আরোগ্য কথা
হেলথ ম্যাগাজিন হিসেবে 'আরোগ্য কথা' ভিন্ন স্বাদের | চিকিৎসা জগতের পজিটিভ নিউজে বিশ্বাসী | সারা বিশ্ব জুড়ে ডায়াগনসিস ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত যে নিত্য নতুন আবিষ্কার হয়ে চলেছে এই কলকাতাতেও তার সব কিছুই প্রায় উপলব্ধ | অথচ সচেতনতার অভাবে প্রচারের আলোয় না আসায় বেশিরভাগ মানুষই অন্ধকারে | কলকাতার অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে সবাইকে অবগত করাই মূল উদ্দেশ্য |

এখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে লাইফস্টাইল ডিজিজের মধ্যে অন্যতম হল ইনফার্টিলিটি বা সন্তানহীনতা। বহু দম্পতি দীর্ঘদিন এই সমস্যায় ভুগলেও নিছক লজ্জার খাতিরে তারা চিকিৎসা করাতে দেরি করেন, যার দরুন সহজ চিকিৎসার পরিবর্তে তাদের জটিল চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন ইনফার্টিলিটির সমস্যাকে কাটিয়ে উঠে অনেকেই সন্তানসুখ লাভ করছেন। পাঠকদের উদ্দেশ্যে রইল তারই কিছু নিদর্শন।

কেস ১

সল্টলেকের এক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত মিঃ আন্ড মিসেস সরকার কেরিয়ারের জন্য দেরিতে সন্তান প্ল্যানিং করার সিদ্ধান্ত নিলেও পরবর্তীকালে বিয়ের দীর্ঘ ৮ বছর অতিক্রম করার পরও স্বাভাবিক নিয়মে সন্তান না এলে জরুরি পরীক্ষার মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, মিসেস সরকারের দুটি ফ্যালোপিয়ান টিউবই ব্লক আছে। ফলে IVF করানো ছাড়া কোনও উপায় নেই। বর্তমানে মিসেস সরকার IVF এর দ্বারা একটি ফুটফুটে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।

কেস ২

নর্থ ক্যালকাটার এক নামী স্কুলের শিক্ষিকা বছর ৩৫-এর সুদেষ্ণা দেবী বিয়ের ৫ বছর পরও সন্তান না আসায় চিকিৎসকের পরামর্শে জানতে পারেন, তার আর্লি মেনোপজের সমস্যা রয়েছে। ফলে দেহে পর্যাপ্ত ডিম্বাণু নেই। এই রকম পরিস্থিতিতে সুদেষ্ণাদেবীকে হরমন ইঞ্জেকশন দিয়ে অতিরিক্ত ডিম্বাণু উৎপাদন করা হয়। এখন তিনি ৭ মাসের প্রেগন্যান্ট।

কেস ৩

কোচবিহারের এক শাড়ি ব্যবসায়ী শঙ্কর চৌধুরির প্রায় ৭ বছর হল বিয়ে হয়েছে। শঙ্করবাবু ও তার স্ত্রী দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সন্তানধারণে বিফল হলে জরুরি পরীক্ষা করে জানা যায়, শঙ্করবাবুর স্ত্রী শারীরিকভাবে সম্পুর্ণ সুস্থ হলেও তিনি নিজে অ্যাজুস্পার্মিয়া রোগে আক্রান্ত। অর্থাৎ তার শরীরে পর্যাপ্ত শুক্রাণু নেই, তাই ডোনার স্পার্ম দিয়ে ‘আই ভি এফ’ করা হয়। গত বছর শঙ্করবাবু একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের বাবা হয়েছেন।

ডা: জয়শ্রী ভট্টাচার্য
FRCOG (UK)
Consultant Gynaecologist & Infertility Specialist
A.H. IVF & Infertility Research Centre
Kolkata,Durgapur,Siliguri,Bankura,Ranchi,Patna
Ph : (033) 4061 0003
Web : www.ahiirc.com

কেবল সরকার দম্পতি কিংবা সুদেষ্ণা দেবী বা শঙ্কর চৌধুরি নন, এরকম হাজার হাজার উদাহরণ রয়েছে আমাদের সামনে, যারা সন্তানহীনতার প্রতিকূলতা কাটিয়ে জন্ম দিচ্ছেন সুস্থ স্বাভাবিক শিশুর। তাই ইনফার্টিলিটির সমস্যা থাকলে অযথা ভয় পেয়ে কিংবা লজ্জিত হয়ে চিকিৎসার আড়ালে থাকবেন না প্লিজ। এগিয়ে আসুন সময় থাকতে থাকতে। সঠিক চিকিৎসা করালে অনায়াসে আপনিও এই খারাপ সময় কাটিয়ে উঠতে পারবেন।

আরও পড়ুন:  ১৬ বছর বয়সে পালিয়ে বিয়ে করেন দিদির ৩১ বছরের সেক্রেটারিকে...জন্মদিনে অজানা আশা

ইনফার্টিলিটি বা সন্তানহীনতা কী?

বিয়ের পর কোনও দম্পতি যদি কোনও প্রকার নিরোধক ছাড়াই দীর্ঘ ১ বছর ব্যাপী চেষ্টা করেও সন্তান ধারণে অক্ষম হন, তাকে ডাক্তারি পরিভাষায় ইনফার্টিলিটি বা সন্তানহীনতা বলা হয়।

কারণ – সন্তানহীনতার ক্ষেত্রে মহিলা ও পুরুষ উভয়ই সমান দায়ী থাকেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে দুজনের কোনও প্রকার সমস্যা না থাকলেও কোনও অজানা কারণে সন্তান আসে না, যা আনএক্সপ্লেন্ড ইনফার্টিলিটি নামে পরিচিত।

রিস্ক ফ্যাক্টর –

মেয়েদের সমস্যা – ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু ঠিকমতো না বেরোলে — এন্ডোমেট্রিওসিস — স্ত্রী হরমোনের সমস্যা — ইউটেরাস বা জরায়ুর মুখে টিউমার — পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম (PCOS) — ফ্যালোপিয়ান টিউবে কোনও সমস্যা — ক্যান্সারে রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপি নিলে।

ছেলেদের সমস্যা – সঠিক পরিমাণ শুক্রাণু তৈরি না হওয়া —  শুক্রাণু টেস্টিস থেকে ঠিক মতো বেরোতে না পারলে —  অতিরিক্ত ধুমপান করলে  —  মাম্পস বা টিউবারকিউলোসিস হলে —  ক্যান্সারে রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপি নিলে।

উভয়ের সমস্যা – দেরিতে বিয়ে বা দেরিতে সন্তান প্ল্যানিং  —  সঠিক পদ্ধতিতে সহবাস না করা —   অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন

এই ভি এফ ( In Vitro Fertiliziation ) কী ?

IVF হল সন্তান ধারণের একটি কৃত্রিম পদ্ধতি। এক্ষেত্রে পুরুষদের শরীর থেকে শুক্রাণু এবং মহিলার থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম পদ্ধতিতে নিষেক ঘটিয়ে ভ্রুণ উৎপাদন করা হয়। সেই উৎপাদিত ভ্রুণ নির্দিষ্ট দিনে মহিলার জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করানোর নামই হল IVF ।

এটি কি ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি?

IVF হল একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ পদ্ধতি। এক্ষেত্রে মহিলার কিংবা পুরুষের শরীরে কোনও প্রকার কাটাছেঁড়া করা হয় না। কেবল কয়েকটি হরমোন ইনজেকশন পুস করে শুক্রাণু এবং ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। সম্পূর্ণ পদ্ধতিটিতে কোনও প্রকার সংক্রমনের সম্ভাবনা নেই। অনেকের ধারণা এতে মা কিংবা হবু সন্তানের শারীরিক জটিলতা আসে, যা কিন্তু সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা। এক্ষেত্রে এই প্রকার কোনও সমস্যার মোকাবিলা করতে হয় না।

আরও পড়ুন:  ১৯৬৬-র বাংলা ছবির রেসিপি থেকেই কি ‘মাছের ঝোল’ তৈরি?

IVF এর সফলতা বাড়ানোর উপায় –

  • মহিলার PCOS কিংবা এন্ডোমেট্রিওসিস থাকলে দেরি না করে দ্রুত IVF করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
  • কম বয়সে IVF করালে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।
  • IVF-এর ক্ষেত্রে Urinary ইনজেকশনের পরিবর্তে Recombinant ইনজেকশনে সফলতার হার বেশি।
  • এখন আগের মতো বেশি ইনজেকশন না দিয়ে কম ইনজেকশন পুস করে IVF-এর প্রচলন শুরু হয়েছে। যা Mild Stimulation IVF বা মিনি IVF নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে সফলতার হার তুলনামূলক বেশি।
  • এখন Preimplantation Genetic Screening (PGS) পদ্ধতির দ্বারা ভ্রুণের গুনগত মান আগেই দেখে নেওয়া সম্ভব। যার ফলে উন্নতমানের ভ্রুণটিই জরায়ুতে প্রতিস্থাপিত করা হয়।
  • এছাড়া এখন Endometrial Receptivity Array (ERA) পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা সম্ভব ঠিক কোন দিন ভ্রুণ জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।
  • Embryoscopy পরীক্ষাটির মাধ্যমে ভ্রুণের সিরিয়াল গ্রোথ নির্ধারণ করা হয়। যার ফলে সবচেয়ে উন্নত ভ্রুণটিই মহিলার জরায়ুতে প্রতিস্থাপিত করে এর সফলতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
  • Blastocyst – আগে ল্যাবে এমব্রায়ো বা ভ্রুণটি ২-৩ দিনে জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হতো। কিন্তু এখন গবেষণায় দেখা গেছে ভ্রুণ প্রতিস্থাপনের আদর্শ সময় হল পঞ্চম দিন। যা Blastocys নামে পরিচিত।
  • Laser Assisted Hatching – যে সকল মহিলার জরায়ুর দেওয়াল মোটা হয়, তাদের ক্ষেত্রে ভ্রুণ প্রতিস্থাপন ঠিকমতো হতে চায় না। সেক্ষেত্রে লেজার দিয়ে একটি ছোটো ফুটো করা হয়, যাতে ভ্রুণ সঠিকভাবে প্রতিস্থাপিত হতে পারে।
  • ডোনার স্পার্ম, এগ ও এমব্রায়ো ( যাদের নিজস্ব স্পার্ম, এগ কিংবা এমব্রায়ো উৎপাদন করা সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে) উপযুক্ত ব্যাঙ্ক থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব।

IVF-এর জন্য ডাক্তারি প্রস্তুতি –

  • সম্পূর্ণ পদ্ধতি সম্পর্কে ভাবী মা ও বাবাকে কাউন্সেলিং করানো
  • এমব্রায়ো ট্রান্সফারের নির্দিষ্ট দিন জানানো
  • প্রয়োজনে এগ এবং স্পার্ম ফ্রিজিং করা
  • হরমোন অ্যানালিসিস করা
  • সিমেন অ্যানালিসিস করা
  • PCOS এবং এন্ডোমেট্রিওসিস থাকলে, তার স্ক্রিনিং করানো।
  • যদি কোনও শারীরিক সমস্যা থাকে তাহলে আগে থেকে তা স্ক্রিনিং করানো
  • হেল্ডি ডায়েট মেনে চলা এবং নিয়মিত হালকা শরীর চর্চা করা।
আরও পড়ুন:  জানেন কি খালি পেটে কী কী করতে নেই?

 

IVF মানেই কি খরচ সাপেক্ষ পদ্ধতি –

অনেকের মনেই এই ধারণা রয়েছে IVF মানেই আকাশ ছোঁয়া খরচ, যা সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালে সম্ভব নয়। কিন্তু এখন অনেক নতুন নতুন উন্নত মানের ইনফার্টিলিটি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে যেখানে একদম সাধ্যের মধ্যে সম্পূর্ণ পদ্ধতিটি করা সম্ভব।

এক নজরে

  • যদি বিয়ের পর কোনও নিরোধক ছাড়াই সহবাস করেও সন্তান ধারণে অক্ষম হন, তাহলে অযথা দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
  • মহিলাদের ক্ষেত্রে পরিবারে কারও যদি কোনও গাইনিকলজিকাল সমস্যা থাকে, তাহলে বয়স সন্ধি সময় থেকে সচেতন হন
  • পুরুষদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ধুমপান কিংবা মদ্যপান কিন্তু পরবর্তীকালে ইনফার্টিলিটির সমস্যার সম্মুখীন করতে পারে
  • যদি IVF করান তাহলে তা অবশ্যই কোনও ভালো প্রতিষ্ঠান এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানেই করানো আবশ্যক
  • IVF-এর ক্ষেত্রে যদি ডোনার শুক্রাণু বা ডিম্বাণুর প্রয়োজন পড়ে, তাহলে তা নিতে লজ্জার কোনও কারণ নেই। এটি চিকিৎসারই একটি অঙ্গ মাত্র। এখন প্রচুর উন্নতমানের ব্যাঙ্ক তৈরী হওয়ায় এটি কোনও সমস্যাই নয়
  • কম বয়সে IVF করালে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। এবং খুবই কম ইনজেকশনের প্রয়োজন পড়ে
  • যদি আপনার ক্যানসারে কেমো কিংবা রেডিওথেরাপি নিতে হয়, কিংবা আপনি কিছুদিন পর সন্তান প্ল্যানিং করতে চান, তাহলে আগে থেকে ভবিষ্যতের জন্য স্পার্ম কিংবা ওভাম প্রিজারভেশন করে রাখতে পারেন।

NO COMMENTS