দেখেছো দাদার জাঙিয়া কেমন বীরদর্পে ছাদের উত্তাপে আরও গরম হচ্ছে । কিন্তু সম্মানহানি তো রাস্তা দিয়ে চলতে থাকা মানুষগুলোর উঁকিঝুঁকির সঙ্গে আমারও, যখন তোমরা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে আমার রোদ্দুরে শোকাতে দেওয়া অন্তর্বাস সন্তর্পণে আড়াল করে দাও বারান্দার ঝুলপড়া পিলারের কোণে ।

রাস্তার মোড়ের ওষুধ দোকানের কাকু কেমন গর্বিত মুখে কন্ডোম বেচল সেদিন ? আর ওষুধ-কাকু নেহাত অবহেলায় কালো প্লাস্টিকে মুড়ে দিয়েছিল আমার সেই প্রথম লাল মাসিকের দাগ । সাদা প্যাডের সম্মানহানি চোখে পড়েনি তোমাদের ? যে নাকি আনন্দে উড়তে চেয়েছিল সেদিন কালোর অন্ধকার ডিঙিয়ে ।

বিয়েতে পরিয়ে দিয়েছিলে যে লোহাটা তোমরা, এক টানে খুলছিলাম যখন, ছুটে এসেছিলে হাত খালি রাখতে না দেওয়ার অজুহাতে । সম্মানহানি যে আমার সাথে লোহাটারও; সে তো তখন স্বস্তির নিঃশ্বাসে দৌড়ে বেড়াতে চায় ।

কপাল পুড়িয়ে বিধবা হলাম যেদিন, অপয়া বলে তুমি গাল পাড়লে, তোমার ছেলেকে খেলাম বলে আমার চুলের মুঠি ধরে রাস্তায় বের করে দিলে, কিন্তু দিব্যি আমার সামনেও এক মাথা সিঁদুর পরে ইলিশের কাঁটা চুষে-বেছে খেয়ে চলেছ । তোমার হাপুস নয়ন ছাইচাপা দিলো আমার মাছ খাওয়ার হাপিত্যেস ।

সেই সেদিন যখন ওদের সুখটান দেখে ভাবলাম আমিও একটু মৌতাত করি; তড়িঘড়ি মিন্থল ফ্লেভার কিনে দিল ওরা –“এটা খা, মেয়েদের জন্য ঠিক আছে”, আমার সম্মান যে লাইটারের সাথে জ্বলে পুড়ে খাক ততক্ষণে ।

তবু পাঁচতারা হোটেলের সভ্যতায় ওরা একাই হুইস্কি । আমার লোভের গুড়ে শুধুই অরেঞ্জ জুস । গলা ভিজিয়ে নেশা করার ইচ্ছেদের জেহাদ কি কেউ শুনল ?

পাঁচ বছরের সরল হাঁটু তো জানেই না সে কেন দেখা দিলেই তার আধুনিকা মা গর্জে উঠে বলছে, “সিট প্রপারলি!” নির্বাক দৃষ্টিতে প্রশ্ন পৌঁছনোরও সময় হয়নি তখনও, সম্মানহানি যে এভাবেও হয় ভেবেছিল সে কখনও ?

“ শরীর খারাপ, ছুঁস না ঠাকুর ! ঢালিস না শিবের মাথায় জল !” তোমাদের শেখানো সংস্কারের বুলি কবেই গেছি ভুলে, যখন ওই দিনগুলোতেও জড়তা ঝেড়ে সহবাসে মাততে বাধ্য হই নিত্যি দিনের মত । তখন সম্মানহানি হয় না আমার ?

ওদের দরজা খোলা রেখেই প্রস্রাব করাতে যে গর্ব, মুখরিত বাতকর্মে যে স্বস্তির সম্মান, আমার ফণীমনসার আড়ালে বসে পড়াতেই তার বিনাশ।

ওরা সম্মান দিতে ভয় পেল । আমার উপার্জন অজান্তেই বেড়ে গিয়েছিল যে ওদের থেকে । চেষ্টা চরিত্তির করেও ঠেকাতে পারলাম কই ? বিয়ের বাজারে তাই আমি “ওভার কোয়ালিফায়েড ।”

আমার সম্মানের চালচুলো তো কবেই গেছে ঘুচে; তোমাদের কানাঘুষো, ফিসফাস, মুখ বেঁকিয়ে চলে যাওয়ার পরিহাস – এ সবের মাঝে আরও কতো সম্মানের বলাৎকার ঘটে যায় অহরহ । হিসাব করতে বসো যদি; বুঝব তোমরাও মানুষ হয়ে উঠছ নতুন করে ।

স্কুলজীবনের প্রথম চুম্বনে, বিয়ের আগেই যৌন মিলনে, আমারও শীৎকার-সহ হস্ত মৈথুনে, ডিস্কথেকের আনন্দ উদযাপনে, বিষ্যুদবারেও চুলে শ্যাম্পু করার স্বাধীনতায়, শাশুড়ির হাতে বেড়ে দেয়া ভাতের আবদারে, আরও অনেক অনেক অবান্তর কিছুতে আমিও যে ওদের মতই মানুষ, হাসির সারল্যে মেনে নিতে পারবে যেদিন; সেদিন জানব তোমরাও মানুষ হয়ে উঠছ নতুন করে ।

আমি নারীত্ব চাইনা । পৌরুষ বুঝি না । আমি শুধু মনুষ্যত্বের খোঁজে কলম ধরেছি ।

আরও পড়ুন:  সীতা প্রকৃতপক্ষে লঙ্কেশ্বর রাবণের কন্যা ছিলেন ?
ঋতুপর্ণা মজুমদার
পেশায় একজন অর্থনীতিবিদ | ২০০৬ থেকে এক প্রখ্যাত মার্কিন মার্কেট রিসার্চ সংস্থা ফ্রস্ট অ্যান্ড সালিভান-এর সঙ্গে যুক্ত | আগাগোড়া কলকাতা নিবাসী এই ভ্রমণপিপাসু আবার কবিও...নেহাতই শখের |

8 COMMENTS

  1. অসাধারণ তোর লেখার বাঁধনী। সব বাঁধ ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে মন। আর উথাল পাথাল ভেতর টা।

  2. Eto sundor lekha is moner bhabh tule dhoreche.Darun darun darun.Tui ro anek lekh Ritu…khule de kichu loker bondho chokh.Kudos☺