হরিদ্বার – যেখানে সারা বিশ্বের হিন্দুরা এসে জড়ো হয়

রুদ্রপ্রয়াগ থেকে হুড়মুড়িয়ে হরিদ্বার চলে তো এলাম কিন্তু এতদিন এ পাহাড় সে পাহাড় ঘুরে প্রায় সমতলভূমিতে পা দিয়ে গরমে প্রাণ যায় যায় অবস্থা সকলের | খুঁজে-পেতে যে হোটেলে ঘর নিলাম – ‘হর কি পৌরি’ অর্থাৎ ঘাটের প্রাণকেন্দ্র সেখান থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা | কুলার যদিও রয়েছে তবে ঠান্ডা ঘরে কে কাটাবে – চতুর্দিক যখন চূড়ান্ত সরগরম |

গাড়োয়াল হিমালয়কে এরা বলে দেবভূমি আর তার প্রধান ফটক হলো এই হরিদ্বার ফলে ভক্তিরস উজাড় করে দেবার জন্য সারা বিশ্বের যত হিন্দু সব এখানে এসে জড়ো হয় | – তার ওপর গরমের ছুটি চলছে ফলে গঙ্গার ঘাটগুলোতে পা রাখার জায়গা নেই |

জমজমাট ফুলের দোকান

ছোট ছোট অজস্র ঘেরা জায়গা আছে বটে তবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দিব্যি খুলে আম কাপড় জামা পাল্টে গঙ্গাস্নান সেরে নিচ্ছে – তার আগে অবশ্য ঘটা করে পুজো-আচ্চা করে নেওয়া চাই – পাণ্ডারা মাছির মতো ভনভন করছে – ফুলের দোকান ডালা সাজিয়ে বসে আছে – তেমন রোখ চেপে গেলে ‘নাই ঘাট’-এ গিয়ে চুল-দাড়ি কমিয়ে এসো, মানাবে ভালো – ছোট ছোট তেরপলের নিচে নাপিতরা অক্লান্তভাবে ক্ষুর চালিয়ে চলেছে | পুঁচকে বাচ্চাদেরও ন্যাড়া করে জলে ডোবাচ্ছে অনেকে – কী ফূর্তি!

নাই ঘাট-এ ন্যাড়া হওয়া চলছে

পশ্চিমের গরম শুকনো – ঘামের বালাই নেই, তাছাড়া বিকেল হতে না হতেই চমৎকার ঠান্ডা বাতাস পাহাড় থেকে নেমে আসছে আর আলো থাকে অনেকক্ষণ – ফলে ছেলে-বুড়ো, মেয়ে-মদ্দ সবাই মিলে একেবারে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে | এখানে সন্ধে মানেই জমজমাট আরতি – শ’য়ে শ’য়ে লাউডস্পিকার মন্ত্র আর ভজনের দামামা বাজিয়ে আগে থেকে উত্তেজনা তুঙ্গে উঠিয়ে দেয় – ঢাক,ঢোল, কাঁসর-ঘন্টা পিটিয়ে আরতি চলতে থাকে |

ধনী-গরিব নির্বিশেষে ভক্তের দল প্রাদেশিকতা শিকেয় তুলে ঠাসাঠাসি করে বুঁদ হয়ে দ্যাখে | নানারকম ফুল দিয়ে সাজানো ছোট ছোট পাতার ভেলা কিনে তার ওপর প্রদীপ জ্বালিয়ে ঘাটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে গঙ্গার স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলে সারা সন্ধে – কার ভেলা বেসামাল হয়ে উল্টোলো, কার প্রদীপের আলো ভাসতে ভাসতে দূরে মিলিয়ে গেল – এসব দেখতে বেশ ভিড় জমে – চেনা-অচেনা মিশে যায় মুহূর্তের মধ্যে | এত কিছু করতে গেলে তো ঘন্টায় ঘন্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ – চিন্তা নেই জমাট দই-এর ঘন লস্যি বিকোচ্ছে সর্বত্র – হাতে কাঠের লাঠি নাড়িয়ে বানানোর দিন আর নেই – ছোট ছোট মেশিন আছে – সিকি মিনিটে গ্লাস ভর্তি সুস্বাদু লস্যি রেডি | চপ-কাটলেট না থাকলে কী হবে নানা রকমের নিরামিষ খাবার আর মিষ্টির অফুরন্ত আয়োজন রয়েছে – সরু সরু গলির মধ্যে গিজগিজে দোকানপাট – জামাকাপড়, খেলনা, ঘর সাজানোর জিনিস, গয়নাগাটি, ঠাকুর দেবতার ছবি, রান্নাঘরের সরঞ্জাম কী নেই ! লাঞ্চ বা ডিনার করতে হবে?

আরও পড়ুন:  বাঃ! তাজপুর
চোটিওয়ালা

চোটিওয়ালার দোকান রয়েছে ঘাটের ধরে সার দিয়ে – সব দোকানেই ঢোকার মুখে লম্বা টিকি বা চোটি মাথায় আলুভাতে মার্কা একটা করে লোক সারা গায়ে গোলাপি রঙ মেখে হাসি হাসি মুখে চেয়ে বসে আছে | আমার দশ বছরের ছেলে বুবুল তো বলেই ফেলল – “পয়সা রোজগারের কী আজব উপায় দেখেছ?” তবে কিনা নির্ভেজাল বঙ্গসন্তানেরা এসব জায়গায় কদাচিৎ আসে – এদের জন্য রয়েছে ঘাট থেকে কিঞ্চিৎ দূরত্বে ‘দাদা-বৌদির হোটেল’ | এরও অজস্র নকল বেরিয়ে গেছে, আলিবাবার গল্পের মতো গলির মধ্যে সবকটা সাইনবোর্ডেই লেখা ‘দাদা-বৌদির হোটেল | কোনটা আদি আর অকৃত্রিম সেটা খুঁজে বার করো | অবশ্য এতে কিছু এসে যায় না – মেনু আর স্বাদের ফারাক এদের সামান্যই – সকাল সন্ধে এখানে লেবু দিয়ে কড়াই-এর ডাল আর পোস্ত চচ্চড়ি খাবার লাইন লেগে যায় |

প্রথম দিনটা শুধু ঘুরে দেখেই কেটে গেল – সঙ্গে একটা ছটফটানি – আঁকাআঁকি শুরু করতে হবে | পরের দিন প্রায় গোটাটাই হরিদ্বারের হরেক কাণ্ড এঁকে কাটালাম | সক্কাল সক্কাল ব্রেকফাস্ট হলো গরমাগরম পুরির সঙ্গে কুমড়োর ঘ্যাঁট, আলু মটর আর ডাল এই তিন রকম সহযোগ |

গরমাগরম কচুরি ভাজা হচ্ছে

চাকাওলা গাড়িতে করে মোড়ের মাথায় নিয়ে এসে ভেজে খাইয়ে এরা চলে যায় | তাতু আর বাকিদের বললাম তোমরা তোমাদের মতো ঘোরো – আমি ছবি এঁকে বেড়াব – দুপুরে খাবার সময় দেখা হবে | একে তো চড়া রোদে ছাওয়া খুঁজে খুঁজে বসা তার ওপর নিমেষে চারদিকে ভিড় জমে যাচ্ছে – এখানে উটকো লোকের কোনো কমতি নেই – আঁকব কী – কোথা থেকে এসেছেন কথাটা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে যাবার যোগাড় – মাতব্বর গোছের একজন আবার ফুট কেটে বসল – “তো আপ হ্যায় কলকেত্তা কা কারিগর!” উপাধির কী ছিরি!

বড় বড় বটগাছ পেলেই তলায় সর্বাঙ্গে ছাই মেখে সাধুবাবারা আখড়া বানিয়ে ফেলে | নানারকম হোম-যজ্ঞ বা স্রেফ হাঁক-ডাক করে চ্যালা চামুন্ডা জোটায় – ছবি আঁকতে গেলে এদের অনেকেই এমন কটমট করে তাকাবে মনে হবে এই বুঝি ভস্ম হয়ে গেলাম |

আরও পড়ুন:  বাঃ! তাজপুর

রাত হয়ে আসছে – হোটেলে ফিরতে হবে, মনে পড়ল গঙ্গাজল নিয়ে যাবার কথা – তার জন্য  বিভিন্ন সাইজের জেরিক্যান ঢেলে বিক্রি হচ্ছে |

হর-কি-পৌরি

ছোট একটা কিনে ফাঁকা হয়ে আসা ঘাটের সিঁড়িতে বসে নিচু হয়ে গঙ্গায় ডুবিয়ে জল ভরলাম – ছলাত করে কিছুটা জল গোড়ালি অবধি ভিজিয়ে দিয়ে চলে গেল – কেন জানিনা সারা শরীর শিরশির করে উঠল – বিশাল উঁচু ফ্লাড লাইটের চড়া আলোর মধ্যেও জায়গাটাকে মনে হলো বড় আরামের, বড় তৃপ্তির | তবু কাল সকালে বেরিয়ে পড়তে হবে – যাব আরেক হিল স্টেশন – ‘মুসৌরি’ – অর্থাৎ আরো ছবি আরো লেখা – পরের বার |

 

প্রথম পর্বের লিঙ্ক – http://banglalive.com/kumaon-to-garwal-himalayas-the-picturesque-travel/

- Might Interest You

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ