‘বাহ্! অদ্ভুত! অত্যুত্তম!’—একটা করে আঁকা দেখছেন আর মুখ দিয়ে এরকম বিশেষণ বেরোচ্ছে | হাতের কাছে রাখা মুড়ির বাটি | তাতে গরম গরম পেঁয়াজি | একটা কামড় দিচ্ছেন পেঁয়াজিতে, খুশিতে ভরে উঠছে মুখ |

শিবরাম চক্রবর্তী-র গল্পের ছবি আঁকতে বসেছেন শৈল চক্রবর্তী | তাঁর আঁকা দেখছেন লেখক | সঙ্গে ওই মন্তব্য | একটা পাখি এঁকে শিল্পী জানতে চাইলেন, পাখাটা কেমন হয়েছে? উত্তর এলো, ‘যেন পাখোয়াজ |’ আর পাখির ল্যাজটা? ‘যেন ল্যাজারাস |’

এমন লক্ষ লক্ষ কথা জলের মত বেরিয়ে আসত শিবরামের মুখ দিয়ে | নিজেকে নিয়ে কম মজা করেছেন শিবরাম? তার সঙ্গে তার সৃষ্ট চরিত্র হর্ষবর্ধন-এর মিল কেউ খুঁজে পেলে তিনি হো-হো হেসে উত্তর দিতেন, কোথায় কাঠের ব্যবসায়ী! কোথায় আমি! ও টাকা খরচের জন্য পাগল | আমি টাকা-র জন্য পাগল | তেল আর জল কোনদিন মিশ খায়?’ হাতে টাকা পেলে এই মানুষটাই হয়ে উঠতেন দিলদরিয়া | অনেকটা হর্ষবর্ধনের মত | একগাদা সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঢুকে পরতেন ‘দিলখুশা’য় | তখন তাঁকে ঠেকায় কে?

একবার শৈলবাবুর বাড়িতে এসেছেন শিবরাম | হাতে পাকানো পান্ডুলিপি | ঘরে ঢুকেই তাড়া লাগালেন শিল্পী-কে, ‘এক্ষুনি সব ছবি এঁকে দিতে হবে |’ শৈলবাবু বললেন, ‘এত তাড়া কিসের? রেখে যান | সময়মত এঁকে দেব |’ শুনেই হইচই বাধিয়ে দিলেন শিবরাম, ‘মোটেই না | আপনি এক্ষুনি আঁকুন | আমি এখন আপনার বাড়িতে তেল মাখা মুড়ি দিয়ে জলখাবার খাব | তারপর দুপুরের খাওয়া | ততক্ষণে আপনার আঁকা হবে না?’

শিবরাম-এর এক ঘোড়ার গল্পে শৈলবাবু শিবরাম-এর মর্জিমত ঘোড়া এঁকেছেন | শিবরাম-কে দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি বার কয়েক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন | তারপর একগাল হেসে মন্তব্য করলেন, ‘শূন্য  মার্গে চলাচল আমার মত স্থুল জীবের পক্ষে তো সম্ভব নয় | কিন্তু এই পক্ষীরাজ আমায় বার বার আকাশে নিয়ে যাবে |’

শিবরামের অন্যতম চরিত্র ‘বিনি’-কে শিল্পী বরাবর খুব সুন্দর করে আঁকতেন | শিল্পীর তুলিতে বিনি সুন্দরী তরুণী | তাই দেখে একদিন রসিকতা করে শিবরাম বলেছিলেন, ‘মেয়েদের আপনি বড় সুন্দর করে ফেলেন |’ শিল্পী সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দোষ স্বীকার করে বললেন, ‘ওটা আমার দুর্বলতা | দোষ-ও বলতে পারেন | যদি বলেন তো ওকে একটু খ্যেদা-বোঁচা, প্যাকাটি বা মোটা করে দিই?’ ওমনি চিত্কার করে বললেন, ‘একদম ঠিক আছে | আর কিচ্ছু করতে হবে না |’

আরও পড়ুন:  নীল তিমি, কিছু ‘অ’প্রাসঙ্গিক কথা

শুনে শৈলবাবু শিবরাম-কে বলেছিলেন, ‘ফটো নেই আপনার? দিন না | আপনার প্রথম পুরুষে লেখা গল্পে সেটা থেকে ছবি করে দেব |’ জন্মরসিক সেদিন দু’মিনিট থমকে ছিলেন | তারপর বলেছিলেন, ‘না, আমার কোনো ফটো নেই | কী হবে ফটো নিয়ে? আপনার ছবিতেই আমি থাকব’—| তারপর গলা খাটো করে বললেন, ‘তাহলে কোনদিন বুড়ো হব না |’

শিবরামের লেখার বৈশিষ্টই ছিল পানিং | নিজের লেখার সমালোচনা করতে গিয়ে একবার লেখক বলেছিলেন, ‘সার্কাসের ক্লাউন সব খেলা জানে | কিন্তু পারতে গিয়ে কোথায় কি যে হয়ে যায়, খেলাটা হাসিল হয় না | হাসির হয়ে ওঠে | আর হাসির হলেই সেই খেলা হাসিল হয় |’ নিজেকে এভাবে নির্ভুল বিচার করার পরেও যার মনে কোনদিন একফোঁটা গ্লানি ঠাঁই পায়নি, তিনি কোনদিন ‘বুড়ো’ হতে পারেন!

NO COMMENTS