জগন্নাথ জগতের নাথ হলেও পুরীতে তাঁর মন্দিরে সকলের প্রবেশাধিকার নেই | এখনও অবধি কত বিখ্যাত ব্যক্তিত্বকে মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি ! অহিন্দু হওয়ার জন্য | শুধু হিন্দুরাই পেরোতে পারবেন মন্দিরের চৌকাঠ | ভিন্নধর্মীরা দারুব্রহ্মের দেখা পাবেন রথযাত্রা উৎসবে |


মহাত্মা গান্ধী :

১৯৩৪ সালে পুরী গিয়েছিলেন জাতির জনক | মুসলিম-খ্রিস্টান-দলিত মিলিয়ে অসংখ্য মানুষকে নিয়ে ঢুকতে গিয়েছিলেন জগন্নাথ মন্দিরে | পারেননি | বলা হয়েছিল‚ তিনি পারবেন ঢুকতে | কিন্তু সঙ্গের বিধর্মীরা নয় | শুনে ফিরে এসেছিলেন মহাত্মা | বলেছিলেন ঈশ্বরের কাছে মানুষের মধ্যে এত ভেদাভেদ কেন ?’ কিন্তু লাভ হয়নি | তিনি জগন্নাথ মন্দিরের প্রধান ফটক থেকে বিশাল হরিজন-পদযাত্রা করেছিলেন | মহাত্মার সঙ্গে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন আচার্য বিনোভা ভাবেও |

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর :

তিনি ব্রাহ্ম উপাসক | তার উপর আবার ঠাকুর বংশে আছে পিরালি ( পীর আলি থেকে উদ্ভূত ) ব্রাহ্মণত্বের বিতর্ক | জাতপাতের গেরোয় আটকে স্বয়ং বিশ্বকবিকে ফিরে আসতে হয়েছিল পুরী মন্দিরের দ্বার থেকে |  

বি . আর আম্বেদকর :
১৯৪৫ সালে তিনিও জগন্নাথ মন্দিরে পা রাখতে পারেননি | বর্ণ-প্রথার ঘোরতর বিরোধী এই মহান ব্যক্তিত্ব বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন শেষ জীবনে | তাই তিনিও ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন |

ইন্দিরা গান্ধী :

কাশ্মীরি ব্রাহ্মণের কন্যা হলে কী হবে ! বিয়ে করেছিলেন পার্সি যুবককে | তাই বিবাহসূত্রে তিনি হয়ে গেলেন পার্সি | ফলে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীনই তাঁকে ফিরে আসতে হয়েছিল জগন্নাথ মন্দিরের দ্বার থেকে | ১৯৮৪ সালে |

ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ :

ইস্কনের প্রতিষ্ঠাতা | পুরী এসেছিলেন ১৯৭৭ সালে | কিন্তু বলা হয়‚ তাঁর সঙ্গে থাকা অহিন্দু কৃষ্ণভক্তরা মন্দিরে ঢুকতে পারবেন না | শুনে ফিরে যান স্বামী প্রভুপাদও |

লর্ড কার্জন :

১৮৮৯ থেকে ১৯০৫ অবধি ভারতের দোর্দন্দপ্রতাপ ভাইসরয় | বঙ্গভঙ্গের ধারণার জন্ম দেওয়ার জন্য কুখ্যাত বটে | কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন | দেখতে গিয়েছিলেন পুরীর মন্দির | ১৯০০ সালে | ফিরে আসতে হয়েছিল বড়লাটকেও |

মহাচক্রী শিরিনধরণ :

থাইল্যান্ডের ক্রাউন প্রিন্সেস হলে কী হবে ! জন্ম তো বৌদ্ধ পরিবারে | পেরোতে পারেননি জগন্নাথ দেবালয়ের চৌকাঠ | ২০০৫ সালে তাঁকেও ফিরে আসতে হয়েছিল |

এলিজাবেথ জিগলার :

সুইস নাগরিক | ২০০৬ সালে জগন্নাথ মন্দিরে দান করেছিলেন ১ কোটি ৭৮ লক্ষ টাকা | কোনও একজন ব্যক্তিবিশেষের কাছ থেকে এই মন্দিরে এখনও অবধি এটাই সর্বোচ্চ দান | কিন্তু তাও জগন্নাথ দেবের দেখা পাননি | কারণ তাঁর জন্ম খ্রিস্টান পরিবারে |

এঁরাও আছেন :

সন্ত কবীর :

ভক্তি আন্দোলনের এই পুরোধা যখন মন্দির দ্বারে এসে দাঁড়িয়েছিলেন‚ প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন | কারণ তাঁর মাথায় ছিল মুসলিমদের ফেজ টুপি | কথিত‚ তিনি ফেরার পরে মন্দিরের প্রধান পুজারীকে স্বপ্নাদেশ দেন স্বয়ং জগন্নাথ দেব | নির্দেশ দেন‚ কবীরকে ফিরিয়ে আনার | এরপর সেই নির্দেশ পালন করা হয় |

গুরু নানক :

নীলাচলে এসেছিলেন ১৫০৮ খ্রিস্টাব্দে ‚ সঙ্গে ছিলেন এক মুসলিম ভক্ত | সেই দেখে তাঁদের আটকে দেওয়া হয় মন্দিরের দ্বারে | পরে অবশ্য স্বয়ং পুরীর রাজার আমন্ত্রণে গুরু নানক প্রবেশ করেন জগন্নাথ মন্দিরে | কারণ রাজাকে স্বপ্নে ইঙ্গিত দেন জগন্নাথ দেব | গুরু নানককে মন্দিরে নিয়ে যাওয়ার জন্য | সেই থেকে এই মন্দিরে গুরু নানকের প্রচারিত মত শিখ ধর্মাবলম্বীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয় |

আরও পড়ুন:  নেননি কোনও সাধনসঙ্গিনী‚ আখড়ায় আশ্রিত বিপন্ন নারীরা ছিলেন আধ্যাত্মিক কন্যার মর্যাদায় অভিষিক্ত

NO COMMENTS