বাংলালাইভ রেটিং -
Double Feluda Bengali Film Review

প্রথমে একটা স্কুপ নিউজ দিই। ক’জন জানেন জানি না, ফেলুদার যে দুটো গল্প নিয়ে এবার এই ‘ডবল ফেলুদা’ তৈরি হল, তার একটা গল্প ‘গোলোকধাম রহস্য’ কিন্তু টেলিভিশনে হয়ে গেছে আগেই। কলকাতা দূরদর্শনের জন্য দু’পর্বে এই গল্প তৈরি হয়েছিল এখন থেকে পাক্কা ছাব্বিশ বছর আগে। সেটা ১৯৯০ সাল। ফেলুদার ২৫ বছর পূর্তি উৎসব চলছে। সত্যজিৎ রায় বহাল তবিয়তে বেঁচে। তাঁর অনুমতি নিয়ে কম বাজেটে বাংলা টিভির জন্য ওই গল্পটা আর তার সঙ্গে ‘ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা’ বানালেন বিভাস চক্রবর্তী। আর সেই তিন এপিসোডের মিনি সিরিজে ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য তিনি বেছে নিলেন কাকে বলুন তো? কাকে আবার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে স্বয়ং!

এখন মুশকিল বলতে এইটে যে, সেই ’৯০ সালেই তো সৌমিত্রের ৫৫ বছর বয়স হয়ে গেছে! চুল-টুল সাদা হয়ে গিয়ে চেহারায় বয়সের বেশ ভালমতোই ছাপ। এরকম বুড়োটে একটা লোককে ফেলুদা মানাবে কী করে? কফিনের ওপর শেষ পেরেকটা ঠুকে দিল বোধহয় তখন আজকাল গ্রুপের ‘টেলিভিশন’ নামের ম্যাগাজিনটা। আগস্ট মাসের ইস্যুতে ডিটেল করে বিভাসবাবুর এই ‘ফেলুদা’ প্রোজেক্ট কভার করতে গিয়ে মহা-উৎসাহের চোটে সেখানে এই কথাগুলোও ছাপা হয়ে বেরিয়ে গেল যে, ‘শহরের বিখ্যাত মেকআপম্যান অনন্ত দাস সৌমিত্রর জন্য একটা চমৎকার পরচুলোর ব্যবস্থা করেছেন’ (‘আবার ফেলুদা’, ‘টেলিভিশন’, আগস্ট ১৯৯০, পৃষ্ঠা ২৩)।

ফেলুদার জন্যে যে সব ইমোশনগুলো মনের কোণে লুকনো ছিল, এই লাইনটা পড়ার পর তার পুরোটা ভেঙে শেষ! ফেলুদা নাকি পরচুলো পরে ঘুরবে, আর সেটা আমাদের হজম করতে হবে? ছ্যা ছ্যা, সে আবার কখনো হয় নাকি?

মিনি-সিরিজটা হল যাকে বলে, চরম অখাদ্য। ভাগ্যিস কোথাও আর তার রেকর্ডিং খুঁজে পাওয়া যায় না, এক যদি না দূরদর্শনের মহাফেজখানার এককোণে কিছু পড়ে-টরে থাকে।

মনে আছে তখন আমি সেই শক সামলাতেই নাজেহাল। এবং সেসময় ঘুণাক্ষরেও এটা আঁচ করতে পারিনি যে, ফেলুদার স্ক্রিন অ্যাডাপটেশনের ভয়ংকর একটা রাহুগ্রাস আসলে শুরু হয়ে গেছে সেই ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর পর থেকেই। কখনো ন্যাশনাল টিভি-র জন্যে সিরিয়াল বানাতে গিয়ে ইয়া মোটা শশী কাপুরকে বোম্বে থেকে ডেকে এনে ফেলুদা সাজানো হবে। কখনো ‘সোনার কেল্লা’ কিংবা ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙিয়ে খেতে ৫৫ বছরের প্রৌঢ় মানুষকে মাথায় পরচুলো পরে নামিয়ে দেওয়া হবে আসরে!

১৯৮৭তে সন্দীপ রায়ের টিভি সিরিজ 'কিসসা কাঠমান্ডু কা'তে ফেলুদার ভূমিকায় শশী কাপুরমজাটা দেখুন! ২৫ বছর পূর্তি উৎসবের মতো ফেলুদার ৫০ বছর পূর্তি উৎসবটাও হচ্ছে কিনা সেই ‘গোলোকধাম রহস্য’ নিয়েই! সেবারও ছিল দুটো গল্প, এবারও তাই! শুধু ‘গোলোকধাম’-এর সঙ্গে ‘ঘুরঘুটিয়া’টা না রেখে তার বদলে ‘সমাদ্দারের চাবি’। আর মাথায় পরচুলোটা এখনও অবধি মিসিং, তার বদলে আছে বেঢপ একটা ভুঁড়ি। যে সিনগুলোয় সব্যসাচী বসে আছেন, কিংবা ভদ্রলোকের মুখের ক্লোজ শট ধরা হচ্ছে স্ক্রিনে, বিশ্বাস করুন সেগুলোতে খুব একটা খারাপ লাগছে না কিন্তু। শুধু উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা-চলা করতে গেলেই সাড়ে সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে, ভাই।

সেরকম একটা শক দিয়েই ছবির শুরু। মণিমোহন সমাদ্দার-এর (ব্রাত্য বসু) সঙ্গে রাধারমণ সমাদ্দারের সেই বাজনা-ঠাসা ঘরে ঢুকছে ফেলুদা। ঘরভর্তি বাজনার সংগ্রহ দেখে তখন কোথায় আমার মুখ হাঁ হয়ে যাওয়ার কথা। তার বদলে মুখ হাঁ হয়ে যাচ্ছে ঢলঢলে জামার তলায় কচ্ছপের পিঠের মতো একটা ভুঁড়ি জেগে উঠতে দেখে!

তারপর নিজেই নিজেকে বোঝাচ্ছি যে না না, ঠিক আছে, আর যাই হোক, শশী কাপুরের চেয়ে বেশি খারাপ তো আর হয় নি!

আচ্ছা, ‘গোলোকধাম রহস্য’ কিংবা ‘সমাদ্দারের চাবি’তে ফেলুদার বয়সটা ঠিক কত হওয়া উচিৎ? এই নিয়ে কোথাও কোন হিসেব লেখা আছে? সব্যসাচী নিজে স্বয়ং একটা ইন্টারভিউতে বলছেন দেখলাম, ‘ফেলুদার বয়স হবে না এটাই বা কোথায় লেখা আছে? ফেলুদাও মানুষ। একটা তথ্য দিই। ফেলুদা যখন পঞ্চাশ বছর আগে লেখা হয়েছিল, তার বয়স ছিল ২৭। অতএব ৫০ বছর পর তার বয়স ৭৭ হতে হয়। আমি তো ৭৭ নই, তার চেয়ে ইয়ং।’ (পপকর্ন, সংবাদ প্রতিদিন, ৯ ডিসেম্বর)।

Pratidin_9th Dec_part 2বেশ যুক্তি কিন্তু, তাই না বলুন? সিনেমা-থিয়েটারে অভিনয় নিয়ে সুপার-ব্যস্ত বলে সব্যসাচীর পক্ষে ফেলুদাকে নিয়ে এর চেয়ে বেশি কোন খোঁজ-খবর নেওয়ার সময় থাকে না জানি। কিন্তু জাস্ট এই যুক্তিটাতেই কী ভাবে তাল ঠুকে ঘাড় নেড়ে দিয়েছেন সত্যজিতের সুপুত্রটিও, সেটাই আসলে অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার।

কেন জানেন? ফেলুদার বয়স নিয়ে যে ঠিক এর ১৮০ ডিগ্রি উলটো ধারণা পোষণ করতেন সত্যজিৎ রায় স্বয়ং! ‘টেলিভিশন’ ম্যাগাজিনের যে কভার ফিচারটার রেফারেন্স একটু আগেই দিলাম, সেখানে নিজের হাতে লিখে দেওয়া এক প্রশ্নোত্তরে সত্যজিৎ রায় স্বয়ং কী বলছেন, শুনবেন?

আরও পড়ুন:  প্রপোজ করতে গিয়েই ল্যাং খেয়েছিলেন অর্জুন কপূর

প্রতিবেদকের প্রশ্নটা ছিল এরকম, ‘ফেলুদার এখন (মানে সেই ’৯০ সালে) বয়স কত?’ সত্যজিতের তরফে এর উত্তরটা ছিল এইরকম যে, ‘শুরুতে ফেলুর বয়স ছিল ২৭/২৮। এখন পঁয়ত্রিশে এসে থেমে গেছে। এসব চরিত্রের বয়স বাড়ানো চলে না। আগাথা ক্রিস্টির গোয়েন্দা এরক্যুল পোয়ারোর প্রথম আবির্ভাব ১৯২৩-এ। তখনই তিনি কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর বয়স পঞ্চাশের উপর তো বটেই। সেই থেকে শুরু করে প্রায় ষাট বছর ধরে একের পর এক রহস্যের সমাধান করে গেছেন পোয়ারো। নিয়ম মতো শেষের দিকে তাঁর বয়স হওয়া উচিৎ ছিল একশোর বেশি। ফেলুর আবির্ভাব পঁচিশ বছর আগে। ফেলুর মাথার চুলে পাক ধরেছে এ তথ্য ফেলু-ফ্যানেরা গলাধঃকরণ করবে কি?’ ( ‘টেলিভিশন’, আগস্ট ১৯৯০, পৃষ্ঠা ২৪-২৫)।

এই ইন্টারভিউটা এরপরেও রি-প্রিন্ট হয়েছে এদিকে ওদিকে। কোনদিন এটা চোখে পড়ে নি সন্দীপ রায়ের, আর তাই ফেলুদাকে নিয়ে বাবার এই স্পষ্ট মতামতটা উনি জানতেই পারেন নি আদৌ, এটা বিশ্বাস করতে হবে?

Romantic Noy_Poster৬০ বছরের বুড়ো ফেলুদার পাশে তোপসের বয়স কত হলে তাকে মানায়, সেটা বলতে পারা খুব মুশকিল। আমার বোধহয় পাপী মন, সেই জন্যে তোপসের রোলে সাহেব ভট্টাচার্যকে দেখতে দেখতে বারবার শুধু এইটে মনে পড়ছিল যে, এই ‘ডবল ফেলুদা’র পাশাপাশি সাহেবের আরও একটা বাংলা সিনেমা এখন এই শহরে চলছে। সেখানে এই সাহেব আবার সোলো হিরো। ছবির নাম ‘রোমান্টিক নয়’। সাহেব সেখানে অভিনয় করেছেন কীসের ভূমিকায়, জানেন তো? পুরুষ যৌনকর্মী! বিষম খাবেন না প্লিজ! একটার পর একটা মেয়ের সঙ্গে বেড সিন, কোথাও তো আবার প্রায় ন্যুড হয়ে দাঁড়াতে হয়েছে, জাস্ট শুধু একটা জাঙিয়া পরা অবস্থায়! আমি শুধু হাইপথেটিক্যালি একটা সিচুয়েশন ভাবছিলাম যে সত্যজিৎ এখনও সুস্থ অবস্থায় বেঁচে আছেন। বয়স্ক ফেলুদা আর পুরুষ-বেশ্যা ইমেজের তোপসেকে দেখে তাঁর সম্ভাব্য রিয়্যাকশন কী হতে পারতো বলুন দেখি?

কিংবা কী মনে হতো তাঁর যখন দেখতেন ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’ ছবিতে যে ভদ্রলোক ফিল্ম ডিরেক্টর পুলক ঘোষাল, ‘যেখানে ভূতের ভয়’ ছবিতে যে ভদ্রলোক গল্প-বলিয়ে তারিণীখুড়ো, সেই ভদ্রলোক আবার একটুও গেট-আপ চেঞ্জ না করে এই ছবিটায় সিধু জ্যাঠা সেজে বসে পড়েছেন!  ঠিক ধরেছেন, পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাই বলছি!

বয়সের আর ইমেজের হিসেব নিয়ে কথা হচ্ছে যখন, তখন এই ফাঁকে গুনতির হিসেব নিয়ে এই ছবির আরেকটা ঘাপলা শুনে রাখুন। ছবির ট্রেলার চালান, শুরুতেই দেখবেন ‘৫০ বছর আগে সত্যজিতের সৃষ্টি গোয়েন্দা ফেলুদার প্রথম আবির্ভাব’ এই কথাগুলো সাড়ম্বরে ভেসে উঠছে স্ক্রিনে। সঙ্গে আবার দেখানো হচ্ছে এই সিরিজের প্রথম গল্প ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’র পাণ্ডুলিপির শট! আমার কোশ্চেন হচ্ছে এখানেই। ৫০ বছর বলছিস কেন ভাই, মিনিমাম যোগ-বিয়োগের অঙ্ক শিখিস নি নাকি?

আপনি নিজেই হিসেব করুন না! ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ ছেপে বেরিয়েছিল ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে। সেই হিসেবে এই ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে পৌঁছে তো ফেলুদার ৫১ বছর পূর্তি উৎসব হওয়ার কথা, তার বদলে হিসেবটা ফস করে ৫০ বছরের হয়ে গেল কেন? ৫১-র চেয়ে ৫০ শুনতে বেশি ভাল লাগে বুঝি? নাকি গেল বছরের ডিসেম্বরে ৫০ পূর্তির সেলিব্রেশনটা যে বেবাক ‘মিস’ করে গেছিলেন, সেই কথাটা চুপচাপ চেপে যাওয়ার তাগিদও ছিল একটা?

ফেলুদার সিনেমায় খুচখাচ করে এরকম সব ঘাপলা থাকছে মানে, ব্যাপারটা জটায়ুর ভাষায় বলতে গেলে ‘হাইলি সাসপিশাস’। কাদের হাতে পড়ল এসে সত্যজিতের অমূল্য সব সৃষ্টিগুলো, ভাই?

ভুঁড়ির ঘাপলা, বয়সের ঘাপলা, স্ক্রিন-ইমেজের ঘাপলা, হিসেবের ঘাপলার পরে এবার বানানের ঘাপলা শুনুন। ছবির শুরুতেই স্মোকিং নিয়ে ডিসক্লেমারে চরম একটা বেআক্কেলে বানান! ‘ধূমপান’ শব্দটার বাংলা বানান লেখা হচ্ছে ‘ধুমপান’! ছবির দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর মুখেও ফের এই ভুল বানানের ছটা! এখন এটা যদি ‘ফেলুদা’ না হয়ে ‘হরিপদ ব্যান্ডওয়ালা’ হত, ডিসক্লেমার ছাড়ুন, ছবির নামের বানান ভুল হলেও কারুর আসতো-যেত না কিছু। কিন্তু ফেলুদার মতো ব্র্যান্ডে এমন নির্লজ্জ ভুল হজম করি কী করে বলুন তো?

ভাববেন না, ভুল বানানের কেলেঙ্কারি এইটুকুতেই শেষ। চলুন ছবির সেকেন্ড হাফে। ‘গোলোকধাম রহস্য’। শব্দটা যে ‘গোলকধাম’ নয়, বরং ‘গোলোকধাম’, স্বয়ং সত্যজিৎ গল্পের হেড-পিস আঁকতে গিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন সেটা। সত্যজিতের এঁকে যাওয়া সেই ছবি আর নামের বানান রয়েছে এ ছবির ট্রেলার আর ক্রেডিট টাইটেলেও। এবং এরপরেও সিনেমার মধ্যে বিজ্ঞানী নীহার দত্তের বাড়ির নেম-প্লেটে শব্দটার স্পষ্ট কোন বানান দেখানো হল, জানেন? ‘গোলকধাম’!

আরও পড়ুন:  অবৈধ সন্তান আছে আমির খানের!?

সত্যজিতের লেখায়-আঁকায় গল্পের নামের যে বানান ছবির ক্রেডিট টাইটেলে আছেসন্দীপবাবুর ৬৩ বছর বয়স, এটা কি সেই বয়সজনিত ক্লান্তির চোটে ‘ভুল’? গোটা ডিরেক্টরিয়াল টিমে আর কেউ ছিল না যে এই ভুলটা কারেক্ট করে দিতে পারে? ফেলুদার ৫০ বছর হচ্ছে বলে ড্রাম বাজানো হচ্ছে সেটা ঠিক আছে, কিন্তু সেটা নিয়ে সিরিয়াস কোন কাজ করতে গেলে তো মিনিমাম একটা রিসার্চ একটা যত্ন থাকতে হয়, নাকি?

‘গোলোকধাম’-এর ভুল বানানটা আসলে লাগু হয়ে আছে সত্যজিৎবাবু চলে যাওয়ার পর থেকেই। প্রথম প্রকাশের সময় সন্দেশে তো বটেই, ১৯৮১-র সেপ্টেম্বরে যখন এই গল্পটা ঠাঁই পেল সত্যজিতের গল্পগ্রন্থ ‘আরো বারো’তে – তখন অবধি নামের বানানটা ঠিকই ছিল। ‘গোলোকধাম’। গোলমালের শুরু পরের দিকে। তখন এদিকে সত্যজিৎ আর নেই, অন্যদিকে বিপণনের নিত্য-নতুন ফিকির এঁটে একটার পর একটা সংকলন, প্যাকেজিং আর রি-প্যাকেজিং চলছে ফেলুদার। তখনই নিঃশব্দে ঘেঁটে গেল নামের বানানটা। হ্যাঁ, নামী প্রকাশনা সংস্থার ‘ফেলুদা সমগ্র’ও এখন বাজারে চলছে দায়সারা ভাবে জুড়ে দেওয়া নামের ওই ভুল বানানটা সঙ্গে নিয়েই!

এই ‘ডবল ফেলুদা’ ছবির এন্ড ক্রেডিটে বড় পাবলিশিং হাউসের কেষ্ট-বিষ্টুদের প্রায় ছলছল চোখে ফেলুদার বিক্রিবাটা নিয়ে তারিফ করতে শুনবেন। পারলে বোধহয় ঢিপ করে ওঁরা ফেলুদার পায়ে একটা প্রণামই ঠুকে ফেলতেন তখন। কিন্তু বছরের পর বছর দায়সারাভাবে ভুল বানানে যে ফেলুদার আস্ত একটা গল্পের নাম ছাপা হয়ে চলেছে, সেটা নিয়ে এঁদের জাস্ট কারুর কোন মাথাব্যথা নেই, কেউ বোধহয় ব্যাপারটা আদৌ নজর করেই দ্যাখেন নি, সেটাই হল মজা!

অবিশ্যি এ ছবিটা দেখার পর বোঝা গেল, খোদ সন্দীপ বাবুরও এ ব্যাপারে দায়-টায় কিছু নেই, হেড-পিসে যেমন ছিল সেটাও যেমন সিনেমায় ছেপে দিয়েছেন, তেমনি আবার গল্পের বাজারি এডিশনে যে বানান ছেপে বেরচ্ছে, কাট-পেস্ট চিপকে দিয়েছেন সেটাও! এখন দুটো বানান আদৌ ম্যাচ করলো কিনা, না করলে কেন করলো না, সেটা দেখার মিনিমাম কোন তাগিদ পান নি খুঁজে।

‘সমাদ্দারের চাবি’ লেখা হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। ‘গোলোকধাম রহস্য’ লেখা হল ১৯৮০ সালে। নতুন করে পড়তে গিয়ে দেখি, ওরে বাব্বা, এ যে একেবারে ব্যোমকেশ লেভেলের পিরিয়ড পিস হয়ে গেছে! ভিনটেজ গন্ধটা একেবারে ম-ম করছে এতে! জোর করে হিঁচড়ে টেনে গল্পদুটোকে এখনকার কলকাতায় সেট করে দেওয়াটা কি মুখের কথা নাকি? গল্পের মোক্ষম সব লজিক তাতে নড়বড়ে হয়ে যাবে না খুব?

দুটো গল্পতেই সমকালকে যত্ন করে বুনে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ, যেমন ধরুন পাতা ওলটালেই গল্পদুটোয় আকছার রেফারেন্স পাবেন ‘লোডশেডিং’ হয়ে যাওয়ার। গল্পগুলোকে ‘মডার্ন’ করার তাগিদে ন্যারেটিভ থেকে জাস্ট কান ধরে সেই ‘লোডশেডিং’ ব্যাপারটাকে বের করে দিচ্ছেন, একজায়গায় ‘লোডশেডিং’-এর বদলে ‘কেবল ফল্ট’ বলে ম্যানেজ করছেন, ঠিক আছে। কিন্তু ‘সমাদ্দারের চাবি’র আসল ভিতটা দাঁড়িয়ে আছে যার ওপরে, যে একটা মানুষ, ব্যাঙ্ক ফেল মেরেছে বলে ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার ওপর থেকে যার ভরসা টুটে গেছে, এখন সে আর ব্যাঙ্কে টাকা না রেখে নিজের টাকা নিজের কাছে জমিয়ে রাখে বাড়িতেই, সেটাকে কী করে আপনি ‘মডার্ন’ করবেন সন্দীপবাবু?

এখানে যা দেখা গেল, ব্যাঙ্ক ফেল মেরে বিশ্বাস টলে যাওয়ার গোটা লজিকটাই গল্প থেকে জাস্ট বাদ চলে গেল। তাড়া তাড়া হাজার টাকার নোট রাধারমণ সমাদ্দার কেন নিজের বাড়িতে জমিয়ে রাখে, কেন সেগুলো ব্যাঙ্কে জমা করে না, সেটা নিয়ে একবারও কারুর মনে কোন খটকা অবধি এলো না, খোদ ফেলু মিত্তিরের মনেও না। গল্পকে আজকের সময়ে এনে ফেলতে গিয়ে বেসিক কোন জায়গাটা নড়বড়ে হয়ে গেল, বুঝতে পেরেছেন সেটা?

সত্যজিৎ গল্পটাকে নিয়ে ফেলেছিলেন প্রাক-পুজোর মরসুমে। সন্দীপও ঠিক সেটাই ফলো করেছেন, একবার শুনিয়েও দিয়েছেন একটা দিন-তারিখের কথা, ১৮ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার। বেশিদিন আগের কথা নয়, ২০১৪ সালেই তো ১৮ সেপ্টেম্বর পড়েছিল বৃহস্পতিবারে! আরে, তবে কি এটা ২০১৪ সালের ঘটনা? আচ্ছা, ফি বছর সেপ্টেম্বরের ওই সময় নাগাদই তো বিশ্বকর্মা পুজো হয়, আপনি ওই টাইম ফ্রেমটাকে ধরছেন, অথচ পুজো-টুজোর কোন রেফারেন্স থাকছে না কোথাও?

খুঁজলে এমন হোঁচট আরও পাবেন দিব্যি। যেমন ধরুন, গল্পের একটা মোক্ষম মোচড় ঘটছে ১৮ সেপ্টেম্বরের ঠিক পরের অমাবস্যার রাতে। এখন ২০১৪ সালের সেই রাতটা যে আসলে নিছক আর পাঁচটা অমাবস্যার রাতের মতন ছিল না, বরং সেটা যে ছিল আসলে মহালয়ার রাত – ভোর হলেই পিতৃপক্ষের শেষ আর দেবীপক্ষের শুরু, আর ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর মতো ফেলুদার এই গল্পটাও যে এভাবে প্রায় পুজোর মধ্যে ঢুকেই পড়েছে, সেসব রেফারেন্স গল্পে আনার কথা মাথায় এল না কারুরই!

আরও পড়ুন:  'আনন্দী' অভিকা গোর আর মনীশের সম্পর্কের কথা কি সত্যি!?

শ্রীনাথের দিয়ে যাওয়া খাবার কেউ খেল না কেনতবে অমনোযোগের আসল বোমাটা পড়লো এসে ‘গোলোকধাম রহস্য’তে। ফেলুদা-তোপসে যে বাড়িটায় থাকে, সেখানে ওরা দুজনে আর একটা চাকর ছাড়া আদৌ আর কেউ থাকে কিনা, তোপসের মা-বাবার কী হল, আদৌ তাঁদের কারুর একটা পাসিং শট অবধি দেখা গেল না কেন, কিংবা এ ছবির মক্কেল সুবীর দত্ত (ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়) যখন ফেলুদাকে প্রথম ‘মিট’ করতে আসে, তখন ওদের চাকর শ্রীনাথ এসে চায়ের সঙ্গে ডালমুট না চিপস কী একটা দিয়ে গেল, অথচ পুরো সিনটায় কেউ একজনও সেই খাবারে হাত অবধি ছোঁয়াল না কেন, এমনকি ফেলুদা অবধি তার মক্কেলকে ভদ্রতা করে একবারও খেতে বলল না কেন, এই খুচরো ভুলগুলো তো ধরছিই না। মহা-ভুল হয়ে গেল তো পরে, নীহার দত্তের বাড়িতে।

শুট শুরুর আগে ধৃতিমানকে প্রয়োজনীয় নির্দেশএকটা সিনে দেখানো হল নীহার দত্তের (ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়) ভাড়াটে ‘দস্তুর’-এর (বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী) ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। এরপর সেই সিনেই দেখানো হল, দস্তুর ফিরছেন বাইরে থেকে, এবং দরজা-টরজা খুলে ভেতরে ঢুকে চাকর হরিকে হাঁক পেড়ে কোল্ড ড্রিংকস দিয়ে যেতে বলছেন! পুরোটা ঘটছে ফেলুদার সামনে, এবং ফেলুদা এই বিষয়ে অন্তত মুখে তালা-চাবি মেরে চুপ।

মনে মনে তখন খুব করে এটা না বলে পারছিলাম না যে, সত্যি কি বুড়ো হয়ে গিয়ে আর এই সন্দীপ রায়ের পাল্লায় পড়ে তোমার মগজাস্ত্রের একেবারেই বারোটা বেজে গেছে ফেলুদা? না হলে এটা একবারও জিজ্ঞেস করছ না কেন যে, কী মিস্টার দস্তুর, আপনি বাইরে যাওয়ার সময় আপনার চাকর হরিকে এভাবে ঘরের ভেতর তালা বন্ধ রেখে যান নাকি? না হলে তালা খুলে ঘরে ঢোকার পরে ঘরের ভেতরে চাকর হরিকে হাঁক পাড়ছেন কোন লজিকে?

খোদ সত্যজিৎ বইতে কী ভাবে লিখে গেছিলেন এই সিচুয়েশনটা? তিনি লিখছেন, ‘ভদ্রলোক (দস্তুর) ভিতর দিয়ে গিয়েছিলেন বোধহয় চাকরকে ডাকতে, ফিরে আসতে ফেলুদা তাঁকে একটা সিগারেট অফার করল।’ এখন এই ‘ভিতর দিয়ে’ বা ‘ভিতর দিকে’ লিখে সত্যজিৎ যে আসলে নীহার দত্তের পুরো বাড়িটার ‘ভিতর দিকে’ বোঝাতে চেয়েছেন, দস্তুরের ফ্ল্যাটের ‘ভিতর দিকে’ নয়, সেটুকু ইন্টারপ্রেট করে নেওয়ার সাধ্য গোটা প্রোডাকশন টিমের একজনের কারুরও হল না? এইভাবে ছবি শুট হয়ে, ফাইনাল এডিট হয়ে বেরিয়ে অবধি গেল!

কী বলবেন বলুন আপনি!

এইজন্যেই কিনা জানি না, ‘ডবল ফেলুদা’ দেখতে দেখতে দম-টম তো সব বন্ধ হয়ে আসে একেকসময়। ফেলুদা ছবির প্রোডাকশন এতটা ঝুলও হতে পারে তাহলে, সত্যি? সেই কবে কোন কালে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ শুট করতে গিয়ে বেনারসে সাইকেল রিক্সাকে হাফ করে কেটে সেটার সঙ্গে একটা ট্যাক্সির পেছন দিকটা জুড়ে তবে ফেলুদার রিক্সা চড়ার সিনটা শুট করেছিলেন সত্যজিৎ, সেই স্টিল ফটো ‘একেই বলে শুটিং’ খুললে দেখতে পাবেন এখনও। আর এখানে? একে তো ছবির বেশিরভাগটাই ইনডোর সেটের ঘেরাটোপে আটকানো টেলিফিল্ম মার্কা ডায়ালগবাজিতে ভর্তি, অল্প যেটুকু বাইরের সিন ছিল, যেমন ফেলুদার ট্যাক্সি কিংবা গাড়িতে চড়ার সিনগুলো – সেগুলোর বেশিরভাগই আউটডোরে না বেরিয়ে স্টুডিওর মধ্যে সস্তা ক্রোমা সেটেই শুট করে নিয়েছেন সন্দীপ। আর তারপরে সেই ক্রোমা কেটে ব্যাকগ্রাউন্ডে রাস্তার শট জুড়েছে সম্ভবত কোন থার্ড গ্রেডের আনাড়ি মক্কেল, একেক সময় চোখে সেগুলো ঠাস ঠাস করে লাগছে।

কিন্তু তার মানে কি এই ছবিটার পুরোটাই রদ্দি, পাতে দেওয়ার মতো কিচ্ছু নেই? না না, তা কেন হবে! ছবির শুরুর সময় একটার পর একটা ফেলুদা বইয়ের কভার ইউজ করে তৈরি বিগিনিং ক্রেডিট নিয়ে তো জাস্ট কোন কথা হবে না, ভাই! আর শেষ কয়েক মিনিটে যখন এন্ড ক্রেডিট রান করছে, তখন ‘সোনার কেল্লা’ কিংবা ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর কুশীলবদের টুকরো কথাগুলো তো গায়ে কাঁটা দিইয়ে, চোখে আবেগের চোটে জল এনে দিয়ে তবে ছাড়ল!

আপনি ফেলুদার ফ্যান? তবে ওই শুরু আর শেষটুকু দেখার জন্যে অন্তত সিনেমা হল-এ যান। আমিও এখানে এই সিনেমাটাকে যেটুকু নম্বর দিলাম, সেটা ওই শুরু আর শেষটুকুর জন্যেই দিলাম!

 

NO COMMENTS