এই কিস্তিতে ভেবেছিলাম ঋষি পরাশরকে নিয়ে লিখব | কিন্তু পরিকল্পনা পাল্টাল এক বিজ্ঞাপনে | সাধক বামাখ্যাপার তিরোভাবতিথি উপলক্ষে বীরভূমে উৎসব | তারাপীঠ ভ্রমণের ডাক দিয়েছে ভ্রমণ সংস্থা | দেখে মনে এল‚ এই সাধককে নিয়ে লিখলে কেমন হয় ? এই রবিবার তাঁর তিরোধানতিথি |

শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের থেকে এক বছরের ছোট ছিলেন | তাঁর জন্ম ১৮৩৭ সালে‚ বীরভূমের তারাপুর বা তারাপীঠের আটুলা গ্রামে | পিতৃদত্ত নাম ছিল বামাচরণ | বাবা সর্বানন্দ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ধর্ম প্রাণ ব্রাহ্মণ | ধর্মীয় গান গেয়ে রোজগার করতেন |

একবার গান গাইতে বসলে সব ইহজ্ঞান লুপ্ত হতেন তিনি | কোনও খেয়ালই থাকত না কোনওদিকে | গানের মাঝেই ভাবসমাধিতে লুটিয়ে পড়তেন | এভাবে চললে আর যা-ই হতো‚ সংসারে কিছুমাত্র সুরাহা হতো না |

বাবার মতো শিশু বামারও ধর্মে খুব মতি | ওইটুকু শিশু‚ সেও লুটিয়ে পড়ে গড়াগড়ি খায় | পড়াশোনায় মন নেই | পাঠশালামুখো হতো না | ভালবাসত বাবার সঙ্গে ঘুরতে |

অভাবের সংসারকে আরও দিশেহারা করে মৃত্যুকোলে ঢলে পড়লেন সর্বানন্দ | সংসারে বামা ছাড়াও বাল্যবিধবা মেয়ে | ছেলেকে বারবার ঠেলে পাঠান মা‚ দুটো পয়সা উপার্জনে | কিন্তু ভবী ভোলবার নয় | কিশোর বামা পড়ে থাকেন তারাপীঠ মন্দিরে আর শ্মশানে | মুখে একটাই বুলি‚  জয় তারা !’ 

এই সময়ে গ্রামে এলেন ব্রজবাসী কৈলাসপতি | কুলীন ব্রাহ্মণ সমাজে তাঁর স্থান নেই | তিনি তান্ত্রিক পিশাচসিদ্ধ | বামা তাঁর শিষ্যত্ব নিলেন | বেগতিক দেখে ছেলেকে বন্দি করে রাখেন বামার মা | কিন্তু যে করেই হোক‚ তিনি পালান | ছুটে যান গুরুর কাছে বা মন্দিরে | মন্দিরের তারা মাকে ডাকেন বড় মা | নিজের জন্মদাত্রীকে ছোট মা |

পাগল সাধক একদিন তারাপীঠ মন্দিরের পুজারী হলেন | কিন্তু তাঁকে নিয়ে সমস্যার শেষ নেই | পুজোর সময় মানেন না কোনও নিয়ম কানুন বা মন্ত্র তন্ত্র | কখনও মাকে ভক্তি করছেন | কখনও বা মা তারাকে চোদ্দ গুষ্টি তুলে গালি দিচ্ছেন | তাঁর পুজোর সময় চারধারে ভিড় জমত দর্শকদের | সবাই দেখত পুজারীর বামুনের খেয়ালীপনা |

এটা ভালভাবে নিল না ব্রাহ্মণ সমাজ | এদিকে হামেশাই মায়ের নৈবেদ্য বা প্রসাদ আগে খেয়ে নিতেন সাধক বামা | তারউপর শ্মশানে বসে অজাত কুজাত সবার সঙ্গে সারতেন খাওয়া দাওয়া | একদিন এই অনাচার বন্ধ করতে তাঁকে বেদম প্রহার করলেন ব্রাহ্মণরা |

সে রাতে স্বপ্ন পেলেন নাটোরের রানি | মন্দির ছেড়ে চলে যাচ্ছেন মা কালী | বলছেন‚ তাঁর ছেলেকে খেতে দেয়নি কেউ | বদলে মেরেছে সবাই | তাই দেবী নিজেও অভুক্ত | তাঁর সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত | কারণ ছেলের প্রহার ধারণ করেছেন নিজ অঙ্গে |

রানিমা এরপর জানতে পারলেন কী হয়েছে | তাঁর নির্দেশে বামা আবার বহাল হলেন পুজারীর কাজে | ততদিনে আর সাধক নন | তিনি বামাখ্যাপা |

পুজোয় কোনও নিয়ম মানতেন না | সংস্কৃতর বদলে বলতেন নিজের মতো বাংলা মন্ত্র | প্রসাদ আগে নিজে খেয়ে উচ্ছিষ্ট ছুড়ে দিতেন কালী বিগ্রহের দিকে | বলতেন‚ মা কখনও সন্তানকে ফেলে আগে খান ? সন্তানের দুষ্টুমিতে রেগে যান ? তাই তো তিনি আগেই প্রসাদ খেয়ে নেন |

চন্দনের বদলে নাকি নিজের চোখের জলে ফুল মাখিয়ে নিতেন বামাখ্যাপা | তারপর তা ছুড়ে দিতেন বিগ্রহের দিকে | আশ্চর্য ! ফুলগুলো নাকি ঠিক মালার আকারে সজ্জিত হতো দেবীর গলায় |

সাধনমগ্ন বামা সারাদিন থাকতেন ভাবসমাধিতে বা ঘোরের মধ্যে | একবার তাঁর সততা পরীক্ষা করতে এক গ্রামবাসী গোপনে এক যৌনকর্মীকে পাঠিয়েছিল তাঁর কাছে | সেই রমণীকে দেখে বামা বলেছিলেন‚ মা‚ তুমি এসেছো ! বলে তাঁর স্তনদুগ্ধ পান করতে উদ্যত হলেন | এতটাই ছিল তাঁর অভিঘাত‚ রমণীর বক্ষ থেকে রক্তপাত হতে লাগল | সে ভয়ে চিৎকার করে উঠল | সব জানাজানি হয়ে যাওয়াতে তিরস্কৃত হল সেই খল গ্রামবাসীই |

মাঝে মাঝে তিনি নিজের প্রস্রাব নিয়ে ছুড়ে দিতেন বিগ্রহের গায়ে | সবাই হায় হায় করলে বলতেন‚ শিশু তো মায়ের গায়ে প্রস্রাব করেই | মা কি তাতে কুপিত হন ? মায়ের কাছে ওটাই তখন গঙ্গাজল |

তন্ত্রসাধনাকে অন্য মার্গে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি | তন্ত্রের জটিল দিকের সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছিল সরল ভক্তিযোগ | শোনা যায়‚ অঘোরী সাধুদের মতো মৃতদেহের উপর বসে ধ্যান বা মৃতদেহ থেকে মাংস ভক্ষণ‚ সবই করতেন তিনি | কিন্তু তাতে শিষ্য সংখ্যা ঘাটতি হয়নি | শিষ্যদের যেমন স্নেহ করতেন‚ তেমনি কঠোর ছিলেন | ভণ্ডামি সহ্য করতে পারতেন না | ভাব আর ভক্তিকে এক বিন্দুতে এনে মিলিয়েছিলেন |

দুই সমসাময়িক শাক্ত সাধক শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ও বামাখ্যাপার মধ্যে মিল ও অমিল‚ দুইই প্রচুর | দুজনকেই বলা যায় বঙ্গে শাক্ত সাধনার দুই স্তম্ভ |

ইহজীবনের শেষ দিকে বামাখ্যাপা কথা প্রায় বলতেনই না | যখন বলতেন‚ হয় মৃত্যু নিয়ে বলতেন | বা গালিগালাজ করতেন তারা মাকে | কিংবা তারা মায়ের জন্য কেঁদে ভাসাতেন | এই মহান সাধকের মৃত্যু হয় ১৯১১ সালের আষাঢ় মাসে |

আরও পড়ুন:  ১০ টি এমন বিষয় যা অনেকেরই অজানা কিন্তু জানলে গর্বিত হবেন যে কোনও দেশপ্রেমী
Sponsored
loading...

1 COMMENT

  1. এই খবর সত্যি কিনা জানিনা….বামদেবের নিকট আত্মীয়ার বিবাহ হয়েছিল বাঁকুড়া জেলার জয়পুর থানার গেলিয়া পঞ্চায়েত এলাকায়।