জলদ গুপ্ত
জলদ গুপ্ত লেখেন না, ভাবেন। নিজেকে মনে করেন মুদির দোকানের মালিক। কোথায় কোন মশলা আছে শুধু সেটুকুই উনি জানেন, খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী কাগজে মুড়ে দিয়ে দেন...ব্যস। সিধুজ্যাঠার মত অনেক কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও অন্যদের অসুবিধা হবে বলে কিছুই করেন নি। কবিতা, নাটক লিখতে পছন্দ করেন আর পাগলের মত পছন্দ করেন সঙ্গীত। পাহাড়ি জঙ্গলের টিলায় বসে হেঁড়ে গলায় গান আর দিনে ১৫ কাপ চায়ের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। আদিখ্যেতাকে ঘেন্না করেন, তর্ক করতে ভালোবাসেন। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে কোন লেখক থাকবে না।

না, এটা কোন খবর নয়। কোন মিটিং বা সম্মেলনের রিপোর্টিং নয়। সম্পাদকের কাছে গালাগাল খেয়ে হঠাৎ পাওয়া কোন চমকও নয়, এটা একটা স্বপ্ন, ভোরের স্বপ্ন। আজ অফিসে স্যানালদার ফেয়ারওয়েল ছিল, বেশ একটা উৎসব উৎসব মেজাজ। স্যান্যালদাকে ফুল, ছাতা, শাল, আর রামায়নের সঙ্গে সিরাজের মটন বিরিয়ানি আর চিকেন চাঁপদেওয়া হল। ওনার মত হাই প্রেশারের রুগীর কাছে সবকটি আইটেমই হাই প্রেশার। অফিসে কোন দিন যাকে বই পড়তে দেখিনি তিনি নাকি এই বুড়ো বয়সে কেজি পাঁচেক ওজনের একটি বই পড়বেন। এই চল্লিশ বছরের চাকরি জীবনে টিফিনে মুড়ি শশা বা খুব বেশি হলে চিঁড়ের পোলাও ছাড়া অন্যকিছু যিনি খান নি তিনি নাকি দুম করে মটন বিরিয়ানি আর চিকেন চাঁপ চিবোবেন ! আমাদের পয়সায় এটাই ওনার শেষ খাওয়া বলেই হয়ত এই আয়োজন…

জানি না কিন্তু অনুষ্ঠানে বলা ওনার শেষ কথাগুলো সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সঙ্গীত ভালবাসতেন, টুকটাক চর্চাও করতেন এটা জানতাম কিন্তু সঙ্গীত সম্পর্কে এত জ্ঞান, এত পড়াশুনা ছিল জানতাম না। আমাদের কাছে নিজেকে বেশ যত্ন করেই লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি।  বিশেষ করে ওনার দুই প্রিয়তম সঙ্গীতব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ এবং সলিল চৌধুরীকে নিয়ে উনি যা বললেন ভাবা যায় না। বললেন, এই দুই মানুষকে নিয়েই স্বচ্ছন্দে বেঁচে থাকা যায়। এরা কাছে থাকলে একাকিত্ব শব্দটা খুব পানসে হয়ে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি…।

অফিস থেকে ফিরে বেশ আয়েশ করে অফিস থেকেই আনা মটন বিরিয়ানি আর চিকেন খেয়ে  হোয়াটস অ্যাপ করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। তারপর একেবারে ভোরবেলায় এই স্বপ্ন। শুনেছি ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়… সত্যিই যদি এই স্বপ্নটা সত্যি হয়ে ওঠে তবে এই বাংলা তথা ভারতবর্ষে একটা নতুন ভোর আসবেই। ঘাটশিলার মত একটা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে সুর্যোদয় দেখতে যাচ্ছি, ফাল্গুন মাস, চারদিকে পলাশ ফুল ফুটেছে। হঠাৎ দেখি দূর থেকে রবিঠাকুর হেঁটে আসছেন। আমি কি করবো ভাবতে ভাবতেই পাশে জঙ্গলে ঢুকে যাওয়া হেলে সাপের মত একটা সরু রাস্তায় চোখ পড়লো, চমকে উঠে দেখলাম সলিল চৌধুরী। কালবিলম্ব না করে একটা টিলার পিছনে লুকিয়ে পড়লাম। তারপর যা দেখলাম এবং শুনলাম তা ‘জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না’। এই পাওয়া আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি হয়ে থাকবে। সঙ্গীতের দুই ভগবান তাদের তৈরি সঙ্গীতের মাধ্যমে খুব সাবলীলভাবে কথা বলছেন। তাদের কথোপকথনটা পুরোটাই সুরে। সেই অসাধারণ কথোপকথনের পুরোটা সবার কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

আরও পড়ুন:  প্রিয় প্রিয়, বিদায়

সলিল চৌধুরীকে দেখতে পেয়ে রবিঠাকুর বললেন…

রবি –  এত দিন যে বসেছিলাম পথ চেয়ে আর কাল গুনে … দেখা পেলেম ফাল্গুনে।

সলিল – যদি কিছু আমারে শুধাও,

           কি যে তোমারে কব…  নীরবে চাহিয়া রব… না বলা কথা বুঝিয়া লও…

রবি – তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে, তখন ছিলেম বহু দূরে কিসের অন্বেষণে…

সলিল – যদি নাম ধরে তোমায় ডাকি

           কেন সবুজ পাতার আগে সাড়া দাও,

           বনে বনে নব মঞ্জরী কেন ফুলে ফুলে ভরে যায় ?

রবি – আমি কেবলই স্বপন করেছি বপন বাতাসে, তাই আকাশকুসুম করিনু চয়ন হতাশে।

         আজ, তোমায় কিছু দেব বলে চায় যে আমার মন,

         নাই বা তোমার থাকলো প্রয়োজন।

         যখন তোমার পেলেম দেখা,

         অন্ধকারে একা একা, ফিরতেছিলে বিজন গভীর বন।

সলিল – মরি হায় হায় গো হায়,

          এলে যখন আমার ভাঙ্গা ঘরে

          আমার ঝরা মালায় নিভু নিভু সুরভী শূন্য আঙ্গিনায়।

রবি – গানে গানে তব বন্ধন যাক টুটে,

        সুরহারা প্রাণ বিষম বাঁধা,

        সেইতো আঁধি সেই তো ধাঁধা,

        গান ভোলা তুই গান ফিরে নে যাক সে আপদ ছুটে।

সলিল –  পা – পা, মা, গা, রে, সা – তার চোখের জটিল ভাষা,

             ধা – ধা, পা, মা, গা, রে – পড়ে পড়ে বোঝার আশা,

             সা, মা, পা, ধা, নি, সা – জানি শুধুই দুরাশা।

রবি – এই তো তোমার আলোকধেনু সুর্য তারা দলে দলে,

        কোথায় বসে বাজাও বেণু চরাও মহাগগন তলে।

সলিল – ওই যে সবুজ বনবীথিকা, দূর দিগন্তের সীমানায়,

           ছোট্ট নদীটির ওই বাঁকে – মোর বীণা হোথায় থাকে।

রবি – গাও বীণা গাও রে… অমৃত মধুর প্রেম গান মানব সবে শুনাও রে।

আরও পড়ুন:  ‘অভিমান’ তাঁর জীবনগাথা? ভালো বাজাতেন বলে স্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবীর আঙুল কেটে দিয়েছিলেন রবি শংকর!?

         মধুর তানে নীরস প্রাণে মধুর প্রেম জাগাও রে।

সলিল – এইবার স্বপ্নের বন্ধন খুললাম।

           মুক্তির ঝর্নার কুলু কুলু সুরে আমি এই গান গাই,

           চাওয়া আর পাওয়া তার হিসাব তো কিছু নাই।

রবি – আকাশ জুড়ে শুনিনু ওই বাজে…

        তোমারই নাম সকল তারার মাঝে।

        সে নামখানি নেমে এল ভুয়ে,

        কখন আমার ললাট দিল ছুঁয়ে।

(এসময় সলিল চৌধুরী হাটুগেড়ে বসে রবিঠাকুরকে প্রণাম করেন।)

সলিল – এবার আমি আমার থেকে আমাকে বাদ দিয়ে অনেক কিছু জীবনে যোগ দিলাম…

রবি – এই লভিনু সঙ্গ তব সুন্দর হে সুন্দর,

        পুণ্য হল অঙ্গ মম, ধন্য হল অন্তর।

সলিল – জানি না, জানি না কোন সাগরের ঢেউ এসে আমার হৃদয়ে লেগেছে

            চেতন সীমানা ছেড়ে অচেতনে মন মোর সহসা জেগেছে।

            আমি অন্তহীন কার অন্তরে, যা শুনতে পাই তা আনমনা

            কোন মৃত্যুহীন গান যৌবনের, কোন পুর্ণিমা কবি কল্পনা।

রবি – তোমার গীতি জাগালো স্মৃতি নয়ন ছলছলিয়া

         বাদল শেষে করুণ হেসে যেন চামেলি কলিয়া

         এবার বিদায় বেলার সুর ধরো ধরো

         তোমার শেষ ফুলে আজি সাজি ভরো ।

সলিল – দাঁড়াও আমি ঠিক করে নি যতেক বোঝাপড়া

           থাক পিছনে পড়ে যত সাধের ভাঙ্গাগড়া

           কুল ভাসানো নদী হয়ে দুকুল বাঁধা হারা

           যখন করেছো ঘর ছাড়া।

রবি – সেই তো তোমার পথের বন্ধু সেই তো

        দূর কুসুমের গন্ধ এনে খোঁজায় মধু সেই তো।

সলিল – আমি বলি তোমায় দূরে থাকো কেন কথা রাখ না

           শুধু মনে মনে কাছে ডাকো তুমি কেন ডাকো না…

রবি – আজি মম মন চাহে জীবনবন্ধুরে

        সেই জনমে মরণে নিত্যসঙ্গী… নিশিদিন সুখে শোকে।

আরও পড়ুন:  প্রেমে শরীর উঁকি দেয় না : বিশ্বনাথ বসু

সলিল – নিজেরে হারায়ে খুঁজি, তোমারই নয়ন মাঝে

           চাহিতে পারিনি কিছু, চাহিয়া মরি যে লাজে…

           কি যে গান গেয়েছি ভুলে, কি কথা কয়েছি ভুলে

           সে সবই আজিকে শুধু, এসেছে ব্যাথারই সাজে

রবি – তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে মোর প্রাণে

        এ আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে।

        আঁধারের তারা যত রয় চেয়ে, কোথাকার পাগল হাওয়া বয় ধেয়ে……

সলিল – পাগল হাওয়া…

           কি আমারই মতন তুমিও হারিয়ে গেলে

           ফুলেরও বনে, হাজারও রঙের মেলায়

           সুরভী লুটের খেলায়, তারে নাহি পেলে……

রবি – তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায় তারি পারে

         দেবে কি গো বাসা আমায় একটি ধারে ?

         আমি শুনব ধ্বনি কানে আমি ভরব ধ্বনি প্রাণে… ।

         এখন আমার সময় হল, যাওয়ার দূয়ার খোলো খোলো

          অলখ দেশে হৃদয় টানে।           

সলিল – না… যেও না…।।

রবি – আবার যদি ইচ্ছা করো, আবার আসি ফিরে

       দুঃখ সুখের ঢেউ খেলানো এই আকাশের তীরে

       বাজিয়ে চলি পথের বাঁশি, ছড়িয়ে চলি চলার হাঁসি

       রঙ্গিন বসন উড়িয়ে চলি জলে স্থলে।

সলিল – মন লাগে না……

           তুমি বিনা মোর জীবনও চাঁদনী বিহীনা রজনী…।

রবি – মধুর তোমার শেষ যেন না পাই প্রহর হল শেষ

        ভুবন জুড়ে রইলো লেগে আনন্দ আবেশ।

 

ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। চমকে বিছানায় উঠে বসে চারদিকে তাকাতে লাগলাম। কোথায় সেই পাহাড়ি রাস্তা, সেই পলাশ, সেই পথের পাশে ফুটে থাকা অনামী বনফুল ? কোথায় গেলেন রবি ঠাকুর, সলিল চৌধুরী ? জানলার ফাঁক দিয়ে একফালি রোদ আমার বিছানায়। দূরে আজানের শব্দ, ঘন্টার ধ্বনি… মনে হল এই তো রবি ঠাকুর এই তো সলিল চৌধুরী… এই তো সঙ্গীত।

4 COMMENTS

  1. ha, thik. asole amar mone hoy kathopokathoner proyojone lekhok lekhatite besh kichu shobder e poriborton korechen. valo laglo.

  2. হ্যাঁ, এটা বা ‘গাও বীণা বীণা গাও রে’ কে গাও বীণা গাও রে করা হয়েছে। আবার ‘ওই যে সবুজ বনবীথিকা…… মোর বীণা হোথায় থাকে’ লাইনে আসল কথাটা হল ‘মোর প্রিয় হোথায় থাকে’…এই ধরনের কিছু ছোট ছোট পরিবর্তন লেখাটার প্রয়োজনে সঠিকভাবে আনা হয়েছে, বিষয়টা বেশ অভিনব এবং উপভোগ্য ।