জলদ গুপ্ত
জলদ গুপ্ত লেখেন না, ভাবেন। নিজেকে মনে করেন মুদির দোকানের মালিক। কোথায় কোন মশলা আছে শুধু সেটুকুই উনি জানেন, খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী কাগজে মুড়ে দিয়ে দেন...ব্যস। সিধুজ্যাঠার মত অনেক কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও অন্যদের অসুবিধা হবে বলে কিছুই করেন নি। কবিতা, নাটক লিখতে পছন্দ করেন আর পাগলের মত পছন্দ করেন সঙ্গীত। পাহাড়ি জঙ্গলের টিলায় বসে হেঁড়ে গলায় গান আর দিনে ১৫ কাপ চায়ের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। আদিখ্যেতাকে ঘেন্না করেন, তর্ক করতে ভালোবাসেন। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে কোন লেখক থাকবে না।

উফ, আর পারা যায় না। একে ভ্যাপসা গরম তার ওপর ভিড় বাস। আজ বসার জায়গাটাও পাই নি। সামান্য টাইমিংএর গন্ডগোলে পাশ থেকে একটা বাচ্চা ছেলে ডজ করে বসে পড়লো। হাতটা নামিয়ে পকেট থেকে রুমালটাও বার করতে পারছি না,  মাথা…ঘাড়…গলা হয়ে দর দর করে  নিচে নামছে ঘাম, কিন্তু আমি অসহায়, কিচ্ছু করার নেই। আজ আবার মেয়ের অঙ্কের মাষ্টারের মাইনে দেওয়ার দিন। আমি না ফেরা পর্যন্ত ছেলেটা যাবে না। একথা সেকথা বলে রাজুর মায়ের সঙ্গে গল্প করবে। এই একটা দিন ছেলেটাকে কেমন যেন কাবুলিওয়ালা মনে হয়। ‘কী পচাদা ? আজ আর গোল করতে পারলেন না’? পাশ থেকে সুবীরের টিপ্পনী।  

একটা জোরে ব্রেক মেরে বাসটা হটাৎই দাঁড়িয়ে গেল। সাংবাদিক হত্যার প্রতিবাদে মিছিল। বুঝুন ঠ্যালা, সামান্য একটা সাংবাদিক মারা যাওয়ার জন্য এতগুলো মানুষ…ছিঃ ছিঃ। পাশ থেকে এক বয়স্ক লোক বললেন, কর্নাটকে কে মারা গেছে তার জন্য আমাদের এখেনে রাস্তা বন্ধ, শালাদের খেয়ে দেয়ে কাজ নেই ! বেশ কিছু লোক ওনাকে সমর্থন করলেন। কন্ডাক্টর চিৎকার করে বলল, আধঘণ্টার বেশি লাগবে দাদা, বেশ বড় মিছিল।

হ্যাঁ, মিছিলটা বেশ বড়ই ছিল। অফিস টাইমে তিতিবিরক্ত করে, শরীরের সব ঘাম বার করে নিয়ে মিছিল শেষ হল এবং আমাদের যাত্রা হল শুরু। মনের মধ্যে জমে থাকা সব রাগ, ক্ষোভ উজাড় করতে করতে এগিয়ে চললো এক বাস অফিসযাত্রী – সংবিধানের বিচারে সাধারণ মধ্যবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষ। কিন্তু এই শেষ বা শুরুর খেলাটা কি সত্যিই ‘শেষ’ বা ‘শুরু’তে শেষ হয় ? সাধারণের প্রতিবাদ নামক আস্ফালন কি সেই অর্থে কোন পরিণতি পায় ? না, পায় না।  সুদূর অতীত থেকে আজ পর্যন্ত কোন কিছুরই শুরু বা শেষ হয় নি। কালের বিচারে সব শুরু বা সব শেষগুলোই শুধুমাত্র একটা ঘটনা বা গল্প হয়ে থেকে গেছে। সমাজ, সংসার বা এক বাস নাগরিক জীবনে কোন প্রভাবই ফেলতে পারে নি। আপাতদৃষ্টিতে একটা সময়কে পরিবর্তনের শুরু বা শেষ বলে মনে হলেও আসলে সেটা সমাজজীবনের আধুনিক মুখোশ মাত্র। সময়ের প্রেক্ষাপটে কৌশল বা পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটলেও ঘটনা কিন্তু একই থাকে। গৌরী লঙ্কেশও তেমনই জমজমাট একটা ঘটনা মাত্র। কিছুদিন পরেই গৌরীকে নিয়ে ছবি হবে। সমালোচকরা সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে ছবি দেখে কাটাছেঁড়া করে নম্বর দেবেন। তাঁর সাহসের প্রশংসায় মিডিয়ার পাতা ভরে যাবে, বেশ কিছু মোমবাতি বিক্রি হবে | কিন্তু তারপর ? তারপর গোরক্ষকদের হাতে নির্বিঘ্নে মানুষের মৃত্যু ঘটবে, গেরস্থের ঘরে পুলিশ সার্চ করে গোমাংস খুঁজবে, মুসলমান নাপিত তার দোকানের বিজ্ঞাপনে দুর্গার ছবি ব্যবহার করে ক্ষমা চাইবেন, বেশ কিছু হিন্দু হিন্দুত্বের নতুন সংজ্ঞা দিয়ে হিন্দু ধর্মকে ব্যাখ্যা করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার অন্যদিকে ইসলামের অপব্যাখ্যা করে কিছু মুর্খ মুসলমান এক নতুন পৃথিবীর নিদান দেবেন, যেখানে শুধুমাত্র মুসলমানরাই থাকবে। অদ্ভুতভাবে এ সব কিছুই ঘটবে প্রশাসনের ঠোঁটের ডগায় আর আল্লাহ বা ভগবানের ধ্বজাধারী বেশকিছু রাজনৈতিক দল এই রাজনৈতিক  কর্মসুচীগুলোকে সযত্নে সফল করার জন্য পথে নামবেন। এখানে মহম্মদ, বিবেকানন্দ বা রবীন্দ্রনাথ-নজরুলদের কোন ঠাই নেই। ওনাদের বলা কথাগুলো সংস্কৃত ভাষার মতো পবিত্র হয়ে জীবনের বাইরে চলে গেছে। ও ভাষায় বা ওদের বাণীকে ফুল জল দিয়ে পুজো করা যায় কিন্তু দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্যে টেনে আনা যায় না।  সত্যি পচা কি বিচিত্র এই দেশ !

আরও পড়ুন:  এই মন্দিরের বিগ্রহ নাকি আখের গুড় মেশানো জল দিয়ে কুলকুচি করেন !

এই আরোপিত ধর্ম বা সুকৌশলে চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক আবেগকে সম্পুর্ণ মর্যাদা দিয়েও চিৎকার করে বলা যায় আইনগত ভাবে এগুলো অন্যায়, অপরাধ। প্রকৃত বা সাবালক রাষ্ট্রে এই ধরণের কার্যকলাপকে প্রকারান্তরে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বলে। কিন্তু এ সবই তো কাগজে লেখা জোরালো অক্ষর দিয়ে তৈরি জম্পেশ কিছু বাক্য…কাগুজে প্রতিবাদ। যে প্রতিবাদের জন্য বলি হতে হয় গৌরী লঙ্কেশদের, যে প্রতিবাদের  জন্য অফিসযাত্রী সাধারণ মধ্যবিত্ত চাকুরেদের হাজিরা খাতায় লাল কালি পড়ে, প্ল্যান করা – সময় মাপা দিনযাপনে ছেদ পড়ে, মাষ্টারের মাইনে বা গ্যাসের বিল দিতে দেরি হয়ে যায়। যে প্রতিবাদের যোগ্য পুরস্কার কয়েক হাজার মানুষের জোটবদ্ধ মিছিল, কয়েক হাজার রঙিন মোমবাতি আর সাতটি বুলেট। ব্যস, সব শেষ বা সব কিছু আবার শুরু। কোনভাবেই এই শুরু বা শেষের গল্পগুলো ছয় বাই আটের রান্নাঘরে ঢোকে না। ইলেকট্রিক বিল বা মেয়ের স্কুলের মাইনে কার্ডের পাশে এই প্রতিবাদ সভার আমন্ত্রণ পত্রটাও জায়গা পায় না। সন্ধ্যের মেগা সিরিয়ালের প্রতিবাদী নারীটার দশ শতাংশ সহানুভুতিও পায় না এই অতি পাকা গৌরী লঙ্কেশ। সে থেকে যায় ইতিহাসের গল্পে – স্রেফ একটি প্রতিবাদী চরিত্র হয়ে।

অন্যান্য গনতান্ত্রিক দেশের মতো আমাদের এই দেশেও সরকার পরিবর্তন হয়। এক আদর্শ চলে গিয়ে আর এক আদর্শ দেশ চালানোর দায়িত্ব নেয়। বলা হয় মানুষের রায়ে এই পরিবর্তন। নির্দিস্ট সরকারের ভুলভ্রান্তির বিরুদ্ধে এই রায় সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ। কিন্তু সত্যি কি তাই ? সাধারণ মানুষ সত্যিই কি তার ব্যালটটাকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন ? নিশ্চই করেন, নাহলে এক সরকার গিয়ে আর এক সরকার আসে কী করে ? কিন্তু এটাও সেই নিরন্তর জীবনযাপনের দৈনন্দিন দায়ের লিস্টে জায়গা করে নিতে পারে না। এটা শুধুমাত্রই করতে হয় নাহলে পিছিয়ে পড়তে হয়। আসলে আমরা সবাই জানি বা এতদিনে জেনে গেছি যে, আমাদের দেশের গনতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় সরকার পরিবর্তন হয় না, এখানে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। ফলে ওই কুড়ি কোটি রান্নাঘরে তার বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ে না, যদি পড়ত তবে বাসের মধ্যে ঘামে ভিজতে থাকা পচাদারা বিনা দ্বিধায় নেমে এসে ওই মিছিলে যোগ দিতেন,  মানুষ খুনের আওয়াজ পেয়ে জানলা বন্ধ করতেন না, একটা গৌরীর জন্য লক্ষ লক্ষ গৌরীর চিৎকারে রাজপথ ভরে যেত। সন্ধ্যের ড্রয়িং রুমে শোনা যেত গৌরী লঙ্কেশদেরই বলা ডায়ালগ।  

আরও পড়ুন:  প্রিয় প্রিয়, বিদায়

আমরা আসলে সেই প্রতিবাদ করতে চাওয়া মাষ্টারমশাইয়ের মতো কিছুই দেখি না। আমরা জানি আমাদের অনেক কিছুই দেখতে নেই। আমাদের বউ আছে, সন্তান আছে, পরিবার আছে। ওই সাতটা বুলেটের একটাও যদি আমার জন্য বরাদ্দ হয় তবে ওদের কে দেখবে ? এই ওদেরকে দেখার ভাবনার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ওই ‘ওদের’ বেঁচে থাকার জোর। ওরা জানে সাতটা বুলেট খেয়ে পড়ে থাকা ডেডবডিটা কেউ দেখতেই পাবে না। কেউ বলতেই পারবে না ওই বুলেটগুলোর মালিক কারা ? সবাই খুব কষ্ট পাবে, বাড়ির লোকজনকে সান্ত্বনা দেবে, গুন গুন করে বলবে ‘বড় ভাল মেয়ে ছিল, খুব শিক্ষিত, মার্জিত……’ । কেউ এগিয়ে এসে বলবে না, এই মেয়েটা আমাদের বাঁচার রাস্তা দেখিয়েছে, আমরা ওর মতো করে বাঁচতে চাই, এই মেয়েটা নিজেই একটা পথ, আমরা আমাদের মেয়েকে ওর মতো করে তৈরি করবো……আমরা মোমবাতি জ্বেলে ওকে শ্রদ্ধা জানাবো না, আমরা মশাল জ্বেলে পথে নামব কারন আমরা অনেক কিছু দেখতে পাচ্ছি… আমরা এখন অনেক কিছু দেখতে পাই।

2 COMMENTS

  1. মানুষ প্রতিবাদ করতে ভুলে যাচ্ছে। এ এক ভয়ঙ্কর সময়।