আইপিএলের জনক কে?

এর উত্তরে আপনি যদি ললিত মোদি বলেন তাহলে পরিসংখ্যানবিদরা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাবে ঠিকই। কিন্তু ক্রিকেট রসিকরা ঘাড় নেড়ে কাকেশ্বর কুচকুচের ভঙ্গিতে বলবে, ‘হয়নি হয়নি ফেল। আইপিএলের জনক আসলে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান।’

স্বাভাবিক ভাবেই ভুরু কুঁচকে যাবে। মনে হবে, সে আবার কী? আইপিএলের সঙ্গে স্যার ডনের কী সম্পর্ক? উত্তর দিতে কাকেশ্বর তার ডানায় ভাসিয়ে আপনাকে নিয়ে যাবে ১৯৭১ সালের মেলবোর্নে। যেখানে বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে অ্যাসেজের তিন নম্বর ম্যাচ। রোজই জানিয়ে দেওয়া হয়, বৃষ্টি থামলেই খেলা শুরু হবে। আশায় আশায় মাঠে আসেন দর্শকরা। আর ফিরে যান। শেষমেশ ৫ জানুয়ারি, যখন বোঝা গেল ম্যাচটার সলিল সমাধি হয়েছে, তখন আচমকাই দর্শকদের বিনোদনের নতুন আইডিয়া খেলে যায় আয়োজকদের মাথায়। আসলে খেলা না হওয়ায় সকলেই বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে নাকউঁচু ইংরেজরা। এক ইংরেজ সাংবাদিক তো লিখেই বসলেন, মাঠে আসা আটহাজার দর্শকরা খেলা দেখতে হাসতে হাসতে এক ডলার করে দিয়ে দেবেন, যাতে অস্ট্রেলিয়া একটা ভালো আউটফিল্ড কভার কিনতে পারে! এই পরিস্থিতিতে এমসিসির প্রেসিডেন্ট স্যার সিরিল হকারের সঙ্গে কথা বলে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের (এখন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া) চেয়ারম্যান স্যার ডন পরিকল্পনা করলেন চল্লিশ ওভারের একটা ম্যাচের। সেটাই ছিল প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ। প্রখর ক্রিকেট বুদ্ধিতে ব্র্যাডম্যান বুঝে গেছিলেন এটা স্রেফ একটা মন ভোলানোর খেলা নয়। ভবিষ্যতে ক্রিকেটকে এইদিকেই ঝুঁকতে হবে। তাই মাঠে আসা দর্শকদের উদ্দেশে ক্রিকেট সম্রাট সেদিন বলেছিলেন, ‘আপনারা একটা ইতিহাসের সাক্ষী হলেন।’

সত্যিই সেটা ছিল এক অনিবার্য অধ্যায়ের সূচনা। ক্রিকেটকে যে টিকে থাকতে গেলে টেস্টের পাশে সীমিত ওভাবের ফর্ম্যাটেও আসতে হবে, সেটা অবশ্য বোঝা গেছিল তারও ঢের আগে থেকে। খোদ ব্র্যাডম্যান চূড়ান্ত অসন্তুষ্ট হচ্ছিলেন ক্রমাগত ঠুকঠুক ও ঘ্যানঘেনে ড্র দেখতে দেখতে। মাঠে দর্শক আসা কমছিল। সেই কারণেই জন্ম নিয়েছিল ষাট ওভারের ওয়ানডে। তবে সেটা আন্তর্জাতিক তকমা পেয়েছিল স্যার ডনের হাত ধরেই। তারপর ওই রাস্তা দিয়েই কয়েক বছর বাদে এসে পড়েন কেরি প্যাকার। সাদা বল, কালো সাইটস্ক্রিন আর রঙিন পোশাকের ধুঁয়াধার ওয়ার্ল্ড সিরিজ নিয়ে। প্রথমে নাক কুঁচকোলেও শেষ পর্যন্ত আইসিসিকে স্বীকার করে নিতেই হয়েছিল ধুরন্ধর ব্যবসায়ী কেরি প্যাকারের দুরন্ত আইডিয়াকে। এর প্রায় তিন দশক পরে ওই পথ দিয়েই শ্রীযুক্ত ললিত মোদির আগমন। সময়ের অনিবার্য দাবিতেই।  

আরও পড়ুন:  বয়সে বড়‚ ভিন প্রদেশের এই মেয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিয়ের প্রস্তাব নস্যাৎ করেছিলেন মহর্ষি ?

নয়ের দশকে অর্থনীতির উদারীকরণের পরে আস্তে আস্তে কেবল চ্যানেলের প্রবেশ ঘটতেই মান্ধাতার আমলের সম্প্রচারের দিন শেষ হল। ইএসপিনের ঝাঁ চকচকে সম্প্রচার দেখে জাস্ট হাঁ হয়ে গিয়েছিলেন আপামর ভারতবাসী। শোনা যায়, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের আইডিয়া তখনও নাকি উঠে এসেছিল। কিন্তু দানা বাঁধেনি। আসলে তখনও সময় হয়নি।

বিদ্রোহী আইসিএলকে রুখতে বিসিসিআই যখন তৎপর হয়েছিল, তখনই ললিত মোদির মাথা থেকে বেরিয়েছিল আইপিএলের ভাবনা, তা কিন্তু নয়। এমন একটা কথা চালু আছে, আমেরিকার বাস্কেটবল লিগ এনবিএ আর ইংল্যান্ডের ইপিএলের মতো ফুটবল লিগের কায়দায় জমজমাট একটা লিগ শুরু করার আইডিয়া নাকি ভারতের ফুটবল ফেডারেশনকে প্রথমে দিয়েছিলেন মোদি। কিন্তু তারা উৎসাহ দেখায়নি। পরবর্তী সময়ে সেই আইডিয়াই লুফে নেয় বিসিসিআই।   

সে বছরই ভারত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয় পাকিস্তানকে রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে হারিয়ে। বিসিসিআই বুঝতে পারে, এই পরিস্থিতিতে আইপিএল একেবারে সঠিক সিদ্ধান্ত। নিলামের পর তারা নিশ্চিন্ত হয়, তাদের চিন্তা এক্কেবারে সঠিক পথে হাঁটছে। ৪০০ লক্ষ ডলার ছিল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলির মোট বেস প্রাইজ। তার জায়গায় সমস্ত ফ্র্যাঞ্চাইজি বিক্রি হয় ৭২৩.৫৯ লক্ষ ডলারে! বাকিটা ইতিহাস…  

জাম্প কাট টু ২০১৭। দশটা বছর পার। ললিত মোদি বহুকাল দেশছাড়া। কিন্তু তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত আইপিএল আজও রমরম করে চলছে। এমন জাদুকাঠি ছুঁইয়েছিলেন মোদি সাহেব, যে ঝিমিয়ে পড়া ভারতীয় ক্রিকেট দর্শক সেই যে হইহই করে জেগে উঠল, আজও তারা মাঠে হোক বা বাড়ির সোফায়, এক্কেবারে সেঁটে যায় আইপিএলের মায়া-বিউগল বেজে উঠলেই। এবারের আইপিএলের উদ্‌বোধনের দিন শচীন তেন্ডুলকর বলেছেন, ‘আইপিএল যখন এল তখন আমরা জানতাম এটা সফল হবেই। কিন্তু কল্পনাও করা যায়নি দশ বছর ধরে সে এই উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।’        

যদিও প্রশ্নটা উঠে গেছে। আইপিএল কি আজও এক অনতিক্রম্য চৌম্বকক্ষেত্র? গত বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জমজমাট সাফল্যের পরে আইপিএল নিয়ে আগ্রহ হারিয়েছিলেন অনেকেই। গ্যালারি ছিল ফাঁকা। ক্যামেরাম্যানকে কায়দা করে ক্যামেরা ঘোরাতে হচ্ছিল খামচা খামচা ভরা গ্যালারির দিকে। টিআরপিও ছিল রীতিমতো পড়তি। কাজেই যতটা ভাবা হচ্ছে, আইপিএল আর সেই জায়গায় নেই। এক দশকের পথ পেরিয়ে সেও খানিক একঘেয়েমির ঘূর্ণাবর্তে পাক খেতে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন:  কিশোর রবির গালে তরুণী অন্নপূর্ণার 'চুম্বন' ! তীব্র আপত্তি বিশ্বভারতীর

ভালো বইয়ের ক্ষেত্রে বলা হয় মলাটই ললাট। খেলার মাঠে দর্শকরাই হচ্ছে সেই মলাট। যাদের ছাড়া খেলা চলতে পারে না। ফাঁকা অডিটোরিয়ামে যেমন অভিনয় হয় না, তেমনই ফাঁকা গ্যালারিতেও চার্জ পান না খেলোয়াড়রা। পকেটও ভরে না আয়োজকদের। সেই জায়গাতেই দারুণভাবে সফল ছিলেন ললিত মোদি। ‘কাস্টমার ডিলাইট’ নামক বস্তুটিকে মহাগুরুত্ব দিয়ে তিনি সেটাকে এক উত্তুঙ্গ উচ্চতায় পৌঁছে দেন। ‘স্টার অফ দ্য ম্যাচ’ কিংবা ‘ভিআইপি বক্স’-এর মতো কনসেপ্ট ছিল অতুলনীয়। খেলা দেখতে আসা একজন দর্শকও যে রাতারাতি তারকা হয়ে যেতে পারেন, এই অভাবনীয় ভাবনাটাই কিন্তু দর্শককে আরও বেশি করে আইপিএলের সঙ্গে আটকে রেখেছিল।  

আসলে সব কিছুরই তো একটা এক্সপায়ারি ডেট থাকে। আইডিয়া যতই ঝকঝকে হোক, বহু ব্যবহারে তাতেও এসে লাগে একঘেয়েমির মরচে। আইপিএলেও সেটা হয়েছে। আর সেটা বুঝেছে বিসিসিআইও। তাই স্পাইডার ক্যাম এমনকী আম্পায়ারের টুপিতে অবধি ক্যামেরা লাগিয়ে অভিনব সব ডাইমেনশন তৈরি করা হয়েছে। বছর তিনেক হল চালু হয়েছে ফ্যান পার্ক। যারা মাঠে যেতে পারবেন না, তারা জায়ান্ট স্ক্রিনে ম্যাচের মজা নিতে পারছেন দল বেঁধে। ২০১৫-তে ছিল ১৬টা ফ্যান পার্ক। এবছরে সেটা বেড়ে ৩৬!

তবু প্রশ্নটাকে তাড়ানো যাচ্ছে না। ভাবনাচিন্তা শুরু করে দিয়েছে বিসিসিআই। ভাবছে আইসিসিও। ভারত ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ বা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ… আস্তে আস্তে ডানা মেলেছে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ। কিন্তু আসল প্রাণভোমরা যে টেস্ট ক্রিকেট সেটা ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। আর তাই গোলাপি বলে দিনরাতের টেস্টের মতো সব আইডিয়ার মধ্যে দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে টেস্টকে। সুখের কথা, টেস্ট না বাঁচলে, টি-টোয়েন্টি তথা আইপিএলও যে বাঁচবে না সেটা অবশেষে বুঝতে পেরেছে আইসিসি।     

- Might Interest You

NO COMMENTS