তারে ধরি ধরি মনে করি ধরতে গেলেম আর পেলেম না। তারে আমার আমার মনে করি আমার হয়ে আর হইল না।

টাকা আছে, আবার নেই। নিজের টাকা নিজের কাছেই নেই। যা দিনকয়েক আগেই ছিল, তা অবশ্য এখনও আছে। তবে তার প্রাণভোমরাটা হঠাৎ গিয়েছে উড়ে। কিছুদিন আগে স্ট্যাটাসমাখা পকেট ভারি লাগছিল যে কাগজগুলো নিয়ে, সেগুলো এক্ষুণি পকেট থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারলে বাঁচি।

বিবিধের মাঝে এখন মিলন মহান। কারণ দেশের একশ পঁচিশ কোটি মানুষ একসঙ্গে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলেছেন। সপ্তাহ দেড়েক আগে প্রধানমন্ত্রীর সেই বিখ্যাত ঘোষণা শোনা মাত্র দেশের আম আদমির যাবতীয় কাম গিয়েছে চুকে। অ্যালার্ম লাগিয়ে তাঁরা ঘুম থেকে উঠছেন। আর বিছানা ছাড়ার পর প্রকৃতি ডাকছে না, ডাকছে ব্যাঙ্ক। গত কয়েকদিনে দেশে যে গোবেচারা কাগজটি সবচেয়ে বেশি ফটোকপি হয়েছে তা হল টাকা পাল্টানোর এফোর মাপের এক পাতার ফর্ম। এটিএম মেশিনগুলিতে টাকা ভরার খবর পেলে মনে হচ্ছে যেন উজিয়ে এল কোনও গুপ্তধনের খোঁজ। মৌমাছির চাকের মতো হই হই করে সেখানে জড়ো হয়ে যাচ্ছেন শয়ে শয়ে লোক। যাঁরা কোনওমতে ম্যানেজ করে টাকাটা তুলতে পারছেন, তাঁদের হাসির পাশে ক্যাটরিনা সোনমও ফ্যাকাশে। আর জ্যান্ত লাইনের সামনে টাকা শেষ হয়ে গেলে ব্যাঙ্ক কিংবা এটিএমের ঝাঁপটা পড়ে যাচ্ছে যখন, মনে হচ্ছে পাঁজরে হাতুড়ি পিটছে কেউ। অগত্যা আবার অন্য রাস্তার জন্য মরিয়া খোঁজ।

কালো টাকা সাদা করার জন্যেই তো এত ঢক্কানিনাদ। ব্যাঙ্কের ভিতরে যাঁরা কাজ করছেন আর ব্যাঙ্কের বাইরে যাঁরা প্রহর গুণছেন—দুপক্ষই বেশ কিছুদিন হল রাত জাগছেন। প্রধানমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন, একটু অসুবিধা হবে। প্রধান বিরোধী দলনেতা, যিনি জীবনে কোনও দিন ব্যাঙ্কমুখো হয়েছেন কি না সন্দেহ, তিনিও গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে ব্যাঙ্কে টাকা বদলের লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। যেন ওই সামান্য টাকাটা বদল করা ওই মুহূর্তে তাঁর খুব দরকার। ‘ধর না আমায়’ বলে তেলেবেগুনে জ্বলে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে ধর্নায় বসে পড়ছেন কোনও কোনও নেতা। ধর্না বিশেষজ্ঞা আরও একজন তুমুল জনদরদী নেত্রী ক্রমশ মেজাজ হারাচ্ছেন। অনশন শুরু করে দিতে পারেন যে কোনও সময়। সাঙ্গপাঙ্গরা তাই ভরপেট্টা খেয়ে নিচ্ছেন কয়েকটা দিন। অনুপ্রেরণায় দুম করে খাওয়া বন্ধ হলে শরীর থাকবে? আরেক নেতার আবার রাগ নরেন্দ্র মোদী পাঁচশ হাজার বাতিল করেছেন বলে নয়, বাতিল করে জাপান উড়ে গিয়েছিলেন বলে। আমরা গেটে আর উনি জেটে! কালকেই অফিস ফেরত বাড়ি আসার পথে যাঁর সামনে রাখা বাটিতে দু’টাকার একটা কয়েন ছুঁড়ে দিয়েছেন, আজ হয়ত তাঁকেই দেখবেন ব্যাঙ্কের লাইনে আপনারই সামনে দাঁড়িয়ে। ‘এই ঝুলিতে বাষট্টি হাজার আছে। তবে পুরো সাদা টাকা বাবু। আপনারাই দিয়েছেন।’ বরের পকেট কাটা আসলে যে মহাবিদ্যা এবং শুভকাজ, দুর্দিনে তা প্রমাণ করে রাতারাতি অনেক গৃহবধূ মসিহা হয়ে গেলেন। নোট বাতিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বেমক্কা ঘোষণাটা না হলে ওই টাকাগুলো ‘কোথা যে উধাও হল’-র মতোই হয়ত চোরা গুণগুণ করে যেত গৃহকর্তাদের মনে। সমাজের নানা স্তরের দামোদর শেঠদের ঘরের, মেঝের, সিন্দুকের, কমোডের গুপ্ত কুঠুরিতে পড়ে থাকা যে টাকা দিনের আলো দেখেনি বহুদিন, সেগুলির কিছু বাসা বদলে যাচ্ছে ব্যাঙ্কে। আর তুমুল ফ্রাসট্রেশনে টাকা বস্তাবন্দি করে ফেলে দিচ্ছেন কেউ কেউ। উদ্ধার করা গোটা কিংবা কুচিকুচি কাটা নোটগুলো ভিজে হলে জানবেন, ঘামে নয়, চোখের নোনতা জলে ভিজেছে সেগুলো। পাঁচশ হাজারের বস্তাভর্তি এমন দামি আবর্জনার স্তুপ এ দেশ এর আগে কখনও দেখেছে কি!

আরও পড়ুন:  গৌরী লঙ্কেশ – একটি দিনগত মৃত্যু

ভারতবর্ষ এক আজব দেশ। সুযোগ পেলেই চোর-পুলিশ খেলাটা আমাদের মজ্জাগত। রাস্তাঘেঁষা পাঁচিলের দেওয়ালে ঠাকুর দেবতার ছবি সাঁটা না থাকলেই সেটা আঁধারবেলায় শৌচালয় হয়ে যায়। সিসিটিভি না দেখতে পেলেই মেট্রোর সিঁড়ির ধারে পানের পিক পড়ে। রাস্তায় ‘মামা’ না থাকলেই সিগনাল দূর হঠো। আসলে ‘ধাপ্পা’ না শোনা পর্যন্ত আমরা ‘টুকি, টুকি’ বলেই জীবনটা কাটিয়ে দিই। তাই তো নতুন দুহাজারি নোট বাজারে ঠিক ঠাক আসতে না আসতেই বেরিয়ে যায় তার জাল। জাল ধরতে পুরনো নোটে জল রাতারাতি জল ঢালা হল। আর সেই জল শুকোতে না শুকোতেই নতুন নোট জাল হল। মেরা ভারত মহান।

টাকা তোলা আর জমা নিয়ে সরকার বাহাদুর নিত্যনতুন কানুন বানাচ্ছেন। সেটা হাওয়ায় ভাল ভাবে ভেসে আসার আগেই চলে আসছে সেই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কাজ হাসিল করার নানা ফন্দি ফিকির। চার রকমের আইডি কার্ড নিয়ে লোকে চারটে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা বদলাচ্ছে। ওদিকে হাতে কালি মাখানোর খবর চাউর হতেই ভোজবাজির মতো লাইন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে নিমেষে। দেশের যে জন ধন অ্যাকাউন্টগুলো দশ টাকার বেশি ব্যালেন্স দেখেনি কোনও দিন, বুভুক্ষুদের গ্রামে আকাশ থেকে কোর্মা কালিয়া পোলাও পড়ার মতো সেখানে দুম করে জমা পড়ে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। অ্যাকাউন্টপিছু জমা পড়া টাকা আড়াই লক্ষের মধ্যে রাখতে পারলে নাকি আয়করবাবুদের ভুরু কুঁচকোবে না। তাই অনেক অ্যাকাউন্টেই জমা করা হচ্ছে তার থেকে ঠিক এক টাকা কম।

পকেটে একশ বাইশ টাকা সম্বল করে পাঁচটা ‘শূন্য এ বুকে’ এটিএম ঘুরে এসে এই লেখা লিখছি যখন, তখন যে ব্যাঙ্কে টাকা আছে, সেই ব্যাঙ্কে আঙুলে মাখানোর কালি নেই। আবার যেখানে কালি আছে, সেখানে টাকা নেই। ব্যাঙ্কের বাইরে লাইনে অপেক্ষায় আছেন যাঁরা, একটা প্রশ্নের কিচিরমিচির তাঁদের মধ্যে খুব। ‘দাদা, কালি দিচ্ছে না তো?’ দিচ্ছে জানলেই মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে যাচ্ছে। কালি যদি একান্তই লাগিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেই পাপী আঙুলের একটা ‘গতি’ করার জন্য কয়েকজন আবার বৌয়ের নেল পালিশ রিমুভার পকেটে করে নিয়ে আসা শুরু করেছেন। সম্প্রতি জানতে পারা গিয়েছে, বিয়ে সামনে আছে এমনটা প্রমাণ করতে পারলেই বর ও কনে পক্ষ মিলিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে আড়াই লক্ষ টাকা তুলতে পারা যাবে। দেখলাম, লাইনে দাঁড়ানো এক মুশকো চেহারার লোক এক গাল হেসে কলারটা খানিক তুলে টকাস করে পানমশলা-জর্দার পিকটা রাস্তায় ফেলে পাশের লোকটিকে বলছেন, ‘বুইলেন মশাই, বড়বাজারের প্রেসে কাজ করি। আটাত্তর বছরের মালিক আজ ছেলের বিয়ের কার্ড ছাপাচ্ছে। আসার আগে বলল, কাল সে কোই দিক্কত নেহি হোগা।’

আরও পড়ুন:  ‘সমালোচক’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কি স্ববিরোধী? (জন্মদিন উপলক্ষ্যে বিশেষ রচনা)

ফেসবুকের ওয়ালে, হোয়াটসঅ্যাপের গ্রুপে প্রধানমন্ত্রীর ওই ঘোষণার পরে আলোচনার আর অন্য কোনও বিষয় নেই। ডিমানিটাইজেশন নামক একটা অজগর সাপের মতো বড় শব্দ আজ সবার মুখে মুখে। দুহাজার টাকার নোট নিয়ে সেলফি তোলার ধুম পড়েছে। একজনের আবার অভিযোগ মাখানো পোস্ট, কপাল থেকে ঘামের ফোঁটা টুপ করে নতুন দুহাজারি নোটের উপর পড়তেই নাকি সেখান থেকে রং উঠে গিয়েছে।

ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ থেকে পাওয়া দুটো মেসেজের কথা উল্লেখ না করলে এই লেখাটিও টাকাহীন এটিএমের মতো মণিহারা ফনি হয়ে যায়।

দুই রিটায়ার্ড বন্ধুর অনেক দিন পরে দেখা। প্রথম জন দ্বিতীয় জনকে শুধোলেন, ‘ছেলেমেয়েরা কোথায় হে? বাড়ির খবর কি?’ যা উত্তর পেলেন তা হল, ‘বড় ছেলে এসবিআইতে আছে, বড় বৌমা ইউবিআইতে। মেজছেলে আইসিআইসিআইতে আর মেজবৌমা পঞ্জাব ন্যাশনালে। মেয়েটা ছোট, এই সবে অ্যাক্সিসে ঢুকলো।’ প্রথম বন্ধু মহা উৎসাহে বললেন, ‘বা রে বা। পরিবারের সবাই ব্যাঙ্কে!’ দ্বিতীয় বন্ধু একটু ঢোক গিলে বললেন, ‘আরে না না ভাই। আসলে সবাই ওখানে লাইন দিয়েছে।’

নোট কান্ডের পর এক জন তো একটি গোটা গানই গেয়ে ফেলেছেন উদাত্ত গলায়। হোয়াটসঅ্যাপে গানটি ভাইরাল। দুর্ভাগ্য, এই সব সুরসিকেরা আমাদের অগোচরেই থেকে গেলেন, দুহাজার টাকার নোটে বসানো ন্যানো চিপের মতো। এই আজব গুজব চিপ কোথায় আছে, কেউ জানে না। গানের লিরিকের কয়েক চামচ তুলে দিলাম।

না পেয়ে তোমার দেখা, পকেট ফাঁকা, দিন যে আমার কাটে না রে
ভেঙে মোর হাজার টাকা দিয়ে যাবি কে আমারে, ও বন্ধু আমার
সমুখে পাঁচশ টাকা হাজার টাকা যেতে হবে ব্যাঙ্ক দুয়ারে
নতুনের দেখা পেতে হবে যেতে ব্যাঙ্ক পিও-র দ্বারে দ্বারে
দেশবাসী জনে জনে, রেডি উইথ ক্যামেরা ফোনে
নিউ নোটের সেলফি নেবে এক নাগাড়ে…।

NO COMMENTS