আজ ক্রিকেট দেবতার জন্মদিন।

বহুকাল ধরেই গ্যালারির কোনায় কোনায় ‘ইফ ক্রিকেট ইজ এ রিলিজিয়ন, শচীন ইজ গড’ লেখা পোস্টার ঘুরতে দেখেছি আমরা। বছর দুয়েক আগে এই নামে একটা বইও লিখেছেন বিজয় সান্থানাম ও শ্যাম বালাসুব্রমনিয়ম। তারও আগে খোদ টাইম ম্যাগাজিন তাদের এশিয়ান সংস্করণে শচীনকে নিয়ে করা কভার স্টোরির নাম রেখেছিল ‘দ্য গড অফ ক্রিকেট’। না রেখে সম্ভবত তাদের কোনও উপায় ছিল না। এক কথায় শচীনকে বর্ণনা করতে গেলে এর চেয়ে সুপ্রযুক্ত আর কিছু হয় না।

যদিও বহু মানুষকে এর বিরোধিতাও করতে শোনা গেছে। একজন মানুষ তিনি যতই সফল হোন না কেন, তাঁকে সেই খেলাটার ঈশ্বর বানিয়ে ফেলাটা নিতান্তই বাড়াবাড়ি বলে মনে হয়েছে তাঁদের। আসলে শচীনের ‘ঈশ্বরত্ব’কে কেবল তাঁর অসামান্য সব রেকর্ড আর রানের বিপুল ভাণ্ডার দিয়ে বিচার করা যাবে না। ২৪ বছরের কেরিয়ারে যেভাবে তিনি একটা বিরাট দেশের সর্বত্র আশার আলো বয়ে নিয়ে গিয়েছেন সেই সাফল্যকেও এর সঙ্গে যোগ করতে হবে।

দুটো উদাহরণ দেওয়া যাক। মাত্র কয়েকদিন আগে, করণ গান্ধি নামের এক শচীন-ভক্তের হাতে লেখা চিঠি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল। বর্তমানে মার্কিন মুলুকের বাসিন্দা করণ সেই চিঠিতে নিজের ছোটবেলার নায়কের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘আপনার খেলা দেখতে দেখতেই বড় হয়েছি। দিন-রাতের ওয়ানডে ম্যাচ দেখার জন্য কত যে টিউশন ক্লাস মিস হয়েছে!’ শচীন সেই চিঠি ইন্সটাগ্রামে পোস্ট করেন। তলায় উত্তরও দেন স্বভাবরসিক ভঙ্গিতে। লেখেন, ‘আমি নিশ্চিত, তোমার টিউটররা ভারতের ওয়ানডে ম্যাচ থাকলে মোটেই খুশি হতেন না।’ সঙ্গে একটা স্মাইলি।

এবার দ্বিতীয় উদাহরণ। ‘জনৈক’ করণ গান্ধির পরে বলিউডের বাদশাহ শাহরুখ খান। মে মাসে মুক্তি পেতে চলা ডকু-ফিচার ‘শচীন: আ বিলিয়ন ড্রিমস’-এর প্রথম ট্রেলার ইউটিউবে মুক্তি পেলে তার লিঙ্ক টুইটারে শেয়ার করেন শচীন। উত্তরে শাহরুখ শচীনকে সিনেমাটির জন্য শুভ কামনা জানান। পাশাপাশি লেখেন, ‘আমি বিশ্বাস করতাম তুমি সফল হলেই আমি হব। আর সফল না হলে আমিও পারব না। কোটি কোটি অন্য ভক্তের মতো আমি আমার পথ নির্দেশক আলোটির অভাব অনুভব করি।’

আরও পড়ুন:  নীল তিমি, কিছু ‘অ’প্রাসঙ্গিক কথা

একদম সাম্প্রতিক এই দুটি ঘটনা যেন আবার নতুন করে বুঝিয়ে দিয়ে গেল শচীন তেন্ডুলকারের আসমুদ্র হিমাচল জুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তার রেখাচিত্রটিকে। দেশের এক নম্বর ফিল্ম-তারকা থেকে একদম সাধারণ জনতা—সকলকেই দশকের পর দশক জুড়ে এভাবেই আচ্ছন্ন করে রেখেছেন তিনি। অবসরের সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে এসেও ‘প্রাক্তন’ হননি মোটেই।

এই রূপকথাকে তাই নিছক রান, সেঞ্চুরির হিসেবে বেঁধে রাখা যাবে না। এই দেশ তথা ক্রিকেট বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটার কম দেখেনি। কেবল পরিসংখ্যানই যদি বিচার্য হয়, তাহলে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের ধারেকাছে কেউ থাকবেন কি? বাহান্ন টেস্টে অতিমানবিক ৯৯.৯৪ গড়ের মতো অলৌকিক আর কী হতে পারে। গত শতাব্দীর তিনের দশকে আর্থিক মন্দায় ডুবে থাকা অস্ট্রেলিয়ার কাছে একমাত্র আশাভরসা ছিল ডনের ব্যাট। কেবল তাঁকে থামাতেই তো বডিলাইনের আয়োজন। তাতেও ডনের গড় ছাপ্পান্ন। কাজেই তিনি যতই ‘ছেলেটা আমার মতোই খেলে’ বলে সার্টিফিকেট দিন না কেন, ঘটনা হচ্ছে শচীন তেন্ডুলকার সহ ক্রিকেট বিশ্বের কোনও খেলোয়াড়ই ডনের ধারেকাছেও পৌঁছোতে পারেননি।  

নাম তো আরও আছে। সুনীল গাভাসকার, ব্রায়ান লারা, গ্যারি সোবার্স, সাঙ্গাকারা থেকে আজকের বিরাট, ডিভিলিয়ার্স এরকম কত নাম! প্রতিভা ও পারফরম্যান্সের বিচারে এঁরা সবাই তুল্যমূল্য। বিভিন্ন সময়ে এঁদের কীর্তি চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, শচীনের মতো সারা দেশের ব্যাটন হাতে এমন দৌড় এঁদের কাউকেই দিতে হয়নি। একজন ব্যাটসম্যান জানেন, তাঁর এই শোয়েব আখতারকে পয়েন্টের ওপর দিয়ে মারা দুর্দান্ত ছক্কাটা আসলে তিনি একা মারলেন না। একই সঙ্গে সারা দেশের মানুষও মারল। একটা নতুন রেকর্ড মানে সেটা আসলে তাঁর নয়। সারা দেশের সম্পত্তি। আবার উলটো দিকে অ্যালেন ডোনাল্ডের ইনসুইং বুঝতে না পারা মানে তাঁর একার নয়, কোটি কোটি ভক্তের মিডল স্টাম্প ছিটকে গেল! তাঁর সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা আসলে তাঁর নয়। সেটা তাঁর ভক্তদের। এটা মাথায় রেখে প্রতিবার ব্যাট হাতে নামতে হয়েছে তাঁকে। এবং সেটা প্রায় কেরিয়ারের শুরু থেকেই। জীবনের প্রথম অস্ট্রেলিয়ান সফর কিংবা তারও আগে, যখন শ্রীকান্ত কিংবা আজহারউদ্দিনের মতো খেলোয়াড়রা দলে রয়েছেন, তখন থেকেই গ্যালারি তাঁকে ঘিরেই নিজেদের আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন।

আরও পড়ুন:  গুরুর আদেশ ! বাছুরের মুখে লেগে থাকা ফেনা পান করে জীবনধারণ ছাত্রের

প্রতিভা অনেকেরই থাকেই। কিন্তু শুধু তা দিয়ে হয় না। একজনের কথা মনে পড়ল। ইংল্যান্ডের গ্রেম হিক। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ছিল। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে কোনও মতে তিরিশের সামান্য বেশি গড়ে শেষ হয়েছিল কেরিয়ার। জীবনের প্রথম টেস্ট ইনিংসে অ্যামব্রোজের বাউন্সার তাঁর শরীর ছুঁয়ে বেরিয়ে গেলে রিচি বেনো ধারাভাষ্য দিতে বসে বলেছিলেন, ‘টেস্ট ক্রিকেটে স্বাগত হিক।’ অর্থাৎ সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেট খেলতে নেমে কেবল প্রতিভা দিয়ে হবে না। তীব্র পুরুষকার দিয়ে তাকে রক্ষাও করতে হবে।

আর সেই জায়গাতেই চূড়ান্ত সফল শচীন। তাঁকে নিয়ে নিন্দুকদের একটা তত্ত্ব আছে। বিশ্বায়নের আদি যুগে বিপণনের বাজারে ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করে তুলতে নাকি শচীনকে কায়দা করে ‘কিংবদন্তি’ করে তোলা হয়েছিল। এটা যে কতটা হাস্যকর ভাবা যায় না! চৌত্রিশ হাজার রান, একশো সেঞ্চুরির মালিককে ‘কাগুজে বাঘ’ বলতে চাওয়ার মতো বোকামি আর কী হতে পারে। নিন্দুকরা একসময় আওয়াজ তুলেছিল, ‘যতই যাই হোক, শচীন সেঞ্চুরি করলে সেটা মোটেই কাজে আসে না। ভারত হারে।’ পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যাবে সেটা একটা ডাহা মিথ্যা ছাড়া কিছু নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভারত জিতেছে। ২০১১ সালের আগে অবধি ‘বিশ্বকাপ জেতেনি তাহলে আর গ্রেট কীসের’ গোছের কথাও শোনা যেত। এই সব গালাগালকে স্টেডিয়ামের বাইরে উড়িয়ে দিয়েছেন লিটল মাস্টার।

তা বলে জীবনে সব সাফল্য অনায়াসে এসেছে তা নয়। কখনও চোটআঘাতে নুয়ে পড়েছেন। কখনও ফর্ম একেবারেই সঙ্গ দেয়নি। কিন্তু শচীন হার মানেননি। পরপর শূন্য করার পরে ফিরে এসেছেন সেঞ্চুরি করে, এমন নজির তৈরি হয়েছে। শাহরুখের যে টুইটের উল্লেখ আগে করেছি তার উত্তরে শচীন টুইট করেছেন, ‘জীবনে যদি হার না থাকত, কেউ কখনও জিতত না, কিছু শিখত না।’

এই বিশ্বাসই প্রতিটা ব্যর্থতার পরে নতুন করে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে তাঁকে। করে তুলেছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, অপরাজেয় এক কিংবদন্তি।

আরও পড়ুন:  অতলে নেমে গেছে পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন ধাপ-কুয়োর সিঁড়ি

NO COMMENTS