আড্ডা শুরু হয়েছিল রবি ঠাকুরের তোমার খোলা হাওয়া গানে… শেষটা অজানা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে গান… চল রাস্তায় সাজি ট্রাম লাইন-এর সুরে | আমাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন ছন্নছাড়া-বাউন্ডুলে সঙ্গীতশিল্পী দেবজ্যোতি মিশ্র ও তাঁর ঘর সাজাতে ভালোবাসা ঘরনি ডঃ জোনাকি মুখোপাধ্যায় | চূড়ান্ত ব্যাস্ততার মধ্যে দুজনকে একসঙ্গে পাওয়াটা ছিল একটা বড় ব্যাপার |

 

প্রতিনিধি : বহুদিন ধরে আপনাদের একসঙ্গে পাওয়ার চেষ্টা করছিশেষ পর্যন্ত সম্ভব হলো,এত ব্যস্ততা!!

দেবজ্যোতি মিশ্র : সত্যিই,এই ধরনের কারণের জন্য আমাদের দুজনকে একসঙ্গে পাওয়াটা সত্যিই খুব সমস্যার | আমার নিজের কর্মব্যস্ততা | তার উপর আবার আমার ডক্টরেট বউ | সুতরাং অনেক বিস্তৃতি রয়েছে |আর আমারও বিভিন্ন কাজের ব্যস্ততা তো থাকেই |

প্রতিনিধি : অন্য কেমেস্ট্রি দিয়ে এই আড্ডার শুরু হলো,কিন্তু আপনাদের দুজনের কেমিস্ট্রি কীভাবে তৈরি হলো?

দেবজ্যোতি মিশ্র : সম্পর্ক সবসময়ই প্রথম,কে যে কার জীবন ছুঁয়ে যায়,যেটাকে বলা হয় ম্যাজিক মোমেন্ট – সেটা কখন আসে বলা মুশকিল | সে বহুদিনের কথা,আবার এই তো এই যেন সেদিনই বা কিছু মুহূর্ত আগের কথা | আমাদের কাছে মুহূর্তগুলো ঠিক এমনই.. (থেমে গিয়ে স্ত্রীকে ইঙ্গিত করে) আরে আমি বলে যাব শুধু, তুমি কিছু বলবে না!

জোনাকি মুখোপাধ্যায় : সম্পর্ক মানেই তো জীবনকে নতুন করে জানা | রিইনভেন্ট করা |

দেবজ্যোতি মিশ্র : আমি ওকে বলি আদরের,ভালবাসার,আমার তছরুপ করা পাগলামিকে ভালোবেসে,আদরে সামলে রাখা একজন মানুষ | আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ বা গোছানো শান্তিপ্রিয় মানুষ একেবারেই নই সেটা তোমরা সবাই জানো | কিন্তু তেমন মানুষকে ও নিজের জায়গা ছেড়ে দিয়ে খুব সুন্দর করে সামলায় | আমাদের এই আদরের সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার পুরো কৃতিত্ব কিন্তু জোনাকির |

প্রতিনিধি : এটা তো ভালো দিক, জীবনে অনেক খারাপ মুহূর্তও তো থাকে,তেমন ঘটনা কি রয়েছে?

দেবজ্যোতি মিশ্র :আমাদের দুজনের ছোটবেলা একেবারেই আলাদা | আমি ভীষণ সৃষ্টিশীল পরিবেশে মানুষ | অধুনা বাংলাদেশ,আমার বাবা-মায়ের কাছে, পূর্ব বাংলা থেকে আসা | জোনাকির পরিবার শ্যামনগরের বাসিন্দা | আমরা এখানে এসে খুব স্ট্রাগল করেছি | আমার বাবাই আমার গুরু | শুধু ভায়োলিন শিক্ষা নয় সঙ্গীতশিক্ষা আমার বাবার কাছেই | আমি ছোট থেকে চুড়ান্ত অভাব-অনটন দেখেছি |সেটা জোনাকি একেবারেই করেনি | আমার বাবা সর্বক্ষন গান-বাজনায় সাহায্য করেছেন | মা বই পড়তে ভালোবাসতেন | আর এই পরিস্থিতিই আমাদের দুজনের জীবনের সেতুবন্ধন করেছে | আর সলিল চৌধুরী আমার জীবনে কীভাবে জড়িয়ে তা তো জানোই | আমার বাবা যদি নেসফিল্ডের গ্রামার হন তবে সলিল চৌধুরী শেক্সপিয়র | বাবা আমার জীবনে নেসফিল্ডের গ্রামারের মতই আমার জীবনে স্তম্ভ হয়ে দাড়িয়ে রয়েছেন | আর বাকি চলতি ফিরতি জীবনের প্রত্যেকটা মানুষ আমার জন্য শিক্ষক | এই যে এই মুহূর্তে তোমার সঙ্গে কথা বলছি এটাও শিক্ষা |

আরও পড়ুন:  ফারহান যখন দাগী আসামি

প্রতিনিধি : কী কী কাজ চলছে বর্তমানে?

দেবজ্যোতি মিশ্র : জানতাম তুমি এই প্রশ্নটা করবে | এই প্রশ্নটা করলেই সব ভুলে যাই আগে কী কী কাজ করেছি | বর্তমানে বিভিন্ন ছবিতে কাজ করছি,অপেরা রয়েছে,ময়মনসিংহ গীতিকা লিখছি,বাংলাদেশের বেঙ্গল ফাউন্ডেশন-এর সঙ্গে কাজ করছি | ওদের জন্য খুব বড় একটা কাজও করলাম যেহেতু পূর্ব বাংলা আমার বাবা-মায়ের জায়গা, সেখানে আমার পরিবারের ভিত রয়েছে |

প্রতিনিধি :জোনাকিদি আপনার জীবনের গল্প একটু শুনে নিই?

জোনাকি মুখোপাধ্যায় : আমি স্কুলে শিক্ষকতা করি | বিগত ২০ বছর ধরে বাচ্চাদের পড়াই | আমার সারাদিন কাটে আমার বাচ্চাদের ঘিরে | আমি বাচ্চাদের নিয়ে একটি বইও লিখছি | বাচ্চাদের মধ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছড়িয়ে দিতে একটি গানের সিডি প্রকাশ করলাম | বাচ্চাদের কাউন্সেলিং করা আমার প্যাশন | আর পড়াশুনোতো রয়েছেই | 

দেবজ্যোতি মিশ্র : আমি বলি,ওর ছোটবেলার কথা আমি ভালো করে বলতে পারি | ও কিন্তু এক খুবই গুণী পরিবারে জন্মেছে | বাবা ডাক্তার ছিলেন, মা ডাবল এম.এ. |খুবই সংস্কৃতিবান পরিবারের মেয়ে | ছোটবেলায় গান শিখেছে অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়,সাগিরুদ্দিন খান, দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে | আমি দেখলাম ও বলতে গিয়ে ভুলে গেল | আজকাল যেসব লোকজনের সঙ্গে থাকলেই লোকে একটা নিজস্বী তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় সকলকে জানান দেয় ও সেসব থেকে একেবারে দূরে | বলব বাচ্চাদের সঙ্গে থাকার মতো শ্রেষ্ঠ কাজটা ও করে | আমি এখনও নিজের মধ্যের বাচ্চাটাকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায় তার চেষ্টা করি | ও আমার ভেতরের বাচ্চাটাকেও বাঁচিয়ে রাখে |

প্রতিনিধি : নিজস্বী মুহূর্তের কথা যখন উঠল তখন জানতে চাইব তোমাদের জীবনের তেমন কোনও মুহূর্ত সম্বন্ধে…

জোনাকি মুখোপাধ্যায় : তেমন মুহূর্ত বলতে খুব মুশকিল | আমরা দুজনেই খুব চাপে থাকি | সময় কম | আমার সকাল ৬টায় স্কুল আর ও বাড়ি ফেরে রাত ১০টা-১০.৩০টা নাগাদ | তবে তার মধ্যেও আমরা দুজনের জন্য সময় বের করি,মাঝেমাঝেই চলে যাই ক্যাফেটেরিয়ায় একান্তে গল্প করতে |তখন গল্পের মধ্যে ভুলে যাই আমাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে | বিয়ের আগের পুরনো দিনগুলোতে ফিরে যাই | সুযোগ পেলে বাড়িতে বসে ওর আর আমার এক্সপেরিয়েন্স শেয়ার করি |

আরও পড়ুন:  ভাগ্যিস ! ছবির জন্য রাজি হয়েছিলেন ঐশ্বর্য

দেবজ্যোতি মিশ্র :আমার কর্মজীবন শুরু হয় ১১টা নাগাদ | ফিরে যখন আসি, জোনাকির শুতে যাওয়ার সময় | শুয়ে পড়লেও আমি জাগিয়ে ওকে আমার কথা শোনাতে থাকি | ও কিন্তু আমার জন্য কষ্ট করে চোখ খুলে রাখে | কিন্তু পরের দিন সকালেই আবার খুব তাড়াতাড়ি ওকে উঠতে হবে ওর ছেলেমেয়েদের পড়াতে | কিন্তু এই বাচ্চা ছেলেটা এসে তখন ওর থেকে সময় আদায় করে নেয় | আমার ছবি আঁকার একটা জগত রয়েছে | খুব বড় প্রদর্শনীও হয়েছে | মুম্বইতে আমার বড় প্রদর্শনী হতে চলেছে | ছবি আঁকার পর জোনাকিকে রাতে জাগিয়ে ছবিগুলো দেখাই | জানি ওর খুব কষ্ট হয় কিন্তু তাও আমার জন্য ও সময় দেয় | আমাকে ডাকলে হয়ত আমি ঘুমিয়ে পড়তাম |

প্রতিনিধি : কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যে ঐ বিশেষ বিষয়টা কী যা আপনাদের আজও এত কাছাকাছি রেখেছে?

দেবজ্যোতি মিশ্র : আমার মনে হয় সেটা আমাদের দুজনের বন্ধুত্ব | আদরের বন্ধুত্ব,প্রেমকে টিকিয়ে রেখেছে | আমার কাছে শুধু একটা বিয়ে খুব জোলো ব্যাপার | ও খুব ঘর করতে ভালবাসে | আর আমি ঘর থেকে বাইরে বেরোতে চাই | আমার মাঝরাতে ২টোর সময়ও বেরিয়ে পড়েছি | এমন হয়েছে কতবার | এমনই একরাতে একটা কফিশপ থেকে বেরিয়ে ফিরে এসে আবার বাড়িতে ফিরে যখন পোশাক ছাড়ছি জোনাকিকে বারন করলাম পোশাক ছাড়তে | বললাম আবার বেরোবো চলো | পরদিন ভোরবেলা বাড়ি ফিরেছি সেদিন |

Sponsored
loading...

NO COMMENTS