বাংলালাইভ রেটিং -

বছর সাত-আট আগের কথা হবে। গাড়ি নিয়ে সপরিবারে পুজো দেখতে বেরিয়েছিলাম ষষ্ঠীর দিন রাতে। সেটাই প্রথম, তার আগে আর কখনও সারারাত জেগে ঠাকুর দ্যাখার সুযোগ হয় নি আমার।

পুজোর সময় মাঝরাতের কলকাতা দেখে সেবার চমকে গেলাম আমি। ঘড়ি তো বলছে রাত আড়াইটে বাজে প্রায়। কিন্তু রাজপথ জুড়ে তখনও যে খালি কাতারে কাতারে লোক! গোটা শহর জুড়ে হঠাৎ কোন মেলা বসে গেছে যেন! সাউথ বলুন, নর্থ বলুন, একইরকম ছবি। এরপর ভোর তখন পৌনে চারটে হবে। ভয়ংকর এক ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে পড়লো গাড়ি। সামনে পেছনে যেদিকে তাকাই চারপাশে নিরন্তর গাড়ি আর কালো কালো সব মানুষের মাথা শুধু। সামনের চৌমাথাটায় সে সব নিয়ে যেন একটা অবিশ্বাস্য জট! মনে হচ্ছিল রাত-জাগা গোটা শহর যেন নেমে এসেছিল পথে।

সেবার প্রথম আর সেবারেই পাকাপাকি ভাবে শেষ। ওই লেভেলের ভিড় সামলানো আর যারই হোক, আমার কর্ম না। তাই তারপর আর কখনও ওভাবে রাতের বেলা কলকাতা ঘুরে ঠাকুর দ্যাখার প্ল্যান করি নি আমি।

পার্সোনাল এই অভিজ্ঞতাটা একটা কারণেই লেখা। ওখান থেকে কাট টু চলে আসুন অরিন্দম শীলের নতুন ছবিতে সোজা। ‘দুর্গা সহায়’ নাম। ঠিক ধরেছেন, সেখানে যে ফের একবার সেই ষষ্ঠী রাতের ছবি।

ছবি তখন শেষ হবে হবে প্রায়। তখন ছোট্ট একটা ইনসার্ট দিয়ে ষষ্ঠী রাতের শট। কলকাতার রাজপথ দিয়ে কাজের মেয়ে দুর্গা মণ্ডলের (অভিনয়ে সোহিনী সরকার) ছুটতে ছুটতে থানায় যাওয়ার সিন।

সেই সিন দেখে আমি তো একেবারে থতমত খেয়ে চুপ। নিজের সেই ঠাকুর দ্যাখার অভিজ্ঞতার সঙ্গে কিছু মিলছে না যে ভায়া! ষষ্ঠী রাতের কলকাতা এত শুনশান হয় বুঝি? গোটা ফ্রেমে তো এক নায়িকা ছাড়া আর লোকজন নেই কোন! পুজোর আলো-পুজোর ভিড় আর পুজোর গাড়ি তো ছেড়েই দিলাম না হয়!

পুজোর রাতের কোন কলকাতা এই ছবিটায় দ্যাখাতে এলেন, স্যর? কলকাতার কোন পল্লী তখন এমন নিঝুম থাকে, ঠিকানা একটু জানিয়ে দেবেন, প্লিজ?

ষষ্ঠীর রাতে দুর্গার হাতে গ্যারেজ পুড়ে ছারখার হল পুরো। কিন্তু আর কেউ তা টেরই পেল না মোটে!

দুর্গার এই থানায় যাওয়ার একটু আগে আরও কী হয়েছে শুনুন। পাড়ার দুষ্টু ছেলেদের বন্ধ গ্যারেজ কেরোসিন ঢেলে নিজের হাতে পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্গা। পুরো গ্যারেজ জুড়ে কী আগুন তখন – বাপ রে বাপ রে বাপ! তবে আসল মজা কোনটা জানেন? এত বড় কেলেঙ্কারিটা দুর্গার সেই ডাকাত বর মাধব (অনির্বাণ ভট্টাচার্য) ছাড়া দেখতে পেল না কেউ! আর মাধবও যে দেখতে পেল, সেটাও শুধু এই কারণে যে বদমায়েশির প্ল্যান ছকতে সেদিন রাতে দুর্গার সঙ্গে দ্যাখা করতে এসেছিল ও।

আর এখানেই খটকা নম্বর দুই। ষষ্ঠীর রাতে খোলা রাস্তার ওপর অমন একটা কাণ্ড হবে, আর একটা মোটে লোক ছাড়া আর কেউ টের পাবে না তা!

শুরু থেকে শেষ অবধি এই সিনেমায় এরকম অগুন্তি সব গুণের কীর্তি ঠাসা। এবার এক এক করে বলি?

একেবারে শুরুর থেকেই ধরুন। গল্পের শুরুতেই যেমন দেখতে পাবেন বাড়ির টিন-এজার ছেলেপুলেদের জমিয়ে হেভি ঘুড়ি ওড়ানোর সিন। ইন্টারকাট করে এর পাশাপাশি দেখান হচ্ছিল কুমোর পাড়া থেকে বাড়িতে দুর্গা প্রতিমা আসার সিন।

ছবির শুরুতে এই সিনগুলো দেখে, মনের মধ্যে প্রশ্ন আসছিল একের পর এক শুধু। আচ্ছা, এটা কি তাহলে বিশ্বকর্মা পুজোর দিন? না হলে সবাই ঘুড়ি ওড়াচ্ছে কেন? কিন্তু যদি বিশ্বকর্মা পুজোই হবে, আউটডোর শটগুলোতে একটা কোথাও তার কোন রেফারেন্স নেই কেন?

নিদেন পক্ষে ডায়ালগেও কেউ সেটা নিয়ে বলছে না কেন কিছু?

উলটে ডায়ালগে কি শুনছি জানেন? পুজোর সময় শুরু হয়ে গেছে বলে অলরেডি নাকি ছোটদের পড়াশুনো সব স্টপ। আরে, এটা শুনে তো আমার আরও অকূলপাথার হাল! ভাবছি, পুজো শুরু হয়ে গেছে মানেটা কী? বাড়িতে যে ঠাকুর আসতে দেখলাম, সেটা তো জাস্ট মাটি দিয়ে তৈরি বেসিক মূর্তি শুধু। না রং হয়েছে, না কোন আবরণ বা আভরণ আছে তার! পুজো যদি শুরুই হয়ে থাকে, তবে সেগুলো হবে কবে?

আরও পড়ুন:  দুঃসহ দারিদ্র্য‚ কালান্তক মৃগী আর আকণ্ঠ নেশায় ক্ষতবিক্ষত ছিল এই অমর কথাসাহিত্যিকের জীবন

কাণ্ড দেখুন, ঠিক এরপরেই আবার শুনলাম, পুজো শুরু হতে এখনও নাকি পনেরো দিন বাকি! তখন আবার উলটো ধাক্কা খাওয়া। পুজো শুরুর পনের দিন আগেই কি স্কুল-কলেজে পুজোর ছুটি পড়ে? যেটুকু জানি, সেটা তো সেই চতুর্থী কি পঞ্চমী থেকে শুরু! অথচ টিন-এজার এই ছেলেমেয়েগুলো বলছে তো যে, এক ফিজিক্স কোচিং যাওয়া ছাড়া তাদের নাকি পড়াশুনোর আর অন্য কাজ নেই!

বুঝতে পারছেন একদম শুরু থেকেই সিনেমার স্ক্রিপ্ট আর ডায়ালগে কেমন ঘেঁটে ঘণ্ট ক’রে বারোটা বাজানো কেস?

বাড়িতে দুর্গা মূর্তি আনার সিনে বাহকদের সকলের প্রায় একই ইউনিফর্ম! এটা কি বিশেষ কোন প্রথা, নাকি আগে থেকে সাজিয়ে দেওয়া ড্রেস!

আরও একটা ব্যাপার বুঝতে পারছিলাম না, জানেন! হঠাৎ করে পুজোর দিন পনের আগে পুরো একটা দুগ্‌গা প্রতিমা ঘরে আনতে হল কেন। ১৩/১ কার্ত্তিক বোস লেনের ওই বসাক বাড়ির রিচ্যুয়াল নাকি এটা? কই, সেটা নিয়ে কোথাও কোন ক্লু দেওয়া নেই তো! কুমোরটুলি থেকে রং করে পোশাক-অলঙ্কার সব পরিয়ে রেডি প্রতিমা ঘরে আনলে ভক্তি কিছু কম পড়ে যেত নাকি?

অবশ্য সেটা করতে গেলে অতখানি সময় ধরে রেলিশ ক’রে মাটির মায়ের রূপটা দ্যাখার চান্স তো মিস হয়ে যেত, ভাই!

দুর্গা মূর্তিটা বাঁশে চাপিয়ে কাঁধে করে রাজপথ দিয়ে বয়ে আনছিল যারা, তাদের নিয়েও আমার একটু প্রশ্ন আছে। ওদের প্রায় সবার পরনে তখন দেখছি ইউনিফর্ম পরার মতো হাতাওয়ালা গেঞ্জি এবং ধুতি। কেন? দুর্গা মূর্তি আনার সময় সবাইকে ড্রেস কি শুধুই সাদা পরতে হয়? নিয়ম আছে কিছু? নাকি ডিরেক্টরের টিম থেকে এটা আগের থেকেই সাজিয়ে দেওয়া ড্রেস? সবাই এক ড্রেসে থাকলে লুকটা আরও বেশি ভাল হবে বলে?

এবার বসাকবাড়ির ভেতরে আসুন প্লিজ। লোকজনের কথাবার্তা শুনে সেখানে একবারও তো মনে হচ্ছে না, কারুর কোথাও কাজের লোকের কোন দরকার আছে বলে। তবু কাণ্ড দেখুন, গোসাবার সেই দুর্গা মণ্ডল ঠিকানা খুঁজে কেমন করে গুছিয়ে যেন সেট হয়ে গেল এই বাড়িটায় এসে! আচ্ছা, ওকে এ বাড়ির ঠিকানা দিল কে, বলুন তো? না, সিনেমায় সরাসরি কোথাও অন্তত সেই উত্তর নেই। আরে, এ বাড়ির লোকজনের সঙ্গে মিনিমাম একটা ইনট্রো সিনও তো নেই ওর! বাড়িতে আসা নতুন একটা কাজের লোক সেট হওয়ার কাণ্ড নিয়ে পুরনো সেই ‘গল্প হলেও সত্যি’ (১৯৬৬) ছবিটা কি আপনার দ্যাখা ছিল না কো, স্যর?

বেশ কিছুক্ষণ পরে ডায়ালগ থেকে হালকা একটা আঁচ পাওয়া গেল যে, লাস্ট তিন বছর দুগ্‌গা নাকি কোন একটা আয়া সেন্টারে আছে। তারপরেই প্রথম যে প্রশ্নটা মনে এল, ও কি তাহলে এ বাড়ির ফাইফরমাশ খাটার লোক নয়, ও কি তাহলে এ বাড়ির আয়া? কিন্তু কার আয়া? বাড়ির প্রবীণ ওই লোকটির নাকি, যাঁর হার্টে সবে একটা অ্যাটাক হয়ে গেছে? কিন্তু এই ছবিতে কোথাও একটা সিনেও কি দ্যাখা গেল তাঁর ডেলি কাজে-কর্মে ওই দুর্গা এসে হেল্প করে দিল বলে?

রিয়্যালিস্টিক ছবি করতে নেমেছেন অরিন্দম আপনি। মিনিমাম এই ডিটেলগুলো ভুলে বসে থাকলে হবে?

হাতে-নাতে চুরি ধরা পড়ে গেলে কাজের মেয়েরা কি এমন মারমুখী হয়ে ওঠে!

বসাকবাড়িতে কাজে ঢোকার পরে-পরেই আলমারি খুলে ঢাউস এক গয়নার বাক্স হাতিয়ে পালাতে গেল দুর্গা! তখন হাতে-নাতে তাকে ধরে ফ্যালায় কী মারমুখী তার ভঙ্গী! এই জায়গাটা দেখে তো আমি পুনর্বার থ’! কাজের বউ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলে এরকম খুনে টাইপের ফাইটিং মোডে চলে যায় বুঝি?

আর মজাটা দেখুন! এই এতবড় যে কেলেঙ্কারি হল, তারপর ওকে বাড়িতে রাখা হবে কি হবে না সেটা নিয়ে তুফান উঠলো বাড়িতে, কিন্তু একবারও কারুর মুখে এল না, ও যে সেন্টার থেকে এসেছে, সেই আয়া সেন্টারের নাম? একবারও কেউ এটা বলল না যে, ফোন করে দেখি, ওদের পাঠানো সব আয়াগুলোই এরকম চোর আয়া হয় কিনা।

অথচ আপনি বলুন অরিন্দম, বাড়ির লোকজনের সেটাই সবচেয়ে ন্যাচারাল রিয়্যাকশন হত কিনা।

স্ক্রিপ্ট কী করে লিখতে হয়, কী ভাবে গল্প আর ক্যারেকটারগুলোকে ক্রেডিবল করে তুলতে হয়, সেটা নিয়ে আপনাদের কারুর কি কোন ধারণাই নেই?

আরও পড়ুন:  সেই যে হিমালয় আর তার অরণ্যের প্রেমে মজেছিলেন‚ তাকেই সঁপে দিয়েছেন মনপ্রাণ

সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখার জন্য এবার ছোট্ট একটা টিপস দিয়ে দিই শুনুন। ছবিতে যে যে ক্যারেকটার ইন্ট্রোডিউস করবেন, গোড়ার দিকে ডায়ালগে তাদের নামগুলোও একটু শুনিয়ে দেবেন প্লিজ। নইলে কী হয় বলুন তো, কী নামে ডাকবো ক্যারেকটারগুলোকে, বুঝতে না পেরে অস্বস্তি হয় খুব। এটায় যেমন হল। ছবি শুরু হয়ে গেছে সেই কখন, অ্যাক্টররাও স্ক্রিন আলো করে ঘুরছে ফিরছে বেশ, কিন্তু এক ওই কাজের মেয়ে দুর্গা ছাড়া বাকিদের আর নামের হদিশ নেই!

প্রায় মিনিট চল্লিশ পরে জানা গেল বাড়ির বড় ছেলের ক্লাস টুয়েলভে পড়া ছেলেটির নাম – ভৃগু (ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়)। আরও মিনিট দশেক তাক করে থেকে, ডায়ালগের আঁকশি ধরে শুনতে পেলাম বাড়ির ছোট ছেলের বউয়ের নাম, মানসী (তনুশ্রী)। বাড়ির সবচেয়ে প্রবীণ মানুষ যিনি, সেই বড় কর্তার নাম জানা গেল ছবির সেকেন্ড হাফে গিয়ে – সোমশঙ্কর বসাক (সুমন্ত মুখোপাধ্যায়)। কিন্তু ছবির শেষ অবধি কোথাও জানা গেল না আর অন্য লোকজনের নাম! বাড়ির বড় ছেলে (কৌশিক সেন), ছেলের বৌ (দেবযানী চট্টোপাধ্যায়), ছোট ছেলে (ইন্দ্রাশিস রায়) – বলুন তো, কোন অপরাধে গোটা ছবিতে এদের কারুর নাম থাকবে না কোন?

বড় ভাই, বড় ভাইয়ের বৌ আর ছোট ভাই… ছবির কোথাও এই তিনজনের নামের হদিশ নেই। অথচ ছবিতে এঁদের রীতিমতো বড় রোল

এদের কারুর নামের হদিশ নেই, অথচ সেকেন্ড হাফে মিনিট পাঁচেকের জন্য গানের শো করতে বাড়িতে যে ছেলেমেয়েগুলো এল, তাদের নাম আর পরিচিতি তো যত্ন করে ধরে ধরেই দিলেন! বলুন তো, ওটার কি দরকার ছিল কিছু?

বেশ কিছুক্ষণ দ্যাখার পরেও বুঝতে পারছিলাম না ঠিক হচ্ছেটা কী এটা? আদৌ কোন গল্প আছে এতে, নাকি বাঙালি বাড়ির দুর্গাপুজোর ভিস্যুয়ালগুলো তুলে রাখার জন্যে এটা একটা ভালো দেখতে ভিডিও ফিল্ম জাস্ট? কুমোরটুলির সেই প্রতিমা দিয়ে শুরু। তারপর একে একে প্রতিমা রং, দৃষ্টিদান, মহালয়ায় তর্পণ করা ঘাটে, কলাবৌয়ের স্নান কিংবা অঞ্জলি বা ধুনুচি নাচের ধুম – কী নেই এতে বলুন, দাদা!

শুধু নিটোল একটা গল্পটুকুই নেই। সেটা ছাড়া রং-ঢং আর ওপর চালাকি ভ’রে ভ’রে স-অ-অ-ব আছে!

অরিন্দম, বিদেশি কোন ফিল্ম মার্কেটে এটা প্লেস করে দিন প্লিজ। ছবিটার লুক-ফিল এত ভালো, আর বনেদি বাড়ির বৌ থেকে গোসাবার অজ গ্রামের মেয়েগুলোকেও এ সিনেমায় দেখতে এত বেশি বেশি ক’রে ভালো, যে উৎসাহী কোন সায়েব-সুবো দেখবেন ঠিক কিনেই নেবেন এই ছবিটার রাইটস!

তাঁরা তো কেউ আর জানতে চাইবে না যে, ‘রিয়্যালিসটিক’ ছবির মধ্যে এত গ্যাস-গুল কেন ভাই? তাঁরা তো আর বলবে না এসে যে, বাড়িতে এতগুলো নানাবয়সের লোক। পুজোর পাঁচ-পাঁচটা দিন। অথচ একবারও কারুর মুখে বাইরে কোথাও ঠাকুর দেখতে যাওয়ার একটা কথা অবধি নেই?

এ কেমন ধারা ডায়ালগ লেখা হল?

কখনও এমন হতে দেখেছেন বুঝি? নাকি রিসার্চ করে দেখতে পেলেন, যে বাড়িতে পুজো হয়, সে বাড়ির ছেলে মেয়ে কেউ বাকি কলকাতায় আর ঠাকুর দ্যাখে না মোটে?

ছবির শুরুর একটা কার্ডে বড় করে ‘শ্রদ্ধা’ লিখে তলায় লেখা ‘উৎসব ও ঋতুপর্ণ ঘোষ’। এই লেখাটার মানেও কিন্তু বুঝতে পারি নি ঠিক! ‘উৎসব’ মানে কি বাড়ির পুজো নিয়ে সেই ঋতুর তৈরি ছবি? তা’ হঠাৎ করে আপনার এই ছবিতে কেন সেই ছবিটার নাম?

সেই ছবির যে তুখোড় স্ক্রিপ্ট, ক্যারেকটার আর সংলাপের যে অবিশ্বাস্য মোচড়, আপনার এই ছবিতে তার পয়েন্ট ওয়ান পারসেন্টও কি আছে? সে সব থেকে শেখার বালাই নেই, শুধু একটা কার্ডে লিখে ‘শ্রদ্ধা’ বলে ঝুলিয়ে দিলেন নাম?

আর হ্যাঁ, বাড়ির পুজোকে বিষয় করে সেই ‘উৎসব’-এর (২০০০) আগে-পরে ভদ্রলোকের তো আরও দু-দুটো ছবি ছিল। ‘হীরের আংটি’ (১৯৯২) আর ‘অন্তরমহল’ (২০০৫) নাম। সে দুটোই বা আপনার ফর্দে তাহলে বাদ পড়ে গেল কেন?

এবার শুনুন, ছবির পুরোটা জুড়ে ছড়িয়ে কত খুচরো অসঙ্গতি!

দুর্গার কথার থেকেই শুনেছেন তো, যে গত তিন বছর শহরে নাকি আয়াগিরি করছে ও। তাহলে পরে ও-ই আবার বলছে কেন যে, বহু বছর ধরে দুগ্‌গা মায়ের নাকি মুখই দেখে নি ও,ওদের গাঁয়ে পুজোই হয় না বলে!

আরও পড়ুন:  সুনীল গ্রোভারের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের মাসুল দিচ্ছেন কপিল শর্মা‚ তলানিতে শো-এর জনপ্রিয়তা

কিংবা মোবাইলের পাওয়ার ব্যাঙ্কটা ভৃগুর দরকারে ঠিক কখন লাগতে পারে, তার আগা-মাথা কিছু না জেনে, এমন কি পাওয়ার ব্যাঙ্ক কাকে বলে, সেটুকুও না জেনে হঠাৎ করেই নিজের থেকে ভৃগু’র জন্যে সেটা নিয়ে এলোই বা কেন দুর্গা?

গোসাবার মেয়ে বাংলা বলে গাঁয়ের টান দিয়ে… অথচ আগমনী গান গাওয়ার সময় কী ট্রেনড গলা আর উচ্চারণ… বাপস!

গোসাবার যে গাঁয়ের মেয়ের বাংলা কথায় তার গাঁ-দেশের টান, হঠাৎ করে ‘আগমনী’ গাওয়ার সময় তার গায়ন-ভঙ্গী টপ লেভেলের পুরো?

চার-পাঁচজন বদমায়েশের কাছে তুমুল মার খেয়ে, ভালমানুষ যে ছেলেটার বিছানা নেওয়ার কথা, একটু চুন-হলুদ লাগিয়ে নিয়ে পরের সিনে সে বিন্দাস ভাবে ফিট?

আর কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হল যে বদমাশদের গ্যারেজ, তারপরেই স্টোরি থেকে তাদের ট্র্যাক বিনা বাক্য-ব্যয়ে হাওয়া?

একটা সিন থেকে স্টোরির কোন লিংক যে আর পরের সিনে পৌঁছচ্ছে না, খাপছাড়া ভাবে সিচুয়েশনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে ওখানেই, বুঝতে পারছেন তো?

আরও একটা উদাহরণ দিই, শুনুন। ওই সিনটা মনে করুন, গয়নার দোকানের এক কর্মচারীর থেকে চুপি চুপি কী যেন গয়না নিচ্ছে বাড়ির বড় ছেলে, আর তারপর সেই কর্মচারীকে বলছে, ‘দোকান বন্ধ করে আমায় একটু ফোন কোর’। এখন ঝট করে এটা দেখে কী মনে হবে বলুন? মনে হবে তো যে, রহস্যের নতুন একটা ট্র্যাক খুলে গেল বুঝি!

ঠিক এর পরেই হল, সেই গয়না বৌকে পরিয়ে আদর করার সিন। সেটা দেখতে গিয়ে আপনিও ভাবছেন বোধহয়, এরপরেই আসতে চলেছে কোন একটা সুপার ড্রামার টার্ন। কিন্তু হায় রে, কোথায় ড্রামা, কোথায় কী! গোটা এপিসোডটা যে ঠিক এইখানেতেই শেষ! এখন কেন যে লুকিয়ে লুকিয়ে দোকান থেকে গয়না আনা, কেন যে দোকানের স্টাফকে পরে ফোন করতে বলা, কেন বৌকে গয়না পরিয়ে আদর, আর ‘দুর্গা সহায়’ ছবির সঙ্গে এই পুরো ঘটনাগুলোর যোগটাই যে কোথায়, সে রহস্য তো বোধহয় শুধু মা দুর্গাই জানে, ভাই!

টুকরো টুকরো ডিটেলের হালও কহতব্য নয়। ওই সিনটা ধরুন, অনেক দিনের পরে বাপের বাড়িতে মেয়ের ফেরার সিন। দরজা খুলে সেই পিসিকে (অভিনয়ে সম্পূর্ণা লাহিড়ী) দেখে উচ্ছ্বসিত ভৃগু। এই অবধি ঠিকঠাক ছিল সব। মুশকিল হল, দরজার সামনে পিসির আনা ‘ভারি’ স্যুটকেসগুলো ভৃগু যখন তুলতে গেল হাতে। এক মুহূর্তে ধরা পড়ে গেল যে সব স্যুটকেসগুলো ফাঁকা! কী ভাবে বলুন তো? ভৃগু একবার টাচ করতেই স্যুটকেসগুলো যেভাবে নড়ল, দেখে!

ধরতে গেলে ফাঁকা স্যুটকেস আর ভরা স্যুটকেস যে আলাদা ভাবে নড়ে, জানেন তো সেটা, নাকি?

মনে হচ্ছে কি এরা একে অন্যের কন্যাস্থানীয় বলে! তবু কেন কে জানে, এঁকে দেখে ওঁর মাতৃস্নেহ উথলে উঠলো খুব!

এবার বলি এ ছবির হায়েস্ট রগড় কোনটা। সেটা হল, বাড়ির কাজের মেয়ে দুগগাকে দেখে বাড়ির ছোট বৌ মানসীর নিজের মরা মেয়ের শোক উথলে ওঠার সিন! কী ভাবে এই সিন লেখা হয়েছিল জানি না, কিন্তু কী ভেবে সিনটা আপনি শুট করলেন অরিন্দম? কাজের মেয়েটা বয়সে যদি বাচ্চা হত, এই হিসেবটা মেনে নেওয়া যেত বেশ! কিন্তু বাড়ির বৌ মানসী মানে তনুশ্রী আর কাজের মেয়ে দুগগা মানে সোহিনী তো বলতে গেলে বয়সে হবে পিঠোপিঠি দুই বোনের মতো জাস্ট! তাঁদের মধ্যে একজনকে দেখে অন্যজনের কন্যা-স্নেহ আসতে পারে নাকি?

উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া এরকম উদ্ভট এক ছবি। অহো কী সাহস, সেটার আবার রিলিজ হল খোদ ‘বাহুবলী’র সঙ্গে! আর বাঙালি কেন ‘দুর্গা সহায়’ না দেখে সেই ‘বাহুবলী’টাই দেখতে গেল, সেটা নিয়ে তারপরেই আবার কোথাও কোথাও মায়াকান্নাও শুরু হয়ে গেল বেশ!

ছবিটা ডেডিকেট করা যাঁকে, সেই ঋতুপর্ণ ভাগ্যিস আর ধরাধামেতেই নেই। না হলে চোখের সামনে ধ্যাস্টামি দেখে রাগের চোটে কাউকে হয়তো নিল ডাউন-ই করিয়ে দিতেন তিনি! এমন একটা ঝুল সিনেমা টানা একশো মিনিট সহ্য করাটা তো আর চাট্টি খানি না!

- Might Interest You

NO COMMENTS