অতি প্রাচীন কাল থেকেই বাংলার একটা নিজস্ব সংস্কৃতি ছিল | বঙ্গাব্দ তারই একটা উদাহরণ | গৌড়রাজ শশাঙ্ক সুদূর কনৌজ থেকে কামরূপ পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করে নিজেকে বাংলার প্রথম সার্বভৌম নরপতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন | আর তারই স্মারক হিসাবে ৫৯৪ খৃষ্টাব্দে তিনি বঙ্গাব্দের প্রচলন করেন | পাল ও সেন যুগ পর্যন্ত তা রাজকীয় মর্যাদায় ছিল |

কিন্তু পরবর্তী কালে ভারতে তথা বাংলার মুসলিম শাসন প্রবর্তিত হলে রাজকীয় অব্দ হিসাবে গণ্য হয় হিজরী | যদিও বাঙালি হিন্দুরা তাদের দেবদেবীর পূজা, একাদশী, পূর্ণিমা-অমাবস্যা তিথি পালনের জন্য বঙ্গাব্দ অর্থাৎ বাংলা পঞ্জিকা ব্যবহার করত | সরকারি স্তরে সর্বত্র হিজরীকে স্বীকৃতি দেওয়ায় মুঘল সম্রাট আকবর প্রথম লক্ষ্য করেন যে হিজরী সন অনুসারে ভূমি-রাজস্ব আদায়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে | সেই তুলনায় বঙ্গাব্দ অনুসারে রাজস্ব আদায় সহজ |

প্রকৃতপক্ষে হিজরী অব্দ হল চান্দ্রবর্ষ আর বঙ্গাব্দ হল সৌরবর্ষ | কৃষিপ্রধান ভারতবর্ষে ফসলের ঋতু ( যা সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘটে থাকে — খরিফ ও রবি শস্য ) হিসাব করে রাজস্বের দিন ধার্য করলে কৃষকদের পক্ষে রাজস্ব দেওয়া সহজতর হবে | তখন সম্রাট আকবর তাঁর সভাসদ জ্যোতিষী আমীর-ফতে-উল্লাহকে এ বিষয়ে দায়িত্ব দেন | আমীর ফতে উল্লাহ দীর্ঘ গবেষণা করে চান্দ্র ও সৌর পঞ্জিকার সমন্বয় সাধন করে সংশোধিত বঙ্গাব্দ তৈরি করেন ১৫৮৪ খৃষ্টাব্দের ১০/১১ই মার্চ | এরপর সম্রাট আকবর একটু পিছিয়ে গিয়ে ১৫৫৬ খৃঃ যখন ২য় পানিপথের যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে তিনি সিংহাসনে বসেন তখন থেকে তার গণনা কার্যকর করেন |

যাই হোক আকবর ঘোষণা করেন চৈত্র সংক্রান্তির মধ্যে বকেয়া খাজনা পরিশোধ করতে হবে | পরদিন ১ লা বৈশাখ থেকে নতুন বছরের হিসাব কষা হবে | স্থানীয় জমিদারগণও সেই আদেশ মেনে নিয়ে ১ লা বৈশাখ নিজ নিজ পারিষদ ও প্রজাদের মিষ্টান্ন বিতরণ করেন | সেই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা তাঁদের মক্কেলদের পুরনো হিসাবপত্র চুকিয়ে নতুন খাতায় তাদের নাম তোলেন ও নতুন হিসাব শুরু হয় | এই উপলক্ষে তাঁদের মিষ্টিমুখও করানো হয় | ক্রমশ এটা একটা উৎসবে পরিণত হয় এবং তা ‘হালখাতা’ নামে পরিচিত হয় | যেহেতু ১লা বৈশাখ নতুন বছরের শুরু তাই তা পার্সি নওরোজের মতো নববর্ষ নামে খ্যাত হয় | ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে | ‘

অবিভক্ত বাংলায় সেই থেকে একই সঙ্গে এই নববর্ষ উৎসব পালিত হত ইং ১৪ই বা ১৫ই এপ্রিল | কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে ১৯৬৬ খৃষ্টাব্দের ১৭ই ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে ডঃ শহীদুল্লার সভাপতিত্বে বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি গঠন করা হয় | সেই কমিটির সুপারিশ মতো বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল নববর্ষ পড়ে এবং বাংলা মাসেরও দিনসংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয় | বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত প্রথম পাঁচ মাস হবে ৩১ দিনে আর পরবর্তী সাত মাস হবে ৩০ দিনে | গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার (ইংরাজী) অনুসারে যে বছর লিপ-ইয়ার হবে সে বছর ফাল্গুন মাসে একদিন বাড়বে | তবে এই সুপারিশ গৃহীত হয় ১৯৮৭ খৃষ্টাব্দে | প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গে এই সংশোধিত পঞ্জিকা স্বীকৃত নয় | পশ্চিমবঙ্গের এবং বাংলাদেশেরও হিন্দু বাঙালীরা নাক্ষত্রিক (নক্ষত্র অনুসারে মাস, বছর স্বীকৃত) পঞ্জিকা বা চিরাচরিত পঞ্জিকাই ব্যবহার করে আসছে পূজা-পার্বণের জন্য |

নববর্ষে উৎসব বাঙালির কছে অত্যন্ত প্রিয় উৎসব | জীর্ণ পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে আপামর বাঙালি মহানন্দে বরণ করে নেয় | অনেকেই নতুন জামাকাপড় পড়ে | প্রতিবেশী বন্ধুবান্ধব পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানায়, মিষ্টিমুখ করায় | অনেকেই সপরিবারে মন্দিরে পূজা দেয়, অল্প-স্বল্প দূরত্বের স্থানে বেড়াতে যায় | পূর্বে নববর্ষে অফিস, আদালত, স্কুল-কলেজ ছুটি থাকত | কিন্তু প্রতি বছরে ইংরাজি ও বাংলা দুটি নববর্ষ হওয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইংরাজি নববর্ষে ছুটি দেওয়া হয় | তাই বর্তমানে বাংলা নববর্ষকে উপভোগ করার সুযোগ ক্রমশ কমে আসছে | আমাদের আজ চিন্তা করার সময় এসেছে — এভাবে ব্যবসায়ী মনোবৃত্তি নিয়ে চলতে থাকলে আমরা আমাদের সংস্কৃতিকেই হারিয়ে ফেলব | আজ বাড়িতে ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়া বাঙালি কেবল ভাল-মন্দ খাওয়ার মধ্য দিয়েই নববর্ষ পালন করছে | বহুর মিলনের মধ্যেই যে উৎসবের সার্থকতা সেটা বোধহয় বাঙালি ভুলতে বসেছে |

(পুনর্মুদ্রিত)

আরও পড়ুন:  পূর্ণ হল প্রয়াত বৃদ্ধ শিঙাড়াওয়ালার শেষ ইচ্ছে...জানলে বিস্মিত হবেন

NO COMMENTS