ওপার বাংলায় ছিল জুতোর ব্যবসা | সব ছেড়ে ছুড়ে চলে আসতে হয়েছিল দেশভাগের জেরে | এ বার বাংলায় কোনওমতে মাথা গোঁজা নদিয়ার রানাঘাটে | একে তো উদ্বাস্তু পরিবার‚ তার উপর ঘরে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী | দিশেহারা অবস্থা সংসারের | 

১৯৪৭-এর ১৫ অগাস্ট দেশে এল স্বাধীনতা | মধ্যরাত্রে সেই ঐতিহাসিক বক্তব্য রাখলেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু | সে সব থেকে বহু দূরে রানাঘাটের উদ্বাস্তু পরিবারে তখন নজর গৃহকর্ত্রীর দিকে | তিনি তখন আসন্নপ্রসবা | দেশ স্বাধীন হওয়ার কিছু পরেই তাঁর কোল আলো করে এল ফুটফুটে কন্যাসন্তান | ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট কাকভোরে | শ্রাবণ মাসের রাখীপূর্ণিমাকে মনে রেখে নাম রাখা হল রাখী |

এমন মাহেন্দ্রক্ষণে জন্ম‚ সেই মেয়ে স্বাধীনচেতা না হয়ে যাবেন কোথায় ছোট থেকেই ডানপিটে | সঙ্গে ছবির পোকা | এমন সময় বাড়ির কাছেই এল শ্যুটিং পার্টি | ১৪ বছরের রাখী নাওয়া খাওয়া ভুলে পড়ে রইলেন সেখানেই | শ্যুটিং হচ্ছিল অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায়  আহ্বান  ছবির | গল্প বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের | মূল চরিত্রে অনিল চট্টোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা রায় |

ইউনিটের সবার সঙ্গে দিব্যি ভাব জমে গেল রাখীর | এতটাই গভীর সখ্যতা‚ শ্যুটিং শেষ হওয়ার পরে চলেও এলেন নায়িকার হাত ধরে | তাঁর কলকাতার বাড়িতে | সন্ধ্যা রায়ের বাড়িতে থাকতে লাগলেন কিশোরী রাখী | 

কিন্তু শুধু কলকাতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকার মানসিকতা ছিল না | দু চোখে ভরপুর অনেক স্বপ্ন | সন্ধ্যা রায় মেজে ঘষে তৈরি করেছিলেন রাখীকে | কদিনেই হয়ে উঠলেন কেতাদুরস্ত | 

১৯৬৭ সালে প্রথম বাংলা ছবিতে অভিনয় | নাম বধূবরণ | নজর কাড়লেন নবাগতা রাখী | সরাসরি এল বম্বের সুযোগ | রাজশ্রী প্রোডাকশনে ধর্মেন্দ্রর বিপরীতে | ছবির নাম জীবনমৃত্যু |

নায়িকা জীবন শুরুর আগে হয়ে গেছে ক্ষণিকের সংসারও | ১৯৬৩ সালে ১৬ বছরের রাখী বিয়ে করেছিলেন অভিনেতা তথা সাংবাদিক অজয় বিশ্বাসকে | দু বছরের মধ্যেই বিচ্ছেদ |

এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাননি তিনি | 

সাতের দশকের শুরুতেই তিনি বম্বের ব্যস্ত নায়িকা | শর্মিলী‚ লাল পাত্থর‚ পরস‚ শেহজাদে‚ হীরা পান্না‚ হামহারে তুমহারে‚ আঁচল‚ বনারসি বাবু‚ মুক্তি পেতে থাকে একের পর এক সফল ছবি |

নায়কদের মধ্যে সবথেকে বেশি জুটি বেঁধেছেন শশী কাপুরের সঙ্গে | মোট দশটি মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিতে অভিনয় করেছেন দুজনে | শর্মিলী ছাড়াও আছে জনওয়ার অউর ইনসান‚ কভি কভি‚ দুসরা আদমি‚ তৃষ্ণা‚ বসেরা এবং জমিন আসমান-এর মতো ছবি | নায়িকা হিসেবে তাঁর শেষ ছবিও শশী কাপুরের বিপরীতেই | ১৯৮৫ সালে পিগহলতা আসমান |

বিগ বি-র সঙ্গে রাখীর জুটিও হাসি ফুটিয়েছে পরিচালক প্রযোজকদের মুখে | কভি কভি‚ বরসাত কি এক রাত‚ মুকদ্দর কা সিকন্দর‚ কসমে ভাদে‚ ত্রিশূল‚ কালা পাত্থর‚ বেমিসাল‚ জুরমানা-র মতো সফল ছবি উপহার দিয়েছেন এই জুটি | এর মাঝেই বাংলা ছবিতে ফিরে এসে অপর্ণা সেনের পরিচালনায়  পরমা-য় অনবদ্য কাজ | 

আটের দশকের মাঝামাঝি থেকে রাখী সরে যান চরিত্রাভিনেতায় | বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বৃদ্ধা মা বা স্বামীহীনার ভূমিকায় | উল্লেখযোগ্য হল রাম লক্ষ্মণ‚ আনাড়ি‚ বাজিগর‚ খলনায়ক‚ করণ অর্জুন‚ বর্ডার‚ সোলজার-এর মতো ছবি | ২০০৩ সালে ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচালনায় স্মরণীয় কাজ শুভ মহরৎ-এ | তারপর আর বড় পর্দায় দেখা যায়নি এই প্রতিভাময়ী অভিনেত্রীকে |

আরব সাগরের তীরে সফল কেরিয়ারের মাঝেই দ্বিতীয় বিয়ে পরিচালক প্রযোজক গুলজারকে‚ ১৯৭৩ সালে | সে বছরই জন্ম একমাত্র মেয়ে মেঘনার | মেয়ের যখন এক বছর বয়স আলাদা হয়ে যান গুলজার ও রাখী | খাতায় কলমে ডিভোর্স না হলেও দুজনে আলাদাই থাকেন | গুঞ্জন‚ দাম্পত্যে ফাটল ধরার কারণ অসূয়া | বম্বেতে রাখীর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আর এক বাঙালিনী শর্মিলা ঠাকুর | শোনা যায়‚ অভিনেত্রী হিসেবে শর্মিলাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন গুলজার | সেটা মেনে নিতে পারেননি তাঁর অর্ধাঙ্গিনী রাখী |

আরও পড়ুন:  ছিল বস্তি‚ হয়ে গেল পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ !

NO COMMENTS