সৌরভ মুখোপাধ্যায়
শূন্য-দশকে উঠে-আসা কথাকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম। জন্ম ১৯৭৩, আশৈশব নিবাস হাওড়ার গ্রামে, পেশায় ইংরাজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক। গত দেড় দশক নিয়মিতভাবে সমস্ত অগ্রণী বাংলা পত্রিকায় গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। পাঠক-প্রশংসিত উপন্যাস ‘ধুলোখেলা’, ‘সংক্রান্তি’ ও ‘প্রথম প্রবাহ’ এবং অনেক জনপ্রিয় ছোটগল্প তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। লিখতে ভালবাসেন ছোটদের জন্যেও, ‘মেঘ-ছেঁড়া রোদ’ তাঁর এক স্মরণীয় কিশোর-উপন্যাস। সাহিত্য ছাড়াও সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রে অনুরাগ প্রবল। ঘোর আলস্যবিলাসী ও আড্ডাপ্রিয়।

 

“আমাদের দেশে সাহিত্য আলোচনায় যে একটা দাঁতে দাঁত চেপে অতি সিরিয়াস ভঙ্গি থাকে, সেটি আমার পছন্দ না। সাহিত্য চরিত্র-উন্নয়নের মাধ্যম কিংবা সাহিত্যিকরা জ্যাঠামশাইয়ের মতন শ্রদ্ধেয়, এমনও আমি মনে করি না। সাহিত্য আনন্দের সামগ্রী, যেমন সঙ্গীত বা চিত্রকলা। সুতরাং খোলামেলা হাসিখুশিভাবে একে গ্রহণ করাই আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়।” (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কৃত্তিবাস,১৯৭৯)

          সমালোচক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে মুক্ত উপলব্ধির এক দিকচিহ্ন মনে করা যেতেই পারে। তাঁর সমসময়ের এবং  পূর্ববর্তী বাংলা সাহিত্যের উপর তাঁর পর্যবেক্ষণগুলি— স্বনামে ও ছদ্মনামে লিখিত— দীর্ঘদিন আমাদের নতুন করে দেখার চোখ খুলে দিয়ে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ থেকে জগদীশ গুপ্ত, সতীনাথ ভাদুড়ী থেকে সমরেশ বসু— দিকপালদের রচনা নিয়ে কতবার কত নতুন আঙ্গিকে আলোচনা করেছেন সুনীল, সেই সব আলো আমাদের ঋদ্ধ করেছে নিয়ত। এক বিরল সহিষ্ণু ঔদার্য ও মালিন্যমুক্ত মানসিকতা যখন উপলব্ধির অতল গভীরতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একজন সমালোচক সেই কোটি স্পর্শ করেন— যেখানে সমালোচক হিসেবে সুনীলের অবস্থান।

          সুনীল নিজের মুখেও বরাবরই এই ‘খোলা-মনের সমালোচনা’র কথা বলেছেন। নীতিবেত্তা বা বোদ্ধা-পণ্ডিত হতেও তাঁর ছিল ঘোর আপত্তি—“অপরের কবিতা পাঠ করার সময় আমি শুধুই একজন বিনীত নম্র ও উদগ্রীব পাঠক…” (কবিতা-পরিচয়, ১৯৬৭)। নিজে যে-পথে হেঁটেছেন, অন্যদের কাছেও প্রত্যাশা করেছেন তেমনটাই। ব্যক্তিগত আলাপচারিতার সূত্র ধরে অনেকেই এমন সাক্ষ্য দিয়েছেন, সুনীল কখনও অন্যের লেখার তীব্র সমালোচনা করতেন না, এমনকী অপরের নিক্ষিপ্ত তীব্র সমালোচনার তিরও তাঁকে সেভাবে বিদ্ধ করতে পারত না। আবার, নিজের লেখার কোনও বিরুদ্ধ সমালোচনার পালটা জবাব দেওয়া— সেও ধাতে ছিল না তাঁর। কেউ অন্যের রচনার কড়া সমালোচনা লিখলে উপদেশ দিতেন লেখাটার ভালো দিকের উপর বেশি ফোকাস করতে, তাঁর নিজের সম্পর্কে কুকথা শুনলে বলতেন, ‘যেতে দাও, বলছে বলুক।’

         কিন্তু, আগাগোড়াই কি এমন স্থিতপ্রজ্ঞ কোমলপন্থী ছিলেন সমালোচক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়? নিজে কক্ষনও করেননি কোনও সাহিত্যকীর্তির তীব্র সমালোচনা, ‘আনন্দের সামগ্রী’কে সিরিয়াস নীতি-চশমায় ফেলে বিচার করেননি কোনোদিন? আবার, লেখক হিসেবেও— কখনওই কোনও সুতীক্ষ্ণ সমালোচনা এমন রক্তাক্ত করেনি তাঁকে, যাতে তিনিও করে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন কিঞ্চিৎ প্রত্যাঘাত— এমনকী ব্যক্তিগত স্তরেও নেমে? 

         এই অনুসন্ধানের প্রথম অংশ আমরা শুরু করতে পারি একদম প্রথমে তুলে-আনা উদ্ধৃতিটির সূত্র ধরেই। বস্তুত, এটি একটি সমালোচনা-নিবন্ধেরই অংশ, নাম ‘বঙ্কিমচন্দ্র’। 

         দেশ পত্রিকায় উনিশশো আটাত্তর সালে বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যকীর্তি-বিষয়ক একটা ধারাবাহিক রচনায় হাত দেন সুনীল। সেখানে বঙ্কিম-রচনার এত তীব্র সমালোচনা শুরু করেছিলেন যে, জনমতের চাপে সে-লেখা বন্ধ করে দেন কর্তৃপক্ষ। প্রায় বছর দু’য়ের ব্যবধানে কৃত্তিবাস পত্রিকায় তিনি সেটি কিঞ্চিৎ দায়সারা ভাবে শেষ করেন, কিন্তু সমালোচনার ধার তখনও একই রকম।   

         আমরা একবার সেই তীব্র সমালোচনার ধরনটি দেখে নিই।

         “…বাংলায় সুদীর্ঘকালের গুজব এই যে, ঔপন্যাসিক হিসেবে বঙ্কিম এখনও মহত্তম। …তাহলে আমি এগুলো কী পড়লাম?… বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলি এত খারাপ? এ কি সত্যিই বিশ্বাস করা যায়?” (দেশ)

        “…বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর একটি উপন্যাসেও আমাকে তৃপ্ত করতে পারলেন না। তাঁর প্রত্যেকটি কাহিনী কৃত্রিম এবং উদ্ভট— যেন মানসচক্ষে তিনি হিন্দি সিনেমা নামক একটা জিনিসের কথা জানতে পেরে তারই কাহিনী বানিয়ে গেছেন।” (ঐ)

        “তাঁর প্রথমদিককার উপন্যাসগুলির কাহিনী অতি কৃত্রিম ও দুর্বল, চরিত্রগুলি অবাস্তব শুধু নয়, উদ্ভট; পরে ক্রমশ কাহিনির বাঁধুনিতে তাঁর দক্ষতা জন্মায়, ঘটনার গতি আরও রোমহর্ষক হয় বটে কিন্তু শেষের দিকে উপন্যাসের মধ্যে নানারকম বক্তব্য প্রচারের অনাবশ্যক ঝোঁকও দেখা দেয়। এই ঝোঁক রসহানিকর এবং তাঁর বক্তব্যগুলি প্রতিক্রিয়াশীল।” (কৃত্তিবাস)

        বঙ্কিমচন্দ্রের ওপর সেই সময়কার সুনীলের যেন এক স্বভাব-বিরুদ্ধ জাতক্রোধ ছিল বলে মনে হয়, এই নিবন্ধটি পড়লে। কাহিনিকার হিসাবে তো বটেই, এমনকী ভাষাশিল্পী হিসেবেও বঙ্কিমকে উড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি! —“বঙ্কিমের উপন্যাস ভাষা-প্রধান নয়, কাহিনী-প্রধান।… কোনও ঔপন্যাসিকের যেমন আগাগোড়াই ভাষাকে নিখুঁত এবং সৌন্দর্যময় করার দিকে লক্ষ্য থাকে… বঙ্কিম সেই ধরণের লেখক নন।” (দেশ)

        এই ‘ক্রোধ’ এমনই তীব্র যে, ঐ একই নিবন্ধে কয়েক অনুচ্ছেদের ব্যবধানে নিজে যা বলেছেন— সাহিত্য আনন্দের সামগ্রী, খোলামেলা ভাবে নেওয়া উচিত, জ্যাঠামশাইগিরি বা সিরিয়াস ভঙ্গি সঙ্গত নয়, ইত্যাদি— আয়রনিক্যালি নিজেই সে-কথা বিস্মৃত হয়ে নৈতিক মানদণ্ড নিয়ে নেমে পড়েছেন একাধিকবার। শুধু নান্দনিক সমালোচনা নয়, তাঁর স্বরে উঠে এসেছে ‘আইডিওলজিক্যাল পারশিয়ালিটি’— তিনি ‘সাহিত্যের প্রভাবে সমাজের ভাল-মন্দ’ খুঁজতে নেমেছেন, সাহিত্যের ‘বক্তব্যে’র উৎকর্ষ-অপকর্ষ নিয়ে জাজমেন্টাল হচ্ছেন— যা তাঁর স্বঘোষিত সমালোচনা-আদর্শেরই একেবারে উলটো নীতি। এই সব জায়গায় নিরপেক্ষ আনন্দ-উপভোক্তা সুনীলকে হঠিয়ে ঢুকে পড়ছেন সমাজনীতি-রাজনীতির বিচারক এক অচেনা, একপেশে সুনীল। দেখা যাক কয়েকটি নমুনা—

আরও পড়ুন:  এ বার দেবী দুর্গার আগমন ও প্রস্থান কোন বাহনে ? তার ফলই বা কী ?

         “হিন্দু-মুসলমানের প্রসঙ্গ এলেই তিনি (বঙ্কিম) হয়ে উঠতেন ঘোরতর সাম্প্রদায়িক। …সাহিত্যের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতা অবলম্বনে তিনি বাঙালি হিন্দু লেখকদের মধ্যে প্রথম এবং অদ্বিতীয়।” (দেশ)

         “বঙ্কিমচন্দ্র ঋষিপ্রতিম, তিনি স্বদেশীমন্ত্রের উদ্গাতা… তা সত্যমিথ্যা যাই হোক, …উপন্যাস লিখে বঙ্কিম আমাদের দেশ বা সমাজের কোনও উপকার করে গেছেন এ-কথা মেনে নিতে আমি রাজি নই। (কৃত্তিবাস)

         “উপন্যাসে তিনি ঘোরতর সনাতনপন্থী। বিদ্যাসাগরের মতোই ব্রাহ্মসমাজকেও যে তিনি মনপ্রাণ দিয়ে অপছন্দ করতেন তা সুবিদিত। বহুবিবাহের নির্লজ্জ সমর্থন করেছেন বঙ্কিম তাঁর ‘দেবী চৌধুরানী’ ও ‘সীতারাম’ উপন্যাসে।” (ঐ)

         “যে-মানসিকতার ফলে ভারতবর্ষকে বিভক্ত করা হল, তার উৎপত্তির অন্যতম প্রধান কারণ ‘আনন্দমঠে’র মতো উপন্যাসের রচনা এবং এই উপন্যাসের লেখককে ‘স্বদেশী মন্ত্রের উদ্গাতা’ হিসেবে গণ্য করা। …বাঙালি জাতি ও তার মাতৃভূমিকে দ্বিখণ্ড করার জন্য কাঁঠালপাড়া-নিবাসী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কি কিছুটা পরিমাণে দায়ী নন?” (ঐ)

        এই দীর্ঘ নিবন্ধটি প্রথম পাঠে আমার ব্যক্তিগতভাবে এতটাই অ-সুনীল-সুলভ স্ববিরোধে ভরা মনে হয়েছিল যে, সেই বিস্ময়ের ধাক্কা এখনও আমি কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

#  

কিন্তু, না। নিবিড় নিরীক্ষণে নানা সময়ে সুনীলের এমন আরও কয়েকটি স্ববিরোধ আমাদের চোখে পড়তে বাধ্য।

         ধরা যাক ঐ উনিশ শো আটাত্তরেই ‘বিভাব’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘হে সমালোচক’ প্রবন্ধটির কথা। এই প্রবন্ধটিও এক আশ্চর্য বৈপরীত্যে ঠাসা। সুনীল সচরাচর নিজের প্রতি ধেয়ে-আসা সমালোচনাকে ফুঁয়ে উড়িয়ে হাসিমুখে চলে যেতেন বলে যে প্রবাদ চালু আছে, এ-নিবন্ধ তার উলটো পথে হেঁটেছে।

         এখানে সমালোচনায় রক্তাক্ত ও ক্রুদ্ধ, প্রত্যাঘাত-পরায়ণ এক অন্য সুনীল।

         নিবন্ধের শুরুতেই আমরা জানতে পারি, তাঁর উদ্দেশে নিক্ষিপ্ত এক কটু সমালোচনার প্রেক্ষিতেই রচিত হচ্ছে এই লেখা। তবু, প্রথম অংশে বেশ বিনীত ভঙ্গিতেই নিরাসক্তির ভাবটি ধরে রাখার আপ্রাণ প্রয়াস। … “লেখকের উচিত কোনও সমালোচনার জবাব না দেওয়া। … তবু আমি দু’এক জায়গায় ভুল করে এ-রকম উত্তর দিয়ে ফেলেছি… মনে হয়েছে, উনি ভুল বুঝেছেন আমাকে, এটা ওঁকে জানানো দরকার। পরে বুঝেছি, সেই জানানোটাও ভুল। আমার রচনার মধ্য দিয়ে যদি সঠিক জানাতে না পেরে থাকি, তাহলে সংযোজনে জানাবার চেষ্টাটা হাস্যকর।”

         তার পরেই আহত, বিমর্ষ ভাবটি অতি সংযত ভঙ্গিতে ফুটে উঠছে, মর্মস্পর্শী ভাষায়— “একজন লেখক যা পারে তাই-ই লেখে। তার থেকে ভালো লেখার ক্ষমতা তার নেই, বা সেই সময় ছিল না। ভালো লেখা এক সাঙ্ঘাতিক কঠিন কাজ, পৃথিবীতে এ-পর্যন্ত একজন লেখকও প্রকৃত ভালো লেখা লিখতে পারেনি। নীল সিন্ধুর ঠিক মাঝখানে এক ক্ষুদ্র প্রবাল দ্বীপে নিঃসঙ্গ বাতিঘর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রকৃত ভালো লেখা। সকলেই সেই দিকে যেতে চায়। যে যে-পর্যন্ত পৌঁছয়। সাঙ্ঘাতিক পরিশ্রম ও অনেকখানি আয়ু ক্ষয় করে একটি রচনা সমাপ্ত করার পরও বুঝতে পারি, ঠিক জায়গায় পৌঁছন গেল না। তখন দুঃখ হয়। সেই দুঃখই পরবর্তী রচনাটির উৎস।”

         ঠিক এর পর থেকেই নিবন্ধলেখকের সুর বদলাতে দেখি আমরা। দুঃখ থেকে ক্ষোভ, ক্ষোভ থেকে ক্রোধ। ঠিক পরের লাইনেই সুনীল বলে ওঠেন, “কেউ একজন কোনোই পরিশ্রম না করে এক কলমের খোঁচায় সেটা উড়িয়ে দিলে বলতে ইচ্ছে করে, তুমি অনধিকারী।”

        শুনে একটু থমকে যেতে হয় না আমাদের? কথাটা ঠিক হল কি?

        সৃষ্টি করতে যে-শ্রম লাগে, সমালোচনায় তা লাগার কথাই নয়— এ সত্যবার্তা তো শিশুতেও জানে! কিন্তু সেই যুক্তিতে ‘অনধিকারী’ বললে তো সম্পূর্ণ সমালোচনা ব্যাপারটাই অনধিকারের পর্যায়ে চলে যায়! তবে সুনীল নিজে কোন্‌ ‘অধিকারে’ বঙ্কিমের অমন ‘পরিশ্রম’জাত ও ‘আয়ুক্ষয়’কারী রচনাগুলিকে কলমের এক এক খোঁচায় নস্যাৎ করছিলেন ঐ একই বছরে, দেশ পত্রিকায়— এমনকী পরের বছরেও— কৃত্তিবাসে?

        আচ্ছা বেশ, ধরে নিই বঙ্কিম ব্যতিক্রম। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস নিয়ে যখন সুনীল বলেন, “নিজেকেই তিনি অনুকরণ করেছেন বারবার…। ছোট গল্পে তিনি যেমন অসাধারণ, উপন্যাসে তেমন নন। পাতার পর পাতা গদ্য-কাহিনীতে বোধহয় ধৈর্য রাখতে পারতেন না। এই অধৈর্য বা তাড়াহুড়োর ছাপ আছে তাঁর অনেক উপন্যাসেরই শেষ পাতায়…” (দেশ, ১৯৯১), কিংবা নজরুল-সুকান্ত প্রমুখকে নিয়ে “সন্ত্রাসবাদ জন্ম দিয়েছিল নজরুলকে— যুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষ জন্ম দিয়েছে সুকান্তকে। কবিত্বে উভয়েই নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর। এখনও মুখ্যত রাজনৈতিক মতবাদকে আশ্রয় করে যে-একদল কবিগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যাঁদের মধ্যে কেউ কেউ খ্যাতিমান, তাঁরাও অনেকেই নিছক পদ্যলেখক ছাড়া আর কী?” (কৃত্তিবাস, ১৩৬১ বঙ্গাব্দ)— অথবা সুধীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে “কবি হিসেবে তিনি আসলে ঢিলেঢালা প্রকৃতির, তাঁর শব্দাবলী মোটেই ওজন-করা ও অমোঘ নয়, এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, প্রচলিত, গতানুগতিক ছবি ব্যবহার করার দিকে তাঁর ঝোঁক ছিল খুব বেশি, প্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হবার পর্যায়ে।… এতে তাঁর কবিতা খুবই দুর্বল হয়ে গেছে…” (‘স্মরণে’, ১৯৬৭)— এই সব মন্তব্যও কি এক-একজন লেখকের আজীবনের সাধনা-যন্ত্রণাকে নস্যাৎ করে দেওয়াই নয় একপ্রকার? কেউ যদি বিপরীত দিক থেকে বলে ওঠে, ‘তুমিই বা কে হে, কলমের খোঁচায় রবীন্দ্রনাথ নজরুল সুকান্ত সুধীন্দ্র বা রাজনৈতিক কবিদের উড়িয়ে দাও? তাঁরাও কি প্রতিটি লেখায় সাঙ্ঘাতিক পরিশ্রম ও আয়ুক্ষয় করেননি? …এ কেমনধারা স্ববিরোধ?’ 

আরও পড়ুন:  কে এই অনুরাধা? যাকে ৯ মাস নিজের বাড়িতে রেখেছিলেন পরিচালক হৃষিকেশ মুখার্জী?

        বস্তুত, নির্মোহ বিচারে আমরা বুঝতে পারি, নিজে চরম আহত হয়েছিলেন বলেই ‘সমালোচক’ সম্পর্কে অমন একটা ভঙ্গুর ও সাজানো কথার আশ্রয় নিতে হয়েছিল সুনীলকে। না হলে, একটি শিল্পসৃষ্টিতে স্রষ্টার শ্রম, যন্ত্রণা ইত্যদি হয়েছে— শুধু এই খাতিরেই সেটার কোনও বিরুদ্ধ-সমালোচনা করা অপরের ‘অনধিকার’, এমন অযৌক্তিক দাবি মানতে গেলে বিশ্বের সমস্ত আর্ট-ক্রিটিসিজম বিসর্জন দিতে হয়— সুনীলের নিজেরগুলি সমেত!

        সম্ভবত কথাগুলি বলে সুনীল নিজেও বুঝেছিলেন যে, বড় চরমপন্থী হয়ে গেল মতটা! তাই, একটু পরেই সুরটা ঈষৎ পালটে ফেলে বললেন, আসলে তাঁর এই বক্তব্যটা হচ্ছে ‘সমসাময়িক সাহিত্যে’র সমালোচনার প্রসঙ্গে। —“কোনও লেখকের পক্ষে সমসাময়িক কালের সাহিত্যের সমালোচক হওয়া খুবই শক্ত কাজ। লেখকের নিজস্ব অহমিকাই প্রধান অন্তরায়। সেইজন্যই সীরিয়াস লেখকরা পূর্ববর্তী সাহিত্যের বিচার করেন— টি এস এলিয়ট যেমন শেলী বিষয়ে, রবীন্দ্রনাথ যেমন মাইকেল বা বঙ্কিম বিষয়ে— কিন্তু সমকাল সম্পর্কে নীরব। এটাই শালীনতা। কিন্তু অনেকে এখন এটা মানেন না।”

#

এইবার কি আস্তে আস্তে সুনীলের ব্যথার জায়গাটা ধরতে পারছি আমরা?

        সমসাময়িক কোনও বন্ধু সম্ভবত সুনীলের লেখার সমালোচনা করেছিলেন, হয়তো বেশ তীব্র ও তিক্ত হয়েছিল সে বিচার— তাই সামগ্রিকভাবে ‘সমসাময়িক সাহিত্যের সমালোচনা’কেই সুনীল একটি লক্ষ্মণরেখার গণ্ডিতে বেঁধে দিতে চাইছেন, ‘অশালীন’ বলে অভিযুক্ত করছেন, অহমিকা-আক্রান্ত বলে নাকচ করেও দিচ্ছেন। এমনকী, সেই বন্ধুকে সরাসরি পালটা আঘাত ছুঁড়ে দিতেও পিছপা নন তিনি— “কথায় আছে, ব্যর্থ লেখকেরা গুলি খাওয়া বাঘ। তারাই সমালোচক। যে নিজে গল্প উপন্যাস কবিতা কিছুই লিখতে পারে না, সে-ই এগুলির নির্মম সমালোচক সেজে বসে।… কিন্তু যে লিখতে পারে, অথচ লেখার জন্য সময় বা মেধা না দিয়ে তার অপব্যয় করে বনের মোষ তাড়ানোর কাজে, তার ব্যবহার কৌতূহলজনক। যেমন আমাদের এক বন্ধু…”

         ‘বন্ধু’-বৃত্তান্তে প্রবেশ করার আগে আমরা ‘সমসাময়িক সাহিত্যের বিচার’ সম্পর্কে সুনীলের পূর্বোক্ত রিজার্ভেশনটি একবার যাচাই করতে চাই। এ কেমন অদ্ভুত দাবি সুনীলের? সীরিয়াস লেখকেরা সমসাময়িক সাহিত্যের বিচার করেন না? অজস্র দেশি-বিদেশি কবি-সাহিত্যিককে আমরা স্ব-কালের সহ-লেখকদের সম্পর্কে আলোচনা করতে দেখেছি— হ্যাঁ, ইতিবাচক নেতিবাচক দু’রকমই। সুনীল কি সেসব পড়েননি? আর, রবীন্দ্রনাথ শুধুই বঙ্কিম আর মাইকেলের সাহিত্য-বিচার করেছেন? যাঁকে আমরা ‘ভোরেশাস রিডার’ বলে জানি, সেই সুনীল এখানে স্পষ্টতই নিজের যুক্তিকে ঠেকনা দিতে গিয়ে অর্ধসত্য বলছেন দেখে আমাদের অবাক লাগে। আরও অবাক লাগবে যদি আমাদের সামনে কেউ তুলে ধরেন এই নিবন্ধের প্রায় আড়াই দশক আগে, ১৩৬১ বঙ্গাব্দে কৃত্তিবাসের বর্ষপূর্তি-সংখ্যায় প্রকাশিত নিম্নলিখিত বিশ্লেষণগুলি—

        “শব্দকে তিনি (শঙ্খ ঘোষ) যথেচ্ছ ব্যবহার করতে পারেন… কিন্তু এই তাঁর একমাত্র শক্তি কেন হবে? তাই তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে যে মুগ্ধতা— কবিতা শেষ হলে তা পরিণত হয় দুঃখে। যে কথা তিনি বলতে শুরু করলেন তা নিয়ে বিস্তর তান করলেন, কিন্তু দুঃখ, পুনরায় সঞ্চারীতে ফিরে এলেন না।  তাই তাঁর ভাষাতেই বলি— ‘যে কথাটা বলব সেটা… বলা হয় না কিছু!’”

আরও পড়ুন:  সেবার টানে ঘর ছেড়েছিলেন অষ্টাদশী‚ তারপর একদিনও দেখেননি জন্মদাত্রীকে‚ নিজেই হয়ে উঠেছিলেন সবার মা

       “সম্প্রতি তাঁর (অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত) মধ্যে মিস্টিসিজমের প্রতি প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি। … ব্যক্তিগতভাবে আমার বিশ্বাস মিস্টিসিজম খাঁটি কবিতার শত্রু এবং প্রায়শই তা প্রতিভাবানকেও দ্বিতীয় শ্রেণীর কবিতা লিখিয়েই খুশি রাখে।”

       “…তিনি (আলোক সরকার) বড়ো বেশি ফর্মের দাসত্ব মানেন। আবেগের সামান্য চিহ্নও যাতে না পাওয়া যায় এজন্য তাঁর কবিতার চারপাশে ফর্মের কড়া পাহারা।”

       “বটকৃষ্ণ দে আবার সম্পূর্ণ তার উল্টো। আবেগ তাঁকে অন্ধ করেছে।… তিনি যে কেন বহুদিন ধরে কোনও সার্থক কবিতা লিখতে পারছেন না সেটা আমার কাছে একটা রহস্য।”

       “মনে হয় তিনি (অরবিন্দ গুহ) ইদানীং নিজের কবিতার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী নন। …কল্যাণ দাশগুপ্তের কোনও উল্লেখযোগ্য আধুনিক কবিতা আজ পর্যন্ত আমার চোখে পড়েনি।… শংকর চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা অসংবদ্ধ। … প্রণব মুখোপাধ্যায়ের এখন কানকে ছেড়ে মনকে আশ্রয় করবার সময় এসেছে… ”

        একেবারে সমসাময়িক ও যশস্বী সহ-লেখকদের সম্পর্কে এইসব বিচার— যেগুলি অনেক সময়েই বেশ স্পষ্টবাক ও কড়া— কার উক্তি এই সব? জনৈক তরুণ কবি ও সম্পাদকের না? যাঁর নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়?   

        সাহিত্যিকরা কেবলই পুরোনো জমানার সাহিত্য বিচার করবেন, সমকাল নিয়ে বিচার করতে গেলেই নাকি ‘অহমিকা’য় আচ্ছন্ন হবেন, তাই তা অনুচিত ও ‘অশালীন’ কাজ— এমন কথা যিনি আজ বলছেন, অতীতে নিজেই তা মানেননি দেখা গেল। আত্মখণ্ডনের আর এক বিস্ময়কর নমুনা!

#

হ্যাঁ, এখনও আমাদের সেই ফেলে-আসা সূত্রটি পড়ে রয়েছে পিছনে। সেই  অসমাপ্ত ‘বন্ধু’-কথাটি।

       ১৯৭৮এর বিভাব পত্রিকার সেই আশ্চর্য রকমের তিক্ত প্রবন্ধটিতে সুনীল প্রায় সরাসরি আঙুল তুলে আক্রমণ করেছিলেন তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে। নাম না করলেও, ওয়াকিফহাল পাঠক ঠিকই বুঝে যান, উদ্দিষ্ট ব্যক্তি কে!

       “যেমন আমাদের এক বন্ধু। ছোটো ছোটো পত্রিকায় সে নানান্‌ চুটকি লেখায় চৌকোষ ভাষায় অনবরত নিজের সময়কার লেখকদের নিন্দে করে যাচ্ছে। কী দারুণ কায়দা সে-সব রচনার, ভাষা যেন মাকড়সার জালে শিশিরবিন্দু, প্রতিটি শব্দ যেন ধানী লঙ্কা, পড়তে পড়তে আহা-আহা বলতে হয়। এখন কোথাও তার লেখা বেরুলেই অনেকে বলে, দেখি দেখি, অমুক আবার কাকে দিল! দেখি দেখি, ওমুক খোঁচাখুঁচির আর কত ভালো ভাষা কায়দা করল!…”

       যাঁকে সকলে শত নিন্দায় অনুদ্বিগ্নমনা বলে জেনে এসেছি, সেই তিনি সমালোচনাকে এতদূর গায়ে মেখেছেন যে, ‘বন্ধু’কে প্রত্যাঘাত পর্যন্ত করছেন— এই সুনীল সত্যি অচেনা ও বিস্ময়কর! কিন্তু, না, বিস্ময়ের এইখানেই শেষ নয়। প্রবন্ধের অন্ত্যভাগে সেই ‘বন্ধু’ তথা তাঁর মতো কঠোর সমালোচকদের দিকে অতি কটু এক ইঙ্গিত করে, প্রায় গালাগালির স্তরে নেমে ক্রুদ্ধ সুনীল বলে ফেললেন—

      “বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যে এখন ভাদ্রমাস, এইসময় কোকিল ডাকে না, কারণ এইসময় অন্য একটি প্রাণী বড়ো গোলমাল করে।”

      সত্যি বলি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কয়েক লক্ষ মুদ্রিত অক্ষর আমি পড়েছি— এই বাক্যটির মতো নিম্ন রুচি তাঁর রচনাসমগ্রে আর কোথাও কক্ষনো দেখিনি। তাঁর সারা জীবনের সাহিত্য-আলোচনায় যে সম্ভ্রান্ত শালীনতার আভা, তার সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ মেরুতে একটুকরো অন্ধকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই কয়েকটি শব্দ।

#

এই দীর্ঘ আলোচনায় তবে কী প্রতিপন্ন হল?

         মাত্র এইটুকুই যে, সাহিত্য-সমালোচক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন এক রক্তমাংসেরই মানুষ, আমাদেরই মতো যাঁর মাঝে-মাঝেই কথায় ও কাজে মিল হত না, আত্মখণ্ডন করে বসতেন মাঝে মাঝেই। হয়তো সমালোচনার আদর্শ রূপটি নিয়ে অনেক বিভ্রান্তির স্তরও পেরিয়েছেন, নিজের মধ্যেই বিবাদ-বিতর্ক করেছেন বহুবার। আমাদেরই মতো তাঁরও, এক-আধবার হলেও, প্রতিক্রিয়া হয়েছিল নিন্দায়— ত্বক ছিঁড়ে ঝরেছিল শোণিত, আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গিয়েছিল ক্ষোভে-ক্রোধে!

         তরুণতর বয়সের এই রাগী চেহারাটি বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মোলায়েম হয়ে গিয়েছিল, হয়তো কঠোর চেষ্টা করেই নিজেকে বদলেছিলেন, স্থিতধী করেছিলেন। তবু, প্রাজ্ঞ নিরাসক্ত মনীষী হিসেবে তাঁর প্রবাদপ্রতিম নিরাবেগ নয়— ছাপার অক্ষরে ধরে-রাখা, ইতিহাসে ঢুকে-পড়া এই টুকরো টুকরো স্ববিরোধগুলিই তাঁকে আমাদের হাতের নাগালে আরও জ্যান্ত করে তোলে বুঝি! ভুল-ভ্রান্তি-বৈপরীত্যে জড়ানো এক আবেগী মানুষ, লেখক ও সমালোচক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়— দেবতা নয়, প্রিয় হয়ে ধরা দেন তখন।।                                                

2 COMMENTS