির খানের কাছে ছিল শপথ নেওয়ার রাত। ঠিক আছে, প্রথমবার হল না তাতে কুছ পরোয়া নেহি। রবার্ট ব্রুসেরও তো টার্গেট হিট করতে বছরের পর বছর কেটেছে ভাই। আমিও ঠিক তেমন একটা মোডে সেট করে নিই নিজেকে। একবার না পারিলে দেখো শতবার। এদিক-ওদিক করে ভারতে অস্কার বেশ খানকয়েকটা এসেছে বটে, কিন্তু সেগুলোর সবগুলোই তো বিদেশি প্রোডাকশনের দৌলতে কিংবা সেই লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট ক্যাটেগরি। হানড্রেড পারসেন্ট দেশি কোন ছবির ঝুলিতে হাতে গরম ‘অস্কার’ তো একশো বছরেও আসে নি। ঠিক আছে, এবার না হয় সেই প্রোজেক্টটাই গোপনে খুলবো আমি, আর চুপচাপ শুরু করবো পাখির চোখ তাক করে এগোন।

মিলিয়ে দেখুন একটু। ‘লগান’ মিস হয়ে যাওয়ার পাঁচ বছরের মাথায় নিজের প্রোডাকশন হাউস থেকে তৈরি ছবি ফের অস্কারে পাঠাচ্ছেন আমির। ‘তারে জমিন পর’ (২০০৭)। কিন্তু এবার আর শুধু মিস নয়, মহা-মিস! ‘লগান’ যতটা এগিয়েছিল, ততটাও পৌঁছতে পারল না ছবি। আমির এতে ধাক্কা খেলেন কতটা জানি না। শুধু দেখা গেল হাল না ছেড়ে কয়েক বছর পর ফের ‘অস্কার’ জেতার জন্যে ভারত থেকে রওনা দিল ‘আমির খান প্রোডাকশনস’-এর ছবি। ‘পিপলি লাইভ’ (২০১০)। কিন্তু আমিরের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল না তো এবারেও!

এই যে বারবার ফেল করে যাওয়া, তবু ভেঙে না পড়া, আর চুপচাপ স্রেফ চোয়াল শক্ত করে নিয়ে পরের বারের জন্যে তৈরি হওয়া, এটা কি আর আমার-আপনার মতো আম-পাবলিকের কাজ? পারলে তো এ কাজ শুধু সুপারহিরোই পারে! ‘দঙ্গল’-এর ওই মহাবীর সিং ফোগট লোকটি যেমন। জীবনের একটা রাউন্ডে স্বপ্নগুলো সব ধুয়েমুছে গেছে তো কি? হার মেনো না ভাই। পরের রাউন্ডে খেলতে নামো নতুন করে। পাঁচটা ইন্দ্রিয় টানটান করে রেডি হয়ে থাকো কবে কখন ঝুপ করে পরের চান্সটা তোমার কাছে এসে পড়ে!

আরও পড়ুন:  কেন বিয়ে হয়নি দিলীপ কুমার ও মধুবালার? কেউ কি ছিল এর নেপথ্যে!?

‘পিপলি লাইভ’ পর্ব শেষ হবার বছর কয়েকের মধ্যেই স্টার টিভি-র তরফে আমিরের কাছে রিয়্যালিটি শো করার অফার। আর সেই শো করার জন্যে সারা ভারত ঢুঁড়ে তাক-লাগানো রিয়্যাল লাইফের ঘটনাগুলো এক এক করে জড়ো করার পালা। ২০১২-তে সেই শো ‘সত্যমেব জয়তে’ শুরু। কে বুঝবে তখন এইটে যে, এই শো আমিরের কাছে নিছক একটা টিভি শো-ই শুধু নয়! এ হলো তাঁর কাছে ভারত চেনার পাঠশালা। এ হল তাঁর কাছে নতুন নতুন ছবির জন্য চমক-দেওয়া-বিষয় খোঁজার আঁতুড়ঘরে ঢোকা।

আমিরের শো-এ রিয়েল গীতা ও ববিতা
আমিরের শো-এ রিয়েল গীতা ও ববিতা

এই শো-য়ের থার্ড সিজন ২০১৪ সালের ৫ অক্টোবর শুরু। আর এই সিজনের ফার্স্ট এপিসোডে আমিরের হাত ধরে গীতা আর ববিতা স্বয়ং মঞ্চে এসে হাজির! এরা কারা বলুন তো? আরে, ‘দঙ্গল’ এখনও দেখেন নি নাকি? এরা তো কুস্তিগীর মহাবীর সিং ফোগটের সেই দুর্দম দুই কন্যা! বুঝতে পারছেন তো, কীভাবে টেলিভিশনের একটা শো সুপারস্টারকে পৌঁছে দিচ্ছে প্রায় মিথ হতে বসা কুস্তিগীরের কাছে! আর কীভাবে তিনি খুঁজে পাচ্ছেন তাঁর প্রোডাকশনের পরের ছবির বিষয়।

সোজা আসুন ‘দঙ্গল’ ছবির লাস্ট সিনে। কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জেতার পর মহাবীর তাঁর মেয়েকে প্রথমবারের জন্যে বলছে দেখি, ‘শাব্বাস’! শুনছি আর ভাবছি, অস্কার টার্গেট করে বছরের পর বছর ধরে আমিরের এই নিঃশব্দ এফর্ট দেওয়ার প্রোজেক্টটাকেও ‘শাব্বাস’ না বলে থাকবো কী করে, ভাই?

অবশ্য জাস্ট মহাবীর সিং ফোগটের জীবন নিয়ে জানলাম আর ছবিটা বানিয়ে ফেললাম, ব্যাপার আদপেই অত সহজসাধ্য নয়।

‘সত্যমেব জয়তে’ থেকে ছবির বিষয় না হয় হল। কিন্তু সে ছবি লিখবে কে? ডিরেক্ট করবে কে? জীবন দেখার অমন একটা মরমী চোখ রয়েছে কার? আশপাশের বেশিরভাগের চোখেই তো চড়া পড়ে গেছে যেন! অস্কার জেতার স্বপ্ন-প্রোজেক্ট যার-তার হাতে ছাড়বেন কী করে পারফেকশনিস্ট খান?

অন্য পাঁচটা ছবির মতো এই ছবিটা হলে, নিজেই না হয় আমির খান ডিরেক্টরের চেয়ারে যেতেন বসে। সেই সেবার ‘তারে জমিন পর’-এর বেলায় ঠিক যেমনটা হল। ছবি শুরু করেছিলেন ডিরেক্টর অমল গুপ্তে, একটা সময় আমির তাঁকে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলে নিজেই সে চেয়ার অকুপাই করে নিলেন। কিন্তু এবার ডায়েট পালটে পালটে শরীরচর্চা করতে গিয়ে আমির খান তো নিজেকে নিয়েই নাজেহাল থাকবেন পুরো। স্বয়ং মহাবীর সিং ফোগটের রোলে অ্যাক্টো করার দুরূহ ভারও যে এবার কাঁধে! এসব কিছুর সঙ্গে আবার ডিরেকশন তো পুরো অসাধ্য কাজ হবে!

এইসময়েই পাওয়া গেল নীতেশ তিওয়ারির খোঁজ। বক্স অফিসে ভদ্রলোকের আগের দুটো ছবি জাস্ট হারিয়ে গিয়েছে যেন। কিন্তু যারা দেখেছে, তাঁরা জানে, দুটো ছবিতেই আশ্চর্য দরদী একটা দেখার নজর ছিল তাঁর!

চিলার পার্টি-র সেই জাঙিয়া মিছিল
চিলার পার্টি-র সেই জাঙিয়া মিছিল

প্রথম ছবি ‘চিলার পার্টি’ (২০১১) কলোনির ছোট্ট একটা কুকুরকে ষড়যন্ত্রী মন্ত্রীমশাইয়ের কোপ থেকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প। জাঁদরেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সঙ্গে একরত্তি সব বাচ্চা ছেলের গা-শিউরানো ফাইট, ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে আরও তুঙ্গে উঠলো সেটা। প্রতিবাদ করবে বলে পুরো মুম্বই জুড়ে অগুন্তি বাচ্চা ছেলে খালি গায়ে শুধু একটা জাঙিয়া পরে বেরিয়ে পড়ল পথে! বিশাল এক মিছিল করে নিরেট এই সিস্টেমটাকে নিজেদের ন্যুডিটি দিয়ে তারা ধাক্কা দিতে চায়! ছবিটা দেখে থাকলে এই ইমেজারিটা বাকি জীবনে আর কোনদিন ভুলতে পারবেন না আপনি।

পরের ছবি ‘ভূতনাথ রিটার্নস’ (২০১৪) ফের সেই ছোট্ট শিশুর যুদ্ধ জেতার গল্প। এবার তার সঙ্গী একটা ভূত! আর তাদের এগেনস্টে ফের সেই হুমদো রাষ্ট্রে লাগু হয়ে থাকা চোখ-কানা গণতন্ত্র! আগের ছবিতে ল্যাংটো হয়েছিল ছোটরা। এটায় তামাম ভারতের ভোট-ব্যবস্থা ল্যাংটো হয়ে পড়লো ওই ডিরেক্টরের হাতে!

Poster_Nil Bate Sannataশুধু তো একা ভদ্রলোক নন, এমনকি ওঁর স্ত্রীও! অশ্বিনী আইয়ার তিওয়ারি। স্বামীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খুদে জীবনের অতুল যুদ্ধ নিয়ে তাঁর হাতেও তৈরি হয় ছবি। অশ্বিনীর প্রথম ছবি ‘নীল বাটে সন্নাটা’র (২০১৬) গল্প নীতেশেরই লিখে দেওয়া। এবং সেটাও সেই ওঁর ট্রেডমার্কওয়ালা গল্প। রূপকথা-সম গল্প শোনাতে শোনাতে ফের একবার মনে করিয়ে দেওয়া যে, অন্যের সেট করে দেওয়া নিয়ম যেন চোখ-কান বুঁজে মেনে নিও না কো তুমি। দরকার মতো সেগুলোকে তুবড়ে বেঁকিয়ে জীবনের পথে এগিয়ে না গেলে জিতবে কী করে?

আরও পড়ুন:  'ভুতু' ফিরছে পর্দায়‚ দেবের সঙ্গে

এটার গল্পে লুকনো চ্যালেঞ্জটা শুনুন। কিশোরী মেয়েকে ভাল করে অঙ্ক করাতে তার স্বল্প-শিক্ষিতা মা নিজেই নতুন করে ভর্তি হচ্ছেন স্কুলে – আর সেটাও কিনা নিজের মেয়ের সঙ্গে একই ক্লাসে! ক্লাসের বাকিদের থেকে নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেখে মেয়ের পাশের বেঞ্চে বসে দাঁতে দাঁত চিপে ক্লাস করছেন নিজের স্বপ্ন সফল করবেন বলে। কী সেই স্বপ্ন? না, মেয়েকে লেখাপড়ায় পোক্ত করে এগিয়ে দেওয়া সিভিল সার্ভিসের দিকে!

কে বলবে যে এ ছবির এই ‘তিনি’ আসলে এক ঝুপড়িবাসিনী মা!

চারপাশের এই দুনিয়াটাকে এমন চোখে দেখতে পারেন যিনি, সেই তিনি ছাড়া আর কে ডিরেক্ট করবে বলুন তো ‘দঙ্গল’?

‘দঙ্গল’-এর সেই শুরুর দিকটা ভাবুন! লোকাল সেই আখড়াগুলোর সিন। দলে দলে কিশোর কিংবা যুবক সেখানে ছোট্ট একটা কৌপীন পরে লড়াই করতে তৈরি। দেখছি আর মনে মনে ভাবছি পাঁচ বছর আগের সেই ‘চিলার পার্টি’র সিন। দলে দলে ছেলেরা যেখানে জাঙিয়া পরে মিছিল করে রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় এক যুদ্ধে নামতে চলেছে। না মনে হয়ে তখন উপায় কি যে, ‘দঙ্গল’-এর তুখোড় দৃশ্যের বীজতলাগুলো আসলে যেন পাঁচ বছর আগের ওই ‘চিলার পার্টি’তেই চুপিসাড়ে ছিল লুকনো!

সাধে কি আর আমির নিজের স্বপ্ন-প্রোজেক্ট তুলে দিয়েছিলেন নীতেশবাবুর হাতে!

director and producer
director and producer

রিয়্যাল লাইফ থেকে খুঁজে-পেতে আনা এমন একটা বিষয়, তার সঙ্গে অমন জাদু-বাস্তবিক রাইটার-কাম-ডিরেক্টরকে পাওয়া। সাধের অস্কার প্রোজেক্ট কি এতেই লক হয়ে গেল নাকি? এটাই যদি ভেবে থাকেন তো আপনি ডাহা ভুল!

এই সব কিছুর পরেও যে একটা জিনিস বাকি! সেটা হল অস্কারের বিদেশী বাজারে নমিনেটেড ছবিখানার একের পর এক স্ক্রিনিং এবং দম-ফাটানো প্রচার! ঠিক এইখানেতেই বছর-বছর পিছিয়ে পড়ে তাবড় তাবড় বিদেশি ভাষার ছবি। অস্কারের হাটে ‘লবিং’ এক সর্বস্বীকৃত প্রথা। কিন্তু মার্কিন দেশের চোস্ত হাওয়াতে মানিয়ে নিয়ে লবিং করার দম দেখানো কি চাট্টিখানি কথা?

কাণ্ড দেখুন, এবার সেখানেও বাবু আমির খানের জয়! নিজের সাধের ছবির গাঁটছড়াটি কার সঙ্গে এবার বেঁধে রেখেছেন তিনি জানেন? ‘ডিজনি’ কোম্পানির সঙ্গে! তুরুপের এই একটা তাসেই তো অস্কার-হাটের বাকি সব মামলাগুলোই সাফ হয়ে গেল, না? ছোট্ট একটা হিসেব শোনাই শুনুন। ১৯৩১ সাল থেকে শুরু করে আজ অবধি ডিজনি কোম্পানির কটা ছবি অস্কার জিতেছে জানেন? ৬১টা ছবি। এরপর আর কি আদৌ কিছু বলার থাকে বাকি?

সব অঙ্ক মিলল? বোঝা গেল তো যে ‘দঙ্গল’ নিছক ছবি মাত্র নয়, এ হল ১৫ বছর অপেক্ষার পর হাত দিয়ে স্বপ্ন ধরতে চাওয়ার দুরন্ত এক প্রোজেক্ট!

কিংবা এও যেন ডিজনি কোম্পানির বানিয়ে দেওয়া রূপকথারই গল্প!

রিয়্যালিটি থেকে মশলা নিয়ে যে রূপকথা অন্য দুনিয়ায় ডানা মেলে দেয় জোরে! সরকারি অফিসে তাই টেবিল-চেয়ার সরিয়ে রেখে কুস্তি লড়াই হয়। আর ভোর পাঁচটায় মেয়েদের ফুচকা খাওয়াতে কোন এক ফুচকাওয়ালাকে ধরে আনেন তাদের ‘হানিকারক পাপ্পা’! অফিস ফ্লোরের মধ্যে না হয়ে ওই কুস্তিটা কি অফিস বাড়ির ছাদে হতে পারতো না? কিংবা, দুই মেয়েকে ফুচকাটা কি খাওয়ানো যেত না বিকেলে? নাহ যেত না! তাতে হয়তো রিয়্যালিটি হত ভাই! কিন্তু ডিজনি-কাটিং রূপকথাটা যে হতো না!

আরও পড়ুন:  বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে এনগেজমেন্ট সেরে ফেললেন ভারতী সিং

শেষটা যদি মহাবীর ওইভাবে না আটকে যেতেন একটা ঘরের মধ্যে, আপনার ইমোশনের ট্রিগার কি আর লাগামছাড়া হতো? এখানে খামোখা মনে রাখলে চলবে কেন যে বাস্তবে এই ঘরবন্দী খেলার কোনকিছুই ঘটে নি!

20আসলে ইশারা তো শুরুর ওই ডিসক্লেমারেই ছিল! বলাই তো ছিল সেখানে যে, গপ্পের মূল চরিত্রগুলো বাস্তব থেকে আনা, কিন্তু বাকি লোকজনে আর ঘটনাগুলোয় চকমকানির পালিশ পড়েছে দিব্যি! জমিয়ে সব মশলাগুলো মাখতে হবে না? সুন্দরী বিউটির সঙ্গে লোভী একটা বিস্ট না থাকলে রূপ রস স্বাদ গন্ধ কানায় কানায় জমবে কী করে সব?

আর জুৎ করে মশলা মাখার হাতটা না থাকলে তো পুরো খেলাটাই মাটি। ক’দিন আগেই ‘বুধিয়া সিং : বর্ন টু রান’য়েই ঠিক যেমনটা হল। ছোট্ট ৫ বছরের ছেলের ঘোর গ্রীষ্মে ৬৫ কিমি ম্যারাথন দৌড়ের গল্প, সঙ্গে সেই মহাবীর স্যরের মতোই দৃশ্যত এক হৃদয়হীন কোচ! কিন্তু ছবিটা দেখল ক’জন, বলুন? কিংবা যেমনটা ঠিক হয়েছিল সেই ‘দিল বোলে হাড়িপ্পা’র (২০০৯) কেসে। সেও তো ছিল ছেলেদের খেলায় গোঁতাগুতি করে পঞ্জাবি একটা মেয়ের নিজেকে সেঁধিয়ে দেওয়ারই গল্প। মতি নন্দীর ‘কলাবতী’ (১৯৮৫) থেকে ঝেঁপে তুলে নেওয়া প্লট। মাপমতো টক-ঝাল-মিষ্টি না দেওয়ার দোষে সেটাও তো কুপোকাত-ই হয়ে ছিল?

নিজের সাধের প্রোজেক্ট নিয়ে অমন আনাড়িপনা কখনো করতে পারেন নাকি আমির খান, পাগল?

এখানে ক্লাইম্যাক্স তাই এমন করে তৈরি যে পাবলিকের গলার কাছে এসে তখন থরথর করে কাঁপতে থাকবে আবেগ। সম্মোহনটা এই লেভেলে হবে যে, জাতীয় সঙ্গীতের টিউন কানে আসার আগেই কলের পুতুলের মতো ‘হল’ জুড়ে দাঁড়িয়ে উঠবে সকলে। সিনেমা শেষ হয়ে যাওয়ার পর ইউটিউবে থিম সংটা ফের শুনতে গেলে গায়ে কাঁটা দেবে খুব। ফেসবুকে গুচ্ছের লোককে টিটকিরি মেরে বেড়ান ছাড়া যার অন্য কাজ নেই, সেই বাঙালি সবজান্তাও ছবি দেখে উঠে স্ট্যাটাস লিখবে, ‘অনেকদিন পর একটা সিনেমা দেখে চোখ ভিজে গেল’!

ধন্য আমির, ধন্য আপনার খাপে খাপ মেলানো প্রোজেক্ট!

4পনের বছর আগের একটা ফ্ল্যাশ ব্যাক দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, শেষটায় চলুন একটা ফ্ল্যাশ ফরোয়ার্ড লিখি। আমার সঙ্গে এগিয়ে চলুন আরও কয়েক বছর পর! আমির তখন প্রবীণ হয়েছেন আরও, আর এবার আমিরের জীবন নিয়েই বলিউডে তৈরি হচ্ছে ছবি!

ইয়ার্কি নয়, সত্যি! তাঁর কেরিয়ারগ্রাফ তো নেহাত আর এইটুকুনি নয়! ‘৭৩-এ সেই প্রথম সিনেমা করা, আর সেখান থেকে অনেক পথ হাঁটতে হাঁটতে ২০১৮ সালে প্রথম অস্কার জিতে নেওয়া – ৪৫ বছরের এই দুরূহ জার্নি সেই সিনেমার বিষয়।

সবে ‘দঙ্গল’ দেখে উঠেছি, চোখের সামনে তাই যেন আরও স্পষ্ট তখন দেখতে পাচ্ছি ভবিষ্যতের সেই কল্প-ছবির ফ্রেমিং! ‘দঙ্গল’-এ মহাবীর সিং ফোগটের রোলে আমির যেভাবে বলছেন, রূপো জিতলে ঠিক একদিন লোকে ভুলে যাবে, ‘গোল্ড জিতি তো মিশাল বন জায়গি’! সেই ছবিতে আমিরের ভূমিকাভিনেতাও ঠিক যেন সেভাবে বলছেন যে, অস্কারে নিছক নমিনেশন পেলে ঠিক একদিন লোকে ভুলে যাবে, কিন্তু ‘অস্কার জিতি তো মিশাল বন জায়গি’!

ভাবছি, আর নিজেরই তখন অবাক লাগছে খুব। নিজের অভিনয়-করা ক্যারেক্টারে লুকিয়ে গিয়ে মিশে যাচ্ছে অভিনেতার নিজের ক্যারেক্টার এসে, আর সেই ক্যারেক্টারের মুখ দিয়ে আজকের বলা কথাগুলো কাট-টু-কাট ম্যাচ করে যাচ্ছে অভিনেতার পরের জীবনের সংলাপমালার সঙ্গে – আমার এই কল্পনাটা কি সত্যি ভীষণ বাড়াবাড়ি?

ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এর আগে আর কখনো এমন হয়েছে? আর কখনো চান্স এসেছে এমন হবার?

বলিউডে এখন বায়োপিকেরই বাজার। গীতা কুমারী ফোগট আর মহাবীর সিং ফোগটেরটা তো জমে ক্ষীর হয়ে গেছে পুরো। কেউ যদি সত্যি আমির খানেরটা করেন, সেটাও কিছু কম যাবে না!

- Might Interest You

NO COMMENTS