কিশোর ঘোষ
জন্ম ১ জুন, ১৯৭৮। প্রথম পরিচয় কবিতায়। ২০০৯ সালে প্রকাশিত কিশোরের কাব্যগ্রন্থ 'উটপালকের ডায়েরি'। পাঠকের পছন্দ হওয়ায় এই বইয়ের তিনটি এডিশন হয়। বইটি পুরস্কৃত হয়, এই বইয়ের কবিতা অনুবাদ হয়। আরও নানা কাণ্ড। অন্য কবিতার বইয়ের নাম 'সাবমেরিন'। এইসঙ্গে গল্প এবং নানা স্বাদের গদ্য লেখক হিসেবেও হালে পাঠকমহলে কতকটা পরিচিত। বাংলা সিনেমার জন্য গানও লিখে থাকেন মাঝেমধ্যে। কর্মসূত্রে একটি দৈনিক সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত।

হাই, আমি দেবায়ন। ফাইনালি আমি কবি হয়েছি। বিকজ অব বিলাভেড এফবি।

কবি হওয়া সোজা না, বিষাদপ্রতিমদাকে দেখেছি বলে জানি ইটস আ টাফ জব। শক্তি, সুনীল হওয়া এক জিনিস আর ‘ফেসবুক কবি’ হওয়া আরেক। সাধনা চাই। ক-ঠো-র সাধনা। এত শক্ত ব্যাপার কীভাবে নরম করলাম? কেমন করে কবি হলাম? বলব। ওয়েট ম্যান। তার আগে বলে দিই, এফবিতে আমায় ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে হলে লিখবেন ‘দেবা The Cool’। বিকজ আমি আছি। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ষোলো ঘণ্টা আই অ্যাম অন। যাই হোক, প্রথমেই একটি অপ্রিয় সত্যি বলে নেওয়া ভালো, দ্যাট ইজ কি হার্ভার্ডের প্রাক্তন ছাত্র মার্ক (জুকারবার্গ) আমাদের জন্য যা করেছে তা আমাদের বাপ-মাও করেনি। ওই লোক এফবি এক্সপ্লোর না করলে আমরা, যারা গত কুড়ি পঁচিশ বছরের মধ্যে জন্মেছি, তারা জাস্ট বোর হয়ে সুইসাইড অ্যাটেম্পট করতাম। কারণ ইটস ডাল। এখানে লাইফ ইজ ডাল। মোটামুটি স্কুল লাইফ শেষ করেই বুঝেছি ইউ হ্যাভ নো লাস ভেগাস অর এনিথিং। আমাদের বাড়ির, কলেজের, মার্কেটের আশপাশের রাস্তাগুলো দেখুন—মানুষ, গাড়ি, ধুলো, হকারে রাঁধা চচ্চড়ি। কলকাতা তবু ভালো। বাট মফসসলে জন্মানো বন্ধুদের অবস্থা ইজ আ বিগ পটি। নো বার, শপিং মল, অ্যাকোয়াটিকা, রেস্টুরেন্ট, ক্যাসিনো…। আমার ধারণা ওখানে মানুষের থেকেও ভ্যানরিক্সার সংখ্যা বেশি। সারাক্ষণ ক্রিং ক্র্যাং আর প্যাঁ পোঁ। ঘুমের মধ্যে আমার সাবকনসাসকে পর্যন্ত চেজ করে দ্যাট ব্লাডি কেয়স।

বাট ইটস ওকে নাউ। বিকজ উই হ্যাভ ফেসবুক। ল্যাপি খুলে বসলেই হল। ইউ আর আউট অব হেল। এমনিতে আমাদের সময় পার্ক আছে কিন্তু মাঠ নেই। বাট নো প্রব। অল ওভার ওয়ার্ল্ড আমার বন্ধুর সংখ্যা থ্রি থাউজেন্ড নাইন হান্ড্রেড অ্যান্ড ফিফটি থ্রি। বিভিন্ন বয়সি। ছেলে, মেয়ে, গে, লেসবি। আমরা সব শেয়ার করি। বাড়ি-কলেজ, প্রেম-প্রেমিকা, জামা-কাপাড়, মুভি-গান, জাঙিয়া-মোজা… মায় এভরিথিং। প্রাইভেট আর পাবলিকের মান্ধাতা আমলের ধারণা ঘুচিয়ে দিয়েছি আমরা। দিস ইজ জেনারেশন ওয়াই-ফাই বস। বাবা কাকাদের মতো ঘোমটার নীচে খ্যামটা নাচা আমাদের না-পসন্দ। আমরা মনে করি যা হবে ওপেন হবে। ভাববেন না যে তার মানে সিরিয়াস আলোচনা হয় না আমাদের। অবশ্যই হয়। যেমন সেবারের ডিবেট চলেছিল টানা সাড়ে সাত দিন। সলমান-ক্যাট না রণবীর-ক্যাট? হুইচ ওয়ান উড বি দ্য বেস্ট কাপল?

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ৮)

সতেরোজন মতামত দিয়েছিলাম। পঞ্চাশের উপর ছবি আপলোড করেছিলাম। কিন্তু ঝামেলা হল। দুই সুন্দরী, ফুল আর সুইট টিনার মধ্যে গোলমাল বেধে গেল দড়াম করে। টিনা যখন ক্যাটরিনা স্টাইলে চুল কার্ল করে হট টপ পরে সেলফি দিল (টু সেক্সি ছিল ফোটো)। ওই ছবি দেখে আলোচনা গেল ঘুরে। টিনাকে প্রোপোজ করে বসল চার পাঁচজন। আমি করিনি। করলে ফুল খেপে যেত। সেদিন সকালেই যে ওর সঙ্গে প্রেম-প্রেম চ্যাটে…। তবে স্বীকার করা ভালো—ওয়াট আ ব্রেস্টকাট ব্রা লাইক টপ! ডিজাইনারগুলো পারেও!

এনি হাউ, প্রসঙ্গ উঠলই যখন তখন একজন এফবি নাগরিক হিসেবে আই হ্যাভ টু টক অ্যাবাউট সেলফি। বেঙ্গলিতে এর একটা ভালো নাম আছে, নিজস্বী। চমকে দেওয়া নিজস্বীতে আমার সঙ্গে এঁটে ওঠা চাপের ব্রো। কবিতা লিখতে যে আমায় উৎসাহ দিয়েছে, এক্ষেত্রেও ইন্সপায়ার করেছে সেই লোক, সেই কবি। প্রোফাইল নেম—বিষাদপ্রতিম কবি। আমরা, ওর পরিচিতরা বলি ‘বিকে’।

বিকে ইজ গ্রেট। ওয়ান অব দ্য গ্রেটেস্ট পোয়েট অব এফবি এরিনা। চেহারা দেখলেই বিশ্বাস করবেন। ঝাঁকড়া চুল, দাড়ির জঙ্গল, সঙ্গে মানানসই সরু ফ্রেমের চশমা। পাঞ্জাবি-জিন্স ছাড়া পরে না। মনে আছে, একবার ওর সঙ্গে লম্বা চ্যাট করার পর মনে মনে একশোবার স্যালুট করেছিলাম। কী মোটিভেশন অন পোয়েট্রি! সেদিন জেনেছিলাম, বিকে যখন বাথরুম-পায়াখানায় যায় তখনও… গামছা তোয়ালে না, পরনে থাকে ওই পোয়েটস ইউনিফর্ম—পাঞ্জাবি অ্যান্ড জিন্স। জিজ্ঞেস করেছিলাম, অসুবিধা হয় না?

বিকে লিখল, ভাই দেবায়ন এ হল মহাজীবনের চর্চা। কবি হওয়া কি সোজা? ইউ ক্যান কল ইট গুহ্য সাধনা।

সেদিনের পর বিকের প্রতি সম্ভ্রম বেড়ে গেল আরও। যাই হোক, বিকে বার বার চমকে দেয় অভিনব সব সেলফিতে। যেমন সেটা ছিল আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবস। বিকে পিক পোস্ট করল। ছবিতে দেখা গেল সে এক মাঝারি আমগাছের মগডালে। পা ঝুলিয়ে। পরনে সবুজ পাঞ্জাবি আর জিন্স। আমি চমকেছিলাম সবুজ রঙের জিন্সে। ও জিনিস সচরাচর মেলে না। সেই ছবিতে সাড়ে তিনশো লাইক পড়েছিল। একশো দশ না বারোটা কমেন্ট। কিন্তু ‘কুছ পানে কেলিয়ে কুছ খোনা পড়তা হ্যায়’। বিকে মাস দেড়েকের জন্য হাঁটা খুইয়েছিল। পা ভেঙে। গাছ থেকে নামতে গিয়ে যত বিপত্তি। বাট ডেডিকেশনটাকে কী করে ইগনোর করি! অতএব এরপর আমিও শুরু করলাম—এক্সপেরিমেন্ট অন সেলফিজ (যার সঙ্গে আমার কবি হয়ে ওঠার বিশেষ যোগ রয়েছে)। সবচেয়ে মজা হয়েছিল ‘সুপারম্যান সেলফি’ নিয়ে। জিন্স-টি শার্ট নরমাল হলেও কাটা আন্ডারওয়্যারটা পরেছিলাম শেষে। প্যান্টের ওপর। ভেবলে গেল সবাই। একশো কমেন্ট ছিল ওই পিকে। সিক্সটি পারসেন্ট গার্লস। কেবল ‘ওয়াও!’ লিখেছিল না হলেও তিরিশটা মেয়ে। এছাড়াও কমোডে বসে, শীর্ষাসনে, ছেঁড়া জামা আর বেল্ট বাঁধা লুঙ্গি পরে, মুখের মধ্যে এক গাদা খাবার ঢুকিয়ে, ভাঙা সানগ্লাস পরে, বাইসেপ ফুলিয়ে…। তাছাড়া যেখানে বেড়াতে গেছি, যে স্পটে স্পটে ঘুরেছি তার সেলফি তো আছেই। ট্যুরে গিয়ে একবার একটা সোশাল সেলফি দিয়েছিলাম।

আরও পড়ুন:  পরের প্রজন্ম

গ্যাংটকের একটা হোটেল খামোখা ছেঁড়া বালিশ দিল। রাগারাগি করায় পাল্টালেও ওই বালিশের কাত হয়ে শুয়ে ছবি তুলে ওয়ালে পোস্ট করলাম। তলায় লিখলাম ‘হোয়াটস গোয়িং অন উইথ গ্যাংটকে বেড়াতে আসা বাঙালিদের সঙ্গে’। মনে আছে বিকে কংগ্রাচুলেট করেছিল। চ্যাটবক্সে লিখেছিল, ‘দেবায়ন ব্রো, তুমি মানুষ না, বাঘের বাচ্চা। বাহ ভাই, সভ্যতা ও সমাজের জন্য এতদিনে একটা কাজের কাজ করলে।’

আমি লিখলাম, ‘থ্যাঙ্কস।’

বিকে লিখল, ‘এতখানি করেছ যখন তবে আরেকটু করো। এই নিয়ে একটা কবিতা লেখো। প্রতিবাদের মাত্রাটা আরও ঘণ হবে।’

আমি লিখব কবিতা? জীবনে লিখিনি! তবে বিকের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর কম কবিতা পড়িনি। সব ওর কবিতা। তার মধ্যে দু’একটা ভোলবার না। যেমন, ‘তোমার চুলের জঙ্গলে আমি ডানাওলা বাঘ হয়ে ঘুরেছি/ মাঘের শীতের মতো/ এই অবেলায়’ কিংবা ‘সাবানের জলে, আমি পিছলে পড়েছি বাগানের কলে/ জানি, খোসা ছিড়বে না, তোমার স্নানের শিখায় তাকালে’।

বুঝতেই পারছেন কবিতা লেখা মোটেই সোজা না। বিকের মতো এমন লেখা তো অক্সিজেন ছাড়া এভারেস্ট ওঠার চেয়ে টাফ। তবু ট্রাই নিলাম। বিকে’কে চ্যাটে বললাম, আমি যা পারব লিখব। আমার মতো। উত্তরে বিকে বলল, সেটাই তো চাই ভাই। কিন্তু হাল ছেড়ো না যেন।  

ট্রু ইন্সপায়ারার বলছিলাম না! আমিও অনুপ্রাণিত হলাম। এবং অনেক ভেবে, এক রাত জেগে লিখেই ফেললাম, সত্যি সত্যি! আমাকে অবাক করে লিখে ফেললাম আমি—

মুখরিত প্রতিবাদ

চারিদিকে মরা খাদ

গ্যাংটক, ডোন্ট টক, যত যা বলিস

আমাদের ছুড়ে দিবি ছেঁড়া সে বালিশ?

মোরা তো ভিখিরি না, নয় কাঙালি

প্রতিবাদে মুখরিত হবে বাঙালি

 

কবিতা আপলোড করে প্রথমেই ট্যাগ করেছিলাম বিকে’কে। কমেন্ট করল বিকে—অসাধারণ। যা ভেবেছিলাম তাই। তুমি সুপ্ত প্রতিভা। আজ অঙ্কুরোদগম হল। ভেবে আনন্দ হচ্ছে যে, তোমার কাব্যবোধের গোড়ায় জল দিয়েছিল এই অধম। এই না হল রবীন্দ্রনাথের জাত! চালিয়ে যাও। কবিতায় কবিতায় ভরিয়ে দাও এফবি-র দেওয়াল, মেঝে, জানলা, ছাদ।

আরও পড়ুন:  বিদায়কালের পরিহাস : বাইশে শ্রাবণের ‘কেচ্ছা’

এদিকে আমি নাম খু্ঁজে পাচ্ছিলাম না কবিতাটার, বিকেই উদ্ধার করল। সুপার নাম দিল আমার প্রথম কবিতার। নাম হল ‘বালিশ বিপ্লব’। আমার একটা নতুন পরিচয় হল সেই থেকে। প্রতিভা শরীরের কোথায়, কোন অঙ্গে থাকে জানি না। কিন্তু সত্যি সেটা চাগাড় দিল বোধ হয়। কারণ এরপর আমিও বিকের মত নিয়মিত কবিতা লিখতে শুরু করলাম। এফবি’র পৃথিবীও হালকা চেঞ্জ করল। নতুন দু’ধরনের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট-এ ভরে উঠলাম। এক, অসংখ্য কবি বন্ধু হল। আর দুই, নতুন করে প্রচুর মেয়ে আমার প্রেমে পড়ল। সব দেখে-শুনে চশমার ফ্রেম বদলালাম। ম্যাচো থেকে ইন্ট্যালেকচুয়েল লুকে শিফট করলাম। কিন্তু ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডের বাইরের প্রেমিকা টুপুর গেল খেপে। বলল, ‘আই ডোন্ট লাইক পোয়েটস।’

জিজ্ঞেস করলাম, ‘হোয়াই?’

বলল, ‘কবিরা খুব ন্যাকা হয়।’

প্রতিবাদ করলাম। প্রথমে ক্ষারাক্ষারি পরে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল।

পরে ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলাম টুপুরকে নিয়ে টাইম ওয়েস্ট করার মানে নেই। ইটস ওকে নাউ। প্রথমত, প্রেমিকার থেকে কবিতা বড়। অনেক বড়। তাছাড়া টুপুর চলে গেলে ওর চলে যাওয়া নিয়ে কবিতা লিখব। তাতে করে আরও দশটা মেয়ে আমার প্রেমে পড়বে। তাছাড়া আমি আজকাল ওইসব টাপুর টুপুরদের নিয়েই শুধু পড়ে নেই। জীবনের আনেক গভীর, ঘন দিক নিয়েও ভাবতে হয় আমাকে। কারণ আমি এখন কবি হয়েছি। বিকজ অব বিলাভেড এফবি।

Sponsored
loading...

NO COMMENTS