জলদ গুপ্ত
জলদ গুপ্ত লেখেন না, ভাবেন। নিজেকে মনে করেন মুদির দোকানের মালিক। কোথায় কোন মশলা আছে শুধু সেটুকুই উনি জানেন, খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী কাগজে মুড়ে দিয়ে দেন...ব্যস। সিধুজ্যাঠার মত অনেক কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও অন্যদের অসুবিধা হবে বলে কিছুই করেন নি। কবিতা, নাটক লিখতে পছন্দ করেন আর পাগলের মত পছন্দ করেন সঙ্গীত। পাহাড়ি জঙ্গলের টিলায় বসে হেঁড়ে গলায় গান আর দিনে ১৫ কাপ চায়ের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। আদিখ্যেতাকে ঘেন্না করেন, তর্ক করতে ভালোবাসেন। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে কোন লেখক থাকবে না।

কুড়ি বছরের জেল হল বাবার। ভক্তদের মিছিল, বিক্ষোভ, অবরোধ, ৩৬ জন কৃতি সন্তানের মৃত্যু…এ সব কোন কিছুই এই হাইটেক বাবাকে তার গোপন গুহায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারল না। ভক্তরা পারল না তাদের ঈশ্বরকে, ঈশ্বরের জায়গা ফিরিয়ে দিতে। জেলের ছোট্ট ঘরের ভিতর সামান্য সরকারী খাবার আর অন্যান্য কয়েদিদের মত বিছানাই এই অতি মুল্যবান ঐশ্বরিক প্রাণের বর্তমান ভবিতব্য। এ এক অসম যুদ্ধ। রাষ্ট্রের তৈরি এক ঈশ্বরের সঙ্গে জনগনের তৈরি আইনের। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে যেখানে আইন জয়লাভ করে, বিজয়ী হয় মানুষ, মানবতা, গনতন্ত্র। কিন্তু সত্যিই কি মানুষ জেতে ? সত্যিই কি সঠিক বিচার পায় তারা ? সব দোষ কি সত্যিই রাম রহিমের ? একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় বিষয়টা ঠিক এতটা সোজা নয়।

জমিদার বাবার ছেলে হলেও আর পাঁচটা অতি সাধারণ ছেলের মতো রাম রহিমেরও বেকার জীবন ছিল। বেঁচে থাকার জন্য দরকার ছিল কাজের। এ সময় থেকে অর্থাৎ কিশোরবেলার শুরুতে রাম রহিম আধ্যাত্মিকভাবে যখন ক্রমে ক্রমে একজন দুজন বা পাঁচজনের বিশ্বাস অর্জন করতে শুরু করেছে তখন কিন্তু সে ধর্ষক ছিল না। নারী দেহের প্রতি স্বাভাবিকের থেকে একটু বেশি টান থাকলেও কাউকে ধর্ষণ করার কথা তখন বোধহয় তার মাথায় আসে নি বা ইচ্ছে থাকলেও সাহসে কুলোয় নি। কৈশোরের বিভিন্ন রকম ‘এইম ইন লাইফ’এর মতো তার ‘এইম ইন লাইফ’ ছিল যে সে ‘বাবা’ হবে। সে যা বলবে হাজার হাজার সন্তান মাথা নিচু করে সেটা শুনবে…কোন প্রশ্ন করবে না। তার ভবিষ্যৎবাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাবে, চারদিকে শিষ্য, শিষ্যারা লাট খাবে। ফ্রিতে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, মার্সেডিজ, রোলস রয়েস … ব্যস, কেল্লা ফতে। ছুতোর, কলের মিস্ত্রি, পাইলট বা ডাক্তার হতে চাওয়ার মতো তার এই বাবা হতে চাওয়ার এইম’ও চুড়ান্ত আইনসম্মত, এর মধ্যে অন্যায়ের কিছু নেই। এই এইম ঠিক করার পর থেকে সে কিন্তু যথেষ্ট পরিশ্রম করতে শুরু করে। একেবারে নিজস্ব ক্যারিশ্মায় খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষগুলোর কাছে পৌঁছতে শুরু করে, তাদের বিশ্বাস, ভালবাসা, ভরসা অর্জন করতে থাকে। এদেরই প্রশ্রয় ও আদরে একটু একটু করে সে এদেরই ভগবান হয়ে উঠতে থাকে, নিশ্চিন্তে তাকে সবাই বাবা বলে ডাকতে থাকে। এই সহজ সরল ধম্ম-সন্তানরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, যার কেউ নেই তার রাম রহিম আছে।

আরও পড়ুন:  জানেন বিয়ের ঠিক আগে কোন ধরণের রূপচর্চা কখনোই করা উচিত নয়?

এই সহজ সরল আধপেটা মানুষগুলোই আবার আর এক দল বাবাদের যত্নের মূলধন। সাদা পাজামা পাঞ্জাবী পরে, হাত জোড় করে এই রাজনৈতিক বাবারা এদের কাছে জল, ভাত, কাপড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গনতান্ত্রিক ভাবে ভোট ভিক্ষা করতে আসে। এদেরকে তারা স্বপ্ন দেখায় যে তারা এই সতীদাহ, তালাক বা ডাইনী আইনের ঘেরাটোপে বন্দি ভুখা দেশটাকে একেবারেই বদলে দেবে। প্রতিটি মানুষ পেট ভরে খেতে, শুতে পাবে। এই দুই বাবা মানে ধর্মবাবা এবং রাজনৈতিক বাবার এগিয়ে চলার পথ দু’রকম হলেও তাদের মুল লক্ষ্য কিন্তু একই  – সেটা হল তেলচিটে পেটের বৈধ বা অবৈধ আধারকার্ডওলা সন্তানদের মঙ্গল সাধন। কারণ ওরাই তো দেশের সম্পদ, ওরাই তো ব্যালট। এই মঙ্গলসাধনের নিরন্তর প্রক্রিয়ায় দুই বাবার আন্তরিক পরিকল্পনার মধ্যে কোন বিরোধ নেই, এখানে ধর্ম ও রাজনীতি মিলেমিশে একাকার। ফলে এই বাবাজীরা খুব সন্তর্পনে দেশের কাজ করার জন্য, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোট বাঁধে – জোটবদ্ধ হয় ঈশ্বর এবং রাষ্ট্র, জোটবদ্ধ হয় ধর্ম ও রাজনীতি। এই জোট খুব সহজেই সহজ সরল মনুষ্য সম্পত্তি করায়ত্ত্ব করে ফেলে। তৈরি হয় এই জোরালো জোটের নতুন ইস্তেহার, যার মুলে থাকে এক অলিখিত চুক্তি – ‘তুমি আমাকে ব্যালট দাও, আমি তোমাকে বৈভব দেব, ক্ষমতা দেব ’। এই চুক্তির জোরেই প্রশাসনের নাকের ডগায় তৈরি হয় আর একটা প্রশাসন। শুরু হয় রাম রহিমের মতো বাবাদের রকেট গতির উত্থ্বান, তৈরি হয় প্রাসাদ, গুম্ফা বা সোনা দিয়ে মোড়া শোবার ঘর এবং এক ঘর সাধ্বী। তখন সেই চুড়ান্ত বৈভব এবং রাষ্ট্রীয়-ঐশ্বরিক ক্ষমতায় বিরাজ করা রাম রহিম ধর্ষণ না করে যাবে কোথায় ? ধর্ষণ বা বিনা বাক্যব্যয়ে নারীদেহ ভোগ করাই তো পুরুষের ক্ষমতা প্রদর্শনের সর্বোত্তম পর্যায়।

সুদূর অতীত থেকে আজ পর্যন্ত এভাবেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং ধর্মকে হাতিয়ার করে রাম রহিম এবং রাজনৈতিক নেতাদের মহাজোটের দাদাগিরি চলছে … চলবে। আর আমরা সেই দাদাগিরিকে দিব্যি ঈশ্বর আখ্যা দিয়ে বাবাদের পা ধোয়া জল খাচ্ছি … পেট না ভরা পর্যন্ত খেয়েই চলেছি। এভাবেই প্রশাসনের সক্রিয় সহযোগিতায় দেশের প্রতিটি কোণে কোণে অজস্র রাম রহিমরা বড় হচ্ছে, জোট বাঁধছে ।  নাহলে যে দেশে অর্ধেকের বেশি মানুষ খেতে পায় না, যে দেশের দুই তৃতীয়াংশ মানুষ ভালোভাবে নাম সই করতে পারে না সেই দেশেরই একটা সাধারণ  মানুষ শুধুমাত্র  ভগবানের কথা রিলে করে এবং দীক্ষা দিয়ে কয়েকশো কোটি টাকার মালিক হয় কী করে … এ প্রশ্ন কেন ওঠে না ? কেন প্রশাসন উঁকি মারে না ওই সোনায় মোড়া কন্ডোম ভর্তি গোপন ডেরায় ? কেন মিলিটারি নামে না ওই আবছা আলোয় ঘেরা গোপন সুড়ঙ্গে ?  রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরা কেন বাবার পায়ের ধুলোর জন্য হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন ? খবর করতে যাওয়া এক সাহসী সাংবাদিক কেন নিঃশব্দে খুন হয়ে যান ? কেন সেই সাংবাদিক হত্যার বিচার পদ্ধতি বিশ বাঁও জলে ডুবে থাকে ?

আরও পড়ুন:  প্রিয় প্রিয়, বিদায়

আসলে রাম রহিম বা রাম রহিমরা এখানে একটি সফল জোটের সামান্য একজন প্রতিনিধি মাত্র। দেশের প্রতিটি গ্রামপঞ্চায়েত থেকে লোকসভা এলাকায়, টিভিতে, কাগজে, আনন্দ দুঃখ বা কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রতিদিন এভাবেই হাজার হাজার রাম রহিমরা পালিত হচ্ছে, বন্দিত হচ্ছে, পুজা পাচ্ছে। ধর্মীয় অভিমানকে সামনে রেখে খুব যত্ন করে লালন করা হচ্ছে এইসব ধর্ষক, জোচ্চোর, রাম রহিমদের। এই পোড়ার দেশে এটাই দস্তুর, এটাই নিয়ম। ঈশ্বর আর জনগনের মাঝে এই দালালরাই তো রাজা, মহারাজা, সম্রাট। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের নিরন্তর খেলায় এই মানুষগুলোই তো সোনার হরিণরূপী মারীচ, যাদের তীব্র আকর্ষণে ঢলে পড়ে জনগন – রূপী সীতা।

কিন্তু আজ রাম রহিম বড় একা। সৎভাবে জোটধর্ম পালন করেও এখন তার পাশে স্বশরীরে কোন জোট-ভাই নেই। দুটো আপেল মুসুম্বি আর গোটা পাঁচেক কড়া পাকের সন্দেশ নিয়ে তাকে কেউ দেখতে আসার সাহসও দেখায় নি। একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে পথ চলে, নির্দিস্ট কর্মসূচী অনুযায়ী কাজ করে, কোটি কোটি ব্যালটকে আয়ত্ত্বে এনেও আজ সে আসামী, আজ তার ঠিকানা দশ ফুট বাই দশ ফুটের স্যাঁতসেঁতে একটা ঘর, আর তার জোট ভাইরা দিব্যি অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, মার্সেডিজ, রোলস রয়েস, কন্ডোম…।

হতাশ ঈশ্বর রাম রহিম হয়তো আজ তাই রবিঠাকুরকে আশ্রয় করে বিড়বিড় করে মনে মনে বলে ওঠে তাঁর কবিতার সেই লাইন… ‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ আমি আজ চোর বটে’।

3 COMMENTS

  1. খুব ভাল লেখা। কিন্তু যাদের জন্য লেখা সেই সাধারণ মানুষ বুঝবে তো ?

  2. মানুষ এই বাবাদেরই তো ভগবান ভেবে পুজো করে, এত কিছুর পরও করবে।