কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের নবম দিন | ভীষ্মের নেতৃত্বে এগিয়ে যাওয়া কৌরব বাহিনীর সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে নাভিশ্বাস পাণ্ডবদের | নবম দিনের সূর্যাস্তের সঙ্গে বসল মিটিং | পাণ্ডব থিঙ্ক ট্যাঙ্ক একমত হল, ভীষ্মকে না থামালে যুদ্ধে হার অবধারিত | এদিকে ভীষ্মের আবার ইচ্ছামৃত্যু | ফলে তাঁকে মারাও যাবে না |

উপায় বের করলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন | পাণ্ডবদের সেনাপতি বললেন, শুধু একটা উপায়েই পিতামহ ভীষ্মকে নিরস্ত করা যায় | যদি তাঁর সামনে কোনও সশস্ত্র মহিলাকে আনা যায় | তাহলেই ধনুক নামাবেন ভীষ্ম |

কিন্তু তখন আর্য সমাজে যুদ্ধক্ষেত্রে নারীরা ব্রাত্য ছিলেন | তাই কীভাবে নিরস্ত করা যায় পিতামহকে ? তারও উপায় দিলেন ধৃষ্টদ্যুম্ন | বললেন, দ্রুপদ রাজার আর এক সন্তান শিখণ্ডীর কথা | স্ত্রী যৌনাঙ্গ থাকলেও যিনি বড় হয়েছিলেন পুরুষ হিসেবে | তিনি ছিলেন দ্রৌপদী-ধৃষ্টদ্যুম্নের বড় ভাই |

ঋষিরা ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, স্ত্রী হিসেবে জন্ম গ্রহণ করা শিখণ্ডী একদিন পুরুষ হবেন | তাই দ্রুপদ তাঁকে পুত্রসন্তান হিসেবে বড় করতে থাকেন | শেখানো হয় অস্ত্র এবং রথ চালনা |

শুধু তাই নয় | বিয়েও দেওয়া হয় শিখণ্ডীর | দশার্ণের রাজা হিরণ্যবর্ণের কন্যার সঙ্গে | কিন্তু শিখণ্ডী-স্ত্রী মানলেন না এই বিয়ে | যেই বুঝলেন তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়েছে এক মহিলার সঙ্গে, তিনি চলে গেলেন বাবার কাছে |

মেয়ের এই অপমানে ক্ষিপ্ত রাজা হিরণ্যবর্ণ বিশাল বাহিনী নিয়ে দ্রুপদের রাজ্য পাঞ্চাল আক্রমণ করতে চাইলেন | এই বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত শিখণ্ডী চলে গেলেন বনে | আত্মঘাতী হতে চাইলেন |

বনে শিখণ্ডীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল যক্ষ স্থুনাবর্নের সঙ্গে | শিখণ্ডীর অবস্থা দেখে করুণা হয় ওই যক্ষপুরুষের | তিনি একরাতের জন্য পৌরুষ দেন শিখণ্ডীকে | শ্বশুরমশাইয়ের পাঠানো এক নারীর সঙ্গে সহবাস করে নিজের পৌরুষের প্রমাণ দিতে হয় শিখণ্ডীকে | ফিরে আসেন তাঁর স্ত্রী |

কিন্তু এতে বিষম রেগে যান যক্ষরাজ কুবের | অভিশাপ দেন স্থুনাবর্ণকে | যতদিন শিখণ্ডী বেঁচে থাকবেন ততদিন পৌরুষহীন থাকবেন ওই যক্ষ | এবং শিখণ্ডী থাকবেন পুরুষ হিসেবে | ফলে এক রাতের জন্য পাওয়া পৌরুষ আজীবন থেকে গেল শিখণ্ডীর কাছে | তিনি একাধারে হলেন স্ত্রী | অন্যদিকে পুরুষ | সত্যি হল ভবিষ্যৎবাণীও | যে‚ শিখণ্ডী নারী হয়ে জন্মালেও একদিন পুরুষ হবেন |

ধৃষ্টদ্যুম্নের প্রস্তাবে সম্মত হলেন শ্রীকৃষ্ণ| শিখণ্ডীর গত জন্মের অম্বা পর্বও জানতেন তিনি | অম্বা-অম্বালিকা ও অম্বিকা , তিন বোনকে অপহরণ করেছিলেন ভীষ্ম | তাঁর ভাই বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য | অম্বা তাঁকে জানান,তিনি অন্য কারওর বাগদত্তা |

এই শুনে ভীষ্ম তাঁকে ছেড়ে দেন | কিন্তু অম্বাকে পরপুরুষ ছোঁয়ায় প্রেমিকের কাছে ব্রাত্য হয়ে যান | প্রতিশোধ নিতে ব্যাকুল অম্বা মহাদেবের বর পান | বর ছিল, পরের জন্মে তিনি ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হবেন|

বর পেয়ে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন অম্বা | পরের জন্মে তাঁর জন্ম হয় দ্রুপদ সন্তান শিখণ্ডী হিসেবে | শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শমতো সেই শিখণ্ডীকে রথের সামনে দাঁড় করিয়ে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দশম দিনে যাত্রা করেন অর্জুন |

না মানব-না মানবী শিখণ্ডীকে দেখে ধনুক নামিয়ে নিলেন ভীষ্ম | কিছুতেই রাজি হলেন না অ-পুরুষ একজনের সামনে অস্ত্র সংযোজন করতে | তখন শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শমতো অর্জুন শরশয্যায় বিদ্ধ করেন পিতামহকে |

মহাভারতের শিখণ্ডী পর্ব কি তাহলে তথাকথিত পৌরুষের বিরুদ্ধে রূপান্তরকামীদের জয়ধ্বনি ?

আরও পড়ুন:  গলা জড়িয়ে স্নান তরুণী কন্যার‚ পিঠে চেপে খেলা নাতনির‚ এ বাড়িতে পোষা বাঘেরা যেন আদুরে বিড়াল

NO COMMENTS