তাঁর করা প্রথম ছবি এক যে আছে কন্যাকে অনেকেই বলেন বাংলার প্রথম আর্বান ফিল্ম‚ অন্যতম মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ছবি | আর সেই তিনিই বলেন‚ অবসর সময়ে ফিল্ম বানান তিনি | রঙিন মানুষ‚ লেখালেখি ভালোবাসেন | প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিদ্যার স্নাতক কেরিয়ার শুরু করেছিলেন সাংবাদিকতা দিয়ে | সেই সুব্রত সেনের সঙ্গে আড্ডায় তন্ময় দত্ত গুপ্ত |

 

 

এখন কী কাজ করছেন?

সুব্রত সেন : এখন ‘কালী’ বলে একটা ডকুমেন্টরি করছি।

কালী মানে ঠাকুর কালী?

সুব্রত সেন : হ্যাঁ |

হঠাৎ কালী কেন?

সুব্রত সেন : আমি সাংবাদিকতার সূত্রে পশ্চিমবঙ্গের অনেক জায়গায় ঘুরেছি।এবং আমি দেখেছি পশ্চিমবঙ্গে কালির উপাসনা যেভাবে হয় সেটা ভারতবর্ষের কোথাও হয় না।এমনকী দিল্লিতে যে কালিবাড়ি সেটাও বাঙালিরা চালায়।একটা লেভেলে কালিকে আমার বাঙালিদের দেবতা মনে হয়।আমাদের সমাজ কালির উপাসনা করে কিন্তু কালো রঙের মেয়েকে ভালোভাবে গ্রহণ করে না।এই দুটো বিষয় নিয়ে আমার এই ডকুমেন্টরি ।

আপনার জীবন বৈচিত্রময়।ফিজিক্স নিয়ে প্রেসিডেন্সি থেকে পাশ করা,তারপর ব্যাংকে চাকরি, এরপর আনন্দবাজার পত্রিকায় সাংবাদিকতা,তারপর স্টেটসম্যান পত্রিকায়। আবার স্টেটসম্যানের পর বাংলা লাইভ ডট কমে চাকরিঠিক এরপরেই আপনি ‘এক যে আছে কন্যা’ পরিচালনা করেন…

সুব্রত সেন : জীবন বৈচিত্রপূর্ণ হওয়াই তো ভালো।স্থবির জীবন কি ভালো?

না, একদমই ভালো নয়।কিন্তু আমার প্রশ্ন সেটা ছিল না।

সুব্রত সেন : তাহলে আপনার প্রশ্নটা কী?

বলছি।ছবি তৈরির একটা প্রসেস থাকে।সেই চিন্তার প্রসেস কি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন সময় থেকেই ছিল?

সুব্রত সেন : হ্যাঁ, ছিল।তবে কী ছবি করব সেই চিন্তা করিনি।যদিও একটা বিষয় বুঝতে পেরেছিলাম।

কী?

সুব্রত সেন : ভালো ছবি মানে একটা খুব ইম্পরটেন্ট ক্রাফট।শিল্প অনেকাংশে দাঁড়িয়ে থাকে ক্রাফটের ওপর।এবং সেই সময় নিজের মতো কোরে এই ক্রাফটটা শেখার চেষ্ট করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে যখন ছবি করলাম তখন গুরুত্ব দিলাম এই ক্রাফটের ওপর।

প্রেসিডেন্সি থেকে বাংলা লাইভ ডট কম পর্যন্ত যে জীবন সেই জীবনের রিফ্লেকশন কি এক ‘যে আছে কন্যাতে’ এসেছে?

সুব্রত সেন : জীবনের রিফ্লেকশন এসেছে।আমি শহুরে জীবনের মধ্যে বড় হয়েছি।তাই আমার ছবিতে শহুরে জীবন এবং শহুরে মানসিকতার পরিচয় রয়েছে।

কিন্তু আপনার ছবি-তো হলিউডের ‘দ্য ক্রাশ’ ছবির ইন্সপিরিশেন।কখনই নিজস্ব দেখা জীবনের ফসল নয়এটা কেন?

সুব্রত সেন : আপনি কী করে বুঝলেন ‘এক যে আছে কন্যা’ আমার নিজস্ব দেখা জীবন নয়?‘এক যে আছে কন্যা’-র মধ্যে অপর্ণা সেনের ‘যুগান্ত’ সিনেমার একটা এসেন্স আছে। দেখবেন আমার ছবির মুখ্য দুজন প্রোটাগনিস্টের নাম অঞ্জন এবং রূপা।‘যুগান্ত’ সিনেমার মেইন প্রোটাগানিস্টের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অঞ্জন দত্ত এবং রূপা গাঙ্গুলী। আমার ছবিতেও বিজ্ঞাপন এজেন্সির একটা প্রেক্ষাপট ছিল।এই বিজ্ঞাপন জগতের চরিত্র,বিজ্ঞাপন জগতকে ব্যবহার করা —সেটা এসেছে যুগান্ত থেকে।আপনি ‘ক্রাশ’ ছবিটা দেখেছেন?দেখলে বুঝতে পারবেন আমার ‘এক যে আছে কন্যা’ ‘ক্রাশ’ নয়।

আপনি ছোটবেলায় সত্যজিৎ রায়ের সংস্পর্শ পেয়েছিলেন।সেই সমস্ত ঘটনা কিছু মনে পড়ে?

সুব্রত সেন : ওনার সঙ্গে আমার আলাপ ছিল।আমি সন্দেশ পত্রিকায় লিখতাম।সেই সূত্রে কয়েকবার সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি গিয়েছিলাম।প্রেসিডেন্সি  কলেজে দ্রীঘাংচু নামে আমরা একটা দেওয়াল পত্রিকা বের করতাম।দ্রীঘাংচু সুকুমার রায়ের একটা ছোট গল্পের নাম। আমি দ্রীঘাংচুর জন্য ওনার কাছে গিয়েছিলাম।উনি ওই পত্রিকার জন্য একটা শুভেচ্ছা বার্তা লিখে দিয়েছিলেন।পরবর্তীকালে আমি ওনাকে প্রেসিডেন্সি কলেজ ম্যাগাজিনের জন্য একটা লোগো তৈরি করে দিতে অনুরোধ করেছিলাম ।উনি সঙ্গে সঙ্গে সেটা তৈরি করে  দিয়েছিলেন।প্রেসিডেন্সি কলেজ ম্যাগাজিনে আজও ওই লোগোটা ব্যবহার করা হয়।এইগুলোই হচ্ছে সংস্পর্শ।আর একটা ঘটনা আছে।

কী?

সুব্রত সেন :  সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে মুখোমুখি পরিচয়ের আগে আমি ওনাকে একবার চিঠি লিখেছিলাম।আমি লিখেছিলাম যে আমি সিনে সেন্ট্রালের মেম্বার হতে চাই।কিন্তু হতে পারছি না।উনি আমার চিঠির উত্তরে লিখেছিলেন — ‘আমি এখন কোনও সিনে সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত নই।তাই এ ব্যাপারে আমি তোমাকে কোনও সাহায্য করতে পারব না।মেম্বার হওয়ার দরকার নেই।ভালো ছবি দেখলে ছবি শেখা যায়’।এই চিঠিটা নিয়ে আমি চলে গিয়েছিলাম সিনে সেন্ট্রালে।সিনে সেন্ট্রালের অধিকর্তারা সেই চিঠি দেখে আমাকে মেম্বার করে দিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন:  রোজকার জীবনে ছেলে তৈমুরের সব কাজ কি করিনাই করেন?

আপনি এক জায়গায় বলেছেন,বাংলা সিনেমাকে সত্যজিৎ রায়ের ইনফ্লুয়েন্স থেকে বেরোতে হবে।এই ইনফ্লুয়েন্স থেকে বের হবার বিষয়টা একটু স্পষ্ট রে বলবেন?

সুব্রত সেন : যে কোনও শিল্পের ভাষা বদলায়।ভাষা এক জায়গায় আটকে থাকে না।রবীন্দ্রনাথের লেখাকে বুদ্ধদেব বসু থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রায় অনেকেই ডিফাই করেছেন।ডিফাই করেছেন বলেই তারা নিজের জায়গা তৈরি করতে পেরেছেন।রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ পড়েছেন? ‘সোনার তরীর’ মতো লেখা আজ যদি কেউ লেখে তাহলে দেশ পত্রিকা সেই লেখা ছাপবে না।আপনাদের বাংলালাইভে এখনও কবিতা বের হয়?

 হ্যাঁ, হয়।

সুব্রত সেন : আমার মনে হয় বাংলালাইভও ছাপবে না।‘সোনার তরী’ ভালো কবিতা।সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।কিন্তু ওই কবিতা আজ আর যুগোপযোগী নয়।ঠিক তেমনই সত্যজিৎ রায়ের মতো ফিল্মমেকার আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে।তাই সবাই সত্যজিৎ হতে চায়।পুরানো ধ্যান ধারণা না ভাঙ্গলে সিনেমা এগোবে না।সিনেমা কেন,কোনও আর্ট ফর্ম এগোবে না।

আপনি বলেছেন আপনার ফেভারিট ফিল্মমেকার জাঁ লুক গোদার।আপনার কি মনে হয় আজকের সময়ে জাঁ লুক গোদারের সিনেমা গ্রহণ করার মতো দর্শক লকাতায় রয়েছে?

সুব্রত সেন : দেখুন জাঁ লুক গোদার ষাটের দশকে ছবি করতেন।এখন দুহাজার ষোলো।পঞ্চাশ বছর পরে জাঁ লুক গোদারের ছবি যদি দর্শক গ্রহণ করতে না পারে তাহলে বুঝব দর্শককে জাঁ লুক গোদার দেখানো হয়নি।যে সিনেমা পঞ্চাশ বছর আগে সারা পৃথিবীতে হয়ে গেছে সে সিনেমা যদি বাঙালিরা না দেখে তাহলে আমার কিছু করার নেই।জাঁ লুক গোদার পঞ্চাশ বছর আগের মানুষ।জাঁ লুক গোদারের ফর্ম আজকের দিনে অত্যন্ত পুরানো।

তাহলে আজকের দিনের ফর্ম কী হওয়া উচিত?

সুব্রত সেন : সারা পৃথিবীতে আজ সিনেমার যে ফর্ম,সেই ফর্ম হওয়া উচিত।সিনেমা কখনও একটা জায়গায় আটকে থাকে না।ফর্মটা পালটাতে পালটাতে যায়।আনফরচুনেটলি আমরা পঞ্চাশ বছর আগে কী হতো সেটা নিয়েই চিন্তিত।আমাদের এখানকার ইন্টালেকচুয়ালরা কামু,কাফকা, সাত্রের বাইরে বেরোতে পারেনি।এখনও তারাবলে —‘কামু পড়েছ?কাফকা পড়েছ’?এই নিয়ে বিরাট আলোচনা চলে।সেই জন্যই গোদার এবং সত্যজিৎ নিয়ে আলোচনা চলতেই থাকে।এগুলো সব অতীত।

পুরানো সত্যজিৎ, গোদার ছেড়ে এখনকার  বাংলা সিনেমা নিয়ে আলোচনা করা উচিত বলে মনে করেন?

সুব্রত সেন : এখনকার বাংলা সিনেমা নিয়ে আমি আলোচনা করতে চাই না।আমরা প্রত্যেকে একসঙ্গে কাজ করছি।আমরা একে অন্যের কলিগ।

কলিগ বলে ভালো মন্দ কিছুই বলবেন না?

সুব্রত সেন : না, বলব না।

আপনার ‘এক যে আছে কন্যা’ যাদবপুর ইউনিভারসিটির ফিল্ম স্টাডিজে দুহাজার দুই সালে নাকি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল ?

সুব্রত সেন : করা হয়েছিল।এখন আছে কিনা জানিনা।আমি যেটা শুনেছিলাম সেটা হলো ওনারা মনে করতেন, মানে, অনেকেই মনে করতেন একটা কথা।তাদের মধ্যে একজন হলেন সিনেমাটোগ্রাফার সুব্রত মিত্র।সুব্রত মিত্র আমাকে বলেছিলেন —‘বাংলা ভাষায় আমি মনে করি তিনটে ছবি খুব ইম্পরটেন্ট।একটা হচ্ছে ‘পথের পাঁচালী’।যেটা মোড় ঘোরানো ছবি।আর একটা হচ্ছে ‘থার্টি সিক্স চৌরঙ্গী লেন’।এবং তিন নম্বর হচ্ছে ‘এক যে আছে কন্যা’।কারণ এখান থেকে আর্বান সিনেমা শুরু হয়েছে’।

আপনি যে সময় ‘নীল নির্জনে’ করলেন সেই সময় ডিজিটাল সিনেমা ছিল না।এই ডিজিটাল টেকনলজির ব্যবহার কী ভেবে করেছিলেন?

সুব্রত সেন : আমার মনে হয়েছিল ডিজিটাল সিনেমা আসছে।তাই এটা নিয়ে নাড়াচাড়া করা দরকার।আমি আমার ছবি ‘এক যে আছে কন্যা’ আর ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’ নিয়ে  বিদেশের ফেস্টিভ্যালে গিয়েছিলাম।তখন দেখেছি ওখানে ডিজিটাল সিনেমা শুরু হয়ে গেছে।আমি ফিজিক্সের ছাত্র বলেই আমার টেকনলজির প্রতি ঝোঁক আছে।সেই জন্য আমি ডিজিটাল টেকনলজি বোঝার চেষ্টা করি।কিন্তু এই টেকনলজির প্রয়োগ ভারতবর্ষে করা যাবে কিনা সেটা বুঝতে পারছিলাম না।‘নীল নির্জনের’ কাজ যখন আমরা শেষ করেছি তখনও আমরা  বুঝতে পারিনি ছবিটা দাঁড়াবে কিনা।কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছবিটা দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন:  কেরিয়ারের শুরুতে শাহরুখকে সব রকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সঞ্জয় দত্ত

এই টেকনলজির রূপান্তরকে আপনি কী ভাবে দেখেন?

সুব্রত সেন : দেখুন ফিল্ম টেকনলজির মাধ্যমে তৈরি হয়।সিনেমার একশো বছরের ইতিহাসে টেকনলজি বহুবার পালটেছে।সিনেমা প্রথমে সায়লেন্ট ছিল।তারপর টকি হলো।তারপর ব্ল্যাক অ্যাণ্ড ওয়াইট থেকে কালার হলো।তারপর কালারের নানা ভ্যারিয়েশন এলো।নানা রকম ফরম্যাট এলো।সুতরাং টেকনলজির পরিবর্তন সব সময় হয়েছে।টেকনলজির সঙ্গে সঙ্গে এস্থেটিকসও বদলে যায়।নতুন এস্থেটিকস তৈরি করা এবং নতুন এস্থেটিকস ধরতে পারাই হলো ট্যালেন্ট।

আপনার প্রতিটা সিনেমার মধ্যে যৌনতা এটা ইম্পর্টেন্ট রোল প্লে করছে।যৌনতা কি আপনার সিনেমাকে চালিত করে?

সুব্রত সেন : যৌনতা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।আমরা তো যৌনতারই ফল।যৌনতার ফলেই আমাদের জন্ম হয়েছে।আমার মধ্যে কোনও ভিক্টোরিয়ান ট্যাবু নেই।তাই যৌনতা নিয়ে আমার কোনও সমস্যা নেই।যৌনতা যে জরুরি সেটা বোঝার জন্য খুব বেশি দূর যেতে হয় না।ফ্রয়েড পড়লেই বোঝা যায়।তাই সিনেমায় যৌনতা থাকলে দোষ হবে কেন!

না, দোষের কথা বলছি না।যৌনতাকে আঙ্গিকের মাধ্যমেও ছবিতে দেখানো যায়।কিন্তু আপনার ছবিতে ডিরেক্ট যৌনতা দেখানো হয়।

সুব্রত সেন : আমার ছবিতে ডিরেক্ট যৌনতা দেখানো হয় না।ডিরেক্ট যৌনতা যদি আমার ছবিতে আসত,তাহলে আমার ছবি সেন্সর সার্টিফিকেট পেত না।আমার ছবি ম্যাক্সিমাম একটা A তকমা পায়।সেনসর বোর্ড যতদিন আছে ততদিন আমাদের ছবিতে ডিরেক্ট যৌনতা দেখানো যাবে না।আমার ছবিতে ডিরেক্ট যৌনতা আছে, এ কথা বললে অদ্ভুত শোনাবে।আমার ছবিতে যৌনতা থাকেই না।

কী বলছেন,আপনার ছবিতে যৌনতা থাকে না?

সুব্রত সেন : যৌনতা থাকে কিন্তু যৌন প্রক্রিয়া থাকে না।

আমি কিন্তু যৌন প্রক্রিয়ার কথা বলিনি।যৌনতার কথা বলছি।

সুব্রত সেন : যৌনতা আরো অনেক ইনটেন্স হতে পারে।যেটা আমাদের দেশে এখনও করা সম্ভব নয়।আমাদের দেশ ন্যুডিটিই অ্যালাও করে না।

বাঙালি দর্শক কি ন্যুডিটি হজম করতে পারবে?

সুব্রত সেন : এটা কিছুটা অভ্যাসের ব্যাপার।আপনার বাড়ির কাজের মহিলাকে রবিশঙ্করের মিউজিক শোনালে তার ভালো লাগবে না।কিন্তু আপনি হয়ত খুশি হবেন।আমি মোৎজার্ট শুনলে খুশি হই।কিন্তু অনেক মানুষ আছেন যারা বলেন এগুলো কী শুনিস?তাই বলছি এগুলো অভ্যাসের ব্যাপার।অভ্যাস থাকলে তবেই আর্টকে এ্যাপ্রিশিয়েট করা যায়।

যখনই কোনও ছবিতে A তকমা পড়,তখনই মানুষ সেটা দেখার জন্য ভিড় করে।এর কারণ কি যৌনতা?

সুব্রত সেন : আমার মনে হয় না।যৌনতা মানুষ ইন্টারনেট খুললেই দেখতে পায়।শুধুমাত্র যৌনতা দেখার জন্য মানুষ ভিড় করছে— এ কথা আমি বিশ্বাস করি না।

সাংবাদিকতা,সিনেমা ছাড়া আপনি উপন্যাসও লিখেছেন।ঔপন্যাসিক হিসেবে কলম ধরার কারণ কি স্বাদ বদল?

সুব্রত সেন : চব্বিশ বছর বয়েসে আমার পর পর দুটো গল্প দেশ পত্রিকায় বেরিয়েছিল।মাঝে মধ্যেই আমার মনে হতো লেখাটা লিখলে হয়।কিন্তু সময় হতো না।উপন্যাস যখন লিখছিলাম,তখন আমার হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল।তাই লিখেছিলাম।

আপনার নিজের লেখা উপন্যাস নিয়ে কখনও ছবি করার ইচ্ছে হয়েছে?

সুব্রত সেন : আমার উপন্যাস নিয়ে ছবি করতে গেলে যে বাজেট দরকার সেটা আমাকে কেউ দেবে না।আমি খুব ছোট বাজেটে ছবি বানাই।আর এই হিসেবেই আমি পরিচিত।

আপনি বলেছেন প্রযোজক আপনাকে আড়াই কোটি টাকার অফার দিলে,ফ্লোরে যাওয়ার আগে আপনি অর্ধেক টাকা ফেরত দিয়ে দেবেন!

সুব্রত সেন : অর্ধেক কেন,আমি তিন ভাগের এক ভাগ টাকা ফেরত দেব।অত টাকা আমার লাগবে না।আমি পার্সোনাল ছবি করতে চাই।ছোট গল্পের মতো।তাই অত বাজেট আমার প্রয়োজন হবে না।

আপনি সৃজিত,শিবপ্রসাদের সিনেমা দেখেছেন?

সুব্রত সেন : হ্যাঁ, দেখেছি।সৃজিতের বেশি ভাগ ছবি আমি দেখেছি।ওর ছবি আমার ভালো লাগে।ওর ছবির মধ্যে আমি বুদ্ধির ছাপ পাই।শিবপ্রসাদ-নন্দিতার ছবি আমি অনেক দিন দেখিনি।‘ইচ্ছে’ আর ‘মুক্তধারার’ পর ওদের ছবি আমার দেখা হয়ে ওঠেনি।

আরও পড়ুন:  গোবিন্দার সঙ্গে কী সমস্যা বরুণ ধাওয়ানের!? নিজের ছবির গান থেকেও বাদ দিয়ে দিলেন তাঁর নাম

আপনি রাজ চক্রবর্তীর ছবি দেখেছেন?

সুব্রত সেন : রাজের আমি অনেক ছবি দেখেছি।রাজের ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবির মধ্যে একটা অদ্ভুত ইনটেনসিটি আছে।

রাজ চক্রবর্তী অনেক রিমেক ছবি তৈরি করেছেন।এটা কি সিনেমার পক্ষে স্বাস্থ্যকর?

সুব্রত সেন : আমি এর মধ্যে অস্বাস্থ্যকরের কিছু দেখি না।আমি ছোটবেলা থেকে বাংলায় বহু অনুবাদ সাহিত্য পড়েছি।সেরকম সিনেমাও হতে পারে।আমার মনে হয় এর ফলে সিনেমার ল্যাঙ্গুয়েজ সমৃদ্ধ হয়।এর প্রয়োজন আছে।দু’হাজার পাঁচ-ছয়-এ এরকম ছবির প্রয়োজন ছিল।ছবির একটা মেজর জায়গা হলো দর্শককে টেনে আনা।এটা না হলে একটা ইন্ডাস্ট্রি বাঁচে না।সিনেমা এণ্ড অফ দ্য ডে একটা মাস মিডিয়া।সেই মাস যদি মুখ ঘুরিয়ে নেয় তাহলে সমস্যা।

এখনও কিন্তু রাজ চক্রবর্তী রিমেক তৈরি করেন।

সুব্রত সেন : এখন রিমেক চলছে না।অন্য কিছু ভাবতে হবে।

আপনার ছবি তো পার্সোনাল ছবি।সেটা নির্দিষ্ট দর্শকদের জন্য।সেক্ষেত্রে আপনি কি কখনও মাসকে টানার কথা ভেবেছেন?

সুব্রত সেন : আমি পারব না।আমার সব কিছু খুব শহুরে।তাই মাসের জন্য ছবি বানাতে পারব বলে মনে হয় না।এটা আমার অক্ষমতা।

মন থেকে কি আপনি মাসের জন্য ছবি বানাতে চান?

সুব্রত সেন : না, আমি চাই না।আমি পারব না।আমি আমার লিমিটেশন বুঝি।

প্যারালাল ফিল্মমেকাররা বলে থাকেন ১৯৮০ থেকে ২০০০ সাল বাংলা সিনেমার সবচেয়ে খারাপ সময়।আপনিও কি তাই মনে করেন?

সুব্রত সেন : এ ব্যাপারে আমি রাইট জাজমেন্ট দিতে পারব না।কারণ ওই বিশ বছরের মধ্যে এগারো বছর আমি কলকাতায় ছিলাম না।দিল্লিতে থাকতাম।ফলে বাংলা ছবি তেমন ভাবে দেখা হতো না।দিল্লির ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অপর্ণা সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবি দেখেছিলাম।

আপনি অঞ্জন চৌধুরীর ‘শত্রু’ দেখেছেন?

সুব্রত সেন : ‘শত্রু’ দেখেছি।তখন আমি কলেজে পড়ি।‘শত্রু’ আমার ভালো লেগেছিল।‘শত্রু’ এবং ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ বাংলা ছবিকে ফিরিয়ে এনেছিল।বাঙালি দর্শক এই দুটো ছবির জন্য আবার সিনেমা হলে যেতে শুরু করেছিল।দর্শক ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই দুটো ছবি মেজর পদক্ষেপ নিয়েছিল।

জানেন তো ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্নাকে’ ইন্টালেকচুয়ালরা যাত্রাপালা বলেন?

যাত্রা একটা আর্ট ফর্ম।যাত্রা একটা লোকশিল্প মাধ্যম।সেই মাধ্যমকে যদি বাংলা সিনেমা নকল করে তাহলে অন্যায়টা কোথায়?আপনি কুরোসোওয়ার ছবি দেখেছেন?দেখলে বুঝতে পারবেন ওনার ছবিতে উনি জাপানিজ থিয়েটারের ফর্মকে ব্যবহার করেছেন।ছবিকে সব সময় ইউরোপ ঘেঁষা কিংবা হলিউডের মতো হতে হবে কেন?সিনেমায় যাত্রার ফর্মকে ব্যবহার করার মধ্যে আমি কোনও সমস্যা দেখি না।

কুরোসাওয়ার  ছবিতে জাপানিজ থিয়েটারের ফর্ম ব্যবহার করা আর ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্নার’ যাত্রা সুলভ ক্রিয়াকলাপকে আপনি এক আসনে বসালেন?

সুব্রত সেন : আমি শুধুমাত্র একটা উদাহরণ দিয়েছি।আপনার ছবিতে মুখ্য চরিত্র হিসেবে নারী ঘুরে ফিরে আসেনারী কেন্দ্রিক ছবি করার কি কোনও কারণ আছে?

সুব্রত সেন : যে কোনও পেইন্টার, মহিলাকেই বেশি করে আঁকেন।তেমন ভাবে কোনও পুরুষকে আঁকেন না।সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসগুলোতে নারী চরিত্রগুলো খুব ইম্পরটেন্ট।যে কোনও ক্রিয়েটিভ মানুষেরই এটা হয়।

কখনও মনে হয় এ শহরে মহিলা ফিল্মমেকারের সংখ্যা এত কম কেন?

সুব্রত সেন : এটা নিয়ে আলাদা করে আমি কখনও ভাবিনি।শুধু ফিল্ম মেকিং-এ নয়,এঞ্জিনিয়ারিং থেকে ইকনোমিক্সের যে কোনও ফ্যাকাল্টিতে যান, দেখবেন মহিলা টিচারের সংখ্যা খুব কম।একটা ব্যাঙ্কের ভিতরে দেখুন,দেখবেন বেশি সংখ্যক পুরুষ কাজ করছেন।এগুলো সোসাইটি নির্ধারণ করে।

অবসরে ফিল্মের চিন্তার বাইরে কী ধরনের চিন্তা আপনার মনে আসে?

সুব্রত সেন : আমি অবসরেই ফিল্ম বানাই।ছবি বানানো আমার পেশা নয়।পেশার জন্য আমাকে আমার পোস্ট প্রোডাকশন স্টুডিও চালাতে হয়।লিখতে হয়।ফিল্ম আমার কাছে একটা অন্যরকম এক্সপিরিয়েন্স।

কী  রকম এক্সপিরিয়েন্স?

সুব্রত সেন : আমার কাছে ফিল্ম হলো জাঁ লুক গোদারের সেই কথা —“A Film is a film is a film”.

NO COMMENTS