না, গল্পটা যার কাছ থেকে শুনেছিলাম তার নাম বলা যাবে না। সেই শর্তেই তিনি বলেছিলেন গল্পটা।

                একবার সুন্দরবন বেড়াতে গেছেন ভদ্রলোক। নৌকো করে নদীতে ঘুরছিলেন। নদীর স্বচ্ছ জল দেখে ভারী লোভ হল; একটু ঝুঁকে হাত দিতে গেলেন জলে। সঙ্গে সঙ্গে মাঝির সতর্কবার্তা-হাত দেবেন না বাবু, এই নদীতে প্রচুর কামট (কুমির), হাত কেটে নেবে। ভদ্রলোক একটু অবাক হয়ে গেলেন; কারণ অদূরেই নদীর জলে স্নান করছিল একজন। সেই দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ভদ্রলোক বললেন, কিন্তু ওই যে লোকটা, জলে নেমে চান করছে, কুমির ওকে কিছু করছে না!

                দাঁড় টানতে টানতে মাঝি বলেছিল, বাবু ও লোকটা উকিল যে!

                ঘটনাটা বলে ভদ্রলোক আমাকে কালীর দিব্যি-টিব্যি করিয়ে নিয়েছিলেন। নাম প্রকাশ করা যাবে না। বলা যায় না, কোনও উকিল হয়তো মানহানির মামলাই ঠুকে দিলেন।

                সত্যি উকিল সম্পর্কে বলতে গেলে আতঙ্কই লাগে। বাঘে ছুঁলে নাকি আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা, আর উকিলে ছুঁলে ছ’শো ছত্রিশ ঘা।

                তবু উকিলের কাছে যেতে হয় আমাদের। চর্মরোগে যেমন ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। কর্মফলে তেমনই যেতে হয় উকিলের কাছে। চরমরোগের কথা এই জন্যেই বললাম যে, চর্মরোগ আর মোকদ্দমার মধ্যে এক আশ্চর্য মিল আছে। প্রথমটা সারে না, আর দ্বিতীয়টা মেটে না। মামলা একবার শুরু হলে চলতে থাকে, চলতেই থাকে; যাকে বলে নেভার এন্ডিং; এবং মামলায় শেষ পর্যন্ত বাদী বিবাদী কোন পক্ষই জেতে না, জেতে উকিল।

                বহুদিন আগে এক কার্টুনিস্টের আঁকা ছবি দেখেছিলাম। পাশাপাশি দুটো ছবি। প্রথম ছবিতে দেখা যাচ্ছে শুধুমাত্র অন্তর্বাস পরে দুই ব্যক্তি মল্লযুদ্ধে রত। বাদী ও বিবাদী। পাশে খুলে রাখা জামা প্যান্ট কোট ঘড়ি চশমা ইত্যাদি। দ্বিতীয় ছবিতে দেখা যাচ্ছে কালো কোট পরা দুজন তাদের ছেড়ে রাখা জিনিস পত্র নিয়ে চম্পট দিচ্ছে। এই দুজনের পেশা কী বলে দিতে হবে না নিশ্চয়ই।

                এখন প্রশ্ন হচ্ছে মামলার নিস্পত্তি হয় না কেন? নানা কারণ আছে। কোর্টের লম্বা ছুটি, বিচারকের অনুপস্থিতি কিংবা বদলি; আর সবচাইতে ভয়াবহ হল, জজসাহেবের কাছ থেকে উকিলের দিন চাওয়া। উকিলি ভাষায় যাকে বলে ‘ডেট নেওয়া’। এই ডেট নেওয়া যে কী জিনিস, চক্করে না পড়লে বোঝা যায় না। উকিল ডেট নেয়, এতে নাকি বিপক্ষকে মোক্ষম প্যাঁচে ফেলা যায়। একটা মামলার কথা বলি। এক গ্রাম্য সরলসাদা মানুষ একবার মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই দ্বারস্থ হয়েছিলেন জনৈক উকিলের। মামলার কাগজপত্র দেখে উকিলবাবু অভয় দিলেন, কোনও চিন্তা নেই, আপনিই জিতবেন। এখানে একটা কথা বলা দরকার উকিলেরা সবসময়ই ভীষণ রকম আশাবাদী হয় এবং সেই আশাবাদ তারা সঞ্চারিত করার চেষ্টা করে মক্কেলের মধ্যে।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ৫)

                যাই হোক, মামলা শুরু হল। নিরক্ষর সেই মানুষটি দিন পড়লে কোর্টে হাজির হন; দুই উকিলের বাকযুদ্ধ শোনেন, যার বেশিরভাগটাই তার হিব্রু বা জার্মান ভাষার মতো মনে হয়-মগজে ঢোকে না। শেষে উকিলকে ফি দিতে হয়; দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, আজ্ঞে উকিলবাবু, আজ তাহলে কী হল?

                উকিল খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে, আজ ওকে দু’শো তিনের ‘ক’ ধারায় চেপে ধরেছিলাম; একেবারে ল্যাজে গোবরে করে দিয়েছি। কোনওদিন বলেন, আজ তিনশো দুই-এর ‘চ’ ধারা দিয়েছি; কোনওদিন বলেন, আজ সাতশো চার-এর ‘ঝ’ ধারা দিয়েছি; দেখলেন না ব্যাটা কেমন মিউমিউ করছিল!

                এইভাবে দিনের পর দিন যায়; সেই ব্যক্তি আদালতে আসেন, উকিলকে পয়সা গুণে দেন, আর একটার পর একটা ধারার কথা শোনেন।

                এই মামলাটা একটু ব্যতিক্রমী মামলা ছিল। ব্যতিক্রমী এই অর্থে যে মামলাটার নিস্পত্তি হল শেষ পর্যন্ত। রায় বেরল মামলার। বহু বহু বছর পর বেরল সেই রায়। সেই ব্যক্তি তখন বৃদ্ধ এবং সঙ্গত কারণেই সর্বস্বান্ত। তাঁর উকিলও বৃদ্ধ এবং অর্থের নিত্যতা সূত্র অনুযায়ী বেশ পুষ্ট। আর, ব্যাপার হল, মামলায় হার হল সেই ব্যক্তির। জজসাহেব যখন রায় পড়ে শোনালেন, সেই সরল নিরক্ষর মানুষটি বুঝতে পারলেন না কিছু। কিন্তু একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলেন, রায় শুনে অপর পক্ষ যেন বেশ উৎফুল্ল। যাই হোক, এজলাস থেকে বেরিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আজ্ঞে উকিলবাবু, আজ তাহলে কোন ধারা হল?

                উকিল বললেন, বলছি, আগে আমার ফিজটা মিটিয়ে দিন।

                ফিজ মিটিয়ে দিলেন সেই সরল মানুষটি। আঙুলে থুতু লাগিয়ে টাকা গুণতে গুণতে উকিল বললেন, আজ হল গিয়ে আপনার অশ্রুধারা। শুধুই অশ্রুধারা।

                উকিলরা নাকি কোন ফি-ই ছাড়ে না। মক্কেলের জেল জরিমানা যাই হোক না কেন, উকিলের ফি মিটিয়ে দিতে হবে। এমনকী এমনও শোনা গেছে, মক্কেলের ফাঁসীর হুকুম হয়েছে; উকিল বলছে, আপনি তো ঝুলে পড়বেন; আমার ফি-টা যেন ঝুলিয়ে রাখবেন না, ঝুলে পড়ার আগে মিটিয়ে দেবেন কিন্তু।

আরও পড়ুন:  প্রসেনজিৎ আমার সঙ্গে প্রচুর পলিটিক্স করেছেন : অভিষেক চ্যাটার্জী

                তবে বুনো ওল আর বাঘা তেতুলের মতো ঝানু মক্কেলও আছে। যারা উকিলকেও প্যাঁচে ফেলে দেয়। তেমনই এক ঘোড়েল মক্কেলের গল্প বলেছেন সুকুমার রায়। ‘ব্যা’ করে পাঁঠার ডাক ডেকে সে নিজে খালাস তো পেয়েইছিল, শেষ পর্যন্ত ওই ‘ব্যা’ ‘ব্যা’-ডেকেই নিজের উকিলেরও ফি-মেরে দিয়েছিল।

                কোনও কোনও মক্কেল আছে, যারা নিজেই এক একজন আইন-বিশারদ। জীবনে বহু কেসে বাদী বা বিবাদী হয়ে আইন কানুনের ঘাঁত ঘোঁত সব জেনে গেছে। উকিল খুব সহজে তাদের মাথায় টুপি পড়াতে পারে না। সময়ে সময়ে নিজের উকিলকে তারা বুদ্ধিও জোগায়। আপনি এই এই পয়েন্টটার উপর জোর দেবেন; কিংবা ওই পক্ষকে এই জায়গাটায় চেপে ধরবেন-এইসব বলে উকিলের কাজে সাহায্য করে। তাদের বিচার বুদ্ধি দেখে উকিলরাও চমকিত হন।

                এইরকম এক মক্কেলের কথা বলি। সে অবশ্য নিজের উকিলকে নয়, চমকে দিয়েছিল অন্যপক্ষের উকিলকে। চুরির অভিযোগে ধরা হয়েছিল তাকে। বিপক্ষ উকিল আদালতে জোর সওয়াল করছিলেন-হুঁজুর, এই লোকটি যে চুরি করেছে, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই; কারণ তার কাছে চুরি করার যন্ত্রপাতি পাওয়া গেছে; এতেই প্রমাণ হয় যে চুরিটা এই করেছে।

                উকিলের বক্তব্য শেষ হতেই কাঠগড়া থেকে সেই অভিযুক্ত ব্যক্তি বলে উঠল, হুঁজুর, আমার একটা বক্তব্য আছে; মানছি আমার কাছে চুরি করার যন্ত্রপাতি পাওয়া গেছে; আর তাতেই উনি বলছেন, চুরি আমিই করেছি; তাই যদি হয় হুঁজুর, তবে তো ওনাকেও রেপ কেসে ফেলে দেওয়া যায়। যায় না কী, আপনিই বিচার করে বলুন হুঁজুর।

                হুঁজুর সেই মামলায় কী রায় দিয়েছিলেন জানা নেই।

                একটা তত্ত্ব আছে, ডাক্তার আর উকিলের কাছে কিছু গোপন করতে নেই। ডাক্তারের কাছে গোপন করলে যেমন রোগ সারে না, তেমনই উকিলের কাছে গোপন করলে মামলায় হার অনিবার্য। চুরি জোচ্চুরি ডাকাতি খুন ধর্ষণ যাই কর না কেন, নিজের উকিলের কাছে সব কবুল করতে হবে।

আরও পড়ুন:  মা ষষ্ঠীর সঙ্গে ঘটা করে জামাই-আদরের সম্পর্ক কী?

                একবার ডাকাতির অভিযোগে অভিযুক্ত এক মক্কেলের হয়ে লড়েছিলেন এক উকিল। প্রাণপণ লড়াই করে সেই উকিল তার মক্কেলকে বেকসুর খালাস করে আনলেন। কৃতজ্ঞ সেই ব্যক্তি বেরিয়ে এসে বললেন, স্যার, কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব-একদিন স্যার যাব আপনার বাড়ি।

                উকিলবাবু আতঙ্কিত গলায় বলেছিলেন, এস; তবে রাতে নয়, দিনের বেলায় এস।

                ধরে নেওয়াই যায়, সেই ব্যক্তি তার উকিলের কাছে সত্য গোপন করেননি।

                তবে উকিল যদি ধুরন্ধর হয়, ঠিক বুঝে যায় মক্কেল কোথায় সত্যি বলছে, আর কোথায় গোপন করছে। এই রকমই এক উকিলের কথা বলি। চুরি বা জালিয়াতি-এই ধরনের কোনও কাজে ফেঁসে গিয়ে এক ব্যক্তি এসেছেন উকিলের কাছে। বলছেন ঘটনার কথা। উকিলবাবু শুনছেন। মন দিয়ে শুনছেন। শুনতে শুনতে হঠাৎ থামালেন মক্কেলকে। তারপর বললেন, আহা আমাকে মিথ্যে কথা বলছেন কেন; আমি তো আপনার হয়ে কোর্টে মিথ্যে বলব; সেইজন্যেই তো আপনি আমাকে পয়সা দেবেন। আপনি আমাকে সত্যি কথাটা বলুন।

                এই উকিল মনে হয় স্বর্গে যাবেন।

 

পুনশ্চ – মামলায় জর্জরিত এক ব্যক্তির সঙ্গে রাস্তায় দেখা সেদিন । জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছেন?

                ভদ্রলোক বললেন, হুকিলের বাড়ি।

                হুকিলের বাড়ি! ভাবলাম কী জানি জিভের ক্ষণিক জড়তায় হয়তো বেরিয়ে গেছে। কিংবা শোনার ভুলও হতে পারে; আমারও তো বয়েস হচ্ছে।

                জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় বাড়ি আপনার উকিলের।

                ভদ্রলোক বললেন, আমার দুটো হুকিল। একটা হুকিলের বাড়ি উল্টোডাঙা আর একটা হুকিলের বাড়ি উলুবেড়িয়ায়।

                না, এবার আর শোনার ভুল নয়। এতবার শোনার ভুল হতে পারে না। তাই জিজ্ঞেস না করে পারলাম না-আচ্ছা দাদা, আপনি ‘হুকিল-হুকিল’ বলছেন কেন!

                বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভদ্রলোক বললেন, হুকিলই তো! হু কিল, মানে যারা মারে, ধনেপ্রাণে মারে একেবারে। আপনি তো মামলায় ফাঁসেননি, তাই জানেন না; উকিলরা আসলে সব হুকিল।

 

- Might Interest You

5 COMMENTS

  1. উল্লাস দা … আপনাকে কুর্নিশ । নেহাত পোড়া কপাল বলে বাঙালি হয়ে জন্মেছি । সাহেব হয়ে জন্মালে , টুপি খুলতাম । ‘ধারা’ – অশ্রুধারা । শব্দের এই খেলাকে সেলাম

  2. Hukil Ukil fatafati. Haste haste pet fete geche. Songe durdanto satire. Kintu ekti marattok bhul ache. Kamoth mane kumir noy, kamoth holo Salt water bull shark. mane nonabadar hangor. Sundorboney prochur porimane dekha jay nona joler nodite.

  3. জমিয়ে দিয়েছ ভায়া। যে ভয়ে ভদ্রলোক নাম বলেননি, সে ভয় যে তোমার নেই তা মালুম তোমার লেখনিতে। চালিয়ে যাও। ফাটাফাটি। জমিয়ে দিলে শব্দে শব্দে ॥

  4. ফাটাফাটি । জমিয়ে দিলে শব্দে শব্দে ।

  5. রেপকেসের যন্ত্রপাতি—- হা হা! ওইখানটা বেস্ট!