আবদেল মাননান
জন্ম : ১৯৬০, চট্টগ্রাম বাসস্থান – ধানমন্ডি | ঢাকা | কবি, নাট্যকার, গবেষক ও দার্শনিক | বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চট্টগ্রাম শহরের ঐতিহ্যবাহী সওদাগর পরিবারে জন্ম হলেও চরম অবৈষয়িক, বেপরোয়া ও আপনভোলা চরিত্রের মানুষ | সাহিত্য, গান, নাটক – লেখালেখি আর সংগঠন ঘটিয়ে তলার ঝোঁক ছোটো থেকেই | ছাত্রদশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধী শিক্ষানীতির প্রবক্তা সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে উত্তাল ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে বছরখানেক কারাবাস | প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই ‘সামনে দাঁড়া পথ রুখে’ বাজেয়াপ্ত করে তত্কালীন বাংলাদেশ সরকার | সাধক গুরু সুফি সদর উদ্দিন আহমদ চিশতী-র সংসর্গ লাভ করেন | গুরু কৃপায় প্রবেশ করেন সুফি দর্শনের নির্জন অন্দরমহলে | ফকির লালন শাহ ও বাংলা সুফি সাহিত্য বিষয়ে নিরলস গবেষণার ফলে প্রকাশিত হয় “অখণ্ড লালন সংগীত (আবদেল মাননান সম্পাদিত)”| যা দুই বাংলায় লালন সংগীতের এক মাত্র প্রামাণ্য অখণ্ড সংকলন | এছাড়াও লিখেছেন লালন দর্শন ভাব-ভাষা বিষয়ক অসংখ্য গবেষণা গ্রন্থ, কবিতার বই, গীতিনাট্য | সম্পাদনা করেন ঢাকা থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাব ও ভাষা বিষয়ক দ্বিমাসিক গবেষণা পত্রিকা “সদর দরজা” | লালন বিশ্ব সংঘের কার্যকরী সম্পাদক | দুই বাংলার অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতি ও অখণ্ড বাঙালি জাতীয়তাবোধের সোচ্চার সমর্থক | পেশা – লেখালিখি, গণ মাধ্যমে কাজ, সম্পাদনা |

ফকির লালন শাহের ১২৭ তম তিরোভাববার্ষিকীতে সভক্তি শ্রদ্ধার্ঘ্য

 

এ বছর ফকির লালন শাহের ১২৭ তম তিরোভাববর্ষ। বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে অনেক আয়োজন হয় কিন্তু লালন শাহকে নিয়ে তেমন উৎসাহ দেখা যায় না। তারপরও জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে বিশ্বমানসে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন ফকির লালন শাহ তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ মুক্তবিশ্বচিন্তার কল্যাণে। গত আড়াইশো বছর ধরে বাঙালি অল্পবিস্তর তাঁর গান গেয়ে চলেছে। অমৃত বাণীসুধা ও হৃদয়মথিত সুরতাললয়ের ঝঙ্কারে উচ্চকিত লালন শাঁই এমন এক শুদ্ধবুদ্ধসত্তা যাঁর সন্ধানে শতবর্ষ পরও পৃথিবীর নানাপ্রান্তের জ্ঞানী ও গুণীজনেরা উৎসুক হয়ে ছুটে আসেন এখানে। যদিও লালন সাধনা, ভাবনা ও গবেষণার পথ এখনও কণ্টকাকীর্ণ। সে কথা তিনি পূর্বেই জানান দিয়েছেন:

আপন ঘরে বোঝাই সোনা
পরে করে লেনাদেনা
আমি হলাম জন্মকানা  না পাই দেখিতে ॥

অখণ্ড ভারতবর্ষে জাতপাত, গোত্রকুল, ভাষা-অঞ্চলের হাজারও রকম ভাগাভাগির মধ্যেও আমরা শহুরে শিক্ষিতেরা তার সন্ধান সঠিক না জানলেও জন্ম জন্মান্তরে তাঁকে বুক দিয়ে আগলে আছেন গ্রামবাংলার নিষ্ঠাবান ভক্তগণ। তাঁদের প্রেম আর ভক্তিভাবের কাছে আমাদের নাগরিক-রাষ্ট্রিক-প্রাতিষ্ঠানিক পাণ্ডিত্য ও খবরদারি সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও অকার্যকর প্রতিপন্ন হয়। লালন ফকিরের সত্যদ্বীন গুরুমুখী আত্মতত্ত্বসাধনার নিগূঢ়পথ। ব্রিটিশ-পাকিস্তান যুগের দ্বিজাতিতাত্ত্বিক দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও ভাগাভাগির সাম্রাজ্যবাদী কূট চক্রান্তের কারণে এ মহৎ মানবধর্মদর্শন বারবার আক্রান্ত ও নিগৃহীত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশেও ফকিরগণ নিরাপদ নন। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও লালনের সত্যাদর্শের পতাকা এখনও উড্ডীন আছে ভক্তের চিত্তাকাশে। এ আদর্শ কেউ সম্পূর্ণ উৎখাত করতে কখনও পারেনি। যদিও তা বিকশিত হয়ে যেভাবে ব্যাপ্তিলাভ করতে পারত সে সম্ভাবনাকে পাথরচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।

সর্বধর্মের অবতার-মহাপুরুষগণ সর্বকালে স্রষ্টার তৌহিদ অর্থাৎ অদ্বৈতবাদের বা সর্বেশ্বরবাদের ধারক-বাহক। তাঁরা সৃষ্টিস্রষ্টার অদ্বৈত সত্যদর্শনকেই মানববিশ্বের নানা ভেদভাষায়, বিচিত্র সঙ্কেতে ও সূক্ষ্ম রূপকে তুলে ধরেন। এক অখণ্ড মহাসত্যকে তাঁরা অভিব্যক্ত করেন জীবের খণ্ডজীবন যাতনা নিবারণের জন্যে। জগতগুরু ফকির লালন শাহ কোনও খণ্ড জ্ঞান, খণ্ড পাত্র, খণ্ড ভূমি বা খণ্ড কালে বিখণ্ডিত সত্তা নন। বরং আমরা তাঁকে শুদ্ধচিত্তে ধারণ না করতে পারার কারণে নিজেরা যেমন খণ্ডিত হয়ে আছি নানা ভাগাভাগির খোঁয়াড়ে তেমনই শাঁইজিকেও খণ্ডিতভাবে হাজির করি যে যার মতো স্বার্থ-সুবিধার মাপকাঠিতে। কিন্তু এর চেয়েও বড় সত্যটি হলো, ফকির লালন শাহ স্থানকালপাত্রজয়ী মহাগুরুরূপে সদা সর্বত্র মহাভাবে জায়মান। তিনি স্বয়ং একক তথা অখণ্ড সত্তা বলেই তাঁর বাণী বা কালামও খণ্ডিত ভাবধারা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পরিশুদ্ধ। এ কারণে লালনসঙ্গীত আমাদের শ্রবণে দর্শনে মননে চিরায়ত মহাজাগতিক ধর্মসঙ্গীত বা বিশ্বভাবসঙ্গীত।

গত দুই শতাব্দীরও অধিককাল ধরে ফকির লালন শাহের তথাকথিত জীবনী বানিয়ে সাহিত্যিক-সিনেমাটিক যে সব জাল-জালিয়াতি ও মিথ্যে কল্পকাহিনি বানিয়ে সমাজে ছড়ানো হচ্ছে তার প্রতিক্রিয়া ভাষায় ব্যক্ত করলে এমনই দাঁড়ায়:

কোন সুদূরে পেরিয়ে গেছে শাঁইজির কাল
পণ্ডিতেরা তর্ক করে নিয়ে তারিখ-সাল ॥

ফকির লালন কর্তৃক বিকশিত অনাদির আদিদর্শন না খুঁজে, না বুঝে  তাঁর মাতাপিতা কে, তাঁর গুরু সিরাজ শাহ’র ঠিকানা কোথায়, তিনি কোন তরিকার সাধক, কোন গ্রামে বা জেলায় জন্মেছেন, হিন্দু না মুসলমান কুলোদ্ভব এসব অসার গালগল্প নিয়ে পণ্ডিতেরা যেমন বহুধাবিভক্ত কুতর্কে লিপ্ত তেমনই তাদের অনুসরণে সাধারণ জনগণও বিভ্রান্তির অতল গহ্বরে পতিত। কিন্তু এ সূক্ষ্ম সত্যটি কেউ বুঝতে চায় না যে, দিব্যজ্ঞানী সিদ্ধ মহাপুরুষদের নিজস্ব মুক্তমত অর্থাৎ আত্মদর্শনলব্ধ মহাসত্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক একটি মুক্তধর্ম। একেই বলা হয় মানবধর্ম তথা শুদ্ধ মুক্ত মহাপুরুষতন্ত্র।

আরও পড়ুন:  গুহার দেওয়ালে‚ টিলার উপরে ধুলোর স্তরে লুকিয়ে ১০ হাজার বছরের বিস্ময়-ইতিহাস

আল্লাহর ক্বাফশক্তির অর্থাৎ মহাশক্তির অধিকারীগণের মধ্যে যাঁরা ক্বাফশক্তি সম্পন্নগণের সন্তোষ লাভের জন্যে তাঁদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন তাঁরাই ফকির। এ তো  আমার কথা নয়, কোরানদর্শন অনুসারে একদেহতত্ত্ব (ওয়াহাদাতুল অজুদ) সাধনার সুসংবদ্ধ ধারা। অথচ বেশির ভাগ মানুষই জানে না ফকিরীধারার রহস্যময় সূক্ষ্ম মাহাত্ম্য। রসবোধহীন অবুঝ লোকদের অপপ্রচারণায় ফকির লালন শাহ ও তাঁর অখণ্ড সঙ্গীতদর্শন নিতান্তই খণ্ডিতভাবে লোকপ্রিয়তা পেয়েছে সমাজে। সেজন্য লালনসঙ্গীতের গায়কের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও লালনসাধকের সংখ্যা দিনে দিনে কমে আসছে সমাজে। কেননা অখণ্ড স্বরূপে লালনদর্শন এখনও কোথাও তা প্রতিষ্ঠা পায়নি, না স্বদেশে না বহির্বিশ্বে। সবই খণ্ডিত ও বিকৃতাচারে বিপর্যস্ত। যেমন তিনি দৈন্য প্রকাশ করেন:

বসতবাড়ির ঝগড়া কেজে আজও মিটল না।
কার গোহালে কে ধোঁয়া দেয় সব দেখি তা না না না ॥

শুদ্ধ ফকিরীধর্মের রসিক সাধক আপনদেহে তথা সাধকদেশের মধ্যে সম্যক গুরু বা কামেল মোর্শেদরূপী পরমের ধ্যানমগ্নতার এত গভীরে তন্ময়াবিষ্ট থাকেন যে, নিজদেহের বাইরে কোনও নারীসঙ্গিনীর প্রতি মন্ময় হওয়ার বা মানসিকভাবে অপরের উপর নির্ভরতার কোনও অবকাশই তাঁর থাকে না। এ কারণে ‘ফকির’ তিনিই যিনি মুক্ত, স্বাধীন, স্বতন্ত্র, বান্ধবহীন (বেনেয়াজ), সর্ববন্ধনহারা মহাপুরুষ গুরু। শাঁইজির সমগ্র জীবনটাই যার মূর্ত দৃষ্টান্ত। তিনি কোনও স্ত্রী বা তথাকথিত সাধনসঙ্গিনী কখনও গ্রহণ করেননি। ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় তিনি সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত, বঞ্চিত ও বিপন্ন যে নারীদের আশ্রয় দিয়েছেন তারা তাঁর আধ্যাত্মিক কন্যার মর্যাদায় অভিষিক্ত। তা যৌনমোহের আবিলতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। অথচ স্বঘোষিত ‘ফকির’ লালনকে ন্যাড়ার ‘বাউল’ বলে প্রচারণা চালিয়ে এমন জঘন্য মিথ্যাচারের সূচনা করেছিল মৌলভি আফসার উদ্দিনের নেতৃত্বে কাঠমোল্লা শ্রেণির ধর্মান্ধেরা সেই ব্রিটিশ যুগের শেষভাগ থেকে। তাদের ‘বাউল ধ্বংস ফতোয়া’র কুপ্রভাব থেকে আমাদের সমাজ আজও মুক্ত হতে পারেনি। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ওদের অনুসরণে সেই মিথ্যারোপকেই অন্ধের মতো আঁকড়ে ধরে আছে শহুরে শিক্ষিত সমাজ। ফলে এরা সারসত্য না জেনে কুতর্ক, বিভ্রান্তি আর মতভেদের মধ্যে নিমজ্জিত করে রাখতে চায় লালনদর্শনকে। শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। সত্য তাঁর আপন শক্তিতে মহাশক্তিমান।

নিখিলবঙ্গে ফকির লালন শাহ্ গুরুমুখী সর্বধর্মের মিলন মোহনা তথা প্ল্যাটফর্ম বলেই ধর্মবর্ণগোত্রকুলের পরিচয় তাঁর কাছে একেবারেই অর্থহীন, জঞ্জালতুল্য। কুটিল লোকদের কপটতা থেকে শাঁইজি সব সময় যোজন দূরে থাকেন। কিন্তু সরলহৃদয় ভক্তের প্রেমডোরে তিনি বাঁধা আছেন সদাই। এখানে নরনারী কি শাদাকালো কি জাতঅজাতের ভেদাভেদ নেই কোনও। সাধুগুরুর চরণে সবারই ঠাঁই মেলে যদি সে হয় অকপট সরলমনা ভক্তজন। শাঁইজি জানান:

ভক্তিভক্তের সঙ্গধারী।
অভক্তের অঙ্গ নাহি হেরি ॥

কিবা,

ভক্তের দ্বারে বাঁধা আছেন শাঁই।
হিন্দু কি যবন বলে তাঁর জাতের বিচার নাই ॥

গুরু লালনের কাছে নিজের চাইতেও তাঁর ভক্ত অনেক বড়। ভক্তের চেয়ে বড় তার নিহেতুভক্তি। শাঁইজি তাঁর প্রতিটি ভক্তের ভেতরে বাইরে একান্ত হয়েই আছেন সচ্চিদানন্দ মহাপ্রেমলীলায়। কিন্তু অসৎ ও অভক্তের দিকে মনোযোগ দেয়া দূরের কথা, ওদিকে এক পলক তাকানোর সময়ও নেই তাঁর; কারণ:

অসৎ অভক্তজনা
তারে গুপ্তভেদ বল না
বললেও সে মানিবে না করবে অহঙ্কারী ॥

গুপ্ত রহস্যজ্ঞানের খবর চেতনশূন্য কোনও অভক্তের অন্তরে আদৌ প্রবেশ করানো যায় না। জোর কওে শোনালেও মনের ভেতরে তা কোনও আলোড়ন তুলতে পারে না। আমিত্বের অহঙ্কার ও বিষয়মোহের সীমাহীন দুর্বলতাই এর প্রধান কারণ। এভাবে ভোগলোলুপ বস্তুবাদী শাসনব্যবস্থা ও তার অনুগামী ধর্মের নামে কুধর্মব্যবস্থার বিষফলজাত এ নৈরাজ্যবাদী অবক্ষয়ী সভ্যতার শিকার কোটি কোটি জনগণের মন ও মস্তিষ্ক আজ ভক্তিপ্রেমশূন্য। ভক্তির পরিবর্তে নির্বিচার ভোগ ও ভোগান্তি তথা দুর্ভোগ বাড়ানোর দিকেই লোকেরা পঙ্গপালের মতো ছুটছে চারদিক। এমন আত্মসুখ বিলাসের পরিণতি কী দাঁড়াচ্ছে সেদিকে কারও খেয়াল নেই। সম্যক গুরুকেন্দ্রিক প্রেমভক্তিবাদকে প্রতিদিনের বাস্তব জীবন ও চেতনজগত থেকে একেবারে নির্বাসনে পাঠিয়ে মানুষের নাকের উপর মরণোত্তর মিথ্যা মুক্তির মুলো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে অনুষ্ঠানবাদী সব লৌকিক ধর্মকর্মে। তার জন্যে ফকির লালন শাহের এমন মর্মান্তিক আর্তি জেগে ওঠে :

আরও পড়ুন:  ঋণ-খেলাপি বাছতে ভারত উজাড় ! এ বার ৫,৩৮৩ কোটি টাকা ব্যাঙ্ক ঋণ নিয়ে দেশত্যাগী ওষুধ ব্যবসায়ী

জগত মুক্তিতে ভোলালেন শাঁই।
ভক্তি দাও হে যাতে চরণ পাই॥
ভক্তিপদ বঞ্চিত করে
মুক্তিপদ দিচ্ছ সবারে
যাতে জীব ব্রহ্মাণ্ডে ঘোরে  কাণ্ড তোমার দেখতে পাই ॥
রাঙাচরণ পাব বলে
বাঞ্ছা সদাই হৃৎকমলে
তোমার নামের মিঠায় মন মজালে  রূপ কেমন তা দেখতে চাই র

লোকসমাজ জীবদ্দশায় ইনসানে কামেল একজন সম্যক গুরুর পাদপদ্মে ভক্তিপ্রণত হয়ে জলন্ত জাহান্নাম থেকে মুক্ত না হয়ে মরণের পর নাজাত বা মুক্তির লোভে ব্যকুল হয়ে ধর্মের নামে কুধর্মের কদাচারে জড়িয়ে পড়ে। এমন অলীক মুক্তির মোহে দিশেহারা বিশ্বের লোকপ্রিয় ধর্মজগত ভ্রান্তির এমন জটিল খাদে গিয়ে পড়েছে যে, কোনোমতেই আর কোমর সোজা করে কেউ উঠে দাঁড়াতে পারছে না। সবাইকে সেখানে টেনে নামাতে উদভ্রান্ত। অতিচর্চিত জনপ্রিয় তাবৎ ধর্মকর্ম অর্থাৎ সমাজে লোকদেখানো ভড়ংবাজির আড়ম্বরপূর্ণ ফ্যাশন প্রতিযোগিতামাত্র। ওসব এখন নিতান্তই খেলো বিষয়ে পরিণত হয়েছে। লৌকিক ধর্মগুলোর অন্ধ অনুসারীরা ভক্তিপ্রেম উপাসনা, সেবা ও সাধনার মূল কেন্দ্রবিন্দুস্বরূপ একজন সম্যক গুরুর রূপধ্যান ভুলে অদেখা-নিরাকার আল্লাহর নামে চরম বিকার ও বিভ্রমের মূর্তিপূজায় ডুবে আছে। নিরাকার আল্লাহ বা অদৃশ্য হরির উদ্দেশে বেশির ভাগ মানুষ প্রার্থনা কি এবাদতের নামে মনের অন্ধকার ঘরে বিষধর সাপ ধরতে শশব্যস্ত। জন্ম জন্মান্তরে এভাবে জগত সংসারের অজ্ঞান লোকগুলো মুলো ঝোলানো মুক্তির কৌশলী চক্রান্তে বারবার নারকীয় যন্ত্রণার আবর্তে পড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। শাঁইজির ভক্তিপদ থেকে বঞ্চিত হয়ে কারও মুক্তি লাভ করার উপায় নেই।

আত্মিকভাবে প্রত্যক্ষমান সদগুরুর অস্তিত্বকে এড়িয়ে গিয়ে শুধু মৌখিকভাবে শব্দ বা নাম উচ্চারণের ধোঁকাবাজি দিয়ে পরম সত্যের সন্ধান কখনোই মেলে না। এজন্যে সম্যক গুরুর ভক্তিপদে শক্তিহারা লোকেরা কপটভাবের ধর্মাচারী। মুক্তিপদলোভী এসব ভ্রান্তজীবকে ভক্তিপদ বঞ্চিত রেখে জন্ম-জন্মান্তরে বারবার দেহধারণ করে কঠিন জীবনদুঃখের ঘানি টেনেই যেতে হচ্ছে। মনের গতিপ্রকৃতিই যার যার প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির নির্ণায়ক। অথচ সম্যক গুরুর তথা মহাপুরুষের রূপধ্যান ভুলে লোকেরা সরাসরি ভগবান বা আল্লাহর দর্শনলাভের ব্যর্থ চেষ্টায় মরিয়া। মহাপুরুষের মাধ্যম ছাড়া পরম সত্তার সাথে সাধারণ মানুষ কখনও যোগ লাগাতেই পারে না। অতএব, বিয়োগের খাতায় লেখা হচ্ছে তাদের সব তামসিক ধর্মকর্মের ফলাফল। শুধু মৌখিক নামের মিঠায় মন মজিয়ে মানবসত্তার মধ্যে গুপ্তসুপ্ত মহাসত্যকে অস্বীকার করে তারা স্রষ্টাকে আজগবি সাত আসমানের শিকেয় তুলে রেখে গোটা ভূবিশ্বকে পরিণত করেছে কৌরব নরকে মানে জলন্ত জাহান্নামে। ধর্ম নেহাত আর মানুষের হৃৎমন্দিরে বা কমলকোঠায় সুরক্ষিত নেই এখন।বরং তা এখন ইট, কাঠ, পাথর, লোহার তৈরি অট্টালিকার দানবীয় প্রকোষ্ঠে বন্দি হয়ে পড়েছে। গুরুবিমুখ নামাজ-পূজার নামে নির্বোধ জনগণের মুক্তি প্রার্থনা হয়ে উঠেছে তাই সাম্রাজ্যবাদ শৃঙ্খলিত পুজিবাদ ও ভোগবাদের বন্দিদশার নামান্তর। সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যে এমন পার্থক্যবোধই আজকের বিশ্বধর্ম সংকটের প্রধানতম কারণ।

আরও পড়ুন:  আমরা ছায়াপথের নাম দিই আকাশগঙ্গা‚ আর গঙ্গাকে বাঁচাতে মৃত্যুবরণ করেন আইআইটি অধ্যাপক থেকে সাধক হওয়া পরিবেশবিদ

অথচ এই মানব আকারসাকারের মধ্যেই বন্দিত্ব ও মুক্তি একত্রে মিলেমিশে আছে। চুরাশি লক্ষ যোনি তথা জৈবিক মাতৃদ্বার পেরিয়ে মানবকুলে আমাদের আবির্ভাব ঘটেছে জন্মমৃত্যুর চক্র থেকে চিরমুক্ত হয়ে মহাপুরুষের স্তরে উত্তরণের জন্য। মানুষ ছাড়া স্রষ্টার কোনও পরমলীলার অস্তিত্ব তথা প্রকাশক্ষেত্রে নেই। বেদ, বেদান্ত, ত্রিপিটক, তৌরাত, জবুর, ইঞ্জিল, কোরান–এসব মহামানুষেরই সৃজন অজ্ঞান-অবোধ মানুষের সত্য-সুপথে উদ্ধারের জন্যে। মানবদেহই স্রষ্টার প্রকাশ-বিকাশের শ্রেষ্ঠতর মাধ্যম। মানুষতত্ত্বই শাঁইজির আদিতত্ত্ব। তাই তিনি জানান:

মোর্শেদকে মানিলে খোদার মান্য হয়।
সন্দেহ যদি হয় কাহারও কোরান দেখলে মিটে যায় ॥
দেখ বেমুরিদ যত
শয়তানের অনুগত
এবাদত বন্দেগি তার তো  সই দেবে না দয়াময় ॥
মোর্শেদ যা ইশারা দেয়
বন্দেগির তরিক সেই হয়
কোরানে তা সাফ লেখা রয়  আবার অলি দরবেশ তাঁরাও কয় ॥
মোর্শেদের মেহের হলে
খোদার মেহের তারে বলে
হেন মোর্শেদ বা ভজিলে  তার কি আর আছে উপায় ॥

গুরুবাক্য বলবান, আর সবই বাহ্যজ্ঞান। মোর্শেদকে মান্য করা মানে অপন গুরুর আদেশ-নির্দেশ অনুসরণ ও অনুকরণ করা। সাধকজগতের পরিভাষায় একে ‘ভজন’ বলা হয়। আগে গুরুভজন। তারপর হবে আত্মদর্শন। কোরানের দৃষ্টিতে গুরুবিহীন লোকমাত্রই শয়তানের শিষ্য। তাদের কোনও উপাসনা বা নামাজ শাঁই তথা হরির কাছে গৃহীত হয় না। মোর্শেদরূপে আল্লাহ যার জন্য যে সাধনপদ্ধতি দান করেন সেটাই তার জন্য পালনীয় ধর্মবিধান বা শরিয়ত। এটাই কোরানের নির্দেশ। সবার জন্য আজীবন একই ধাঁচের নামাজ বা ধ্যান কখনও সঠিক হতে পারে না। জন্মকর্ম, জ্ঞানপাত্র ও ধারণক্ষমতা অনুসারে এক একজনের জন্য এক একটি স্বতন্ত্র তরিকা বা পন্থা নির্ধারিত হয়। সাধু-সুফিগণের এমনই ভজনধারা। এভাবেই গুরু তথা মোর্শেদের কৃপালাভ অর্থাৎ ভগবান বা আল্লাহর পরিপূর্ণ কৃপালাভ করা সাধকের পক্ষে সম্ভব। পরিণামে গুরুমুখী সাধনায় নিমগ্ন না হয়ে যে যতই ধার্মিক সাজুক তাতে কারও রক্ষে নেই। শাঁইজির দেশনা অনুযায়ী গুরুভজন না করে তার পরিবর্তে আপন মর্জিমতো চলে, বইপত্র পড়ে মুখস্ত বুলিবাগীশ হলে কখনও প্রকৃত কল্যাণের অধিকারী হওয়া যাবে না। যদি কারও গুরু না মেলে তাহলে তার ধর্মকর্ম সবই অসার হতে বাধ্য। হচ্ছেও তাই।

কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মই মানুষকে এখন আর স্বস্তি দিতে পারছে না। তাই শহরাঞ্চলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মসজিদগৃহের সংখ্যাবৃদ্ধির পাশাপাশি ইদের আগে তথাকথিত জাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে কিংবা সৌদি আরবে হজ করতে গিয়ে শতশত মানুষ পদদলিত হয়ে অপমৃত্যুর শিকারে পরিণত হচ্ছে বছর বছর। অন্যদিকে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট প্রতিষ্ঠার নামে যে দানবীয় উল্লাসে অশান্তির দাবানল বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চলছে তা আরও ভয়ঙ্কর। এর প্রতিবিধান কোরানেই রয়েছে। বাঙলায় কোরান লালনের নামান্তর। এ নিখাদ সত্যটি বাঙালি মেনে না নেয়া পর্যন্ত তার নিস্তার নেই। লালনকে উপেক্ষা করে বিশ্বে বাঙালির মাথা তুলে দাঁড়াবার জায়গা কোথায় ?

সার কথাটি হল, সমাজে মহাপুরুষের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব না থাকলে কোনও ধর্মীয় শৃঙ্খলাই বজায় থাকতে পারে না। শাঁইজির ১২৭ তম তিরোভাব দিবসে এই শূন্যতাই আজ আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

(পুনর্মুদ্রিত)

NO COMMENTS