নাম-শোনা দুই বন্ধু মোরা, হয়নি পরিচয়!
আমার বুকে কাঁদছে আশা, তোমার বুকে ভয় |
এই-পার ঢেউ বাদল-বায়ে
আছড়ে পড়ে তোমার পায়ে,
আমার ঢেউ-এর দোলায় তোমার করলো না কুল ক্ষয়,
কুল ভেঙ্গেছে আমার ধারে—তোমার ধারে নয়—

পিরিতি এমনিতেই কাঁঠালের আঠা | লাগলে ছাড়ে না | আর পরকীয়া? একদম ফেভিকলের জোড় | লাগলে ছাড়াছাড়ি দুর অস্ত, সারাক্ষণ ‘দুঁহু করে দুঁহু কান্দে বিচ্ছেদ ভাবিয়া/ একতিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া’ দশা | এই দশায় দ্বাপরে জ্বলে-পুড়ে মরতে হয়েছিল শ্রীরাধা-কে | ঘোর কলিতে একই হাল একালের ‘রাধিকা’ রেখার | যার জেরে এখনো তাঁর সিঁথিতে জ্বলজ্বল করে সিঁদুর | কেউ বলেন, অমিতাভের সঙ্গে গোপনে বিয়ে হয়েছিল রেখার | এই লাল রেখা তার চিহ্ন | অনেকের মত, রেখার সঙ্গে নাকি বিয়ে হয়েছিল সঞ্জয় দত্তের | তাই সিঁদুর পরেন | আসলে কার জন্য সিঁদুর পরেন রহস্যময়ী বলিউড দিভা? জানতে গেলে উল্টোতেই হবে  ইতিহাসের পাতা | আরো একবার…   

১৪ ফেব্রুয়ারি যদি প্রেমের উদযাপনের দিন হয় তাহলে ১০ ও ১১ অক্টোবর— প্রেমে মাতাল এক অভিশপ্ত প্রেমিক যুগলের জন্মদিন | দিন দুটো এলেই যাঁরা নিয়মিত রুপোলি পর্দার মানুষদের নিয়ে নাড়াঘাঁটা করেন তাঁরা এবং যাঁরা অনিয়মিত ভাবে করেন তাঁদেরও দু’টি মুখ ঘুরেফিরে মনে পড়ে বারেবারে | একটি মুখ ভানু রেখা গণেশন ওরফে রেখা | দ্বিতীয় জন? এরপরেও বলে দিতে হবে? প্রথম জন রেখা হলে দ্বিতীয় জন দি গ্রেট য়্যান্ড গ্র্যান্ড অমিতাভ বচ্চন ছাড়া আর কে হবেন!

কেন এমনটা হয়? আজও? কারণ, এটাই অমোঘ নিয়তি |  কারণ, ১৯৭৬ থেকে যে ‘সিলসিলা’র শুরু ২০১৭-তে এসেও তা ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ!’ ১৯৭৬-এর আগে আক্ষরিক অর্থে রেখা-অমিতাভ ছিলেন দো আনজানে | কেউ কাউকে চিনতেন না | ওই বছরের একটি ছবি ‘দো আনজানে’ অদ্ভুতভাবে দুটো সমান্তরাল সরলরেখাকে এক বিন্দুতে মিলিয়ে দিয়েছিল | এটা নিয়তি নয় তো কী?

আরও পড়ুন:  আজ জন্মদিন‚ পুলেল্লা গোপীচন্দের জীবন নিয়ে ছবি তৈরির কথা ঘোষণা করল ফক্স স্টার স্টুডিওস

ওই সময় রেখা সিঙ্গল | অমিতাভ বিবাহিত | দুই সন্তানের বাবা | তার পরেও হুড়মুড়িয়ে প্রেমে পড়লেন দু’জনে | প্রথম প্রথম তাঁরা রেখার এক বন্ধুর বাড়ির কাছের বাংলোয় দেখা করতেন | কেউ টের-ও পেতেন না রাধা কখন, কোথায় অভিসারে যেতেন | আজও কেউ টের পেতেন না, যদি ১৯৭৮-এ ‘গঙ্গা কি সৌগন্ধ’ ছবির শুটের সময় রেখার সঙ্গে অন্য অভিনেতার খারাপ ব্যবহারের বারবার প্রতিবাদ না করতেন অমিতাভ | এরপরে দু’য়ে দু’য়ে চার করতে বলিউডের কতক্ষণ সময় লাগতে পারে?

এরপরেই ঋষি কাপুর-নিতু সিং-এর বিয়েতে রেখার কপালে প্রথম সিঁদুর দেখতে পান সবাই | সেদিন সিঁদুর-এর সঙ্গে রেখা মঙ্গলসূত্র-ও পরেছিলেন | সবাই যখন রেখাকে নিয়ে ব্যস্ত, অনেকক্ষণ স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছিলেন অমিতাভ-জায়া জয়া | শেষে এককোনে সরে গিয়েছিলেন মাথা হেঁট করে | দু’চোখ বেয়ে জল ঝরছিল ঝরঝরিয়ে |

সবাই জানেন, এরপরেই জয়া নাকি তুমুল ঝগড়া করেছিলেন রেখার সঙ্গে | সত্যিটা একদম আলাদা | এর ঠিক দু’দিন পরে ডিনারে জয়া নিজের বাড়িতে ডেকেছিলেন ‘সতীন’ রেখাকে | খুব নরম গলায় বলেছিলেন, ‘মরে না যাওয়া পর্যন্ত আমি অমিতকে ছেড়ে যাব না | এবার তুমি ঠিক কর, কী করবে?’ রেখা সেদিন বুঝেছিলেন, হয় তাঁকে সারাজীবন সিঙ্গল থাকতে হবে নয়তো তাঁর পরিচয় হবে অমিতাভের ‘মিস্ট্রেস’…‘রক্ষিতা’! এবার দো’টানায় পড়লেন শ্রীমতি নিজেই | তাঁর-ও তখন রাধার মতোই ‘শ্যাম  রাখি, না কুল রাখি’ দশা | তখন কিন্তু এখনকার মতো তাঁর সিঁথিতে সবসময় সিঁদুর জ্বলত না |

যতই হোক, রেখা আফটার অল রক্ত-মাংসের মানবী | তাই অমিতাভের থেকে আলাদা হওয়ার পর জড়াবো জড়াবো না করেও জড়িয়ে পড়লেন ‘বেওসায়ী’ মুকেশ আগরওয়ালের সঙ্গে | বিয়ে করে যখন তাঁরা লন্ডনে মধুচন্দ্রিমায় গিয়েছিলেন, রেখার থেকে সুখী বোধহয় আর কেউ ছিলেন না | কিন্তু চাঁদেও যে গ্রহণ লাগে! বিয়ের সাত মাস পরে রেখা আচমকা জানতে পারলেন, মুকেশ মানসিক রোগী | স্বপ্নের প্রাসাদ গুঁড়িয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে | মুকেশের থেকে আসতে আসতে সরতে লাগলেন অভিনেত্রী | সেই বিচ্ছেদ মুকেশের সইলো না | একদিন নিজেদের ঘরে নাটকীয়ভাবে রেখার ওড়না গলায় জড়িয়ে আত্মহত্যা করলেন মুকেশ | শ্বশুরবাড়ি রটালো, রেখা রাক্ষসী | নিজের স্বামীকে খেয়েছে |

আরও পড়ুন:  মেয়ে তুমি বড়ই মন্দ, শরীর জুড়ে যোনির গন্ধ...

রেখা আবার একা | এবার তাঁর সিথিতে জ্বলতে লাগলো সিঁদুর! লোকে ভাবলো খিদে মেটাতে রেখা আবার কাকে বিয়ে করলেন? কিন্তু কাউকেই তো তার ত্রিসীমানায় দেখা যায় না? তাহলে কি অমিতাভের মঙ্গল কামনায় এই সিঁদুররেখা? ১৯৮৪-তে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে রেখা অভিমানে ভেঙ্গে পড়ে বলেছিলেন, ‘অমিত তো পুরনো মানসিকতার | কাউকে দুঃখ দিতে পারেন না | তাহলে নিজের স্ত্রীকে (মানে আমাকে) কী করে এত দুঃখ দিচ্ছেন? নিজের ইমেজ ধরে রাখতে? সন্তানদের মুখ চেয়ে? কিন্তু আমার যে খুব কষ্ট হয়! সবার সঙ্গে কথা বলেন | আমার সঙ্গে কথা বলতে এলেই আড়াল টানেন | কেন?’ বরাবরের মতো অমিতাভ এবারেও নীরব |

এর অনেক পরে আসল রহস্য ফাঁস করেছিলেন অভিনেতা পুনিত ইশারের স্ত্রী দিপালী | তাঁর কথায়, রেখা সারাটা জীবন ফুরিয়ে ফেললেন শুধুই অমিতাভের জন্য | ওই সিঁদুর অমিতের প্রতি রেখার ভালবাসার চিহ্ন | রেখা ততদিনে অমিতের নীরবতা মন্ত্রে দীক্ষিত | তাই মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘দক্ষিণের মেয়েরা নিজেদের সিঁদুরে সাজাতে ভালবাসে | আমার এই সাজ সেরকমই |’

তাহলে রেখা-অমিতের ভালবাসা ফুরিয়ে গিয়েছে? ২০০৮ কিন্তু অন্য সাক্ষী দিচ্ছে | ওই বছরে এক প্রথম সারির পত্রিকাকে রেখা জানিয়েছিলেন, ‘মি. বচ্চন আমার জীবনের সেরা উপহার | আজও আমি সেই উপহার  আগলিয়ে বেড়াচ্ছি | তিনি আমার রক্ষক | শিক্ষক | অফ-ক্যামেরা অনেক কিছু শিখেছি তাঁর থেকে |’ কী শিখেছেন ভানুরেখা গনেশন? ভালবাসার আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়ে উঠতে? আর তার সিঁথির সিঁদুর? সেটা কি নীরব ভালবাসার সরব চাওয়া? সময় হয়ত ক্ষত ঢেকেছে | দাগটা রয়েই গিয়েছে | সিঁথির সিঁদুর হয়ে | ঠিক যেমন ১০ আর ১১ অক্টোবর এলে রেখা আজও গুমরে উঠে মনে মনে হয়ত এমনটাই বলেন—

চেনার বন্ধু পেলাম না’কো জানার অবসর |
গানের পাখি বসেছিলেম দু’দিন শাখার ’পর |
গান ফুরালেই যাব যবে,
গানের কথাই মনে রবে,
পাখি তখন থাকবে না কো’—থাকবে পাখির স্বর,
উড়ব আমি, কাঁদবে তুমি ব্যথার বালুচর! 

আরও পড়ুন:  ধূমধাম করে মা-মরা বড় মেয়ের বিয়ে দিলেন রাজপাল যাদব

NO COMMENTS