তিন রাত ঘুম নেই। এবারের দোল পুরো দুলিয়ে দিয়েছে। আজ চারদিন হল সম্পাদকের ফরমান এসেছে। এই দোলে এমন একজন মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে হবে, যার সঙ্গে এই উৎসবের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। এই রঙ, গান, ভাং, মদ, বসন্ত, পলাশ ইত্যাদি কোনকিছুই যাকে টাচ করে না। শর্ত একটাই, মানুষটাকে বিখ্যাত হতে হবে, এক ডাকে সবাই তাকে চিনবে। মাথা চুলকে বড় বড় ঘা হয়ে গেল কিন্তু এমন মানুষ খুঁজে পেলাম না, যে আমায়…। রঙ, গান, মদ ইত্যাদি যাকে টাচ করে না, সে কি করে বিখ্যাত হবে আমি জানি না। আবার সবাই তাকে একডাকে চিনবে , এ কি অবাস্তব আবদার… থুড়ি ফরমান। সম্পাদককে বললাম যে আপনি দুএকটা নাম সাজেস্ট করুন। চেঁচিয়ে উঠে বললেন, ‘আপনাকে তাহলে আমার কি দরকার’?

তিনদিন ধরে সম্পাদকের ধাঁধার উত্তর বার করতে না পেরে রাত বারোটা নাগাদ জম্পেশ করে একটা রেজিগনেশন লেটার লিখে আনমনে টিভির চ্যানেল ঘোরাচ্ছি। কাল আমার চাকরি জীবনের শেষদিন। কারুর প্রতি আমার কোন রাগ, অভিমান, ক্ষোভ নেই। বসের সামান্য একটা আবদার যে রাখতে পারে না, সে……

‘কিতনে আদমি থে ?… তিন সর্দার’ …… টিভিতে শোলে হচ্ছে। গব্বর সিং’এর সেই বিখ্যাত ডায়ালগ। আজও এই সব ডায়ালগ আসমুদ্রহিমাচলের ঠোঁটের ডগায়। এই ছবি থেকেই তিনি প্রথম ভিলেনদের জন্য নির্দিস্ট গলিপথটাকেই বদলে দিয়ে ছিলেন। একটা ছবিতে ভিলেনও যে তুমুলভাবে জনপ্রিয় হতে পারে, সেটা উনিই প্রথম……।

চমকে উঠলাম, আরে, এই তো আমার ধাঁধার উত্তর। রঙ, গান, বসন্ত, পলাশ, হোলিকে নির্লিপ্ত ভাবে সরিয়ে রেখেই তো তিনি বিখ্যাত, জনপ্রিয়। ভারতবর্ষে গব্বর সিংকে চেনে না এমন মানুষ বিরল। লাফ মেরে উঠে সম্পাদককে ফোন করলাম। ওনারই চেষ্টায় অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে গব্বর সিং’এর অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া গেল তবে মাত্র কুড়ি মিনিটের জন্য। ওনার সঙ্গে আমার কথোপকথনের পুরোটাই আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করলাম।

জলদ – আপনাকে হোলির আগাম শুভেচ্ছা…

গব্বর – হোলি কব হ্যায় ? কব হ্যায় হোলি ?

জলদ – (ভয় পেয়ে একটু চমকে গিয়ে)…কাল, মানে পরশু… মানে…  

গব্বর – (হাসি) সমঝা, সমঝা, আচ্ছা হ্যায়, আপনাকেও হোলির শুভেচ্ছা…

জলদ – আপনি তো বেশ ভাল বাংলা বলেন !

আরও পড়ুন:  গোরুর মুখের খবর

গব্বর – হা … বাংলাই তো আমার সব। বাংলার জন্যই আমাকে লোকে চিনেছে। শোলে রিলিজ করার পর যখন দেশের অন্যান্য জায়গা এই ছবিকে রিফিউজ করেছিল তখন বাংলাই তো আমাকে বিখ্যাত করলো, সম্মান দিল, জনপ্রিয় করলো…

জলদ -আজও আপনি সমানভাবে জনপ্রিয়, বিখ্যাত…

গব্বর – ও তো আপনাদের আশীর্বাদ আছে।

জলদ – আমাদের পত্রিকার দোল সংখ্যার জন্য আমরা এমন একজন বিখ্যাত, জনপ্রিয় মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে চাইছিলাম যার সঙ্গে দোল বা হোলির কোন সম্পর্ক নেই। এই আবীর, পলাশ, বসন্ত এসব কোনকিছুই তার গায়ে লাগে না। অথচ তাকে সবাই এক ডাকে চেনে… 

গব্বর – আমাকে আপনার সেইরকম মানুষ বলে মনে হল ?

জলদ –মানে…আপনি…

গব্বর – ভুল… একেবারে ভুল। আরে বাবা, ডাকু বলে কি আমি মানুষ নয় ? অন্য সবার মতই এই বসন্তকাল, আবীর, পলাশ এসব আমার বেশ ভাল লাগে। আর নাচগান তো আমার ফেভারিট। বাসন্তীর নাচ দেখার জন্য আমি নিজের বিপদেরও তোয়াক্কা করি নি। নাহলে ওখানেই তো বীরুর মারা যাওয়ার কথা। তারপর ঠাকুর সাহাবের সঙ্গে টক্করের সময় বিপদ আছে জেনেও স্রেফ নাচগানের লোভে  আমি আমার ডেরা ছেড়ে অন্য জায়গায় রাত কাটাতে গিয়েছিলাম। ‘মেহেবুবা…মেহেবুবা…’ কি, মনে পড়ছে ?

(এসময় খৈনির পুঁটলি থেকে খৈনি বার করে সেই বিখ্যাত স্টাইলে খৈনি ডলে গালে ফেললেন )।

জলদ – তারমানে…আপনিও রঙ খেলেন ?

গব্বর – না, রঙ আমি খেলি না। সেটা অবশ্য একেবারেই অন্য কারণে। আসলে আমি স্নান করি না, দাঁত মাজি না। রঙ খেললে আমাকে স্নান করতে হবে, সাবান মাখতে হবে। সেটা আমি করতে পারব না।   

জলদ -রামগড়ে এবারও তো হোলি খেলা হবে…ধুমধাম, নাচগান…

গব্বর – সব বাকোয়াজ…ফালতু…শুনুন বাসন্তী ছাড়া বসন্তোৎসব – নিমক বিনা সামোসা। রামগড়-এর হোলি মানেই বাসন্তী। নাচগান, খাওয়াদাওয়া, ফুর্তি সবকিছুর প্রাণ ছিল ও… কী দেখতে ছিল, কী ফিগার…উসকি মসি উসকো কোন চাক্কি কা পিসা আটা খিলাতে থে এ ম্যায় নেহি জানতা মগর, আপনাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অনেক বড় বড় নায়িকারা বাসন্তীর সামনে লজ্জ্বা পাবে, ইয়ে জরুর জানতা, বুঝলেন।  বীরুটা মাঝখান থেকে কাঠি না করলে…

জলদ –কী করতেন ?

আরও পড়ুন:  সাংবাদিক তুমি...।।

গব্বর -বিয়ে করতাম। একটা ঘর, আট দশটা ছেলেপুলে…বেশ বড় একটা ডাকাতদল করা যেত…(একটু অন্যমনস্ক)। বাসন্তীর মসিরও তো বীরুকে পছন্দ ছিল না। মাঝখানে জয়ই তো ঘটকালিটা করলো, ওদের প্রেমটা করিয়ে দিল। নাহলে  বাসন্তীর বীরুকে পছন্দই হতো না। একটা মদোমাতাল…যাকগে, ছাড়ুন, যা হবার হয়ে গিয়েছে…এখন এসব ভেবে আর কি হবে। ওরা দুজন তো বেশ ভালই আছে…দুই সন্তান। আমার সঙ্গে বীরুর তো মাঝে মাঝেই কথা হয়।

জলদ – বীরুদা, বাসন্তীবৌদির সঙ্গে আপনার যোগাযোগ আছে ?

গব্বর – হ্যাঁ, হোয়াটস অ্যাপে, ফেসবুকে কথা হয়। মগর, আমার জয়’এর জন্য খুব মন খারাপ করে। বহুত আচ্ছা ল্যাড়কা…কেয়া তাকত থে…কেয়া দিমাক থা…ও ডাকু হলে সরকারের কপালে দুঃখ ছিল। কী পারসোনালিটি ছিল ওর। রামগড়ের সেই বিখ্যাত হোলির দিনের কথাই ধরুন। সেই বিখ্যাত গান… ‘হোলি কে দিন, দিল খিল যা তে হ্যায়…’, সবাই নাচছে, বীরু মদ খেয়ে টালমাটাল হয়ে গলায় মালা পরে একেবারে কেষ্ট। বাসন্তী নাচছে, ওর নাচের তালে মাতাল হয়ে উঠেছে রামগড়, কিন্তু জয় ? শান্ত, চুপচাপ। একেবারে আমার মতো…কী মেজাজ। তারপর সবাই যখন ওকে নাচার জন্য জোর করলো তখন ও উঠলো, নাচলো কিন্তু ঠাকুর সাহাবের ছেলের বউয়ের জন্য…, বহুত দিন বাদ গব্বর কো কোয়ি মিলা থা, যো ইতনা ট্যালেন্টেড থে।     

জলদ -আর ঠাকুর সাহাব ?

গব্বর – সৎ, ইমানদার মগর দিমাক ? দেখুন, আমার সঙ্গে ঝামেলা না করলে ওনার কোন প্রবলেম হত ? আমার জন্য জয়, বীরুকে ছাড়তে পারলি আর নিজের জন্য গব্বরকে ছাড়তে পারলি না ? মাথামোটা কাহিকা । আরে তখন গব্বর নামটাই একটা আতঙ্ক…বিভীষিকা। ভাবুন আজ থেকে প্রায় তেতাল্লিশ বছর আগে, ১৯৭৫ সালে সরকার আমার ওপর পুরে পঞ্চাশ হাজার ইনাম রেখেছিল। রামগড়সে পচাস পচাস ক্রোশ দূর গাঁওমে, যব বাচ্চা রাতকো রোতা থা, তব মা ক্যায়তে থে, বেটা শো যা…নেহি তো গব্বর সিং আ-জায়েগা …

জলদ -আসলে উনি তো প্রশাসনের একজন, একজন সৎ, ইমানদার পুলিশ অফিসার …

গব্বর – তো কেয়া হ্যায় ? গব্বরকে তাপ’সে উনে এক’ই আদমি বাঁচা সাকতা থা, ও খুদ গব্বর, এটা উনি ভুলে গেলেন। তো সাজা মিলনা থা উনকো, মিলা…

আরও পড়ুন:  সাংবাদিক তুমি...।।

জলদ – আমাদের পত্রিকার মাধ্যমে সরকার বা প্রশাসনকে কি কিছু বলবেন ?

গব্বর – একটা কথাই বলবো, আমার মত এমন হাজার হাজার গব্বর আজ দেশ, রাজ্য, জেলা, পাড়ায় দাদা। তাদের কথামতই প্রশাসন চলছে। স্রিফ ভয়ে মানুষও তাদের মেনে নিয়েছে। আমি রামগড়ের মানুষের কাছ থেকে চাল, ডাল, জোয়ার, আনাজ নিলেও কখনো তাদের অর্থ, সম্পদে হাত দিই নি। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষদের মারি নি। রামগড়ের মহিলাদের বেইজ্জত করি নি। যদি সেটা করতাম তবে রামগড়ের মত ছোট্ট একটা গ্রাম কবে শ্মশান হয়ে যেত, ওখানে একটাও মহিলার গায়ে কাপড় থাকত না, বাসন্তিও রামগড়ে টাঙ্গা চালিয়ে রোজগার করতে পারত না। তার ঠিকানা হত আমার ডেরা।

আমার ঝামেলা ছিল ঠাকুর সাহাবের সঙ্গে, আমি আমার মতো করে তার মোকাবিলা করেছি। হ্যাঁ, তার জন্য ঠাকুর সাহাবের পরিবারের নিরীহ মানুষগুলোকে আমি খুন করেছি, এর জন্য আমি অনুতপ্ত। আমি জানি আমি পাপ করেছি। তার সাজাও আমি পাচ্ছি কিন্তু আজ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঝান্ডাকে হাতিয়ার করে আমার থেকেও ভয়ঙ্কর মানুষেরা দেশ, রাজ্য, এলাকার সিংহাসনে বসে দিনের পর দিন যে পাপ করে চলেছে তার সাজা কে দেবে ? সাধারন খেটে খাওয়া মানুষের কাছ থেকে তোলা তুলে যারা নিজেদের পেট ভরাচ্ছে তাদের বিচার কে করবে ? কে বাঁচাবে বাসন্তীর মতো হাজার হাজার মেয়েদের যারা প্রতিদিন এইসব নেতাদের লালসার শিকার হচ্ছে ? আমার যদি ক্ষমতা থাকত তাহলে আমি ওদের চুন চুন কে মার দেতা। আজ ঈশ্বরকে তাই চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, ‘ও দিন মুঝে দে দে ঠাকুর, ও দিন মুঝে দে দে’।             

জলদ – কাল হোলি, আপনার ভক্তদের আপনি কী বলবেন ?

গব্বর –  সবাই জমিয়ে হোলি উৎসবে মেতে উঠুন। আপনারা তো রামগড়ের হোলি দেখেছেন। ওইভাবে সবাই নাচগান, আবীর, রঙের খেলায় আনন্দ করুন। মদ, ভাং খেতে পারেন তবে একটু সমঝে খাবেন। ঠোঁটের নিচে আমার মতো খৈনি রাখতে পারেন, দেখবেন মজা পাবেন। আর খালি হাতমে ওয়াপাস নেহি আনা…তুমহি কো এক আদমি রঙ দেগা তো তুমকো চারো আদমিকো রঙ দেনা পড়েগা। মনে রাখবেন, ‘যো ডর গ্যায়া সমঝো ও মর গ্যায়া’।

- Might Interest You

2 COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ