খাজুরাহো বা কোনার্কের মন্দিরে কামরতিরত নারী-পুরুষ দেখে আন্দাজ করা যায় প্রাচীন ভারতে যৌনতা কতটা গুরুত্ব পেত | এটা ভাবার কোনও কারণ নেই প্রাচীনত্ব লোপ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই কামবাসনাও সমাজ থেকে দূর হয়েছিল | বেশি অতীতে যেতে হবে না | ব্রিটিশ ভারতবর্ষেও বিভিন্ন নেটিভ স্টেটের রাজা রাজড়াদের কীর্তিকলাপ জানলে চমকে উঠতে হয় |

এরকমই একজন ছিলেন পাতিয়ালার মহারাজা ভূপিন্দর সিং | জন্ম ১৮৯১ সালে | সিংহাসনে আরোহণ করেন মাত্র ৯ বছর বয়সে |  সাবালক হওয়ার পরে তাঁকে দেওয়া হয় ব্রিটিশ শাসনের অধীনে পাতিয়ালা স্টেটের পূর্ণ শাসনভার |

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে Imperial War Council-এ তিনি ছিলেন ভারতীয় প্রতিনিধি | শিখদের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন গোল টেবিল বৈঠকে | রনজি ট্রোফির জন্যেও বহু কিছু করেছেন | নিজে তৎকালীন ভারতীয় ক্রিকেট দলে খেলেওছেন | প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্টেট ব্যাঙ্ক অফ পাতিয়ালার | তাঁর আমলে পাতিয়ালায় চলত মোনোরেলও |

এবার অন্য প্রসঙ্গে চোখ রাখুন | দেখুন কতটা বিলাসব্যসনে ডুবে থাকতেন এই মহারাজা |

তিনি প্রথম ভারতবাসী যিনি কিনেছিলেন আস্ত এয়ারলাইন্স | মালিক হয়েছিলেন ব্রিটিশ ওই উড়ান সংস্থার | ১৯২৬ সালে এক ট্রাঙ্ক ভর্তি মণি মাণিক্য তিনি পঠিয়েছিলেন ফরাসি অলঙ্কার নির্মাতা কার্তিয়ের-কে | পেটিকায় অন্য দামী পাথরের সঙ্গে ছিল বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম হিরে | সেসব দিয়ে তৈরি হয়েছিল বিখ্যাত পাতিয়ালা নেকলেস | তখনই এর দাম ছিল ২৫ মিলিয়ন ডলার |

নেকলেসে ওই বড় হিরে সহ ছিল মোট ২৯৩০ টি হিরে এবং অন্যান্য দুর্মূল্য পাথর | এই কণ্ঠহার রহস্যজনক ভাবে উধাও হয়ে যায় তাঁর মৃত্যুর পরে | ব্রিটিশ সরকার দাবি করেছিল‚ প্রয়াত মহারাজ ভূপিন্দর সিং-এর প্রথমা স্ত্রী সেটা উপহার দিয়েছিলেন রানি মেরিকে | দিল্লি দরবারে‚ রানির প্রথমবার ভারত সফর উপলক্ষে | এই ঐতিহাসিক নেকলেস পরে নানা হাত ঘুরে আংশিক পাওয়া যায় | সেসব অন্য অধ্যায় | এখানে বলি‚ অগাধ সম্পত্তির মধ্যে ভূপিন্দর সিং-এর গাড়িশালে ছিল ২০ টিরও বেশি রোলস রয়েস | ছিল মার্সিডিজ মেব্যাক | সেটা নাকি তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন স্বয়ং হিটলার ! ইংল্যান্ডের রাজাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন বলে এই মহারাজা বানিয়েছিলেন ১৪০০ বাসনের ডিনার সেট | সম্পূর্ণ রুপোর | কয়েক বছর আগে তা আকাশছোঁয়া দামে তা নীলাম হয়েছে |

শুধু জড় পদার্থ নয় | তীব্র আসক্তি ছিল নারীসঙ্গে | তাঁর ৫ জন ( বা কোথাও দাবি‚ ১০ জন ) স্ত্রীর সন্তান ছিল ৮৮ জন | আর ছিল বিশাল হারেম | সেই অন্তঃপুরে তাঁর যৌনদাসী থাকতেন অন্তত ৩৩২ জন | দিনের যে কোনও সময়ে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে যত জনের সঙ্গে যেভাবে খুশি যৌনতায় মেতে উঠতেন মহারাজ ভূপিন্দর সিং | সেই বর্ণনা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে দেওয়ান জারমানি দাসের বই দ্য মহারাজা -এ | যেখানে ভূপিন্দর সিং ছড়াও আছে অন্য ভারতীয় স্টেটের কামাসক্ত রাজা মহারাজাদের যৌন জীবন |

সেই বইয়ে দাবি করা হয়েছে ভূপিন্দর সিং-এর এমন এক মহল ছিল যেখানে প্রবেশ করতে পারতেন শুধু নগ্ন পুরুষ ও নারী | গ্রীষ্মকালীন বিনোদনের সেই প্রাসাদে ছিল সুইমিং পুল | তার চারপাশে বসে থাকতেন নগ্নিকারা | সাঁতারের মাঝে যৌনতায় মেতে উঠতেন কামুক মহারাজা | কখনও চলত জলকেলি | ফূর্তি করতে আসতেন সাহেবরাও |

সবথেকে ভয়ঙ্কর অধ্যায় হল তান্ত্রিক যৌনতার | সেটা উপভোগ করবার জন্য মহারাজাকে সাহায্য করতেন এক তান্ত্রিক | নাম তাঁর প্রকাশনন্দ ঝা |

জারমানি দাসের বইয়ের বিবরণ থেকে জানা যায়‚ দেবীমূর্তির সামনে ডাকা হতো ১৫০ থেকে ৪০০ জন মেয়েকে | বেশিরভাগই কুমারী | মহিষবলির পরে গভীর রাত অবধি পুজো করতেন বাঘ্ছাল পরিহিত প্রকাশ তান্ত্রিক | সেখানে মহারাজার ঘনিষ্ঠ জন ছাড়া আর কারও প্রবেশাধিকার ছিল না |

পুজোর পরে দেবীমূর্তির সামনে বিবস্ত্র হতে বলা হতো ওই মেয়েদের | তারপর তান্ত্রিকের নির্দেশে কয়েকজন মদমত্ত যুবক এসে মেয়েদের দেহে সুরা ঢালত | এরপর রাতভর কী চলত সহজেই অনুমেয় | বলি দেওয়া পশুরক্তের সঙ্গে মিশে যেত হতভাগ্য তরুণীদের রক্ত | তীক্ষ্ণ শীৎকারে চাপা পড়ে যেত তাদের কান্না |

জীবনভর এই উচ্ছৃঙ্খলতার মাশুল দিতে হয়েছিল মহারাজা ভূপিন্দর সিংকে | ১৯৩৮ সালের ২৩ মার্চ তিনি প্রয়াত হন মাত্র ৪৭ বছর বয়সে | পাতিয়ালার সিংহাসনে বসেন তাঁর বড় ছেলে যাদবেন্দ্র সিং | তাঁর আমলেই স্বাধীন ভারতবর্ষের অংশ হয় পাতিয়ালা স্টেট |

আরও পড়ুন:  এই ' নায়িকা-সংবাদে ' মহা শোরগোল-চাঞ্চল্য ওপার বাংলা জুড়ে

NO COMMENTS