বাংলালাইভ রেটিং -

সিন কেটে বাদ দেওয়ার পুরো লিস্টটা হাতে আসার পর সেটা দেখে সত্যি বলতে কি অবাক হয়ে গেছিলাম খুব। মনে হচ্ছিল, এটা কি সত্যি নাকি ইয়ার্কি করছে কেউ?

সিরিয়াসলি সিবিএফসি বোর্ডের তরফ থেকে এই এই দৃশ্য আর শব্দগুলো কেটে বাদ দিতে বলা হয়েছে ছবি থেকে? আর সত্যি সত্যি সেটা মেনেও নিচ্ছেন ছবির পরিচালক অরিন্দম শীল? তাঁর একবারও মনে হচ্ছে না যে, এগুলো করার পর আস্ত ছবিটাকে জাস্ট একটা মশকরার মতো দ্যাখাতে পারে বলে?

সিবিএফসি (চলতি লব্জে আপনারা যাকে ‘সেন্সর বোর্ড’ বলেন) থেকে কাটাকুটি খেলার বিচিত্র ওই লিস্টটা এবার এক এক করে পড়ে যাচ্ছি শুনুন তাহলে।

প্রথমেই ছেঁটে ফেলতে বলা হয়েছে এরকম সব ডিসক্লেমারগুলো যেগুলোতে দাবি করা হয়েছিল যে এই ছবি তৈরি হয়েছে সত্যি ঘটনা অবলম্বনে। এর সঙ্গে হাওয়া করে দিতে হবে ঋণস্বীকারের সেই কার্ডটাকেও, যেখানে বিশেষ একটা বইয়ের নাম ক’রে বলা হয়েছিল সেই বইয়ের অনুপ্রেরণাতেই মূলত এই ছবির নির্মাণ।

এর বদলে ছবির শুরুতে কী জুড়ে দিতে হবে জানেন?

ইংরেজি আর বাংলাতে লেখা নতুন একটা ডিসক্লেমার, যেখানে বলা হবে যে, এই ছবির পুরোটাই নাকি ‘ওয়ার্ক অফ ফিকশন’ মানে বানিয়ে লেখা গল্প! মৃত বা জীবিত কোন ব্যক্তির সঙ্গে কোথাও এর কোন মিল পাওয়া গেলে সে সবটাই নাকি কাকতালীয় পুরো! 

‘কাটস / ইনসার্শন রেকমেনডেড বাই সিবিএফসি’ লেখা তালিকার এতটা অবধি পড়ার পরেই তো আঁতকে উঠেছি আমি। এতদিন ধরে মিডিয়ায় ছবিটাকে বিখ্যাত সেই ধনঞ্জয়ের কেস অবলম্বনে তৈরি বলে ইন্টারভিউ দিয়ে আসার পরে এককথায় নিজের ছবির শুরুতে এরকম ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ মার্কা ডিসক্লেমার দিতে এককথায় রাজি হলেন কী করে ডিরেক্টর?

১৪ বছর কী ভাবে ও জেলের মধ্যে কাটাল তা নিয়ে ছবিতে বিশেষ কিছু নেই

খবরের কাগজের রিপোর্টারের কাছে বিরাট দম দেখিয়ে বলা ওই কথাগুলোরই বা তাহলে কী হবে অরিন্দম? ‘আমি এটুকুই বলব, আমি আজকের লালবাজারের অনেক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা প্রায় সবাই বলেছে, ধনঞ্জয়ের কেসের ব্যাপারে তাড়াহুড়ো এবং ভুল হয়েছিল। এছাড়াও বই পড়েছি। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পড়েছি। নানা সাক্ষীর জবানবন্দি নিয়ে নাড়াচাড়া করেছি। সেই জবানবন্দির নানা ফাঁকফোকর নিয়ে বিখ্যাত আইনজীবীদের সঙ্গে বসে ডিসকাস করেছি। এমনকি পারেখ পরিবারের কিছু মানুষের সঙ্গে কথাও বলেছি যারা আমাকে স্পষ্ট বলেছে, ‘হেতালকা খুন আন্টি নে কিয়া থা, ধনঞ্জয় নহি’। এটা ছিল একটা অনার কিলিং কিন্তু তার খেসারত দিয়েছিল বেচারা ধনঞ্জয়। এবং আমি মানুষ হিসেবেও বিশ্বাস করি ধনঞ্জয়কে ফাঁসানো হয়েছিল। এবং পরোক্ষভাবে এটার জন্য দায়ী ছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং তাঁর স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্য। আমার আর এসব বলতে কোনও ভয়ডর নেই কারণ একটাই জীবন। আজ যদি না বলি কবে বলব?’ অরিন্দমের বয়ানে এই কথাগুলো ছাপা হয়েছে, সংবাদ প্রতিদিনের ‘কফি হাউস’ ক্রোড়পত্রে, শনিবার ১২ অগাস্ট। এরপর অরিন্দম আবার পুরো লেখাটা শেয়ার করেছেন নিজের ফেসবুক পেজেও!

আল্টিমেট রগড় হল, এই লেখা ছেপে বেরনোর ঠিক একদিন আগে রিলিজ করেছে ‘ধনঞ্জয়’, আর খবরের কাগজে এত গরম গরম কথা বলে বেড়ানোর পাশাপাশি, ছবিতে কিন্তু সেন্সর বোর্ডের কথামতো কাট-ছাঁট সব করেই দিয়েছেন অরিন্দম। ছবি শুরুর আগে ইংরেজি আর বাংলায় লম্বা একটা ডিসক্লেমার শুনতে পাচ্ছি সেই পরিচালক অরিন্দম শীলেরই ভয়েসে যে, এই ছবিতে দ্যাখান ঘটনার সঙ্গে জীবিত বা মৃত কারুর জীবনের কোন মিল পাওয়া গেলে সেটা নাকি অনিচ্ছাকৃত আর কাকতালীয় বলেই ভাবতে হবে!

ইংরেজিতে কথাগুলো ঠিক এইরকম যে, ‘দিস ফিল্ম ইজ আ ওয়ার্ক অফ ফিকশন অ্যান্ড ইজ নট বেসড অন অ্যান্ড/অর নট ইনটেনডেড টু বি বেসড অন দ্য লাইফ অফ এনি পার্সন ডেড অর অ্যালাইভ।’ ডিসক্লেমার শেষ হচ্ছে এরকম একটা ঘোষণা করে যে, ছবিটা আর কোন কারণে নয়, নিছক বিনোদনের (এন্টারটেনমেন্ট) জন্য তৈরি!

ছবি পাশমার্ক পেয়ে যাওয়ার পর সেন্সর বোর্ড কর্তা পহেলাজ নিহালনির সঙ্গে হাসিমুখে ছবি তুলে নিজের ফেসবুক পেজে পোস্ট করছেন ঠিক আছে, কিন্তু বুধবার ৯ আগস্ট এটা করতে গিয়ে একবার এটা মনে হল না অরিন্দম, যে একটু যাচাই করে দেখি যে, নিহালনি’র আবদারগুলোয় আদৌ কোন যুক্তি আছে কিনা।

সত্যি ঘটনা নিয়ে ছবি তো আর প্রথম আপনিই বানাচ্ছেন না, এর আগেও এরকম ছবি হয়েছে ঢের। ‘নো ওয়ান কিল্‌ড জেসিকা’-র (২০১১) কথাই ধরুন, সাড়ে ছ’বছর আগে রিলিজ। এর শুরুতে স্পষ্ট লেখা, ‘দিস ফিল্ম ইজ বেসড অন সার্টেন রিয়্যাল লাইফ ইভেন্টস, বাট ইজ নাইদার মিন্ট টু বি আ ডকুমেন্টারি নর বায়োগ্রাফি অফ এনি পার্সন। দিস ফিল্ম ইজ আ হাইব্রিড অফ ফ্যাক্ট অ্যান্ড ফিকশন।’ সে ছবির নির্মাতাদের স্ট্যান্ড কতটা অনেস্ট ছিল, সেটা বুঝতে পারছেন আপনি? পুরনো এই ছবির উদাহরণটা নিহালনিকে একবার বলে দেখতে পারতেন তো, দাদা!

হিন্দি ছবি ছাড়ুন, বাংলা ছবির কথাই না হয় বলি। ঠিক চার বছর আগের ছবি ‘প্রলয়’ (২০১৩)। সেটার শুরুতেও স্পষ্ট করে লেখা যে, ‘যে সত্য ঘটনা নিয়ে এ গল্পের শুরু, সেই ঘটনার নায়ক বরুণ বিশ্বাস, আজকে বহু মানুষের কাছে এক আদর্শ। বরুণ বিশ্বাসের জীবনের কিছু ঘটনা বাদে এই গল্পের বাকি চরিত্র, দল, ঘটনা, সংঘাত সম্পূর্ণভাবে কাহিনীর জন্য কল্পিত। কারোর সঙ্গে কোনরকম মিল সম্পূর্ণভাবে এক সমাপতন। নাটকীয়তার খাতিরে কিছু সংলাপ হয়তো অস্বস্তিকর হতে পারে, তার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।’ আর কিছু না হোক, ডিসক্লেমার দেওয়ার সময় এই ‘প্রলয়’ মডেলটা ফলো করার সাহস দ্যাখাতে পারতেন তো আপনি, অরিন্দম?

আরও পড়ুন:  কীভাবে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন কঙ্গনার সঙ্গে? জানালেন আদিত্য পাঞ্চোলি

শুধু খবরের কাগজে তুফান তুলতে ‘ভয় পেয়ে বাঁচার কোনও মানে নেই’ (আজকাল, ৫ আগস্ট) মার্কা কথা বলে কোন লাভ আছে, বলুন?

অল্প পরিসরেও চমকে দেওয়ার মতো অভিনয় করলেন পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়

দেবাশিস সেনগুপ্ত, প্রবাল চৌধুরী আর পরমেশ গোস্বামী’র গবেষণা-গ্রন্থ ‘আদালত মিডিয়া সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি’ (প্রকাশক –‘গুরুচণ্ডা৯’, প্রথম সংস্করণ – ১১ অগাস্ট ২০১৬) ছাপা হয়ে না বেরলে এরকম একটা বিষয় নিয়ে ছবি তৈরির কথা আপনি কখনও ভাবতেন কিনা, জানি না। ‘ধনঞ্জয়’ দেখতে বসে একেকবার তো মনে হচ্ছিল, আপনার এই সিনেমাটা যেন ওই বইটার একটা ফিল্ম-ভার্সনের মতো। লাইনের পর লাইন যেন ওই বইটা থেকে তুলে নিয়ে নিজের ছবিতে কপি-পেস্ট বসাতে বসাতে গেছেন!

এই বইটার ঋণ নানা ইন্টারভিউতে আপনি স্বীকারও করেছেন আগে। সেসব ইন্টারভিউয়ের কপি রয়েছে আমার কাছে। এবার সিনেমায় কী করলেন, নিহালনি’র আবদার মেনে ক্রেডিট লিস্ট থেকে সেই বইয়ের উল্লেখটাই হাওয়া ক’রে দিলেন জাস্ট! ওই তিন গবেষকের নাম রইলো ছবির শুরুতে ইংরেজিতে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে একটা ‘স্পেশাল থ্যাংকস’-এর লিস্টে, অন্য আরও লোকজনের নামের সঙ্গে মিশিয়ে! সবকটা নাম পড়ে ওঠার আগেই ফেড আউট হয়ে গেল লিস্ট!

সাবাশ অরিন্দম, সাবাশ। ব্যাপারটা ঠিক কী রকম মনে হল জানেন? ধরুন – এই যে সৃজিত ‘ইয়েতি অভিযান’ বানাচ্ছেন, তা তিনি যদি ছবির শুরুতে আর পাঁচজনের নামের সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নামটা মিশিয়ে দিয়ে জাস্ট একটা ‘স্পেশ্যাল থ্যাংকস’ জানিয়ে চুপচাপ গল্পের ক্রেডিট নিজের নামে চালান করে দ্যান তো তখন যেরকম লাগবে, অনেকটা ঠিক সেরকম!

এবার আসুন ছবির ভেতরে। হেমা পারেখ (অভিনয়ে অনুষা বিশ্বনাথন) ফ্ল্যাটে একলা রয়েছে, আর এই সময় ফোন করার অছিলায় ফ্ল্যাটে ঢুকে রেপ করার জন্যে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে ধনঞ্জয় (অভিনয়ে অনির্বাণ ভট্টাচার্য)। এই যে সিনটা, সেন্সর বোর্ড পরিষ্কার হরফে জানিয়ে দিয়েছে যে, কেটে বাদ দিয়ে দিতে হবে এই দৃশ্যের আশি ভাগ। বিশেষত হেমা’কে মারধোর করার সব দৃশ্যগুলো। আপনি তো নতমস্তকে মেনেই নিয়েছেন এটা, আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যে, একবার নেটে ক্লিক করলে যেখানে সারা পৃথিবীর পর্নো-দুনিয়ার রাজ্য খুলে যায় চোখের সামনে, সেখানে সিনেমায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য ক’টা চড়-থাপ্পড় আর রেপ সিন থাকলে যে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত, সে আপনি আর আপনার পহেলাজবাবুই জানেন।

ধনঞ্জয়কে অ্যারেস্ট করার পর পুলিশ ধরে পেটাচ্ছে, এই সিনের ফিফটি পারসেন্ট কেটে ফেলে দিতে বলেছে সেন্সর বোর্ড। ‘কি করে তোকে বলব’ (২০১৬) মার্কা নেহাত খাজা লেভেলের বাংলা সিনেমাতেও পুলিশি মারের যে ভয়ংকর সিকোয়েন্স অবলীলায় দ্যাখান হয়, তারপরে আপনার ছবির জন্যে নিহালনি’র এই নিদান ঠিক নাকি ভুল, সেটা বরং আপনি ঠিক করে নিন, দাদা!

লিস্টে এরপর দেখছি রক্ত গড়িয়ে পড়ার একটা শট কেটে পুরো বাদ দিয়ে দিতে বলেছেন নিহালনি। এখন কী বলব বলুন, বাংলা মেনস্ট্রিম ছবিতে কী পরিমাণ রক্ত দ্যাখান হয়, সেটা পরখ করে দেখতে হলে কেউ একটু জিৎ-কোয়েলের ‘সাত পাকে বাঁধা’র (২০০৯) শেষদিকটা দেখে নেবেন প্লিজ। সেখানে ওই পরিমাণ রক্ত দ্যাখান গেলে এখানে কী অসুবিধে হয়ে গেল, বুঝতে পারছি না আমি।

একের পর এক ভিস্যুয়াল কেটে উড়িয়ে দেওয়ার পর, এবার আসুন এ ছবির অডিওট্র্যাকে নিহালনি কী কাণ্ড ঘটিয়ে ছেড়েছেন, সেটার বিষয়ে। কেটে সাফ করে দেওয়া হয়েছে ‘খানকির ছেলে’, ‘বোকাচোদা’ বা ‘বহেনচোদ’ জাতীয় সব গালিগালাজ। সিনেমার পর্দায় এসব গালি শুনতে পেলে জনসমাজের সর্বনাশ হয়ে যাবে, সেটা তো আমি-আপনি সবাই জানি। আমার শুধু একটাই জিজ্ঞাসা। এইসব ফরমান যখন নিহালনি জারি করছিলেন, তখন এসব শুনে আপনার একবারও কি পূর্বসূরী সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের মুখটা মনে পড়লো না অরিন্দম? বছর ছয়েক আগে সেই ‘বাইশে শ্রাবণ’ (২০১১) ছবিতে অপভাষা প্রয়োগের কী চরম নজির বানিয়ে রেখেছেন ভদ্রলোক, সেটা একটু শেয়ার করতে পারতেন তো আপনার সেই নিহালনি স্যরের সঙ্গে? সৃজিতের ছবি পাশমার্ক পেয়ে গেলে, আপনার ছবি কোন দোষে আটকে যাবে বলুন?

এই সব প্রশ্নের উত্তরে আপনি কী বলতে পারেন, সেটা বোধহয় আন্দাজ করতে পারি। ছবির রিলিজ ডেট আগে থেকেই ঠিক করে রাখা ছিল ১১ অগাস্ট। নিহালনি’র সঙ্গে লড়তে গেলে, সেই রিলিজ ডেটে আর ধরানো যেত না ছবি।

আরও পড়ুন:  আমন্ত্রিত অতিথির ফোন নিয়ে আছড়ে ভাঙলেন সলমন‚ কিন্তু কেন!?

আমার প্রশ্নটাও ঠিক এখানেই। ছবির রিলিজ যে ১১ অগাস্ট হবে, সেটা তো বহুদিন আগে থেকেই ঠিক করে রাখা ছিল, দাদা! আর, এরকম তুমুল বিতর্কিত একটা বিষয় নিয়ে তৈরি ছবি যে সেন্সর বোর্ডে হোঁচট খাবে, সেটা আঁচ করতেও তো বোধহয় গণৎকার হতে হয় না! সে সব ভেবে, সার্টিফিকেশনের জন্য অন্তত মাসখানেক সময় হাতে রেখে কি এগোলে ভাল হত না? তার বদলে হল কী? ১১ তারিখ ছবির রিলিজ, আর ৯ তারিখ কোনমতে পহেলাজ নিহালনিকে দিয়ে ছবি ‘পাশ’ করাচ্ছেন আপনি! নিহালনি যে ‘কাট’গুলোর ফরমান দিচ্ছেন, ‘জো হুজুর’ বলে সেগুলো মেনে নিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু কাটগুলো সব প্রিন্টে বসিয়ে ফাইনাল কপি রেডি করতে তো নাজেহাল হয়ে যাচ্ছে আপনার টিমের লোক। ১১ তারিখ ছবির রিলিজ ডেট ঠিকই, কিন্তু পিভিআর, আইনক্স-এর মতো বেশিরভাগ মাল্টিপ্লেক্স চেনে ধরান যাচ্ছে না ছবি। তাই ১১ তারিখ ছবির রিলিজ হচ্ছে সিঙ্গেল স্ক্রিন থিয়েটারে আর সিনেপলিসে। বাকি মাল্টিপ্লেক্সে ছবি চলতে শুরু করছে ১২ তারিখ থেকে। খবরের কাগজে ওদিকে বিজ্ঞাপন বেরিয়ে গেছে ১১ তারিখেই সর্বত্র রিলিজ হচ্ছে বলে। সব মিলিয়ে বিভ্রান্তির চরম। এমন তুমুল অপেশাদার ভাবে বাংলা ছবির রিলিজ এর আগে আর কখনও হয়েছে, অরিন্দম?

বাস্তবের ধনঞ্জয়

অবশ্য গোটা ছবিটাই তো এদিক-ওদিক অপেশাদারিতে ভর্তি! ফেসবুকে আপনাকে বলতে শুনছি, এটা নাকি কোর্টরুম ড্রামা! ছবির শুরু থেকে শেষ অবধি কোর্টরুম আছে ঠিকই, কিন্তু ড্রামা কোথায় আছে, সেটা বলবেন একটু প্লিজ? কোর্টরুম ড্রামা ব্যাপারটাই আসলে এমন যে, জমিয়ে দ্যাখাতে পারলে পাবলিক রসিয়ে রসিয়ে খায়। শুধু ‘দামিনী’ (১৯৯৩) বা ‘আদালত ও একটি মেয়ে’ই (১৯৮১) তো না, এরকম উদাহরণ আরও হাজার একটা আছে। তীক্ষ্ণ সওয়াল করে মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে নির্দোষকে বাঁচিয়ে দেওয়ার সেই তুমুল ড্রামা ‘টুয়েলভ অ্যাংরি মেন’ (১৯৫৭) বা সেটার হিন্দি রিমেক ‘এক রুকা হুয়া ফয়সলা’ (১৯৮৬) ছবিগুলো আপনি বা আপনার স্ক্রিপ্ট রাইটার কেউ দেখেন নি নাকি আগে? নিদেনপক্ষে ‘আদালত’ বা ‘ভাঁওয়ার’-এর মতো টিভি শোগুলো? এসব যদি দেখেই থাকেন, তো সিনেমার পর্দায় নাটক জমাতে এরকম ফেল মেরে গেলেন কেন?

লম্বা লম্বা সব কোর্টরুমের সিনগুলো এলে তো একটা সময় হাই তুলতে শুরু করছিলাম, দাদা! কোর্টরুমের সেট ফেলে টানা সেখানে শুট করে গেলে বাজেট অনেকটা বেঁচে যায়, সেটা জানি। কিন্তু আমার মুশকিল কোথায় হচ্ছে, জানেন? একের পর এক ক্যারেক্টারের মিছিল চলছে কোর্টে, আর এত ক্যারেক্টারের ব্যাক স্টোরি আর নাম-ধাম, কিছুই মনে রাখতে পারছি না যে! মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, আপনাকে কেউ যেন হোম টাস্ক দিয়েছিল যে ‘আদালত মিডিয়া সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি’ নামের বইটার সব চ্যাপ্টারগুলোই কাট-টু-কাট ছবিতে বসিয়ে দিতে হবে বলে। আর আপনিও সেটাই করতে করতে গেছেন। এগুলো করতে গিয়ে একবারও আপনার মনে হল না যে, ফিল্ম আর প্রবন্ধের বই – দুটো ঠিক এক জিনিষ নয়, বইয়ে যেটা পড়লাম, ছবিতে সেটা ঘুরিয়ে একটু অন্যভাবে দ্যাখাই।

টানা এক বছর ধরে এই কেস নিয়ে নাকি অনেক রিসার্চ করেছেন আপনি। সেরকমটাই অন্তত দাবি করতে দেখলাম আপনাকে খবরের কাগজে ইন্টার্ভিউ দেওয়ার সময় (আজকাল, ৫ আগস্ট)। মুশকিল হল, ছবির শরীরে সেই রিসার্চের কোন চিহ্নমাত্র নেই! এমন একটা তথ্যও নেই ছবিতে, যেটা দেবাশিস সেনগুপ্ত-প্রবাল চৌধুরী-পরমেশ গোস্বামীর ওই বইটায় নেই! বইয়ের চতুর্দশ পরিচ্ছেদে পয়েন্ট সাজিয়ে সাজিয়ে লেখা রয়েছে, পারেখ ফ্যামিলিতে আসলে সেদিন কী হয়েছিল বলে মনে হয়। সিনেমার শেষদিকে এসে স্টার্ট টু ফিনিশ সেটা অবধি ঝেড়ে কপি করে দিলেন আপনি। আর কপি বলে কপি! প্রায় মাছি মারা কেরানি স্টাইলে কপি! বইতে লেখা ছিল, আই সি এস সি পরীক্ষা দিয়ে বন্ধুর সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া আর শারীরিক সান্নিধ্য (পড়ুন সেক্স) কাটিয়ে হেতাল বাড়ি ফেরে। হেতাল পোশাক পালটানোর সময় তার প্যান্টিতে রক্তের দাগ দেখে মায়ের সন্দেহ হয় মেয়ে কিছু ঘটিয়ে এসেছে বলে, আর তারপর তুলকালাম শুরু হয় বাড়িতে (পৃষ্ঠা ১৩২)।

বইয়ে লেখা এই লাইনগুলো স্ক্রিনে আনতে গিয়ে মিনিমাম একটু ভাবনাচিন্তা করবে না ডিরেক্টর আর স্ক্রিপ্ট রাইটার? আঠেরো বছরের মেয়ের প্যান্টিতে রক্তের দাগ মানেই মা ভেবে নেবে সেটা হাইমেন ছেঁড়ার ব্লাড? কেন, সেটা পিরিয়ড শুরু হওয়ার দাগ হতে পারে না বুঝি? কিন্তু ওই যে বললাম না, বইতে যা লেখা আছে, তার এক লাইন বাইরে গিয়ে নিজের মাথা খাটানোর সাহস দ্যাখান নি অরিন্দম। সুতরাং সিনেমাতেও দ্যাখা গেল প্যান্টিতে রক্ত মানেই ফার্স্ট টাইম সেক্স, আর তার মানেই মায়ের হাতে মার খেয়ে মেয়ের হঠাৎ করে মৃত্যু।

বাস্তবের হেতাল

বইটা পড়তে পড়তে কী কৌতূহল হচ্ছিল আমার আঠেরো বছরের হেতালকে নিয়ে। আই সি এস ই পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফেরার আগে বন্ধুর কাছে যে মেয়ে সেক্স করতে যায়। বারবার মনে হচ্ছিল, সেই ৫ মার্চ ১৯৯০ – সোমবারেই আই সি এস ই পরীক্ষার লাস্ট ডে ছিল কিনা। আর সেক্সটা তখন পরীক্ষা শেষের টেনশন রিলিভার হিসেবে কাজ করেছিল কিনা। নাকি পরীক্ষা তখনও শেষ হয় নি, পরের দিনেও অন্য পরীক্ষা ছিল? বইতে এই কথাগুলো কোথাও লেখা নেই। এক বছর ধরে অরিন্দম শীল এটা নিয়ে ‘গবেষণা’ করেছেন জেনে মনে হচ্ছিল যে ওঁর ছবিতে বোধহয় এই ডিটেলগুলোও থাকবে। ওমা, কোথায় কী – ওসব কিস্যু নেই!

আরও পড়ুন:  চার দু’গুণে আটটা ড্রেস, এবার পুজোয় তুমি-ই বেস্ট

ধনঞ্জয়ের কেস তো বটেই, ওই বইতে লেখা সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা থেকে পর্যন্ত লাইন ঝেড়ে দিয়েছেন এ ছবির চিত্রনাট্যকার আর সংলাপ-রচয়িতা। ধনঞ্জয়ের মামলার সঙ্গে সৈকত তুলনা করেছিলেন কাফকার লেখা ‘ট্রায়াল’ উপন্যাসের (পৃষ্ঠা ১৪)। সৈকত নামটা একটু ভুল লিখেছিলেন, উপন্যাসের নাম ‘ট্রায়াল’ নয় ‘দ্য ট্রায়াল’। এখানে কী হল, কোনরকম ক্রস চেক না করে ঈষৎ ভুল সেই উপন্যাসের নামটাই সোজা বসিয়ে দেওয়া হল উকিল শিবরাজ চৌধুরী’র (অভিনয়ে কৌশিক সেন, চরিত্রের নামটা সিনেমা থেকে জানতে পারি নি, খবরের কাগজের ছবির প্রমোশনাল রাইট-আপ পড়ে জেনেছি) সংলাপে। কাফকা’র পাশাপাশি সৈকত লিখেছিলেন কুন্দেরার কথা। কিন্তু ‘কুন্দেরা’ নামটা ছবির লোকজনের পছন্দ হল না বোধহয়, ফস করে কাফকার সঙ্গে ম্যাচিং করে এখানে বসিয়ে দেওয়া হল কাম্যু’র ‘আউটসাইডার’-এর নাম! আমার তখন প্রায় মাথায় হাত! সত্যি ছবির নির্মাতারা কেউ পড়ে দেখেছেন সেই ‘দ্য আউটসাইডার’? কোন লজিকে সেটা এই ধনঞ্জয়ের সঙ্গে যায় একটু বলবেন কেউ?

বই থেকে যেমন লাইন-কে-লাইন তুলে নিয়েছেন, ঠিক সেভাবে চুপচাপ সিকোয়েন্স তুলে নিয়েছেন এম এস সথ্যু’র তৈরি তথ্যচিত্র ‘দ্য রাইট টু লিভ’ থেকেও। সেখানে এমন একটি দৃশ্য আছে যে, ধনঞ্জয়ের গ্রামের বাড়িতে ধনঞ্জয়ের বাবার ইন্টার্ভিউ নিতে গেছেন সাংবাদিক অনিরুদ্ধ ধর। বাবার হাহাকার, আকুলতা ফেটে বেরচ্ছে যেন। হঠাৎ এক মুহূর্তে বাবার পিছনে এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারের কোন এক সদস্যা সটান ফিট হয়ে আছড়ে পড়ে গেলেন মাটিতে।

এই তথ্যচিত্র ইউটিউবে রয়েছে, নিজে চোখে সেটা দেখলে অভিঘাতটা টের পাবেন আরও ভাল। আর এটা দেখে উঠে যখন অরিন্দমের ছবিটা দেখতে বসবেন, তখন হাঁ হয়ে যাবেন দেখে যে কী ভাবে আনাড়ি ভাবে এখান থেকে সিকোয়েন্স কপি করার চেষ্টা করেছেন অরিন্দম, এমন কী ব্যাকগ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে থাকা ওই মহিলার হঠাৎ করে ফিট হয়ে পড়ে যাওয়ার সিনটা অবধি সিনেমায় ছেপে লাগানো আছে!

বাহ অরিন্দম বাহ!

ছবিতে দুজন উকিলের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন কাঞ্চন আর মীর। কিন্তু ধরাবাঁধা কয়েকটা ডায়ালগ ছাড়া এই ভদ্রলোকদের তো অভিনয়ের স্কোপই নেই কোন! তবু এঁদের নিলেন কেন অরিন্দম? কী মনে হল, এই নামগুলো থাকলে ছবির ওজন বাড়বে একটু?

উকিল কাব্য সিনহা’র (অভিনয়ে মিমি চক্রবর্তী) চরিত্রটা তো আরও ধাঁধার মতো! এক তো এটা বোঝা গেল না যে, দুনিয়ায় এত নাম থাকতে হঠাৎ কাব্য সিনহা নামটা রাখতে গেলেন কেন নির্মাতারা? কোন একজন জাজের মুখে একটা সিনে নামটা তো ‘কাপুচিনা’র মতো শোনাচ্ছিল প্রায়! আর যেটা বুঝতে পারছিলাম না, এরকম কঠিন এক ভূমিকায় অভিনয় করার আগে সিরিয়াসলি আদৌ কোন প্রস্তুতি নিয়েছিলেন কিনা মিমি। আর কিছু যদি নাও করে থাকেন, ‘অঙ্কুর অরোরা মার্ডার কেস’-এ (২০১৩) পাবলিক প্রসিকিউটার-এর ভূমিকায় পাওলি কী ভাবে আগুন জ্বেলে দিয়েছিলেন সেটা একটু দেখে নিতে পারতেন তো?

আরও মজা কী জানেন? সব কিছু ছেড়ে-ছুড়ে কাব্য সিনহা নামের ওই মেয়েটি হঠাৎ করে ধনঞ্জয়ের কেস রি-ওপেন করাতে বসলো কেন আদৌ, সেই ব্যাখ্যাটাও ছবিতে খুব স্পষ্ট করে নেই। ধনঞ্জয়ের দুঃখী বৌকে গ্রামের অঙ্গনওয়ারী কেন্দ্রে বসে থাকতে দেখেই জাস্ট বিনা কারণে এত আবেগ আর ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো শুরু?

মনে আছে প্রথম যেদিন পোস্টার রিলিজ হল ছবির, ফেসবুক আর টুইটারে সে কী গণ-তোষামুদির ঝড়। ধনঞ্জয়ের পোস্টার নাকি আন্তর্জাতিক মানের পোস্টার। বাংলা সিনেমার পোস্টারে এই আন্তর্জাতিক মান আসলে কী ভাবে এলো সেটা অবশ্য আপনি জানতে পারবেন সাত বছর আগের ছবি ‘আ সার্বিয়ান ফিল্ম’-এর পোস্টার দ্যাখার পর তবেই।

ছবির বেশির ভাগটাই আসলে এরকম সব জোড়াতালি আর অপেশাদারিতে ভর্তি। তাই বলে ছবিতে ভাল লাগার কিছুই নেই, তাও অবশ্য নয়। যেমন, ধনঞ্জয়ের ভূমিকায় চমৎকার অভিনয় করতে দেখলাম অনির্বাণকে আর ধনঞ্জয়ের বাবার ভূমিকায় তো জাস্ট ফাটিয়ে দিয়েছেন পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় মশাই। আর সুযোগ পেলে আউটডোরে চমৎকার সব ভিস্যুয়ালস ক্যামেরায় ধরেছেন সৌমিক হালদার বাবু। ছবির শেষটায় বাঁধাগতের মিডিয়ার ওপর যে রাগটা উগড়ে দিয়েছেন অরিন্দম, সেটাও মোটের ওপর ভালই।

ছবির বিষয় অ-সাধারণ তো বটেই। তবে তার সবটুকু ক্রেডিট ওই তিন গবেষক ভদ্রলোকের প্রাপ্য, অরিন্দম শীলের নয়।

হ্যাঁ, আরও যত্ন নিয়ে বানালে এ ছবি হয়তো আগুন হতে পারতো। আপাতত নিছক একটা ভালো ছবি হয়েই রয়ে গেল এটা, তার বেশি আর কিচ্ছু না।

NO COMMENTS