রসের রসত্ব নির্ভর করে সেটা কোন দিনের রস তার ওপরেও | একটু খুলেই বলা যাক | ধরুন যে গাছের রস আজকে খেলেন, তার ঠিক আগের তিন দিন সেই গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়নি | এবং হাঁড়ি বাঁধার আগে গাছের চাঁছা অংশের ওপর পুনরায় হালকা করে চেঁছে দিয়েছে শিউলি | তাহলে আপনি হলেন সেই ভাগ্যবান, যিনি খেয়েছেন জিরেনকাটের (অর্থাৎ গাছকে জিরোতে দেবার পর চেঁছে বা কেটে সংগৃহীত ) রস | স্বচ্ছ টলটলে ঈষৎ লালচে | আসুন, স্মরণ করা যাক, ইরিবালা দেবীর ‘রায়বাড়ী’-তে লেখা সেই লাইনক’টি, “জগাই গাছি খেজুর গাছের জিরেনকাটের রস বিনুকে দিতে হাজির হইয়াছে |” গাছের জিরোনো বা বিশ্রামপর্বের এক চমত্কার বর্ণনা আছে সাহিত্যিক ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়ের ‘তাতারাসি’ গল্পে; “কেমন রসবতী মেয়েমানুষের মতো গাছগুলো | ভরা তিন দিন তিন রাত ফোঁটা ফোঁটা ধারায় ভাঁড় ভর্তি করে দিয়েছে | এখন জিরোবে | তিন দিন অশৌচ | মাটির রস টেনে টেনে গায়ে মাসে পুরিয়ে সুরিয়ে ভারী হবে |”

জিরেনকাটের রস আরো সরেস হবে যদি রসাবতরণের সময়টুকু আকাশ একেবারে মেঘহীন হিম জ্যোত্স্নাময় হয় | হতে পারে, এভাবে পাতাল ফুঁড়ে মর্ত্যের খেজুর গাছ বেয়ে আসা অমৃতের সঙ্গে একটা সুক্ষ্ম মহাজাগতিক যোগসূত্র তৈরি হয় স্বর্গের | রসের উত্তরণ ঘটে যায় | ভাসমান মেঘ, ধুলিকণা, যাবতীয় অস্বচ্ছতার ফ্যাক্টরগুলো এই সুক্ষ্ম স্বর্গীয় যাত্রাপথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় | এক্ষেত্রে নির্মেঘ নিস্কলুস আকাশের সঙ্গে বাতাসে একটা ক্রিস্প, মুচমুচে ঠান্ডার কামড় থাকাটাই যথেষ্ট নয় | বরং যত হাড় কাঁপানো ঠান্ডা পড়বে জিরেনকাটের রসের সরসতা ও মিষ্টত্ব তত গগনচুম্বী হবে | জিরেনকাটের রসেরও আছে তরবেতর | উচ্চকোটির জিরেনকাটের রসের সুবাস, যেন ঘাসের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সবুজ বাতাস |

best quality date juiceখেজুর গাছের রস তো আসলে খেজুর গাছের রাগমোচন | অন্তঃস্থলের গুপ্তকথা | হৃদয়্সুধা | ধরার মাঝে অমৃতবারি | তো ঘরানার তফাতে যেমন একই রাগের পরিবেশন বদলে যায়, তেমনই প্রকৃতির রূপ বদলের সঙ্গে সঙ্গে জিরেনকাটের রসের স্বাদেও তারতম্য ঘটে যায় | ঘোলাটে আকাশ ও হালকা শীতে উত্সারিত জিরেনকাটের রস টক গন্ধযুক্ত হয় | শীতকালের দু’এক পশলা বৃষ্টিতে রস জিরেনকাটের হলেও তা জোলো স্বাদের, গন্ধহীন | হঠাৎ করে দখিনা বাতাস বইতে শুরু করলে জিরেনকাটের রস হালকা ধূসর রঙের বিষাদগ্রস্ত ঘোলাটে পানীয়তে পরিণত হয় |

আরও পড়ুন:  সাংবাদিক তুমি...।।

জিরেনকাটের রস যেদিন নামানো হয়, তার অবব্যহিত পরের তিন দিনের রসকে বলা হয় যথাক্রমে এককাট, দু’কাট বা দোকাট এবং তিনকাট বা তেকাট-এর রস | স্থাভেদে বলা হয় এককাঠি, দু’কাঠি, তিনকাঠির রস | এক নম্বর, দু’নম্বর, তিন নম্বর রস – এভাবেও বলা হয়ে থাকে, মূলত শহরাঞ্চলে | আদর করে কোড ল্যাঙ্গুয়েজে বড়, ছোট, মেজ এভাবেও ডাকা হয়ে থাকে | কোথাও বা জিরেনকাটের রসকেই বলা হয় এককাটের রস |

রসের মিষ্টত্ব নির্ভর করে যাদের ওপর সেগুলির অন্যতম মাটির প্রকৃতি | যেমন দক্ষিণ ২৪-পরগণা এবং পূর্ব মেদিনীপুর – দুই জেলারই গা ঘেঁষে রয়েছে সমুদ্র | নোনা জলের জোয়ার-ভাঁটা | কিন্তু দু’য়ের মধ্যে দক্ষিণ ২৪-পরগণা নদীবহুল | সেসব নদীতে জোয়ারের সময় ঢুকে পড়ে সমুদ্রের নোনা জল | আবার নদীখাতের অগভীরতাসহ নানান কারণে বন্যার প্রকোপও বেশি | ফলে বর্ষাকালে এবং ভরা কোটালের সময় নদীর পাড়  উপচে ঢুকে পড়া নোনা জল নদীর প্লাবনভূমি ছাড়িয়ে আরো অনেকদূর পর্যন্ত প্রবেশ করে | তাই দক্ষিণ ২৪-পরগণার থেকে পূর্ব মেদিনীপুরের রসের স্বাদ উত্তম | বিশেষত পূর্ব মেদিনীপুরের যেসব অঞ্চলের মাটিতে কিছুটা বেলেমাটি রয়েছে | হালকা নোনা হাওয়া অধিক সংখ্যায় এবং ভালো মানের খেজুর গাছ জন্মানোর অনুকূল কিন্তু মাটিতে নুনের উপস্থিতি জাত রসের চিরশত্রু | তাই জয়নগর-বহড়ু দক্ষিণ ২৪-পরগণার অনেকটা দক্ষিণে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও সেখানকার বাতাসে নোনাভাব থাকলেও মাটিতে তার উপস্থিতি মাত্রাতিরিক্ত নয় | তাই এই অঞ্চলের খেজুরগাছের মান উন্নত ধরণের | রসও হয় ভালো জাতের | ভৌগলিক কারণেই উত্তর ২৪-পরগণা (বিশেষত বসিরহাট), বাংলাদেশের যশোরের খেজুর রস অত্যন্ত উচ্চমানের |

 

গত পর্বের লিং – http://banglalive.com/the-tale-of-date-juice-known-as-kejur-ros-in-bengalpart2/

 

১ম পর্বের লিং – http://banglalive.com/the-tale-of-date-juice-known-as-kejur-ros-in-bengal/

 

- Might Interest You

NO COMMENTS