“এই বাংলো?”

সরিৎ একেবারে গেটের সামনে গিয়ে ব্রেক কষেছে | এতক্ষণ যে জঙ্গলটা এত গাঢ় হয়ে রাস্তার দু’পাশে ঝুঁকে ছিল,সেটা এখানে অনেক পাওনা | বেশ খোলামেলা ফাঁকা জায়গা চারপাশে  | আর সেই ফাঁকা জায়গাটার ঠিক মাঝখানে ফরেস্ট বাংলোটা দাঁড়িয়ে |

দীননাথ গাড়ির পেছনের দরজাটা খুলে নেমে পড়ল চটপট | লম্বা একটা শ্বাস টেনে নিয়ে দু’হাতের তালুদুটো ঘষে নিল ক’বার, তার পর খুশি খুশি গলায় বলল, “ওহ! দিনের আলো ফুরোয়নি দ্যাখ! জঙ্গলের মধ্যে কেমন মনে হচ্ছিল সন্ধে নেমে গেছে বুঝি |”

সত্যিই তাই | জঙ্গলের রাস্তাটাতে চারপাশ এত অন্ধকার লাগছিল, হেডলাইট পর্যন্ত জ্বালাতে হয়েছে আমাদের | মূলত শালের জঙ্গল, তার সাথে অল্পবিস্তর সেগুন আর মহুয়া | এর আগে কখনও এত ঘন আরণ্যক পথে আমরা লং ড্রাইভে বেরোইনি | এবার যে অ্যাডভেঞ্চারটা হয়েই গেল, তার একটা বড় কারণ সরিতের নতুন গাড়ি | আগে আমার ভাঙাচোরা অ্যাম্বাসাডারটাতে চড়ে আমরা চার বন্ধু ঘুরতে-বেড়াতে গেছি বটে, কিন্তু সে বেচারি এমন একটানা আড়াইশো কিলোমিটার ছুটতে পারত না | তাই সরিৎ এই নতুন মজবুত মাহিন্দ্রা গাড়িটা কেনার পরেই আমাদের প্ল্যান ঠিক হয়ে যায় | এবার আর শহর-মফস্বলের হাইওয়ে দিয়ে ড্রাইভ নয় | স্ট্রেট জঙ্গল | চারপাশে স্তব্ধ বনানী, চাকার নীচে শুকনো পাতার মুড়মুড়…আর এদিক ওদিক থেকে ভেসে আসা পাখির ডাক | ভাগ্য ভাল থাকলে গোটাকয় জন্তুজানোয়ারের দৌড়াদৌড়িও চোখে পড়বে | আর কী চাই |

না, কথাটা একশো ভাগ সত্যি হলো না | আরো কিছু চাই | এবং সেই ‘আরো’টুকুর হদিশ এনেছিল শ্যাম | মোটামুটি কিলোমিটার হিসেব করে সে জানিয়েছিল, ফরেস্টের ঠিক মধ্যিখানে থাকা এই বাংলোটায় পৌঁছতে আমাদের সন্ধে গড়িয়ে যাবে | এক্কেবারে আইডিয়াল টাইম | রাত্তিরটা এই বনবাংলোয় কাটিয়ে ভোরবেলা আবার রওনা | এবং এই রাত্তিরটাই হতে পারে স্পেশাল |

“হোয়াটস স্পেশাল ইন আ ফরেস্ট বাংলো?” দীননাথ ভুরু কুঁচকেছিল, “আমার এক্সপেরিয়েন্স বলে, এইসব সাবেক বনবাংলোগুলো বেশিরভাগই ভাঙাচোরা হয় | পরিকাঠামো খারাপ | টয়লেট বাজে | নোংরা | সারা রাত মশার জ্বালায় ঘুমোতে পারা যায় না |”

“সে সব জানি ভাই | তবে এই পার্টিকুলার বাংলোটায় রাত কাটানোর থ্রিল আলাদা | তোরা সবাই সাহসী লোকজন, আশা করি এনজয় করবি,” একটু চুপ করে থেকে গলায় একটা নাটুকে মোচড় এনে শ্যাম বলেছিল, “বাংলোটা কিন্তু হন্টেড |”

আমি হেসে ফেলেছিলাম, “ভূতুড়ে? রিয়েলি?…গ্যারান্টি দিচ্ছিস তো?”

শ্যাম হাসেনি | বলেছিল, “আমি খুব বিশ্বস্ত সোর্স থেকে জেনেছি | কিছু একটা কেস আছেই ওখানে | যারা রাত কাটাতে গেছে, প্রত্যেকেরই অদ্ভুত অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছে |”

“মানে? ভূত দেখেছে স্বচক্ষে?” সরিৎ ঝুঁকে এসেছিল |

“অত ডিটেলস পাইনি | তবে মুখে মুখে কথাটা ছড়িয়েছে | এমনও শুনেছি যে, ওখানে যে কেয়ারটেকার-কাম-চৌকিদার থাকে, সে লোকটাই নাকি বেশ ফিশি|”

“ফিশি মানে? সেই ভূত নাকি?” দীননাথ হেসে ফেলেছিল |

শ্যাম মাথা নেড়েছিল দু’বার | “জানা যায় না ঠিকঠাক | ক’বছর আগে নিজের গলায় ফাঁস লাগিয়েছিল এক চৌকিদার | তারই ভূত নাকি ঘোরাফেরা করে ওখানে | আবার এও শোনা যায়, গলায় ফাঁস লাগিয়েছিল বটে, হাসপাতালে বেঁচে যায় | কোনটা যে সঠিক, এত দূর থেকে বলা শক্ত | হাওয়ায় ওড়া গুজব কি না | বাট দেয়ার ইজ সামথিং ফর শিওর | সেটাই একবার যাচাই করে দেখতে চাই | তোরা তো জানিস, এই ব্যাপারটা আমার ফিল্ড অফ ইন্টারেস্ট | কত হানাবাড়ি-জঙ্গল-শ্মশান-মশানে ঢুঁ মেরেছি অশরীরীর খোঁজে | সরিৎ গাড়িটা কিনেই ফেলল যখন, আর এই বাংলোর সন্ধানটাও টাটকা টাটকা মিলে গেল, দুয়ে-দুয়ে চার করেই ফেলা যাক না…কী বলিস?”

আমি একটা বুড়ো আঙুল তুলে বলেছিলাম, “আমি আছি |”

সরিৎ আর দীননাথ রাজি হয়েছিল সঙ্গে সঙ্গেই | আমরা চারজনেই ভূত-প্রেত ব্যাপারটাতে ভয়ের কিছু দেখি না | শ্যাম হল অনুসন্ধানী, ভূতের খোঁজ নিয়ে বেড়ায় | দীননাথ প্রখর নাস্তিক, ভূত বলে কিছু থাকাতেই পারে না – এই ওর বিশ্বাস | সরিৎ আর আমি, যাকে বলে, অজ্ঞেয়বাদী | থাকুক বা না থাকুক, আমাদের কিচ্ছু যায় আসে না | যদি চোখের দেখা সম্ভব হয়, সে তো ভাল কথা | একটা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে |

অতএব, যথা ইচ্ছা তথা কাজ | দুশো একুশ কিলোমিটার গাড়ি হাঁকিয়ে এই ভর সন্ধের মুখে এই বাংলোয় এসে ওঠা |

চতুর্দিকে ঠাসা জঙ্গলের মধ্যে এক চিলতে ফাঁকা জমি কাঠের বেড়া দিয়ে ঘেরা, তার মাঝখানে একতলা বাড়ি | পরপর তিনখানা ঘর, সামনে বারান্দা | দীননাথের আশঙ্কাটা একেবারে মিথ্যে ছিল না, বাংলোটাকে বাইরে থেকে দেখে খুব একটা আরামদায়ক মনে হচ্ছে না বাস্তবিকই | লোকজন খুব একটা আসে-টাসে না বোধহয় | বেশ জরাজীর্ণ, বহুদিনের অযত্নের ছাপ সর্বাঙ্গে | হন্টেড হাউস হয়ে ওঠার পক্ষে একদম উপযুক্ত | আমরা যখন বুকিং করতে যাই তখনই অফিসের বাবুরা একটু আমতা-আমতা করেছিল | তার মানে ভূতের গুজবটা ছড়িয়েছে ভালই |

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১১)

শ্যাম অবিকল শিকারী কুকুরের ভঙ্গিতে বার পাঁচেক হাওয়া শুঁকল | তারপর চাপা গলায় বলল, “আছে | কিছু একটা তো আছেই | আই ফিল ইট |”

সরিৎ বলল, “ভূতের গন্ধ পাওয়া যায়?”

“উঁহু | ডিস ইজ সিক্সথ সেন্স | ঘাঁটতে ঘাঁটতে তৈরি হয় | কুন্ডুগিরির ভাঙা রাজবাড়ি আর বাজিতপুরের শ্মশানে ঠিক এই রকম ফিলিং হয়েছিল |”

“দেখতে তো পাসনি কিচ্ছু?”

“না, চোখের দেখাটা হয়নি | কিন্তু দু’জায়গাতেই অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল | রাজবাড়ির বৈঠকখানায় যখন রাত কাটাচ্ছিলাম, বাতিটা বারবার নিভে যাচ্ছিল | বার বার জ্বালাই, দু’তিন মিনিটের মধ্যেই নিভে যায় | ঠিক যেন কে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিচ্ছে | অথচ শীতকাল, সব জানলা বন্ধ, হাওয়া নেই একটুও |”

দীননাথ এবার তার যুক্তিবাদের ঝাঁপি খোলে | গম্ভীর গলায় বলে, “বহুদিনের বন্ধ ঘরে নানারকম গ্যাস জমা হয় | অক্সিজেন কম থাকে | বাতি নিভে যাওয়ার পিছনে ভূত নেই, প্লেন সায়েন্স |”

শ্যাম তর্ক করে না কখনও, শুধু অদ্ভুত একটা হাসি খেলা করে ওর ঠোঁটে | সেইরকম হাসিটা ঝুলিয়ে রেখেই বলল, “বাজিতপুরের শ্মশানের ধারেই গঙ্গা-যাত্রীর কুটির | সেখানে রাত কাটানোর সময় বাইরের দাওয়ায় পরিষ্কার পায়চারির আওয়াজ পেয়েছি | কাশির শব্দও | যতবার টর্চ নিয়ে দরজা খুলেছি, কেউ কোত্থাও নেই | অন্তত আটবার হয়েছে, মাঝরাত থেকে ভোর – এইটুকু সময়ের মধ্যে!”

“মনের ভুল | বিশ্বাস করতে চেয়েছিস বলেই এক শব্দকে অন্য শব্দ বলে ভ্রম হয়েছে | ছুঁচো দৌড়েছে, তুই ভেবেছিস মানুষ হাঁটছে | গাছের ডালে ঘষার আওয়াজ, তুই ভেবেছিস কাশি | শ্রুতিবিভ্রম | সাইকোলজিতে আছে |”

তর্কটাকে আর বাড়তে দিই না | বলি, “তোরা কি সন্ধে গড়িয়ে যাওয়া অব্দি বাইরে দাঁড়িয়ে ডিবেট করবি না কি? চল আগে ভেতরে গিয়ে জমিয়ে বসি, তারপর সারারাত তো পড়ে আছে |”

“চৌকিদারটাকে ডাকা যাক | ত্রিসীমানায় তো পাত্তা নেই কারও,” বলে সরিৎ গম্ভীর গলায় বেশ মেজাজি হাঁক ছাড়ে একটা. “চো –ও –কি –দা –র |”

দীননাথ খুক করে হাসে, “চৌকিদারই নাকি ভূত? দ্যাখো, কঙ্কালের ওপর উর্দি পাগড়ি চাপাতে একটু টাইম লাগবে নিশ্চয়ই?”

শ্যাম গম্ভীর হয়ে বলে, “ভূত মানেই কঙ্কাল এটা একটা বস্তাপচা হাস্যকর ধারণা |”

বলতে বলতেই দেখা যায়, উত্তরদিকের একটা খুপরি থেকে নীল রঙের ফতুয়া আর খাকি প্যান্ট পরা একটা আধবুড়ো লোক হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসছে | সরিৎ ছদ্ম ইয়ার্কির গলায় বলে, “অ্যাটেনশন | দ্য অ্যালেজেড ঘোস্ট ইজ কামিং |”

আমার হেভি হাসি পাচ্ছিল | জলজ্যান্ত একটা গোমড়াথেরিয়াম গোছের লোক, সে না কি ভূত! গুজবের কোনও মা-বাবা নেই দেখা যাচ্ছে |

দীননাথ বলল, “ইস আলোটা না কমে গেলে এখনই দেখা যেত ছায়া পড়ছে কিনা !”

“সন্ধেবেলা টর্চ জ্বেলে দেখে নেব’খন,” আমি বললাম | “মোট কথা এ লোকটা যদি ভূত হয়, তবে আমরাও তাই ! যত্তসব রাবিশ রিউমার !”

এসে পড়েছে লোকটা | আমাদের চারজোড়া সন্দিগ্ধ দৃষ্টির সামনে কেমন যেন জড়োসড়ো | মরে-আসা বিকেলের আলোয় আমরা সবাই বেশ স্পষ্ট করেই দেখতে পাচ্ছিলাম | নিতান্ত নিরীহ ছাপোষা লোক একটা, মাথার চুল এলোমেলো, ফতুয়াটা বেশ ময়লা | সরিৎ ওকে আপাদমস্তক জরিপ করে নিয়ে কড়া গলায় বলে, “থাকা যাবে তো রাত্তিরটা? ঘরদোরের অবস্থা দেখে তো সুবিধের মনে হচ্ছে না !”

“আজ্ঞে থাকা যাবে খুব | একটু ঝাড়ু মেরে দিলেই,” লোকটা ঈষৎ নুয়ে পড়ে হাত কচলায়, “দশটা মিনিট টাইম দ্যান, সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি |”

“ইলেকট্রিক কানেকশন ঠিকঠাক আছে তো?” দীননাথ জিজ্ঞেস করে |

লোকটা খুব অপরাধী অপরাধী ভঙ্গি করে বলে, “ওইটাই একটু অসুবিধে হুজুর | চারমাস ধরে কানেকশন খারাপ হয়ে আছে | অফিসে জানাই, সেরে দিয়ে যায়, ফের হপ্তা না ঘুরতেই আবার…| বলছে নাকি সব তার-ফার পুরো পাল্টাতে হবে | “

“তার মানে আলো নেই?”

“বাতি আছে হুজুর | অফিস থেকেই সাপ্লাই দিয়ে গেছে | আর, মানে,” একটু ইতস্তত করে চৌকিদার বলে, “ভিজিটার তো আসে না খুব একটা |”

আমি ফস করে বলে ফেলি, “ কেন আসে না?”

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ১২)

“সে আমি কী জানব বাবু,” একবার আমার দিকে চোরা চাউনি দিয়েই মাথা নামিয়ে নেই লোকটা | তারপর বলে, “আপনারা একটুখানি দাঁড়াননা এইখানে, ঘর সাফ করেই আপনাদের ডেকে নিচ্ছি |”

লোকটা আবার পিছন ফিরে হনহনিয়ে হেঁটে গেল | আমার দেখার ভুল কি না জানিনা, কেমন যেন তবে মনে হল ওর পায়ের পাতাদুটো মাটিতে ঠেকছে না পুরো | কীরকম যেন ভেসে ভেসে চলে গেল…| ধুর! কম আলোয় অমন কত কী মনে হয় |

গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে দীননাথ বলে উঠল, “এইখানেই একবার লোকটাকে জেরা করা শুরু করে দিলে হত | গলায়-দড়ি কেসটা কি ওরই, না  কি…”

সরিৎ হাসল, “তার চেয়ে আরও সরাসরি কোশ্চেন করাই বেটার | অ্যাই ঝেড়ে কাশো তো | তুমি ভূত না জ্যান্ত?”

শ্যাম অনেকক্ষণ কথা বলেনি | আমি ওর পেটে একটা খোঁচা দিয়ে বললাম, “কী বে? চুপ কেন? সিক্সথ সেন্স কিছু বলল?”

শ্যামা খুব চাপা খসখসে একটা স্বরে বলল, “লোকটার গলায় একটা দাগ আছে কিন্তু | গোল | কালশিটের মতন | ফাঁসের দাগের মতোই অনেকটা |”

আমাদের চারপাশে পাতলা অন্ধকার নেমে আসছে | শ্যামের কথাটা শুনে আমরা কেউই কিছু বললাম না সঙ্গে সঙ্গে | সরিৎ অনেকক্ষণ পর একটু উসখুস করে উঠল, “এ কী রে ভাই ! দশ মিনিটের জায়গায় বিশ মিনিট দাঁড়িয়ে আছি যে! সাফাই করব বলে লোকটা উবে গেল না কি?”

বলতে-না-বলতেই আমাদের বাঁ পাশ থেকে একটা কচি গলা শোনা গেল | “চলে আসুন বাবুরা | ঘরদোর রেডি |”

আবছা অন্ধকারের মধ্যে কখন যে বাচ্চা ছেলেটা এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়ালই করিনি | গায়ে ডোরাকাটা একটা জামা, হাফ প্যান্ট | পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল | আমারই সবচেয়ে কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে বলে মুখটাও দেখতে পেলাম, বেশ মিষ্টি টুলটুলে | চোখ দুটো বড় বড় | চৌকিদারের ছেলে নিশ্চয়ই | বলল, “বাবা, সব টিপটপ সাফাই করে ফেলেছে | আপনাদের জিনিসপত্র কী আছে দিন, আমি নিয়ে যাচ্ছি |”

“ধ্যাৎ,  এইটুকু ছেলে মালা বইবে কী?” সরিৎ একটা হাতের ভঙ্গি করে বলল, “তুই যা খোকা | আমাদের জিনিস আমরা নিয়ে যাচ্ছি |”

ছেলেটা চুপচাপ চলে গেল |

আমরা ধীরে সুস্থে লটবহর নিয়ে ঘরে গিয়ে উঠলাম | বারান্দা পেরিয়ে দুটো বড় রুম | ঠিকই বলেছে ছেলেটা, সাফাইটা কিন্তু বেশ চমৎকারই হয়েছে – সত্যিই টিপটপ যাকে বলে | সরিৎ বলল, “কে কে কোন ঘরটায় থাকবে বুঝে নাও | দু’জন দু’জন করে দিব্যি হয়ে যাবে |”

দীননাথ বলল, “চারজন এক ঘরে থাকলেই ভাল হত না? একটা রাত্তির…আবার আলাদা শোয়ার কী আছে?”

আমি হাসলাম | “কী দীনুবাবু? ভয় পেয়েছ মনে হচ্ছে?”

দীননাথ বিরক্তির ভঙ্গি করল, “ধ্যাৎ ফালতু বকিস না | চোখের সামনে দেখতেই তো পাওয়া গেল জ্যান্ত চৌকিদার | তার আবার ছেলে পর্যন্ত রয়েছে | যত সব গাঁজাখুরি গুজব |”

শ্যাম একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “না, এক ঘরে চারজন থাকলে একটা প্লাস পয়েন্ট আছে কিন্তু | সত্যিই যদি চৌকিদারের ভূত বলে কিছু থাকে, তবে তা সবাই একসঙ্গে দেখা যাবে | না হলে এ ঘরে হয়তো দেখা দিল…ও ঘরের লোকেরা বঞ্চিত হল, এটা ঠিক নয় |”

শেষ অব্দি চারজনেই দক্ষিণদিকের বড় ঘরটায় আস্তানা নিলাম | মেঝেতে মাদুর পাতা, তার ওপর নিজেদের মস্ত শতরঞ্চি বিছিয়ে বসা গেল | কিন্তু চৌকিদার লোকটার তো পাত্তা নেই! ঘরদোর সাফ করেই তার দায়িত্ব খতম না কি? রাতের খাবারদাবারের ব্যবস্থা চাই, তার আগে চাই একটু কড়া চা কিংবা কফি | লোকটা গেল কোথায়?”

সরিৎ একটু এদিক ওদিক উঁকিঝুঁকি মেরে বলল, “সত্যিই ভূত না কি রে? এমন নয় তো যে শেষ অব্দি জানা যাবে যে এখানে দীর্ঘদিন কোনও চৌকিদার নেই….একেবারে ডেজার্টেড বাংলো? হয়তো এই সাফসুতরো করে –টরে দিয়েই উবে গেল হাওয়ায়?”

“তাহলে তো বেশ উপকারী ভূত,” দীননাথ হাসল, “আর একটু উপকার করে রাতের খাওয়াটুকু প্রোভাইড করে গেলেই হয়! এবং সে খাবারদাবার যেন সলিড হয়, হাওয়ায় মিলিয়ে না যায়, ব্যস…”

শ্যাম কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ বাতিটা দপ করে নিভে গেল |
চারজনেই এক মুহূর্ত চুপ করে গেলাম | সেই রাজবাড়ির গল্পটা মনে পড়ে গেল |

ঘরে কি খুব বেশি বাতাস বইছিল? না তো! আচমকাই নিভে গেল বাতিটা, বিনা কারণে?

অন্ধকারটা ভাল লাগছে না | পাশের ফাঁকা ঘরটাতে কিন্তু বাতিটা দিব্যি জ্বলছে, তার আভা বারান্দায় পড়ছে | শুধু এই ঘরটায়….

আরও পড়ুন:  লেখক বেচারার খেদ

“বাতিটা ও ঘর থেকে নিয়ে আসি,” বলে আমি উঠতে যাচ্ছি, এমন সময় শ্যাম আমার হাতটা চেপে ধরল |

দরজায় কেউ একটা এসে দাঁড়িয়েছে | কালো সিলুয়েটটা ফ্রেমের ঠিক মাঝখানে |

“বাবুরা এসে গেছেন?” চেনা গলাটা শুনতে পাচ্ছি | যেন একটু সংকুচিত | “বাতিটা নিভে গেল, ছি ছি… আমি একটু গা হাত পা ধুয়ে এলাম, দেরি হয়ে গেল | বড্ড ধুলো ছিল, ঝাড়তে গিয়ে গা-মাথা একদম সাদা…”

সরিৎ একটু ভারিক্কি গলায় বলে, “তুমি আলোটা নিয়ে এসো দিকি চটপট|”

দৌড়ে পাশের ঘর থেকে বাতিটা নিয়ে এল চৌকিদার | মেঝেতে বসাল | দিব্যি ছায়া পড়ছে দেয়ালে | পা-ও থেকে আছে মাটিতে | এ কস্মিনকালেও ভূত-ফুত নয় | পরিষ্কার জ্যান্ত লোক |

“আপনারা অনেকক্ষণ ঘরে ঢুকে এসেছেন বাবু? আমার বড্ড দেরি হল, মাফ করবেন,” জোড়হাত করছে লোকটা |

আমি বললাম, “হ্যাঁ, তোমার ছেলেই তো ডেকে আনল | বলল, সাফ হয়ে গেছে, ঘরে চলে আসুন |”

বাতির আলোয় স্পষ্ট দেখলাম, আমার কথাটা শেষ হওয়ার আগেই লোকটা কেমন যেন পাথরের মূর্তির মতো হয়ে গেল | জোড়হাতেই থেমে রইল, হাঁ বন্ধ হল না অনেকক্ষণ | তারপর ঠোঁটদুটো তিরতির করে কাঁপতে লাগল | আস্তে আস্তে কুঁজো হয়ে বসে পড়ল মেঝেতে | ফ্যাসফ্যাসে কাঁপা গলায় বলল, “আপনারা দেখলেন ওকে? দেখতে পেলেন?”

“মানে? কী বলছ?”

“সব্বাইকে দেখা দেয়…শয়তান ছেলে…আমাকে একবারও দেয় না…,” লোকটা দাঁতে দাঁত চেপে কান্না সামলাচ্ছে , “সারারাত জেগে বসে থাকি, বাবু…একবারও দেখতে পাইনি…তিন বছর হয়ে গেল…এত রাগ আমার ওপর…এইখানেই ঘোরে ফেরে,কত লোক দেখতে পায়, আমি পাই না…”

হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে চৌকিদার | আমরা স্তব্ধ |

আমার বুকের ভেতরে কী রকম একটা অবিশ্বাস-মেশানো মোচড় দিচ্ছে | কাঁটা দিচ্ছে সর্বশরীরে | এ কী বলছে লোকটা? আমার দু’হাত দূরেই যে দাঁড়িয়ে ছিল বাচ্চা ছেলেটা…যদিও আধো-অন্ধকার, তবু নির্ভুল মনে আছে ওর ডোরাকাটা জামা, বাঁ দিকে সিঁথি আঁচড়ানো চুল, ভাসা ভাসা চোখ দুটো …

গলাটা শুকিয়ে গেছে আমার হঠাৎই | “তোমার ছেলে …?”

“মা-মরা বাচ্চা, হুজুর, আমার বুধন…এগারোটা বছর হাতের তেলোয় করে বড় করেছিলুম…দু’দিনের জ্বরে চলে গেছে…”

সরিৎ ঢোঁক গিলে জিজ্ঞেস করে, “তোমার ওপর…রাগ… বলছিলে কেন?”

“তিন বছর আগে, এইরকমই এক টুরিস্ট পার্টি এসেছিল, তাদের দেখভাল করছিলাম, হুজুর,” লোকটা নাক টেনে টেনে বলতে থাকে, “একটু বাজার যেতে হয়েছিল সন্ধেবেলা…ছেলের তখন ধূম জ্বর…কেবল বলছিল আমায় ছেড়ে যেও না…পাশে বসো…আমি শুনিনি, বাবু…বখশিসের লোভে চলে গেছ্লুম, বুঝতে পারিনি অসুখটা অত বাড়াবাড়ি হবে…এসে দেখি…ছেলে মরে ঠান্ডা হয়ে আছে গো…ও হো হো …”

আমরা শ্বাস চেপে শুনি | ভূতের গল্পটা এরকম দাঁড়াবে, আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল |

অনেকক্ষণ পড়ে শ্যাম নিচু গলায় বলল, “আচ্ছা…এখানে কেউ গলায় ফাঁসি দিয়ে মরেছিল এরকম শুনেছ কখনও?”

“আমি…আমিই গো বাবু…,” গলায় হাত চেপে অন্য হাতে লোকটা মাথা চাপড়াল, “লজ্জায়-ঘেন্নায়-ধিক্কারে নিজের গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে পড়েছিলুম….কিন্তু ওই টুরিস্টবাবুরা দেখতে পেয়ে আমায় বাঁচিয়ে দেয়….হাসপাতালে ছিলুম এক সপ্তা’র ওপর…কিন্তু বাবুরা, বিশ্বাস করুন আমি বাঁচতে চাইনি, মরে যেতেই চেয়েছিলুম, বুধনের কাছে যেতে চেয়েছিলুম, পারলুম না…”

দীননাথ ওর কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রাখে | এখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে বুড়ো লোকটা | “আমি জানি গো বাবু…! এখানে লোকজন আসতে চায় না আর…ভূতুড়ে বাংলো বলে বদনাম হয়ে গেছে | কতজন কত কী দ্যাখে | গুজব ছড়ায় | ভয় পায় লোকে | শুধু আমি…একটু দেখব বলে জেগে থাকি রাতের পর রাত… আমি দেখতে পাই না একটিবারও! আপনারা দেখলেন, বাবু…আমি পাপী…আমি পেলুম না…”

বলতে বলতে কীরকম পাগলের মতো ছটফটিয়ে উঠছে চৌকিদার! হঠাৎ ছিটকে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, বারান্দায় হাঁটু গেড়ে বসে চিৎকার করে ওঠে, “বুধন …!বুধন বাবা…! একবার দেখা দে…বাপ আমার…একটিবার দেখি রে…রাগ করে না, লক্ষ্মী বাবা আমার…”

গলা চিরে যাচ্ছে | বারান্দাটায় আলো নেই, সেই ছমছমে অন্ধকারে লুটিয়ে কাঁদছে পুত্রহারা একটা লোক | তার চিৎকার হা হা করে ছুটে যাচ্ছে গাঢ় অরণ্যের দিকে | শালাগাছ্গুলো মূক হয়ে দাঁড়িয়ে বুঝি শুনছে সে কান্না |

আমাদের ঘরে বাতির শিখাটা অল্প অল্প কাঁপছে | দেয়ালে চারটে ছায়াও দুলছে মৃদু মৃদু | মাথা নিচু করে বসে আছি আমরা | যারা ভূতের খোঁজে এসেছিলাম |

নির্জন ফরেস্ট বাংলোর রাত গাঢ় হয়ে এল ||

2 COMMENTS

  1. অসাধারণ স্যার । ভাষায় ব্যক্ত করার সামর্থ্য নেই।

এমন আরো নিবন্ধ