বাংলালাইভ রেটিং -

সেদিন সাতসকালে চেতলার মাছের বাজারে হঠাৎ ঝন্টুদা’র সঙ্গে দ্যাখা। ভদ্রলোকের আসল নামটা অবশ্য অন্য, তবে সত্যি পরিচয়টা ফাঁস করতে চাই না বলে এই নামটা এখানে বানিয়ে বানিয়ে লিখলাম।

সবে বোধহয় তখন জমিয়ে একটা ইলিশ দর করতে শুরু করেছিল লোকটা, আমায় দেখে মাঝপথেই সেসব ছেড়ে ছিটকে এল এদিকে। ‘তোমার সঙ্গে খুব দরকার আছে গুরু। আলাদা করে একটু বসতে চাই কোথাও, আজ বিকেল নাগাদ সময় হবে তোমার?’

আমি তো শুনে বেশ কিছুটা থমকে গিয়ে থ’! ঝন্টুদা তো ওষুধের দোকান চালিয়ে দিব্যি টু পাইস করছে বলেই শুনেছি, তার ওপর সেই দোকানের পেছন দিকটা আবার টিভি-সিনেমার এডিট স্যুট বানিয়েও নাকি মাল কামাচ্ছে দেদার। সব মিলিয়ে তুঙ্গে বৃহস্পতি। নতুন করে এই ঘাঘু লোকের কোন কাজে লাগবোটা আমি, শুনি?

আমার এই জিজ্ঞেসাটা বোধহয় আমার চোখ-মুখ দেখেই পড়তে পারল লোকটা। দেখলাম এবার মুখে একটা আদুরে-আদুরে হাসি খেলছে। ‘আসলে তোমার অ্যাডভাইস চাইছিলাম একটু – তুমি তো এ লাইনে অনেকদিনের লোক!’ এবার এটা শুনে তো আমি আরও তাজ্জব। ‘কোন লাইনের কথা বলছ গো তুমি ঝন্টুদা? এই মাছের বাজারের লাইন?’

‘আরে দূর… তা কেন হবে, বলছি এই টিভি-সিনেমার লাইনের কথা। আমার ছেলেটাকে ফিল্ম ডিরেক্টর বানাবো বলে ঠিক করলাম কিনা… প্ল্যান-ট্যান সব সাজিয়ে ফেলেছি দিব্যি, ফাইনালি সেসব তোমায় একটু দেখিয়ে নিতাম আর কি!’

শুনে আমি বাজারের জল-কাদার মধ্যেই ঠাস করে অজ্ঞান হয়ে পড়ি আর কি! ‘বলছ কী বস, তোমার ছেলে ফিল্ম ডিরেক্টর হবে? মানে… ও শিখেছে এসব কিছু? ডিরেকশনের কোর্স-ফোর্স সব করে ফেলেছে নাকি?’

‘আরে না না! রাখো তোমার কোর্স! ওসব শিখলে এই বাংলা বাজারে করে খেতে হবে না আর! দেখছি তো সব হাল হকিকত, ডিরেক্টরগুলোর বেশিরভাগই তো টপ লেভেলের ড্যাশ! ওর জন্য আবার কোর্স কী লাগে শুনি?’ বলে এবার গলাটা আরও আস্তে করলো ঝন্টুদা, ‘আর ছেলে ডিরেকশন দেবে না ঘেঁচু, জানো তো ও একটু মাথামোটা টাইপের আছে! ওকে সামনে রেখে পেছন থেকে পুরোটা চালাবো তো আসলে আমি!’

মানে? এবার আমি এত ঘাবড়ে গেছি যে আমার কথাই প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে!

‘দ্যাখো – খুলেই বলছি পুরোটা…তোমার কাছে লুকোতে চাই না কিছু! এই এডিট স্যুট চালাতে গিয়ে টালিগঞ্জের মক্কেল তো আর কম দেখলাম না আমি। জানো তো – ডিরেক্টর গাধা হলেও চাপ হয় না কিছু, শুধু ক্রু মেম্বারগুলোকে চোখা হতে হয় – ব্যাস! তাহলে আমার ছেলেটাই বা পারবে না কেন, বলো? সলিড একটা অ্যাসিস্ট্যান্ট রেখে দোব সঙ্গে, সে-ই তো ম্যানেজ করে দেবে সবটা। আরে, আমি কথা বলে নিয়েছি সবার সঙ্গে – এই ইন্ডাস্ট্রির টপ ক্যামেরাম্যান, টপ এডিটর, টপ সাউন্ডের লোক – সবাই রাজি হয়ে গেছে এই প্রোজেক্ট করতে। সবার শুধু মনের মতো পয়সা হলেই চলবে! ডিরেক্টরের তাহলে কাজটা কী আর রইলো, বল তুমি? শুধু ওই অ্যাকশন বলবে, আর কাট!’ এবার দেখলাম ঝন্টুদার মুখে একটা দুষ্টু-দুষ্টু হাসি।

‘দেবী’ সিনেমাটা নিয়ে লিখতে গিয়ে শুরুতে যে এতটা ঝন্টুদার গল্প লিখে বসলাম, সেটা কেন জানেন? ছবিটার একশো মাইলের মধ্যে কোথাও হয়তো ওই ভদ্রলোক নেই। তবু সিনেমাটা দেখতে দেখতে কেন যেন ঝন্টুদা’র সেই অমর-বাণীই মনে পড়ে যায় খালি! ‘বুঝলে গুরু, আরবান বাংলা সিনেমা মানে এখন হচ্ছে জাস্ট গিমিক আর প্যাকেজিং। বাজার গরম হবে এমন একটা সাবজেক্ট বেছে নাও ফার্স্ট, তারপর তাতে গরম মশলা টাইপের একটা কাস্ট ফিট করে দাও দেখি? এরপর দ্যাখো, রগড় কেমন জমে।’ বলতে বলতে দাদার মুখে কেল্লা ফতে হাসি! আর এখন ‘দেবী’ ছবিতে পাওলিকে যত দেখছি, মনের মধ্যে বুড়বুড়ি কাটছে ভদ্রলোকের ওই কথাগুলো শুধু।

গিমিক বলে গিমিক! দেবদাস লেখার একশো বছর পূর্তি, সেই একশো বছরে পৌঁছে প্রায় কান মলে দিয়ে সোজা সেই ‘দেবদাস’ ক্যারেক্টারটাকেই মেয়ে বানিয়ে ছাড়ো, ভাই। ওই দিনকয়েক আগে অঞ্জন দত্তও করলো না? দশ বছর আগে ‘ দ্য বং কানেকশন’ বানিয়েছিল ছেলে ক্যারেক্টার নিয়ে, এখন আবার তার একটা লেজুড় তৈরি করতে গিয়ে ধুমাধার ছেলে ক্যারেক্টারের বদলে কাট-পেস্ট মেয়ে ক্যারেক্টার বসিয়ে দিল গল্পে। কিছুটা সেইরকম ব্যাপার আর কী এটা।

আরও পড়ুন:  মেয়ের কী নাম রাখলেন সোহা-কুণাল?
মডার্ন পার্বতীর সাজে শুভ মুখার্জি

কাজ তো বেজায় ইজি! ‘দেবদাস’-এর জেন্ডার উলটে দিয়ে এখানে ওকে বানিয়ে দাও ‘দেবী’ (পাওলি)। ‘পার্বতী’কে করে দাও প্রতীক (নবাগত শুভ মুখার্জি) আর চন্দ্রমুখী হয়ে যাক চার্লি ওরফে চন্দন (শতাফ ফিগার)। আর মার্কেটিং বাজেটের বেশ কিছুটা হাভাতে ওই প্রিন্ট মিডিয়ার শ্রীমুখে দাও ঢেলে। ব্যাস – অমনি দ্যাখো সবাই মিলে কেমন তোমার ফিল্মকে নিয়ে ধন্য-রব তোলে!

তবে ক্লাসিকের ওপর এই লেভেলের রেলাবাজি দ্যাখাতে গেলে শেষ মুশকিলটা কোথায় হয়, জানেন? অন্ধ হাবার মতো কাট-পেস্ট করে করে রোল রিভার্সাল করিয়ে দিলেই যে গল্প দাঁড়ায় না, ক্যারেক্টারগুলোকে কনভিন্সিং বানিয়ে তুলতে যে রাইটারের রীতিমতো কব্জির জোরও লাগে, সেই মহা-সত্যিটা কোথাও গিয়ে চুপচাপ জাস্ট চাপা পড়ে যায় যেন!

পুরো ছবিটা জুড়ে এখানেও তাই কেমন একটা ‘বকচ্ছপ’-এর ভাব। যেন, হওয়ার ছিল কী, আর ধেড়ে খোকার হাতে পড়ে হয়ে গেল শেষে কী!

মডার্ন চন্দ্রমুখী শতাফ ফিগার

ক্রেডিট টাইটেলে দেখলাম, এ ছবির স্ক্রিনপ্লে আর ডায়ালগ লিখেছেন ঋতর্ষি দত্ত নামের কেউ। এখন শরৎ-কাহিনীকে মুচড়ে ধরে উলটে দেওয়া কী আর চাট্টিখানি কথা! কিছুটা দম তো নতুন রাইটারের থাকতেই হবে, ভায়া! এই ঋতর্ষির কি অতটা দম আছে? ধুস! দম দ্যাখাবেন কী, মনে হচ্ছিল যে, আধো-আধো করে কোন মতে সব সিকোয়েন্সগুলো নামিয়ে ফেলতে পারলেই যেন ঋতর্ষি মুক্তি পেয়ে বাঁচেন!

শুরুর সিনটাই ধরুন। কলকাতার এক বাঙালি ফ্যামিলি – বিয়েবাড়ির সিন। সিনের পর সিন গড়াচ্ছে, অথচ কার বিয়ে, কবে বিয়ে, কখন বিয়ে, কারুর ডায়ালগে বা রিয়্যাকশনে কিস্যু তার বোঝার উপায় নেই! সঙ্গে আর্ট ডিরেকশনের চরম নমুনা ফ্রি, পুরো বাড়িটার দেওয়ালে দেওয়ালে গাঁদাফুল দিয়ে সাজানো! বাঙালি বিয়ের সাজগোজ বুঝি এরকম গাঁদাফুলে হয়, ভাই? নাকি তামিল রিমেক করতে করতে মাথাটা ঘুলিয়ে গেছে?

সেই বাড়ির ওপরতলায় নিজের ঘরে চুটিয়ে দেবী গাঁজা টানিতেছে বসে। তারপর যেই খেয়াল হল, বয়ফ্রেন্ডকে সঙ্গে নিয়ে তার শহর বেড়ানো শুরু। এবার কলকাতা শহরের বুকে যেই সেই বাইক রাইড চালু, সঙ্গে সঙ্গে অমনি একটা গান শুরু হল হিন্দি! স্ক্রিনে তখন একটার পর একটা বিগিনিং ক্রেডিট পড়ছে। আর আমার তো এদিকে তখন প্রায় খাবি খাওয়ার দশা। পুরোদস্তুর বাংলা একটা ছবিতে গুঁতিয়ে হঠাৎ হিন্দি গান ঢুকল এসে কোন লজিকে শুনি?

হঠাৎ একটা বিয়ের গান… এই গানের সঙ্গে গল্পের কোন যোগই নেই

তখনও জানি না যে গোটা সিনেমাটায় আসলে ওই লজিক নামের জিনিসখানাই নেই। যে বাড়িতে অমন জাঁদরেল একটা মা (সুদীপা বসু) আর সঙ্গে খুব নির্বিরোধী ভালোমানুষ একটা বাবা (অর্ধেন্দু ব্যানার্জি) ফুল ভল্যুমে হাজির, যে বাড়ির ছোট্ট মেয়ে দিয়া (রিমা গুহঠাকুরতা) বেশ মিষ্টি-শান্ত-লক্ষ্মীমন্ত, সেই বাড়ির বড় মেয়ে দেবী খামোখা এমন বিগড়ে গেল কেন? কে দেবে উত্তর এর বলুন? একেক সময় মনে হচ্ছিল ওই গাঁজার নেশা কি একলা শুধু দেবী-ই করে, নাকি সেই ধুমকিতে চিৎপাত থাকে স্ক্রিপ্ট রাইটার আর ডিরেক্টরটি নিজেও? না হলে এমন কাগের ঠ্যাং – বগের ঠ্যাং ছবির চলন কি এমনি এমনি হয়!

সোশ্যাল স্ট্রাকচার নিয়ে মোটের ওপর যে আইডিয়াটুকু ছিল, তাতে মনে হতো, প্রি-ম্যারিটাল সেক্স করতে গিয়ে গাঁইগুই করার ব্যাপারটা বোধহয় মেয়েদের দিক থেকেই আসে। কিন্তু এ ছবিতে তেড়ে রোল রিভার্সাল দ্যাখাতে হবে তো, নাকি? তাই এটাও এখানে দ্যাখানো হল দিব্যি, যে দেবী খুব ‘করতে’ চাইছে ওটা, আর প্রায় অভিমানী মুখে প্রেমিক-প্রবর প্রতীক তখন লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যেতেই ব্যস্ত! রিয়্যালিটিগুলো উলটে যাচ্ছে, খুব ভাল কথা ভাই! কিন্তু এই উলটে যাওয়ার জাস্টিফিকেশন স্ক্রিপ্ট থেকে হাওয়া হয়ে গেল কেন?

আর কাণ্ড দেখুন, ফ্ল্যাশ ব্যাকে তো কিশোর বয়সে চুটিয়ে ওদের সেক্স করবার গরমাগরম সিন। প্রতীক নিচে, আর ওর ওপর চড়ে বসেছে সেই দেবী। প্রথমবার হওয়ার পরে প্রতীকের হাতের আঙুল টেনে ধরে নিজের দু’ পায়ের ফাঁকে কোথায় আবার ঠেকিয়ে দিল মেয়ে, আর অমনি ক্যামেরা দ্যাখাল প্রতীকের সেই হাতের আঙুলে লাল টুকটুকে রক্ত রয়েছে লেগে! সাদা-কাল ফ্ল্যাশ ব্যাকেতে টুকটুকে লাল ব্লাড, মনে হল দৃশ্য দেখে প্রণাম ঠুকি একটা! আরবান ফিল্ম মানেই যে এখন গিমিক দেওয়ার হিড়িক, ঝন্টুদার সেই অমৃত-বচন মনে পড়ে গেল ফের।

আরও পড়ুন:  অভিনেত্রী টিউলিপ জোশীকে মনে পড়ে? তিনি এখন কোটিপতি ব্যবসায়ী!

কিন্তু শরীর নিয়ে দুজনের এই মিষ্টি মিষ্টি খেলাটা হঠাৎ বন্ধ হল বা কেন? দেবী হঠাৎ করে স্টেটসে চলে গেল কেন, ভাই? তা গেলই যদি বা, ফের হঠাৎ করে দেশে ফেরত এলো বা কেন? তারপর ফের সাউথ ইস্ট এশিয়া চরতে বেরল কেন? ওকে এত-এত টাকাপয়সাই বা জুগিয়ে যাচ্ছে কে? প্রতীকের ছোঁয়া এড়িয়ে গিয়ে বছরের পর বছর যখন কাটিয়ে দিচ্ছে দিব্যি, তখন প্রতীকের বিয়ের খবর পাওয়ার পরে দূর বিদেশে চেঁচিয়ে-টেচিয়ে আদিখ্যেতারই বা মানে কতখানি আছে?

আরও শুনুন কথা! প্রতীকের তো জানতাম নাকি কলকাতাতেই বাস। সিনেমার সেকেন্ড হাফে, প্রতীকের বিয়ের খবর পেয়ে দেবীর যখন পাগল-পাগল দশা, ও যখন পুরো রাত চক্কর কাটছে পাটায়া সিটির পথে, তখন কাণ্ড দেখুন, হঠাৎ করে দেখতে পাবেন ফ্যামিলি নিয়ে আলিশান এক বাংলো সহ প্রতীকও নাকি এখন সেই পাটায়া সিটিরই লোক! রাত দুটোর সময় হাজত থেকে দেবীকে বাঁচাতে দিব্যি ছেলেটা পুলিশ স্টেশনে যায়! এখন আপনি বলুন, কী মনে হচ্ছে এতটা পড়ার পর? স্ক্রিপ্টটা কি আদৌ সিরিয়াস হয়ে লেখা, নাকি পুরোটাই প্রোডিউসারের পয়সা উড়িয়ে সেই খিল্লি খেলার মতো?

সারাদিন জুড়ে ভিজে বা শুকনো হরেক রকম নেশা করাই দেবীর প্রধান কাজ। মদ-গাঁজা তো রয়েছে বটেই, সঙ্গে যখন-তখন দিব্যি চুটিয়ে কোকেন টানারও পালা! অথচ ডায়ালগে কী শুনতে হচ্ছে, জানেন? অরগ্যান ট্র্যাফিকিং নিয়ে দেবীর তৈরি সিরিয়াস সব রিপোর্টের জেরে দুনিয়া জুড়ে নাকি এখন তুলকালামের ঝড়! ইউটিউবে ওর আপলোড করা কাজ দেখবে বলে ওর ফ্যানবেস নাকি অপেক্ষা করে থাকে! পুরো ছবি জুড়ে যে মেয়েটা স্রেফ হিপির মতো ঘুরে ঘুরে যায় শুধু, আর ড্রাগ নিয়ে যায় খালি, তার নামে এসব শুনতে থাকলে, আর মাথা ঠিক থাকে ভাই?

হঠাৎ করে জীবনানন্দের কবিতা ঢুকে পড়েছে ছবিতে

একটা পেনিলেস জাঙ্কি (উপমাটা এই সিনেমা থেকেই নেওয়া) ছাড়া ওকে দেখে যখন আর কিচ্ছু মনে হয় না, তখন কিনা ব্যাকগ্রাউন্ডে জুড়ে দেওয়া আছে জীবনানন্দের কাব্যি। ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’। সেই সময়গুলো মনে হচ্ছিল, বড় কষ্ট পেয়ে পরলোক থেকে যেন যন্ত্রণাতে ককিয়ে উঠছেন কবি। ‘বনলতা সেন’ কবিতাটা ঠাস করে এভাবে ওঁর নিজের গালেই পড়তে পারে কখনো, আগে থেকে আঁচ করতে পারেন নি বোধহয়!

এরপর তো আবার সিনেমাতে মাঝে মাঝেই নাইট ক্লাবে যেমন খুশি নেত্য করার সিন। বেহেড টাইপের সিনেমা দেখতে দেখতে তখন ঘোর এসে গেছে এমন যে সেই নাচগুলোকে মনে হচ্ছে ঠিক যেন উল্লুকের নাচ বলে। একবার তো এটাও মনে হল, ধরা যাক শরৎবাবু বেঁচে আছেন আর প্রিমিয়ারে ডাক পেয়ে বঙ্গপ্রতিভার বানানো ছবি দেখতে গেছেন খুব আশা-টাশা নিয়ে মনে। এই আনাড়ি বালখিল্যপনার জেরে তাঁর তো তখন হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেত ভাই! এক্সপেরিমেন্ট করতে গেলে মিনিমাম একটা শিক্ষা লাগে তো, নাকি? সেই শিক্ষাই তো ‘দেবদাস’ ভেঙেচুরে একটা ‘দেব ডি’ বানিয়ে নিতে পারে!

ঋকের প্রথম ছবি হওয়ার কথা ছিল এটাই

‘দেবী’ ছবির ডিরেক্টর ঋক বাসু’র আদৌ সেই শিক্ষা-দীক্ষা নেই নাকি ইচ্ছে করেই এই সিনেমাটা খুব হেলা-ফেলা করে বানিয়ে নিলেন, জানি না আমি, ঠিকই। হতে পারে এটাই ভদ্রলোকের কাজের স্টাইল। যে, সিনেমার নাম করে যা বানিয়ে দেব, তার একটা সিনের সঙ্গে কোন তাল থাকবে না পরের সিনের আদৌ। কিন্তু এমনভাবে প্যাকেজ করে, প্রোমোট করে মাল ছাড়বো বাজারে যে লোকে হুড়হুড়িয়ে দেখতে আসবে ঠিক! ‘দেবদাস’ চটকে মাখতে গিয়ে শরৎবাবুর জন্মদিনটা টার্গেট করে ছিপ ফেলবো গাঙে। ১৫ সেপ্টেম্বর রিলিজ হবে পোস্টার আর টিজার। আর পার্সোনাল র‍্যাপোর জেরে বাংলার সেলেব-কুলের সার্টিফিকেট ম্যানেজ করা তো জাস্ট নস্যি তখন, ভায়া!

আরও পড়ুন:  উত্তরাধিকার সূত্রে আরাধ্যাকে কী দিতে চান ঐশ্বর্য?
এই ছবি থেকে আইডিয়া কপি করে সাজানো হয় ‘ভিডিও’ ছবির প্লট

একটু ফ্ল্যাশ ব্যাকে যাই চলুন। বছর তিনেক আগে প্রথম নিজের ছবি তৈরির প্ল্যান ঘোষণা করেন ঋক। সেটা কিন্তু এটা নয়, অন্য একটা ছবি। ‘ভিডিও’ নামে সেই ছবিটা কখনো আর তৈরি হয় নি ঠিকই, তবে ওটার ট্রেলার কিন্তু আজ এখনও ইউটিউবে আছে। দেখলে পরে বুঝতে পারবেন, আগাপাস্তলা ‘দ্য ব্লেয়ার উইচ প্রোজেক্ট’ (১৯৯৯) থেকে কনসেপ্ট টুকে প্ল্যান করা হয় ওটা। সে ছবির পোস্টারে পরিচালকের নামটা আবার স্টাইল মেরে ‘রিক বি’ বলে লেখা! দেখলে পরে, মানতে হবে, আর কিছু না থাক, তখন থেকেই তোমার হেভি কেত রয়েছে গুরু!

এরপর নামী প্রোডাকশন হাউসে দামি দামি সব বাংলা ছবির ট্রেলার কেটে হাত পাকানোর শুরু। সেসব করতে করতেই আবার নতুন করে ছবি তৈরির সুযোগ। ‘জি বাংলা অরিজিনালস’ বলে একটা সিরিজ হতো না আগে? সেখানে সেই ঋক বানালেন ‘বনলতা’ নামের একটা ছবি। ছবির কনসেপ্ট নাকি শর্মী পাণ্ডে বলে কারুর লেখা, আর স্ক্রিপ্ট নাকি লিখে দিয়েছিলেন ‘সৃজাত বন্দ্যোপাধ্যায়’ নামের কেউ। এখন এই বানানের ‘সৃজাত’ আসলে সেই কবি ‘শ্রীজাত’ কিনা, নাকি এটা অন্য আর কেউ, সেটাও বোধহয় এক সেই ঋক নিজেই কেবল জানেন।

এই ছবির কনসেপ্ট টুকে তৈরি হল ‘বনলতা

ঋক বাসু’র প্রথম সৃষ্টি, টেলিভিশনের জন্যে তৈরি ‘বনলতা’ নামের সেই ছবিটা যদি জোগাড় করে দেখতে পারেন, আঁতকে উঠে মালুম পাবেন, সে ছবিরও মূল কনসেপ্ট ঝাড়া! একতা কাপুরের ‘রাগিনী এম এম এস’ (২০১১) থেকে ঋকের বানানো এই বাংলা কপিতেও কাঁচা সেক্স আর উৎকট হরর ছিল ঠাসা! চ্যানেল অবধি বাধ্য হয়ে সে ছবির স্লট পিছিয়ে দ্যায় গভীর রাতের দিকে। আর হ্যাঁ, সে ছবিতেও ঋকের ট্রেডমার্ক সেই স্টাইল ছিল পুরো, মানে না ছিল ছবির একটা সিনের সঙ্গে অন্য সিনের কোন মিল, না ছিল সংলাপের মধ্যে আদৌ কোন লিংক, আর না ছিল সে ছবির কোন ঘটনার মাথা কিংবা মুণ্ডু!

এই সব কিছু সারার পরে ফাইনালি বড়পর্দায় এই ‘দেবী’ তৈরির পালা। কাণ্ড দেখুন, ঠিক এইসময়েই আবার নাকি বেছে বেছে সেই একতা কাপুর-ই কাজ করছেন ‘দেবদাস’-এর ফিমেল ভার্সন নিয়ে! আর সেটা জানতে পেরে এবার ঋকের দাবি, দেবদাসকে মেয়ে হিসেবে ক্রিয়েট করার অরিজিনাল ক্রেডিট নাকি আসলে ওঁর, ওই একতা কিংবা অন্য কারুর নয়। শুনে মনে হল, বলি, সাবাশ বাঙালি সাবাশ! সেবার ‘ভিডিও’ নিয়ে কী করেছিলে, জাস্ট চেপে যাও গুরু! আর ‘বনলতা’ নামে কেসটা ভুলেও সামনে এনো না যেন। বড় গলা করে ক্রিয়েটিভিটির ক্লেম করে যাও শুধু!

সিনেমা দেখে ‘হল’ থেকে বেরতে গিয়ে শুনতে পাচ্ছি হল-রিয়্যাকশন লাইভ! কে যেন বলছে, ‘বাপ রে বাপ, কোন লজিকে এটা ‘দেবদাস’ হলো ভাই? এতো পাক্কা হরর ফিলিম একটা! টানা দু’ঘণ্টা এই ছবি দেখতে থাকাই তো হরর ইভেন্ট পুরো!’ আর একজনের সোজা কনফেস, ‘নেহাত পকেট থেকে পয়সা খসিয়ে টিকিট কেটেছি দাদা। না হলে কখন চুপচাপ জাস্ট ফেটে পড়তাম আমি।’

আর শেষটা দেখছি সব দায় পড়ছে গিয়ে সেই বেচারা বাংলা ছবির ঘাড়ে। ‘বাংলা ছবি তো, এর চেয়ে ভাল হবেটা কী করে, বলুন?’

লেখার শেষে ফেরত চলুন সেই চেতলা বাজারে সোজা। আরেকবার সেই ঝন্টুদাদা’র কাছে।

আমায় দেখে ঝন্টুদা’র সে কী কান-এঁটো-করা হাসি। ‘কী গো, তুমি দেখলে নাকি ‘দেবী’? ডিরেক্টরকে চিনি না ঠিকই, কিন্তু ওটা তো আসলে আমারই মডেলে তৈরি করা বই’…বলে গলাটা দাদা নামিয়ে আনল খাদে, আর ফিসফিসে হল স্বর! ‘আসলে বইয়ের ভেতরে কী আছে, তাতে কী আসে যায়, বলো? মেন কথা হলো এই বাজারে তো টিঁকতে হবে গো ভাই! … আর ভালো কথা, এটার রিভিউ লিখতে গিয়ে ডিরেক্টরের দোষ ধরো না কো যেন! পাঁঠা পাবলিকের বাজার রে ভাই, আজ বাদে কাল ওই ছেলেটাও এই বাজারে সেলেব হল বলে’।

2 COMMENTS

  1. The movie must be boring but you got into the spirit of it and lengthened the review to the extent of point of saturation. Reviews should always be short and to the point.