আগের পর্বে লিখেছিলম কলকাতায় আর্মেনিয়দের পা রাখার কথা | এ বার নতুন শহরকে তারা কী করে আত্মস্থ করেছিলেন‚ সেই নিয়ে অতীত-খনন | 

ককেশাস পার্বত্য এলাকার দেশ আর্মেনিয়ার মানুষ মূলত ছিল ব্যবসায়ী | কলকাতায় এসে তারা প্রথমে ব্যবসাই করত | কিন্তু ব্রিটিশরা ময়দানে চলে আসায় বেশ পিছিয়ে পড়ে তারা | প্রতিযোগিতায় ধাক্কা খেয়ে সরে আসে অন্য জীবিকায় | বাড়াতে থাকে ব্যবসায়িক গণ্ডিও | এক এক জন আর্মেনিয়ান সাহেব কিনে ফেলেন জাহাজ‚ কোলিয়ারি‚ রেসের ঘোড়ার মতো দামী দামী সম্পত্তি |

পরবর্তী প্রজন্ম ব্যবসা থেকে সরে আসে গবেষক‚ চিকিৎসক‚ উকিল‚ ইঞ্জিয়ারিং-এর মতো পেশায় | নিজেদের পকেটপূর্তির সঙ্গে কলকাতাকেও সাজিয়েছিলেন তাঁরা | কত যে বাড়ি ও প্রাসাদ বানিয়েছিলেন বলে শেষ করা যাবে না | এছাড়াও বানিয়েছিলেন গির্জা‚ স্কুল‚ ফেরিঘাট ও স্নানঘাট | 

আজকের বড়বাজারে আর্মেনীয়দের তৈরি চার্চ অফ দ্য হোলি নাজারেথ সম্ভবত কলকাতার প্রাচীনতম গির্জা | আগের পর্বেই বলেছি‚ ব্রিটিশদের বহু আগে কলকাতায় থাকতে শুরু করে আর্মেনীয়রা | এই জমি ছিল তাদের সমাধিক্ষেত্র | ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে সেখানেই গির্জা বানিয়েছিল তারা | তারও দু বছর বাদে জোব চার্নক এসেছিলেন গোবিন্দপুর সুতানটী ও কলকাতায় | কলকাতার প্রাচীনতম খ্রিস্টান সমাধি পাওয়া গেছে এই গির্জাতেই | ১৬৩০ সনে ( এই বছরেই জন্ম হয় জোব চার্নকের ) কলকাতায় প্রয়াত হয়েছিলেন আর্মেনিয় মহিলা‚ রেজাবীবেহ সুকিয়া | তাঁরই সমাধিফলক সম্প্রতি পাওয়া গেছে এই গির্জায় |

১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে বানানো গির্জা ভয়াবহ আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায় | পরে ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে আবার গির্জাটি বানান আগা নজর | এ ছাড়াও কলকাতায় আরও দুটি আর্মেনীয় গির্জা আছে | সেন্ট মেরিজ চার্চ এবং চার্চ অফ গ্রেগরি দ্য ল্যুমিনেটর | 

কলকাতাকে আর্মেনীয়দের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপহার হল আর্মানি ঘাট | ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে এই ঘাট বানিয়েছিলেন বিখ্যাত আর্মেনীয় কারবারি ম্যানভেল হাজারমল বা হুজুরিমল | পরে ১৮৫৪-১৮৭৪ এখানেই ছিল ইস্টার্ন রেলওয়েজের ‘Calcutta Station and Ticket Reservation Room’ | এই টিকিটঘরে টিকিট কিনে রেলের স্টিমারে গঙ্গা পেরিয়ে হাওড়া থেকে ট্রেন ধরত যাত্রীরা |

পরে কালীঘাট মন্দিরের কাছেও কয়েক বিঘা জমির উপরে ঘাট বানিয়েছিলেন হুজুরিমল | বৈঠকখানা বাজারে ছিল তাঁর নামে বিশাল পুষ্করিণী | এখন আর তার অস্তিত্ব নেই | নেবুতলায় আছে আর্মেনীয় স্মৃতি বিজড়িত হুজুরিমল লেন | 

হুজুরিমল পরিবার কয়েক পুরুষ ধরে এই শহরের বাসিন্দা ছিলেন | আর এক ধনী উমিচাঁদের সঙ্গেও যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ছিল তাঁদের | আর যে সব বিখ্যাত আর্মেনীয় পরিবার আপন করে নিয়েছিল এই শহরকে তাঁদের মধ্যে একটি হল অ্যাপকার | 

মাত্র ১৬ বছর বয়সে ভাগ্যের সন্ধানে বম্বে এসেছিলেন অ্যারাটুন অ্যাপকার | সেখান থেকে কলকাতা | এই শহরে ব্যবসা করে প্রবল প্রতিপত্তি হয় তাঁর | যেমন পেয়েছেন‚ দু হাত ভরে এই শহরকে দিয়েছেন তাঁরা | অ্যারাটুনের এক ছেলে কলকাতার প্রথম আর্মেনিয়ান শেরিফ হন | অন্যান্য ছেলেও যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন সাংগঠনিক ও সেবামূলক কাজে | শিক্ষাজগতে আর্মেনিয়ান কলেজ ও দ্য আর্মেনিয়ান ফিলানথ্রোফিক অ্যাকাডেমি হল আরও দুটি উজ্জ্বল পালক | যা কল্লোলিনী কলকাতার মুকুটে যোগ করেছিলেন এই বিদেশিরা |

প্রথম পর্বের লিঙ্ক :  জোব চার্নক তখন তখন মায়ের গর্ভে‚ কলকাতায় বসবাসের পরে চোখ বুজলেন বিদেশিনী রমণী http://banglalive.com/older-than-the-oldest/

আরও পড়ুন:  প্রাক্তন লিভ ইন পার্টনার রিয়া পিল্লাইয়ের সঙ্গে লিয়েন্ডারের দ্বন্দ্বে কম পড়েছে একটি শূন্য

1 COMMENT