অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

সম্প্রতি, মোবাইল টাওয়ার এবং তার বিকিরণ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়গুলিকে নিয়ে চারপাশে বেশ একটা চাপা উৎকণ্ঠার পরিবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত ৪ঠা এপ্রিল, ২০১৭ তারিখে মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে রায় দিয়েছেন যে, গোয়ালিয়র-নিবাসী জনৈক শ্রী হরিশচন্দ্র তিওয়ারির বাসভবনের নিকটস্থ মোবাইল টাওয়ারটিকে অবিলম্বে স্থানান্তরিত করতে হবে। মামলাকারীর বক্তব্য ছিল যে, উক্ত টাওয়ারটির থেকে নিঃসৃত বিকিরণের কারণেই তিনি হজকিন’স লিম্ফোমা নামক একটি বিরল ও দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

বর্তমানে সিমলেস-কানেকটিভিটির দুনিয়ায় বিভিন্ন টেলি-যোগাযোগ ব্যবস্থাগুলির মধ্যে মোবাইল-প্রযুক্তির ব্যবহারই সবচাইতে বেশি। আমাদের দেশে এই মুহূর্তে মোবাইল-গ্রাহকের সংখ্যা ১০০কোটি ছাড়িয়েছে এবং এর সঙ্গে-সঙ্গেই সমগ্র দেশে কাজ করে চলা মোবাইল টাওয়ারের সংখ্যাও ৫লক্ষেরও বেশি বলে জানা গিয়েছে। পরিষেবা-প্রদানকারী বিভিন্ন সংস্থাও, ক্রমেই এই বিপুল বাজারকে ধরবার নিমিত্তে নানা সুযোগ-সুবিধার কথা বলে ক্রেতাদেরকে প্রলুব্ধ করছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা যে ঠিক কতখানি ওই মুঠোফোনটির প্রতি নির্ভরশীল তা নিশ্চয়ই আর নতুন করে বলবার অপেক্ষা রাখে না। এমন একটি নিত্য-ব্যবহার্য্য প্রযুক্তি – সত্যি-সত্যিই জনস্বাস্থ্যের উপরে কোনো স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিস্তার করছে কিনা, সে বিষয়ে এখন আলোচনার অবকাশ রয়েছে।

এই প্রসঙ্গে বিকিরণ বিষয়টিকে সহজ দু-চার কথায় জেনে নেওয়া প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, বিকিরণ বললেই মানুষজন তেজস্ক্রিয় বিকিরণ সম্পর্কে ভেবে বসেন। মোবাইল টাওয়ার-জনিত বিকিরণের সঙ্গে তেজস্ক্রিয়তার সম্পর্ক টানাটা একেবারেই অনুচিত হবে। যখন আমরা ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন বা যোগাযোগের কথা বলি, তখন আসলে আমরা – আমাদের বার্তাসমূহকে অতি উচ্চ কম্পাংকের কিছু তরঙ্গের মাধ্যমে অন্যত্র পাঠাবার চেষ্টা করে থাকি। এ সমস্ত তরঙ্গগুলি কোনে মাধ্যম-ব্যতীতই আমাদের বার্তাকে দূরে নিয়ে যেতে সক্ষম। এই উচ্চ কম্পাংকের তরঙ্গ-প্রবাহকেই আমরা বিকিরণ বলে চিহ্নিত করে থাকি – এবং যে বিষয়টিকে এবারে বলা প্রয়োজন সেটি হলো, যে কোনো সজীব কোষেই এই বিকিরণ শোষিত হয়ে থাকে। বস্তু-বিশেষে কেবল তার মাত্রার ব্যতিক্রম ঘটে।

আরও পড়ুন:  শারদ-সন্ধ্যায় হয়ে উঠুন কাজলনয়না হরিণী

মোবাইল-প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলিতে একটি শব্দবন্ধ বহুল-ভাবে প্রচারিত। আমরা সেটিকে বলি SAR বা স্পেসিফিক এ্যাবসর্পশন রেট। কোনো বস্তু প্রতি একক ভরে মোট কত পরিমাণ বিকিরণ শোষণ করছে তার পরিমাণ-নির্দেশক হিসেবে এই পরিমাপটিকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। দুঃখের বিষয় হলো পৃথিবীর অন্যান্য বহু দেশেই মোবাইল-প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির উপরে SAR-বিষয়ক কড়া-নির্দেশিকা জারি থাকলেও আমাদের দেশে সেইরূপ কোনও নির্দেশিকা এখনও অবধি নেই, এমনকি ক্রেতামহলেও এ সম্পর্কে প্রচারে ঘাটতি রয়েছে।

যেহেতু মোবাইল-টাওয়ার বিকিরণের কুফল সংক্রান্ত যে সমস্ত গবেষণা এখনও অবধি সারা পৃথিবীতে হয়ে এসেছে বা হয়ে চলেছে – তার প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটিগুলি সবসময় সাধারণের নাগালে আসেনা – সেই কারণে, কিছু সাধারণ তথ্যের মাধ্যমে এ-বিষয়ের কয়েকটি দিককে তুলে ধরতে চেষ্টা করবো। ২০১১ সালের ৩১শে মে প্রকাশিত, বিশ্ব-স্বাস্থ্য সংস্থার শাখা সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার’ তাদের রিপোর্টে জানায় – মোবাইল-টাওয়ার বিকিরণকে সম্ভাব্য কারসিনোজেন বা ক্যান্সার-সৃষ্টিকারীরূপে চিহ্নিত করা যেতে পারে। সম্প্রতি আইআইটি বম্বের অধ্যাপক শ্রী গিরীশ কুমার তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে – ওরলী, মুম্বাইতে ঊষাকিরণ আবাসনের ষষ্ঠ থেকে দশম তল অবধি আবাসিকদের ভিতরে গত কিছু বছরে ক্যান্সার-আক্রান্তের সংখ্যা ধারাবাহিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। যার কারণ-স্বরূপ তিনি দেখিয়েছেন যে, ঊষাকিরণ আবাসনের ঠিক উলটো-দিককার আরেকটি আবাসনের মাথায় বসানো মোবাইল-টাওয়ারের মোট বিকিরণের সিংহভাগটুকুই নির্দিষ্ট-ভাবে পূর্বোক্ত আবাসনের ষষ্ঠ থেকে দশম তলকেই প্রভাবিত করে চলেছে। বিপদটাকে বোধহয় সত্যিই একেবারে উড়িয়ে দেওয়াটা অনুচিত হবে।

ক্যান্সার হয়তো একেবারে একটি প্রাণঘাতী প্রভাব হয়ে দাঁড়ালো – কিন্তু কপালজোরে ক্যান্সার থেকে বাঁচলেও, দৈনন্দিন জীবনেই মোবাইল-টাওয়ার নিঃসৃত বিকিরণের একাধিক স্বল্পমেয়াদী অথচ যথেষ্টই ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা সতর্ক হতে বলছেন। বিজ্ঞানীদের বক্তব্য অনুসারে, মোবাইল-টাওয়ার বিকিরণের প্রভাবে – ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে, বিস্মৃতি দেখা দিতে পারে, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন থেকে স্নায়বিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। ১৯৯৫ এবং ২০০৫ সালের দুটি গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে – এক্সরশ্মির প্রভাবে কেমন করে মানব ডিএনএ-গুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, একই প্রভাব মোবাইল-টাওয়ার নিঃসৃত উচ্চ কম্পাংকের তরঙ্গ-সমূহের ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে মানব-শরীরে অত্যন্ত ক্ষতিকারক প্রভাব দেখা দিতে পারে। সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত একটি সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অধ্যাপক গিরীশ কুমার দেখিয়েছেন যে, অস্ট্রিয়ার সালজবার্গ এবং জার্মানীর একটি শহরে – দুইটি পৃথক মোবাইল-টাওয়ার বসানোর কারণে পাশ্বর্স্থ এলাকায় ক্যান্সার-প্রবণতা ৮ থেকে ১০ গুণ অবধি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই ধরণের পরিসংখ্যান পাওয়া গিয়েছে ব্রাজিল এবং মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলির থেকেও।

আরও পড়ুন:  যেখানে ঠাকুরদালানে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানায় 'হাবসি ক্রীতদাস এবং ক্রীতদাসী '

এ তো গেলো মানবশরীরের উপর মোবাইল বিকিরণের প্রভাব। আমাদের চারপাশের আর যে সমস্ত সজীব বস্তুদের অস্তিত্ব দেখা যায়, তাদের – অর্থাৎ কিনা পশু, পাখি, কীট-পতঙ্গ এমনকি উদ্ভিদের উপরেও এই বিকিরণের প্রভাব নিয়ে গবেষণার কাজ চলছে। দীর্ঘসময়ের বিভিন্ন গবেষণাতেই এটি উঠে এসেছে যে, মোবাইল-টাওয়ারের নিকটবর্তী এলাকায় ছোট পাখি ও মৌমাছিদের সংখ্যা দিনে দিনে হ্রাস পেয়ে আসে। তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এমনকি প্রজনন-ক্ষমতায়ও এর প্রভাব পড়ে। অধ্যাপক কুমার তাঁর বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন যে, গুরগাঁও-দিল্লি হাইওয়ের উপরে একটি খামারবাড়িতে ফলবতী উদ্ভিদের প্রজনন-ক্ষমতা গত কয়েক বছরে লক্ষ্যণীয় ভাবেই কমে এসেছে। এর কারণ-স্বরূপ উক্ত খামারের নিকটবর্তী বেশ কয়েকটি সুউচ্চ মোবাইল-টাওয়ারের উপস্থিতিকেই তিনি সন্দেহ করতে চেয়েছেন।

দেশের টেলিকম-মন্ত্রক অবশ্য এসমস্ত বিষয়কে গুরুত্ব দিতে নারাজ, উলটে তাঁরা এসমস্ত কিছুকেই আতংক ছড়ানোর চেষ্টা হিসাবে দেখাতে উৎসাহী। শেষ তথ্য হিসেবে তাই বলতে পারি, নভেম্বর, ২০১১ সালের ভারত-সরকারের পরিবেশ-মন্ত্রকের রিপোর্ট অনুযায়ী – পশু-পাখি, কীটপতঙ্গ এবং উদ্ভিদের উপরে মোবাইল বিকিরণের প্রভাব খতিয়ে দেখতে সেই সময় অবধি মোট ৯১৯টি সমীক্ষা চালানো হয়। সেগুলির মধ্যে ১৯৬টি সমীক্ষায় সুনিশ্চিত কোনো বক্তব্য উঠে আসতে পারেনি। ১৩০টি সমীক্ষা দাবি করতে চেয়েছে যে বাস্তুতন্ত্রের উপরে মোবাইল বিকিরণের কোনো ক্ষতিকারক প্রভাব নেই। অথচ ৫৯৩টি সমীক্ষাতেই সরাসরি বাস্তুতন্ত্রের উপরে মোবাইল বিকিরণের ক্ষতিকারক প্রভাবের কথা উল্লিখিত হয়েছে।

যে প্রযুক্তি আমাদের এতখানি কাছের ও প্রয়োজনের – সেই প্রযুক্তির সম্পর্কে যখন এতখানি সন্দেহের অবকাশ রয়ে যায়, তখন অন্যান্য দেশগুলির মতই বোধহয় বিষয়টিকে যথাযোগ্য গুরুত্বের জায়গাতে রেখেই অনুসন্ধান চালানো উচিত। প্রযুক্তির একদিককার আশীর্বাদ, অন্যদিক দিয়ে যেন অভিশাপ-রূপে না দেখা দেয় – সেদিকটায় আমাদের লক্ষ্য রাখাটা একান্ত ভাবেই আজ দরকার বোধ হচ্ছে।

NO COMMENTS