ধরুন‚ আপনি জানেন কেউ একজন বহুদিন আগেই মারা গিয়েছেন | কিন্তু শুনলেন‚ তিনি নাকি ফের বেঁচে উঠে বহাল তবিয়তে আছেন | কেমন লাগবে ? আমার লেগেছিল‚ যখন শুনেছিলাম‚ ভারতবর্ষে এমন কয়েকটি গ্রাম আছে যেখানে কৃষক তার গরু-মোষকেও আদেশ দেয় সংস্কৃতে ! সেই গ্রামের সাধারণ মানুষ তো বটেই | গৃহপালিত পশুরাও দিব্যি বোঝে দেবভাষা |

এর মধ্যে কিন্তু কাশ্মীরের সেই গ্রাম নেই | যেখানে নাকি বাস করেন খাঁটি আর্যরা | বরং এই গ্রামগুলো আছে তথাকথিত আর্যাবর্তের বাইরে | অন্যতম হল কর্নাটকের মাত্তুর‚ হোসাল্লি | মধ্যপ্রদেশের ঝিরি‚ মোহদ এবং রঘুওয়ার |

একদা দ্রাবিড় অধ্যুষিত এই জায়গাতেই এখন কথ্য ভাষা সংস্কৃত | প্রথমেই কর্নাটকের মাত্তুর | শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত সেই উপন্যাস ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ | দুই নদী মিলে তো হল তুঙ্গভদ্রা | তার এক নদী তুঙ্গ | বিজয়নগর সাম্রাজ্যে সেই নদীর তীরে এসে বসত গড়েছিলেন সাঙ্কেথি ব্রাহ্মণ (Sankethi Brahmins ) সম্প্রদায় | যজন যাজনের জায়গাটিকে উপযুক্ত মনে হয়েছিল তাঁদের |

এই সম্প্রদায়ের আর একটি গোষ্ঠী একটু এগিয়ে বসত গড়েছিল হোসাল্লিতে | দুটি গোষ্ঠীই সম্রাটের দেওয়া জমি ও অন্যান্য সাহায্য নিতে অস্বীকার করেছিলেন | ধর্মচ্যুত হওয়ার ভয়ে | শেষে এক ব্রাহ্মণের হাত দিয়ে তাঁদের জমি দান করেন বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজা |

মূলত কেরল থেকে আসা এই ব্রাহ্মণদের বংশধারা এখনও আছেন | তাঁরা সংস্কৃত ভাষার চর্চার ধারক ও বাহক | তবে কালক্রমে তাঁদের কথ্য ভাষাতে মিশে গেছে কন্নড়‚ তেলুগু‚ তামিল | তবে মূল ব্যাকরণ কিন্তু অনুসরণ করা হয় দেবভাষারই এবং হরফ অবশ্যই দেবনাগরী |

মাঝে সংস্কৃত চর্চায় ভাটা পড়েছিল | ফের স্থানীয় মঠের প্রধানের উদ্যোগে শুরু হয়েছে চর্চা | এবং সেই ধারা আজও চলেছে | শুধু ব্রাহ্মণ নয় | গ্রামের সব সম্প্রদায়ের সব পেশার মানুষ ঝরঝরে সংস্কৃত বলেন | বাদ যান না মুসলিমরাও | তাঁরাও আপন করে নিয়েছেন দেবভাষাকে |

গ্রামের ঘরে ঘরে শিশুরা জন্ম থেকেই সংস্কৃত শেখে তাদের মায়ের কাছে | পাঠশালাতে পাঠ শুরু হয় বৈদিক স্তোত্র পাঠ দিয়ে | এখানে সব স্কুলে সংস্কৃত প্রথম ভাষা | দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে থাকে ইংরেজি বা কন্নড় | তার মানে কিন্তু এই নয়‚ সবাই বড় হয়ে পুরোহিত হয় | গ্রামের নতুন প্রজন্ম দিব্যি শাসন করছে তথ্যপ্রযুক্তি দুনিয়া | এবং তারা বিনা দ্বিধায় স্বীকার করেছে‚ সংস্কৃত পড়ায় তাদের সুবিধে হয়েছে বিজ্ঞান শিক্ষা আয়ত্ত করতে | সুদূর বিদেশে বসেও তারা ভুলতে পারে না গ্রামের পাঠশালায় বসে বৈদিক স্তোত্র পাঠ |

আরও পড়ুন:  রহস্যময় অসুখে তরুণীর দেহে লোমের বদলে গজায় নখ

কর্নাটকের শিমোগা জেলার মাত্তুর এবং হোসাল্লি দুই গ্রামেই দেখা হলে বলা হয় ‘কথমস্থি’? অর্থাৎ কেমন আছেন? এমনকী‚ দোকানে দোকানে জিনিসপত্রের প্যাকেটের গায়ে নির্দেশিকাও লেখা থাকে সংস্কৃতে | বাড়িতে আসা অতিথিকে প্রশ্ন করা হয়‚ ‘কফি ভা চায়ম‚ কিম ইচ্ছসি ভবন?’ অর্থাৎ আপনি চা‚ না কফি‚ কী নেবেন ? মোবাইলে কথোপকথনের ভাষাও এখানে সংস্কৃত | শুধু‚ যুগের প্রয়োজনে সহজ কথ্য রূপ পেয়েছে কবি কালিদাসের ভাষা |

ঠিক একই ছবি মধ্যপ্রদেশের ঝিরি‚ মোহাদ আর বঘুওয়াড়ে ‚ এবং রাজস্থানের গনওয়াড়াতেও | এই সব গ্রামেই সমাজের সব স্তরের ভাব আদান প্রদানের একমাত্র মাধ্যম হল বিস্মৃতপ্রায় সংস্কৃত |

তবে এসবের মাঝে আছে ছন্দোপতনের শব্দও | এই গ্রামগুলোয় পালন করা হয় বৈদিক যুগের জীবনযাত্রা | ব্রাহ্মণদের জন্য বিশেষ সম্মান তো অবশ্যই | সেইসঙ্গে আছে জাতপাতের বেড়াজালও | এখনও মেনে নেওয়া হয় না ভিন্ন গোষ্ঠীতে বিয়ে | সমাজপতিদের রক্তচক্ষুতে আটকে যায় নতুন প্রজন্মের ভালবাসার শব্দ |

তবু এভাবেই বয়ে চলেছে তাদের জীবনযাত্রা | একদিকে বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে বিলুপ্তপ্রায় দেবভাষাকে | নতুন প্রজন্ম সংস্কৃতকে হাতিয়ার করেই মুখোমুখি হচ্ছে বাইরের দুনিয়ার | চেষ্টা চলছে দুই প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধনের | ভালবেসেই সবাই আপন করে নিয়েছে ভাস‚ ভবভূতির ভাষাকে | তাদের জীবনযাত্রার গল্প বলতে বলতেই আপন মনে বয়ে চলেছে তুঙ্গভদ্রা | মোহনার দিকে |

(বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে পুনর্মুদ্রিত)

NO COMMENTS