পৌরাণিক খলনায়কদের মধ্যে এই পর্বে দুর্যোধন |

তাঁর প্রকৃত নাম সুয়োধন | অর্থাৎ মহান যোদ্ধা | পরে তা হয়ে যায় দুর্যোধন | অর্থ‚ যাঁকে যুদ্ধে জয় করা দুঃসাধ্য | তাঁর জন্মবৃত্তান্ত শুনলে মনে হয় যেন আজকের টেস্ট টিউব বেবি বা IVF পদ্ধতি | 

ব্যসদেবের আশীর্বাদে শতপুত্রের জননী হওয়ার বর পেয়েছিলেন গান্ধারী | কিন্তু গর্ভের ভারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি | নির্ধারিত দিন চলে যাওয়ার পরেও প্রসবের কোনও লক্ষণ ছিল না | একদিন‚ আর না পেরে জঠরে আঘাত করলেন ধৃতরাষ্ট্র পত্নী | প্রসব করলেন একটি মাংসপিণ্ড | সেটিকে ১০১ খণ্ডে সমান ভাবে ভাগ করলেন ব্যাসদেব | ঘিপূর্ণ কলসিতে রেখে মুখ বন্ধ করে রাখলেন মাটির নিচে | দু বছর পরে প্রথম কলসিতে মাংসপিণ্ড জন্ম হয় দুর্যোধনের |

তিনি ছিলেন ভীমের সমবয়সী | মধ্যম পাণ্ডবের সঙ্গেই ছিল তাঁর তীব্রতম রেষারেষি | দুর্যোধন মানতেই পারতেন না‚ যে সিংহাসনে বসার কথা তাঁর পিতার‚ অন্ধত্বের কারণে তা চলে গেছে পাণ্ডুর কাছে | পঞ্চ পাণ্ডবের জন্মদাতা যেহেতু পাণ্ডব নন‚ দুর্যোধন তাঁদের উত্তরাধিকারের বিরোধিতা করেছিলেন | সর্বদা সম্বোধন করতেন কৌন্তেয় বলে | অর্থাৎ কুন্তীর পুত্র |

হস্তিনাপুরের বিরুদ্ধে আক্রোশ চরিতার্থ করতে একবগ্গা দুর্যোধনকে পাশার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন ধুরন্ধর শকুনি | মাতুল-দোষেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনেন জ্যেষ্ঠ কৌরব | বলরাম-কৃপাচার্য-দ্রোণাচার্যের সুযোগ্য শিষ্য দুর্যোধন ছিলেন বলশালী যোদ্ধা | গদাযুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য | স্মর্তব্য যে‚ বলরামের প্রিয় শিষ্য ছিলেন তিনি‚ ভীম নন |

দুর্যোধনের জীবনে সর্বধিক কম আলোচিত পর্ব আগে বলি | কলিঙ্গ রাজকন্যা ভানুমাতীকে বিবাহ করেছিলেন তিনি | স্বয়ম্বর সভা থেকে অপহরণ করে এনে | এতে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন পরম মিত্র কর্ণ | তাঁর চরিত্রের এক কণা ভাল দিক যদি থাকে‚ তা হল‚ সুতপুত্র কর্ণের সঙ্গে বন্ধুত্ব | অঙ্গরাজ্য দান করে যে মিত্রতার সূচনা হয়েছিল শেষদিন অবধি তার প্রতি অবিমিশ্র শ্রদ্ধা বজায় রেখেছিলেন দুর্যোধন | কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কর্ণের মৃত্যুতে দুর্যোধন যা শোকগ্রস্ত হয়েছিলেন আপন ভ্রাতাদের প্রয়াণেও অতটা হননি | 

ফিরে আসি ভানুমতীতে | ক্ষীণ কটী-ভারী নিতম্বে অসামান্য এই সুন্দরীর কথা মহাভারতে বেশি নেই | তবে দুর্যোধন কিন্তু একবারই মাত্র বিবাহ করেছিলেন | ভানুমতীকে কথা দিয়েছিলেন | তাঁর কোনও সতীন থাকবে না | সে প্রতিশ্রুতি রেখেছিলেন দুর্যোধন | তাঁদের দুই সন্তান | পুত্র লক্ষ্মণ | কন্যা লক্ষ্মণা | লক্ষ্মণকে কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে বধ করেছিলেন অর্জুনপুত্র অভিমন্যু | লক্ষ্মণার বিবাহ হয়েছিল কৃষ্ণপুত্র শাম্বর সঙ্গে | অপছন্দের দুর্যোধনের সঙ্গে কৃষ্ণের এই আত্মীয়তাও স্থাপিত হয়েছিল | দুর্যোধন-কন্যাই ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের পুত্রবধূ |

স্বভাবে একবগ্গা ছাড়াও গান্ধারীর বড় ছেলে ছিলেন চির হিংসুটে | অসূয়া তাঁর পতনের মূল কারণ | খাণ্ডবপ্রস্থ যখন পাণ্ডবদের ইন্দ্রপ্রস্থ হয়ে গেল‚ তিনি সহ্য করতে পারেননি | ময় দানবের তৈরি ওই প্রাসাদে তিনি দৃষ্টিভ্রমের স্বীকার হয়েছিলেন | জমি ভেবে পা ফেলেছিলেন | পড়ে গেছিলেন জলে | দেখে পরিহাস করেছিলেন দ্রৌপদী | বলেছিলেন ‚ অন্ধের ছেলে তো অন্ধই হয় | এই অপমান ভুলতে পারেননি দুর্যোধন | 

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ফলাফল আন্দাজ করতে পেরেছিলেন ভানুমতী | স্বপ্নে দেখেছিলেন এক বেজি মেরে ফেলছে একশো সাপকে | পরিশেষে সেটাই হয়েছিল | বাস্তবিক ভীমসেনের হাতে প্রাণ দিয়েছিলেন শত কৌরব | কিন্তু অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধ কি আর এক স্বপ্নে আটকায় ?

যুদ্ধের অষ্টাদশ দিনে কুরু বাহিনী ছত্রভঙ্গ | রথী মহারথীদের মধ্যে অবশিষ্ট শুধু দুর্যোধন‚ কৃতবর্মা‚ অশ্বত্থামা ও কৃপাচার্য | দুর্বাসা মুনিকে তুষ্ট করতে দুর্যোধন তপস্যায় বসলেন দ্বৈপায়ন হ্রদে | তাঁকে খুঁজতে সেখানে হাজির হলেন শ্রীকৃষ্ণ ও পঞ্চ পাণ্ডব |

পরাজয় অনিবার্য দেখে দুর্যোধন বললেন তিনি রাজ্য এমনই ছেড়ে দিচ্ছেন | কিন্তু যুধিষ্ঠির রাজি হলেন না | বললেন ভিক্ষার দান নেবেন না | যে দুর্যোধন বলেছিলেন বিনা যুদ্ধে এক সূচ্যগ্র ভূমি দেবেন না‚ তিনি একথা বলছেন ! স্থির হল‚ হ্রদতীরে গদাযুদ্ধ হবে | যিনি জিতবেন‚ হস্তিনাপুর তাঁর | দুর্যোধন বেছে নিতে পারবেন তাঁর প্রতিপক্ষ | 

ইচ্ছে করলে দুর্যোধন বাছতেই পারতেন যুধিষ্ঠির অর্জুন নকুল সহদেবের মধ্যে একজনকে | গদাযুদ্ধে এরা কেউ তাঁর সমানে দাঁড়াতে পারতেন না | কিন্তু তিনি ক্ষত্রিয় ধর্ম মেনে প্রতিপক্ষ চাইলেন ভীমকেই | 

শুরু হল গদাযুদ্ধ | শিষ্যদের সম্মুখ সমর দেখতে উপস্থিত হলেন বলরামও | কিন্তু যুদ্ধে দুর্যোধনের সামনে প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হচ্ছিলেন ভীমসেন | বারবার পিছিয়ে পড়ছিলেন তিনি | শ্রীকৃষ্ণ বুঝলেন সোজা পথে হারানো যাবে না দুর্যোধনকে | তিনি বারবার নিজের উরু বা জঙ্ঘা চাপড়ে ভীমকে উৎসাহ দিতে লাগলেন | ইঙ্গিত বুঝতে পারলেন ভীম | গদা দিয়ে আঘাত করলেন দুর্যোধনের উরু বা জঙ্ঘায় | ভূপতিত হলেন জ্যেষ্ঠ কৌরব | এরপর ভীম পদপিষ্ট করেন উরুভঙ্গ দুর্যোধনকে |

গদাযুদ্ধে কোমরের নিচে আঘাত নিয়মবিরুদ্ধ | কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ জানতেন ওই অংশে আঘাত না করলে দুর্যোধন অপরাজেয় | কারণ গান্ধারীর দৃষ্টি | কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে পুত্র দুর্যোধনকে তাঁর সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে আসতে বলেছিলেন গান্ধারী | বিস্মিত হলেও মায়ের আদেশের দ্বিরুক্তি করেননি দুর্যোধন | কিন্তু লজ্জায় পুরো উলঙ্গ হতে পারেননি | জন্মদাত্রীর সামনে তিনি যান কৌপীন পরে | 

পুত্র এসেছে জেনে গান্ধারী চোখের বাঁধন খোলেন | জীবনে ওই একবারই | পুত্রকে কৌপীন পরিহিত দেখে ব্যথিত হলেন গান্ধারী | কারণ তিনি পুত্রকে ডেকেছিলেন তাঁর দেহকে দুর্ভেদ্যদেহে পরিণত করবেন বলে | এতটাই শক্তি ছিল তাঁর দৃষ্টিতে | কিন্তু শর্ত ছিল‚ একবারই মাত্র এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন তিনি | এবং যাঁর উপর প্রয়োগ করবেন তাঁকে বস্ত্রহীন হয়ে থাকতে হবে | দুর্যোধন কৌপীন পরিহিত হয়ে থাকায় দেহের ওই এক চিলতে অংশ দুর্ভেদ্য হল না | বাকি দেহ অপরাজেয় হয়ে থাকল যেকোনও অস্ত্রের সামনে | এই রহস্য ত্রিকালদর্শী শ্রীকৃষ্ণের কাছে অজ্ঞাত ছিল না |

কিন্তু অসৎ উপায়ে গদাযুদ্ধের জন্য রেগে যান বলরাম | তাঁকে কৃষ্ণ বোঝান‚ যে অসৎ‚ অধর্মকারী তাকে বিনাশ করতে ধর্মের পথ ত্যাগ করলে কোনও অপরাধ হয় না | ক্ষুব্ধ বলরাম বলেন‚ তাঁর শ্রেষ্ঠ শিষ্য হয়ে থাকবেন দুর্যোধনই | ভীমসেন নন |

হ্রদতীরে মৃত্যুপথযাত্রী দুর্যোধন অভিসম্পাত দেন কৃষ্ণকে | শেষ মুহূর্তে কেউ ছিলেন না পাশে | তিলে তিলে দগ্ধে দগ্ধে শেষ হয় বীর কৌরবের জীবন | মহাপ্রস্থান পেরিয়ে স্বর্গারোহণের পরে পঞ্চ পাণ্ডব দেখেন তাঁদের আগেই সেখানে অধিষ্ঠান করছেন দুর্যোধন | জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি ক্ষত্রিয় ধর্ম থেকে বিচ্যুত হননি দুর্যোধন | এই একমাত্র কারণে ইহজীবনে বহু অধর্ম করলেও তিনি পরজীবনে স্বর্গলাভ করেছিলেন | দুর্যোধনকে বলা হয় কলিযুগের অবতার | তবে ভারতের কিছু জায়গায় তাঁর মন্দিরও আছে |

আরও পড়ুন:  কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কবে ঠিক হবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ?

NO COMMENTS