বিশ্বদীপ দে
পেশা সাংবাদিকতা। পাশাপাশি নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করেন। আকাশবাণী কলকাতার আমন্ত্রিত গল্পকার। প্রথম সারির বহু পত্রপত্রিকায় ছোটগল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

বিসিসিআই বনাম আইসিসি। একেবারে ‘হাল্লা চলেছে যুদ্ধে’ মুড।

আর কদিন পরেই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। কিন্তু বাইশ গজে কোনও বল গড়ানোর আগেই লড়াই শুরু হয়ে গেছে জমজমাট। সে লড়াই কোহলি-রুট-ওয়ার্নার-ডিভিলিয়ার্সদের শিরোপা দখলের নয়। সে লড়াই বিসিসিআইয়ের সঙ্গে আইসিসির। শশাঙ্ক মনোহর, যিনি বছরখানেক আগেও ছিলেন বিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট, সেই তিনিই এখন আইসিসির চেয়ারম্যান হিসেবে বিসিসিআই তথা ভারতের ‘দাদাগিরি’ ভাঙতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ!   

প্রাক্তন আইসিসি চেয়ারম্যান এন শ্রীনিবাসনের তৈরি করা ‘বিগ থ্রি’ মডেলকে ভেঙে ফর্দাফাঁই করে ফেলা হয়েছে এরই মধ্যে। ২০১৪ সালে ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডকে সবথেকে বেশি লভ্যাংশ দেওয়ার যে নিয়ম চালু হয়েছিল গত ফেব্রুয়ারি মাসেই সেই নিয়ম ভেঙে নতুন নিয়মের খসড়া বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। এবার তাতে পাকাপাকি সিলমোহর পড়ল। এবার প্রতিটি দেশই সমান লভ্যাংশ পাবে। সবচেয়ে বড় কথা, অন্যান্য দেশের সঙ্গে গলা মিলিয়েছে বিগ থ্রি-র অপর দুই দেশ অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডও!     

ফেব্রুয়ারি মাসে যখন প্রথম খসড়া তৈরি হয়, তখন থেকেই এর তীব্র বিরোধিতা শুরু করেছিল বিসিসিআই। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি যত হাতের বাইরে গেছে, তত গোঁসা বেড়েছে তাদের। এমনকী চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির দল ঘোষণা না করে পালটা চাপ তৈরি করে যাচ্ছিল তারা। নির্ধারিত ২৫ এপ্রিলের মধ্যে সব দেশ যখন তাদের স্কোয়াড ঘোষণা করে দিয়েছিল তখন একমাত্র বিসিসিআই-ই দল ঘোষণা করেনি। সোজা কথায়, যুদ্ধের বার্তা ছিল স্পষ্ট। টুর্নামেন্টে না খেলার ঘন মেঘও ঘনিয়ে উঠেছিল ক্রিকেটের বাইশ গজে।

যদিও শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচিত কমিটির (সিওএ) হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি বদলেছে। বিসিসিআইকে একটি চিঠিতে তারা কড়া সুরে নির্দেশ দেয়, যত দ্রুত সম্ভব চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির দল ঘোষণা করতে। বাধ্য ছাত্রের মতো সেই নির্দেশ মেনে নিয়েছে বিসিসিআই। ঘোষণা করেছে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ভারতীয় স্কোয়াড। কিন্তু আইসিসির সঙ্গে তাদের লড়াই? তা কি আদৌ থামবে? প্রশ্নটা উঠে পড়েছে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি কাদের হাতে উঠবে সেই প্রশ্নের পাশাপাশি এদিকেও কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে ক্রীড়ামোদী মহল।

আরও পড়ুন:  পড়াশোনা ফ্রি স্কুলে, মাত্র ২৩ বছর বয়সেই অধ্যাপক হয়েছিলেন এই বিস্ময় প্রতিভা !

শশাঙ্ক মনোহর অবশ্য আইসিসি চেয়ারম্যানের পদ ছাড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু মূলত সিঙ্গাপুর ক্রিকেটের প্রধান ইমরান খোয়াজার হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত থেকে যেতে রাজি হন মনোহর। অ্যাসোসিয়েট দেশগুলির প্রধান ইমরান আসলে বুঝতে পেরেছেন বিসিসিআইয়ের মৌরসি পাট্টা ভাঙতে দুঁদে আইনজীবী মনোহরই সঠিক ব্যক্তি। আর মনোহর নতুন করে ফিরতেই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত রূপ পায় বিগ থ্রি-র ধ্বংসপ্রাপ্তি। ফলে ৫৭০ মিলিয়নের জায়গায় ২৯৩ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসতে চলেছে ২০১৫-২৩ সময়কালে বিসিসআইয়ের লভ্যাংশের পরিমাণ।

যাক, এসব অঙ্কের কচকচি থাক। সোজা কথায় শ্রীনির আমলে যেভাবে ফুলেফেঁপে উঠতে শুরু করেছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কোষাগার, সেই জোয়ারে এবার ভাটার টান। আর সেই জায়গাতেই উঠতে শুরু করেছে প্রশ্ন। সত্যিই কি সমান লভ্যাংশের নিয়মের বিরুদ্ধাচরণ করে অন্যায় করল ভারত? আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, আইসিসির সদস্য অন্য দেশগুলিরও সমান টাকা পাওয়ার দাবি মেনে নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তই নিল আইসিসি। কিন্তু উলটো একটা মতও শোনা যাচ্ছে। সেই মতে আবার অবতারণা করা হয়েছে একদম অন্যরকম একটা যুক্তির।

বলা হচ্ছে, ক্রিকেট আর এখন শুধুমাত্র একটা খেলা নয়। জেন্টলম্যান আর পেশাদারের ভাগ উঠে গেছে বহুদিন। ধীরে ধীরে নিষ্ঠুর পেশাদার একটা ইন্ডাস্ট্রি হয়ে উঠেছে ক্রিকেট। যার তুমুল ব্যবসায়িক দিককে অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। আর সেই ব্যবসার সিংহভাগই আসে ভারতের থেকে। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে, অ্যাসেজের থেকেও মাঠ বেশি ভরছে অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারত খেলতে গেলে। আইপিএল খেলতে প্রবল গরমের দুটো মাস ধরে এখানে পড়ে থাকছেন পৃথিবীর সেরা খেলোয়াড়েরা। কারণ একটাই। খেলে পাওয়া যাচ্ছে তুমুল অর্থ! দেখাদেখি অন্য দেশেও চালু হয়ে গেছে রংচঙে টি২০ ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ। কিন্তু তারা আইপিএলের কাছে গোহারা হেরেছে। ক্রিকেট ছেড়ে দিন, পৃথিবীর সমস্ত ক্রীড়া লিগের মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে এখন আইপিএল। টিআরপি পড়ে যাচ্ছে-টাচ্ছে বলে কথা রটছে বটে। কিন্তু ঘটনা হল, আইপিএলের সমর্থকেরা এ রাজ্যের পুরোনো এক রাজনৈতিক স্লোগানকে সামান্য বদলে মুচকি হেসে বলছেন, ‘হতে পারে আইপিএলের বাজার পড়েছে আগের থেকে। কিন্তু আইপিএলের বিকল্প হতে পারে একমাত্র উন্নততর আইপিএলই।’ অর্থাৎ টুর্নামেন্টের নানারকম বদল ঘটানো যেতে পারে, একে আরও জনপ্রিয় করে তুলতে। কিন্তু দীর্ঘ দশ বছরে আইপিএল যা ব্যবসা দিয়েছে তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। সোপ অপেরার মতোই আইপিএলও অমোঘ হয়ে পড়েছে ড্রয়িংরুমে।

আরও পড়ুন:  কিমা পোলাও

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাজারেও ভারতের একই রকম দৌরাত্ম্য। অনেকেরই মনে থাকবে, ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারত আগেভাগে বিদায় নেওয়ার পরে টুর্নামেন্টটাই কেমন যেন জোলো হয়ে গিয়েছিল! আসলে ভারত থাকা মানেই জমকালো একটা ব্যাপার। আর তার হাত ধরেই গ্যালারির টইটম্বুর হয়ে ওঠা। টিআরপি চড়চড় করে উঠতে থাকা। যার ফলে আইসিসির ভাঁড়ারও ভরে ওঠা। কাজেই ক্রিকেট-ব্যবসার কেন্দ্রে যে ভারত, তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। সেই হিসেবে তারা যদি বাড়তি মুনাফা চায় তাতে ক্ষতি কী? তবে এমনিতেও আইসিসির হিসেব অনুযায়ী। ভারত অন্য দেশের থেকে সব মিলিয়ে সবথেকে বেশি লভ্যাংশই পাবে। কিন্তু সেটা তাদের চাহিদার চেয়ে অনেকটাই কম। উলটো মতের সমর্থকরা সেটা নিয়েই ঠোঁট ফোলাচ্ছেন।

যাই হোক, আপাতত লড়াইয়ের ময়দান জমজমাট। ১ জুন পরদা উঠবে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির। শেষ পর্যন্ত কে ট্রফি হাতে দাঁড়াবেন ক্যামেরার সামনে, তা জানা যাবে টুর্নামেন্ট শেষ হলেই। কিন্তু বিসিসিআই বনাম আইসিসির এই লড়াই আপাতত চলতে থাকবে। নতুন কোন কোন অধ্যায় দেখতে পাওয়া যায়, লড়াই কোনদিকে গড়ায়, সেদিকেও চোখ থাকবে ক্রিকেটপ্রেমীদের। বাইশ গজের বাইরের সে লড়াইও যে কম চিত্তাকর্ষক নয়।   

- Might Interest You

NO COMMENTS