দীপান্বিতা রায়
বাংলা সংবাদ চ্যানেলের দায়িত্বপূর্ণ চাকরি সামলে নিয়মিত কলম ধরেন শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য | বঞ্চিত হন না সাবালক পাঠকমহলও | উল্লেখযোগ্য বই ‘রূপকথার অরূপরতন’, ‘গুপীবাঘার পোলাপান’, ‘বাহনের বায়নাক্কা’ এবং ‘স্বপ্নে বাঁচা’ |

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় | বাংলা সাহিত্যের এক অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র | ১৮৯৪ সালে কাঁচড়াপাড়ার কাছে মুরাতিপুর গ্রামে জন্ম | অভাবী পরিবার | প্রবল দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা শুরু | মেধাবী ছাত্র ছিলেন | তাই পরে নানারকম বৃত্তি পাওয়ার সুবাদে পড়াশোনা চালিয়ে নিয়ে যেতে অসুবিধা হয়নি | ১৩৩৫ বঙ্গাব্দে বিচিত্রা পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে তাঁর পথের পাঁচালী উপন্যাস প্রকাশিত হতে থাকলে বাঙালি পাঠক সমাজে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে |

বিভূতিভূষণের লেখায় আমরা তৎকালীন গ্রাম বাংলার একটা সামগ্রিক চিত্র পাই | বাংলার গ্রামের সজল‚ স্নিগ্ধ রূপটি তিনি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন | তার পাশাপাশি এসেছে সেই পরিবেশে বসবাসকারী মানুষের কথাও | লেখক বিভূতিভূষণের বর্ণনায় আছে এক অদ্ভূত মায়াবী যাদু | সামান্য জিনিসও তাঁর কলমের গুণে অসাধারণ সৌন্দর্যে ভরপুর হয়ে পাঠকের সামনে ধরা দেয় | পথের পাঁচালীতে এক জায়গায় তিনি বলছেন‚

আমডোব ! ছোট্ট চাষাদের গাঁ-খানা-কেমন নামটি ! মেয়েরা উঠানে বিচালি কাটিতেছে‚ ছাগল বাঁধিতেছে‚ মুরগীকে ভাত খাওয়াইতেছে‚ বড় লোকেরা পাট শুকাইতেছে‚ বাঁশ কাটিতেছে—-দেখিতে দেখিতে গাঁ পিছনে ছাড়িয়া একেবারে বাইরের মাঠ …. বিলে জল থৈ থৈ করিতেছে …. উড়ি ধানের খেতে বক বসিয়া আছে …. নাল ফুলের পাতা ও ফুটন্ত ফুলে জল দেখা যায় না |  

অতি পরিচিত দৃশ্য | কিন্তু তবু যেন বারবার পড়লেও পুরনো হয় না | বিভূতিভূষণের এই মায়াবী মন কিন্তু তাঁর উপন্যাসের চরিত্র সৃষ্টির পিছনেও ঠিক একইভাবে কাজ করে | সেজন্য তাঁর লেখায় নিষ্ঠুরতা‚ ক্রূরতা প্রায় নেই বললেই চলে | গ্রাম্য কুটিলতা‚ প্যাঁচ-পয়জার‚ সংকীর্ণতা আছে ঠিকই‚ কিন্তু সেগুলো ও বেশ নিচু মাত্রাতেই | সেই কারণে তাঁর রচিত চরিত্র যে সবসময় বহুমাত্রিক হয়েছে তাও নয় | বিশেষ করে তাঁর লেখায় পুরুষচরিত্রগুলির মধ্যে ভালত্ব ব্যাপারটা একটু বেশিমাত্রায় আছে | তুলনায় মেয়েরা বেশি স্বাভাবিক‚ অনেক বেশি দোষে-গুণে মেলানো বর্ণময় মানুষ |

পথের পাঁচালী উপন্যাসই বিভূতিভূষণকে পাঠকের কাছে পরিচিত করেছিল | তাই সেই উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্র সর্বজয়ার প্রসঙ্গেই প্রথমে আসা যাক | উপন্যাসের একেবারে শুরুর দিকেই হরিহরের দূরসম্পর্কীয়া দিদি ইন্দির ঠাকুরুণের সঙ্গে সর্বজয়ার সম্পর্কের একটি বর্ণনা লেখক দিচ্ছেন |

হরিহরের বউ দেখিতে টুকটুকে সুন্দরী হইলে কি হইবে‚ ভারী ঝগড়াটে‚ তাহাকে তো দুই চক্ষু পাড়িয়া দেখিতে পারে না | কোথাকার কে তার ঠিকানা নাই‚ কি তাহার সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজিয়া মেলে না‚ বসিয়া অন্নধ্বংস করিতেছে | সে খুঁটিনাটি লইয়া বুড়ীর সঙ্গে দুবেলা ঝগড়া বাধায় | অনেকটা ঝগড়া চলিবার পর বুড়ী নিজস্ব একটি পিতলের ঘটি কাঁখে ও ডান হাতে একটা কাপড়ের পুঁটুলি ঝুলাইয়া বলিত—

– চল্লাম নতুন বউ‚ আর যদি কখনো এ বাড়ির মাটি মাড়াই‚ তবে আমার — |

বিধবা‚ অসহায় ইন্দির ঠাকরুণের জীবনের শেষ আশ্রয়টুকুও নির্দয়ভাবে কেড়ে নিয়েছিল সর্বজয়া | অথচ এই সর্বজয়াই কিন্তু দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন মা | সংসারের জন্য‚ ছেলে-মেয়ের জন্য তার পরিশ্রম এবং স্বার্থত্যাগের কোনও তুলনা নেই | গল্প যত এগোয়‚ তত আমরা দেখতে পাই অকল্পনীয় দারিদ্র্যের মধ্যেও সর্বজয়া কীভাবে প্রাণপণে তার দুটি সন্তানকে রক্ষা করার চেষ্টা করে চলেছে | ইন্দির ঠাকরুণের সঙ্গে যে ব্যবহার সে করেছিল‚ তার জন্য অনুতাপও করেছে সর্বজয়া | যদিও সে ঘটনা অনেক পরের | বিধবা সর্বজয়া তখন কাশীতে বড়লোকের বাড়িতে রাঁধুনির কাজ করে | সেই বাড়িতে একদিন এক রানিমা এসেছিলেন | বাড়িসুদ্ধ লোক তার খাতির-যত্নে ব্যস্ত | মস্ত বড়লোক | মস্ত জমিদারি | যশোরের কোন কলেজের জন্য নাকি দু-লক্ষ টাকা দান করেছেন | চাকর-দাসীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সর্বজয়াও দেখছিল সেই মহিলাকে | আর বারে বারেই তার মনে হচ্ছিল‚ বড্ড যেন চেনা | কোথায় যেন দেখেছে তাকে | তারপর বৃদ্ধার ষোল বেহারার প্রকাণ্ড পাল্কি যখন ফটক দিয়ে বেরিয়ে গেল‚ তখন তার মনে পড়ল কার সঙ্গে মিল আছে এই রানিমার |

এইমাত্র তাহার মনে পড়িয়াছে | অনেকটা এইরকম চেহারার ও এইরকম বয়সের — সেই তাহার বুড়ি ঠাকুরঝি ইন্দির ঠাকরুণ‚ সেই ছেঁড়া কাপড় গেরো দিয়ে পরা‚ ভাঙা পাথরে আমড়া ভাতে ভাত‚ তুচ্ছ একটা নোনা ফলের জন্য কত অপমান‚ কেউ পোঁছে না‚ কেউ মানে না‚ দুপুর বেলায় সেই বাড়ী হইতে বিদায় করিয়া দেওয়া‚ পথে পড়িয়া সেই দীন মৃত্যু
সর্বজয়ার অশ্রু বাধা মানিল না | মানুষের অন্তর-বেদনা মৃত্যুর পরপারে পৌঁছয় কিনা সর্বজয়া জানে না‚ তবু সে আজ বার বার মনে মনে ক্ষমা চাহিয়া অপরিণত বয়সের সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করিতে চাহিল |

কল্লোল যুগের লেখক বিভূতিভূষণ মনের দিক দিয়ে যে যথেষ্ট প্রগতিশীল ছিলেন একথা তাঁর নারী চরিত্র চিত্রায়ণ থেকে বেশ স্পষ্ট বোঝা যায় | তাঁর যেসব উপন্যাসে মেয়েদের যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা আছে‚ তার মধ্যে অন্যতম হল আদর্শ হিন্দু হোটেল | এখানে মূল চরিত্র হাজারি ঠাকুর নিশ্চিত‚ কিন্তু দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র অবশ্যই পদ্ম ঝি | রাণাঘাট স্টেশনে বেচু চক্কত্তির হোটেলে যার সর্বময় কর্তৃত্ব | কিন্তু কে এই পদ্ম ঝি ? বেচু চক্কত্তির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক | তার কথা ভিন্ন অন্য কারুর কথা বেচু কানেও তোলে না | উপন্যাসের একেবারে শুরুর দিকে হাজারি ঠাকুর এক জায়গায় বলে

পদ্মটা কি সোজা বদমাশ মাগী — পেট ভরে যে কেউ খায় – তাও সহ্যি হয় না | যদু বাঁড়ুয্যের হোটেলে বেলা এগারোটার সময় রাঁধুনি বামুন একথালা ভাত খেয়ে নেয়‚ আমাদের এখানে তা হবার জো আছে ? বাব্বাঃ যেমন কর্তা‚ তেমনি গিন্নি — ( পদ্ম ঝিকে মনে মনে গিন্নি বলিয়া হাজারি ঠাকুর খুব আমোদ উপভোগ করিল — মুখ ফুটিয়া যাহা বলা যায় না‚ মনে মনে তাহা বলিয়াও সুখ )

বেচু চক্কত্তির সঙ্গে পদ্ম ঝি-এর সম্পর্কটা যে লোকের চোখে অন্তত কীরকম‚ তা এখানে লেখক সহজেই বুঝিয়ে দেন | এরপর উপন্যাস এগোয় হাজারি ঠাকুরের হোটেল তৈরির স্বপ্নকে ঘিরে | হাজারি ঠাকুরের সঙ্গে বারে বারে বিভিন্ন বিষয়ে পদ্ম ঝি-এর সংঘাত বাধে | এমনকি তাকে চোর অপবাদ দিয়ে হোটেল থেকে তাড়িয়েও দেয় পদ্ম ঝি | কিন্তু সেই সংঘাত যে পুরোপুরি স্বার্থের সংঘাত‚ অসহায় মানুষের ওপর ক্ষমতাশালীর চিরকালীন অত্যাচার‚ তাও স্পষ্টভাবে সামনে আসে |

আবার হাজারি যখন ক্রমশ জীবনে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে তখন তার ওপর পদ্ম ঝিয়ের রাগের বহিঃপ্রকাশও লেখক খোলামেলা ভাবে তুলে ধরেন |

নানারকমভাবে চেষ্টা করিয়া এই হোটেলটা সে আর কর্তা দুজনে গড়িয়া তুলিয়াছিল | এই হোটেলের দৌলতে যথেষ্ট একদিন হইয়াছে | ফুলেনবলা গ্রামের যে পাড়ায় তাহার আদি বাস ছিল‚ সেখানে তার ভাই এখনও আছে–চাষবাস করিয়া খায়–আর সে এই রানাঘাট শহরে সোনাদানাও পরিয়া বেড়াইয়াছে একদিন–এই হোটেলের দৌলতে | এই হোটেল তাহার বুকের পাঁজর | কিন্তু আজ বড় মুশকিলের মধ্যে পড়িতে হইয়াছে | কোথা হইতে এক উনপাঁজুরে গাঁজাখোর আসিয়া জুটিল হোটেলে–হোটেলের সুলুকসন্ধান জানিয়া লইয়া এখন তাহাদেরই শিলনোড়ায় তাহাদেরই দাঁতের গোড়া ভাঙিতেছে !…যাহার জন্য আজ এই হোটেলের দুরবস্থা‚ ইচ্ছা হয় সেই কুকুরটাকে গলা টিপিয়া মারে‚ যদি বাগে পায় |

বেচু চক্কত্তি এবং পদ্ম ঝি-এর সম্পর্ক নিয়ে কোনও ধরনের নেতিবাচক ইঙ্গিত কিন্তু উপন্যাসে আর নেই | অথচ গল্প অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পর‚ যখন হাজারি ঠাকুরের নিজের হোটেল রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত‚ বেচুর হোটেলটি উঠে যাওয়ার মুখে‚ পেয়াদা এসেছে সেই সম্পত্তি ক্রোক করতে‚ সেই সময় পদ্ম নিজেই তার আর বেচুর সম্পর্কের বিষয়টি হাজারি ঠাকুরকে বলে | হাজারি সেদিন তার কাছে জানতে চেয়েছিল বেচু চক্কত্তির সঙ্গে পদ্ম ঝি-র আলাপ হল কীভাবে |

সেসব অনেক কথা ঠাকুর | উনি আমাদের গাঁ ফুলে-নবলার চক্কত্তিদের বাড়ির ছেলে | ওঁর বাবার নাম ছিল তারাচাঁদ চক্কত্তি–বড় ভালো লোক ছিলেন তিনি | অবস্থাও ভালো ছিল তাঁর–আমাদের কর্তা হচ্ছেন তারাচাঁদ চক্কত্তির বড়ো ছেলে | লেখাপড়া তেমন শেখেননি‚ বললেন রানাঘাটে গিয়ে হোটেল করব‚ পদ্ম কিছু টাকা দিতে পার ? দিলাম টাকা | সে আজ হয়ে গেল—-

গ্রামে এত লোক থাকিতে তারাচাঁদ চক্কত্তির বড়ো ছেলে তাহার কাছেই টাকা চাহিল কেন‚ সেই বা টাকা দিল কেন‚ রানাঘাটে বেচুর হোটেলে তাহার ঝিগিরি করা নিতান্তই দৈবাধীন যোগাযোগ না পূর্ব হইতেই অবলম্বিত ব্যবস্থার ফল–এসব কথা হাজারি জিজ্ঞাসা করিলে তাহাকে দোষ দেওয়া যাইত না |

কিন্তু এসব কথা হাজারি পদ্মকে জিজ্ঞাসা করেনি | কারণ পদ্মকে বেচু চক্কত্তির সঙ্গে সম্পর্কের দরুন কোনও বিপদে ফেলা লেখকের উদ্দেশ্য নয় এবং পছন্দও নয় | বরং পদ্মর ভালবাসা এবং কর্মক্ষমতাকে ব্যবহার করে উঁচুজাতের মানুষ বেচু চক্কত্তি আসলে সারা জীবনই তাকে কীভাবে ঠকিয়ে গেছে‚ সেকথাই তিনি ভারী সুক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন |

বিভূতিভূষণ যে আদতে মোটেই রক্ষণশীল ছিলেন না‚ তার প্রমাণ আমরা ইছামতী উপন্যাসের দুটি চরিত্র বিবর্তনে খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি | প্রথমটি হল গয়া মেম | গয়া বরদা বাগদিনীর মেয়ে | মোল্লাহাটি নীলকুঠি এলাকায় বরদা বাগদিনীর দারুন প্রভাব | কারণ সে হল গয়া মেমের মা | নীলকুঠির বড় সাহেবের সঙ্গে গয়ার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা |গয়াকে কেউ কোনওদিন বড় সাহেবের সঙ্গে দেখেনি | অথচ কথাটা সবার জানা | গয়া বড় সাহেবের আয়া | দিনের বেশিরভাগ সময়টাই থাকে কুঠিতে | ফরসা কালপেড়ে শাড়ি ছাড়া পরে না | হাতে পৈঁছে‚ বাজুবন্ধ‚ কানে মাকড়ি‚ গলায় মুড়কি-মাদুলি গাঁথা সোনার হার | গয়া যে গ্রামের অন্য বৌ ঝিদের কাছে বেশ ঈর্ষার পাত্রী‚ সে কথা বুঝতে অসুবিধে হয় না |

এর পাশাপাশি লেখক কিন্তু নিজেই জানিয়ে দেন যে গয়া মানুষ ভাল | ছোট বড় বিপদে সে সকলকে সাহায্য করে | গল্প যত এগোয়‚ গয়া মেমের দয়ালু মনের পরিচয় তত বেশি বেশি করে পাওয়া যায় | নীলকুঠিতে শ্যামচাঁদ খেয়ে অসুস্থ‚ বৃদ্ধ রামকানাই কবিরাজ যখন বাড়ি ফিরে আসেন‚ তখন গয়াই তাকে লুকিয়ে দেখাশোনা করে | তার জন্য দুধ নিয়ে যায় | আমিন প্রসন্ন চক্কত্তির ভারী লোভ গয়ার উপর | গয়া সেকথা বোঝে ঠিকই | কিন্তু আমিন বিপদে পড়ুক‚ এমনটা মোটেও চায় না | তাই আমিন যে লুকিয়ে তার পিছু নেয় একথা কাউকে বলে না | বরং নানাভাবে প্রসন্নকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে |

গয়া মেম ছিল বড়সাহেব শিপটনের রক্ষিতা | কিন্তু তার প্রতি গ্রামের মানুষের ঘৃণার বিষয়টি সেভাবে তুলে ধরেননি লেখক | যদিও সময়ের প্রেক্ষিতে সেটাই হয়তো ছিল স্বাভাবিক | বরং শিপটন সাহেবের প্রতি গয়ার ভালোবাসাকে তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন | উপন্যাসের শেষদিকে সুন্দর করে বর্ণনাও করেছেন | গয়া মেমের তখন বয়স হয়েছে | বয়স বেড়েছে প্রসন্ন আমিনেরও | প্রসন্ন গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিল | তাই বহুদিন তাদের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ নেই | হঠাৎ একদিন তাদের দেখা হয়ে যায় পুরনো কুঠিবাড়ির পাশে আগাছার জঙ্গলে ঢেকে যাওয়া গোরস্থানে‚ যেখানে আছে শিপটন সাহেবের কবর |

গয়া মেম ওর কথায় ভালো করে কর্ণপাত না করেই বললে—-আসুন খুড়োমশাই‚ বড়সায়েবের কবরটা দেখবেন না ? আসুন | আলেন যখন‚ দেখেই যান—-| পরে সে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল | শিপটনের সমাধির উপর টাটকা সন্ধ্যামালতী আর কুঠির বাগানের গাছেরই বকফুল ছড়ানো | তা থেকে এক গোছা সন্ধ্যামালতী তুলে নিয়ে ওর হাতে দিয়ে বলল–দ্যান ছড়িয়ে দ্যান | আজ মরবার তারিখ সাহেবের‚ মনে আছে না ? কত নুনডা খেয়েছেন এক সময় ! দ্যান দুটো উলুখড়ের ফুলও দ্যান তুলে টাটকা | দ্যান ওই সঙ্গে—-| প্রসন্ন চক্কত্তি দেখলে ওর দুগাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়েচে নতুন করে |

এই উপন্যাসেরই আর এক অন্যরকম চরিত্র নিস্তারিণী | গ্রামের মেয়ে | গ্রামের বউ | কিন্তু সর্বদাই মুক্তির ইচ্ছেয় তার বুকের মধ্যে ছটফট | ঘড়া বুকে নিয়ে সাঁতার দিয়ে সে পেরিয়ে যায়  ভাদ্রের খরস্রোতা ইছামতী | কামট-কুমির গ্রাহ্যও করে না | নিজের গ্রাম পেরিয়ে অন্য গ্রামের ঘাটে এসে হুঁশ হয় তার | একা একা বাড়ি ফেরে অজানা পথ ধরে | নিস্তারিণী যেন অন্য জগতের মেয়ে | শাশুড়িকে সে ভয় পায় না | স্বামীকেও না | অজানা পথে পা বাড়িয়েই যেন তার আনন্দ | মানতে চায় না সমাজ সংস্কার | নিস্তারিণী প্রেমে পড়ে গ্রামের ছেলে গোবিন্দর | নদীর ধরে জঙ্গলে তাদের দুজনকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখে নিস্তারিণীকে বকাবকি করে তিলু | নিস্তারিণী কিন্তু অনায়সে বলে দেয় গোবিন্দকে তার ভাল লাগে | ইচ্ছে করে গোবিন্দর সঙ্গে লুকিয়ে কথা বলতে |

তুমি দিদি স্বামী পেয়েচ শিবির মতো | অমন শিবির মতো স্বামী আমরা পেলি আমরাও অমন কথা বলতাম | আহা তিনি যে গুণবান ! একখানা কাপড় চেয়েছিলাম বলে কী বকুনি –যেমন শাশুড়ির‚ তেমনি সেই গুণবানের ! বাপের বাড়ির একজোড়া গুজরীপঞ্জম ছিল‚তা সেবার বাঁধা দিয়ে নালু পালের কাছ থেকে টাক নিয়েছিল–আজও ফিরিয়ে আনার নাম নেই | এত বলি‚ কথা শোনে না | আনবে কোথা থেকি ? এই তো সংসারের ছিরি ! ধান এবার হয়নি‚ যা হয়েছিল‚ তিনটে মাস টেনেটুনে চলেছিল | ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে দিয়ে কোমরে বাত ধরবার মতো হয়েছে | এত করেও মন পাবার জো নেই কারও | কেন আমি থাকব অমন শ্বশুরবাড়ি‚ বলে দাও তো দিদি |

যে পরিবেশ এবং প্রেক্ষিত বিভূতিভূষণের লেখার মূল উপজীব্য‚ সেখানে এমন বিদ্রোহিনী নিশ্চিত বিরল | কিন্তু লেখকের মনের সবটুকু সহানুভূতি এবং ভালবাসা আদায় করে নেয় নিস্তারিণী | সে শুধু সুন্দরী নয় | সাহসী‚ কর্মঠ‚ বুদ্ধিমতী এমনকী চমৎকার গানও গায় |

বিভূতিভূষণ ছিলেন কল্লোল যুগের সাহিত্যিক | তাঁর সমসাময়িক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা তারাশঙ্করের লেখায় আমরা জীবনের অনেক কঠিন-কঠোর রূপ‚ অনেক প্রতিবাদ‚ আন্দোলন‚ বিদ্রোহ দেখি | বিভূতিভূষণে কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে সেসব নেই মোটেই | কিন্তু তাঁর বিদ্রোহী সত্ত্বা নিঃশব্দে‚ গোপনে চারিয়ে যায় তাঁরই কলমের চরিত্রদের মধ্যে | কেদার রাজা উপন্যাসে যৌনকর্মী কমলাকেও তিনি তাই সযত্নে আঁকেন | হতদরিদ্র ঘরের মেয়ে শরতের শত প্রলোভন তুচ্ছ করাকে তুলে ধরেন অনায়াসে | তাঁর লেখার গুণে কখনও এদের অনেক দূরের মহান মানুষ বলে মনেই হয় না | বরং চেনা চেনা লাগে | ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে যায় | মনে হয়‚ তাদের মতো হতে পারাটা বেশ সহজ | একজন প্রগতিশীল‚ জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির লেখক হিসেবে এখানেই বোধহয় বিভূতিভূষণের মুন্সিয়ানা এবং সাফল্য |

(১৮৯৪-এর ১২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় | ১২৪ তম জন্মদিনে অমর এই কথা সাহিত্যিকের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণে পুনর্মুদ্রিত)

আরও পড়ুন:  আয়েশ করে ভক্ষণ ! ভেড়ার মাংসের স্বাদে মুগ্ধ গণেশ ঠাকুর ! তুঙ্গে বিতর্ক

1 COMMENT