বাংলালাইভ রেটিং -

কোন লেখকের লেখা আইডিয়া ঝেঁপে ‘জগগা জাসুস’-এর ক্যারেক্টার তৈরি হল, সেটা পরে বলছি। সিনেমা দেখতে গিয়ে সিনেমার টার্গেট ভিউয়ারদের ঠিক কেমন রেসপন্স দেখতে পেলাম, সেটা লিখে রাখি আগে।

সবে শেষ হয়েছে সিনেমাটা, এন্ড ক্রেডিটের নাম দেখানো শুরু হল এই জাস্ট। নামী মাল্টিপ্লেক্সের অডিটোরিয়ামের আলোগুলো জ্বলে উঠছে ধীরে। তাকিয়ে দেখি, চারপাশে বসা খুদে মানুষজনের বেশিরভাগই এর মধ্যে ঘুমিয়ে পুরো কাদা!

অথচ ওরাই তো ছবির আসল ভিউয়ার, নাকি? গেল শুক্রবারই খবরের কাগজে অনুরাগ বাসু’কে বড় মুখ ক’রে বলতে শুনলাম, এটা নাকি বড় বাজেটে বড় ভাবে বানানো বাচ্চাদের ছবি (পপকর্ন, সংবাদ প্রতিদিন, ১৪ জুলাই)। আর ছবির টিজার বলুন, ট্রেলার বলুন, পোস্টার বলুন, সব দেখলে প্রথম যেটা মাথায় আসছে, যে ওরেব্বাস, এ তো মেগা স্কেলে বানানো কোন অ্যাডভেঞ্চারের সিনেমা বোধহয় এটা!

তা সেই ‘বড় বাজেটে বড় ভাবে’ বানানো বাচ্চাদের ছবির ছিরি কি তাহলে দাঁড়াল এরকম যে ছবি দেখতে বসে সেই বাচ্চারাই সব ঘুমিয়ে পুরো শেষ!

অবশ্য ওদের আর দোষ দিই কী করে বলুন? আমি নিজে তো বয়সে বাচ্চা নই, বলতে গেলে আধ-দামড়া হাফ-বুড়ো একটা লোক। আমি নিজেই তো দিশা পাচ্ছিলাম না একেকবার যে চোখের সামনে পর্দায় অ্যাকচুয়ালি ঘটছেটা ঠিক কী! তাহলে বাচ্চারা আর ঘটনাপ্রবাহের কূল খুঁজে পাবেটা কী করে, শুনি?

বলা নেই কওয়া নেই, কলকাতা বইমেলার এক প্যাভিলিয়নের মধ্যে এক ঝাঁক কচি কাঁচাদের গল্প শোনাতে বসে গেল সম্ভবত কোন এক পাবলিশিং হাউসের সঙ্গে যুক্ত এক মহিলা (এই ভূমিকায় ক্যাটরিনা কাইফ)। ছবিটা বলতে গেলে এখান থেকে শুরু (এর আগে যদিও একটা পুরুলিয়ার সিন আছে)। কমিক ক্যারেক্টার জগগা জাসুসের গল্প শোনাতে শোনাতে মহিলা দাবি করছেন শুনলাম যে, এই ‘জগগা জাসুস’ ক্যারেক্টারের অ্যাডভেঞ্চারগুলো নাকি বানানো নয়, সত্যি। আচ্ছা, তা না হয় হল, কিন্তু একটা কথা বলুন, কলকাতা বইমেলায় সত্যি কি এমন ক’রে গল্প বলার আসর বসে নাকি কোথাও? গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে একটানা কলকাতা বইমেলাতে যাচ্ছি, কোথাও কোনদিন তেমন কিছু ঘটতে দেখি নি তো!

ব্যাস, ছবির শুরুতেই আমি প্রায় এক গলা জলের মধ্যে ঝুপুস! বইমেলার কিম্ভুত এই সিকোয়েন্স কোত্থেকে আমদানি করলেন আপনি অনুরাগ?

আরও শুনুন, মেলার সেই পুরো প্যাভিলিয়ন জুড়ে নানা বয়সের খুদে, কিন্তু কোথাও তাদের বাবা-মা কারুর টিকির দ্যাখা পর্যন্ত নেই! দেখতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, এই বাচ্চারা কি বইমেলায় সব একলা এসেছে নাকি? না হলে এদের গার্জেনরা সব গেলটা কোথায়? আর কী লক্ষ্মী দেখুন বাচ্চাগুলো, কারুর কোন বায়না নেই, কিচ্ছু নেই, মন দিয়ে সবাই গপ্পো শুনে যাচ্ছে, আর দরকারে দুয়েকটা ব্যাপার নিয়ে কোশ্চেন করছে শুধু।

এটা বইমেলা নাকি ক্লাসরুম চলছে কোন?

সিনেমার সেকেন্ড হাফে ওই মহিলার সঙ্গে স্টেপস মিলিয়ে মিলিয়ে তো রীতিমতো নাচ-গান অবধি করতে থাকে বাচ্চাগুলো। আর তখন গানের লাইনগুলো কী সোশ্যালি রেলেভেন্ট সব লাইন, বাপরে বাপ! পুরো লিরিক জুড়ে তখন কঠিন সব আত্ম-সমালোচনার একের পর এক ঝড়! সিস্টেমের দিকে প্রায় আঙুল তুলে বলতে থাকা যে, এমন ক’রে বানাচ্ছ আমাদের যে আমরা সবাই বলতে শিখছি, পুরুলিয়ায় অস্ত্র-বর্ষণ হচ্ছে, হোক না, তাতে আমার কী! পাটনায় ট্রেনে বোমা বিস্ফোরণ, হোক না, তাতে আমার কী! দেশ জুড়ে আত্মহত্যা করে বেঁচে থাকার জ্বালা জুড়চ্ছে চাষিরা, হোক না, তাতে আমার কী?

কমিক অ্যাডভেঞ্চার দেখতে বসে এসব জ্ঞান শুনতে হলে মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে না বলুন?

জোর করে গাল টিপে ধরে মুখ হাঁ করিয়ে সোশ্যাল অ্যাওয়ারনেস গিলিয়ে দেওয়ার এই সিনগুলো দেখে সিনেমা দেখতে আসা বাচ্চাগুলোর কী হাল হচ্ছিল, জানি না। কিন্তু আমার ঝট ক’রে কী মনে হল জানেন?

মনে হল, অনুরাগের কাছে জানতে চাই এটা যে, এই সিনটায় পার্ট করানোর জন্য ক্যাটরিনা ছাড়া আর কাউকে তুই খুঁজে পেলি না ভাই? এমন একটা বয়সে পৌঁছেছি যে, ক্যাটরিনা বলতে টপ অফ দ্য মাইন্ডে ঝট করে যে ছবিটা আসে, সেটা তো মহিলার সেই স্পেনে গিয়ে বিকিনি পরে রণবীরের সঙ্গে ছুটি কাটানোর সিন! তা’ এখন সেই বিকিনি-সুন্দরীর মুখ থেকে কিনা এই লেভেলের সমাজ-সচেতনতাও শিখতে হবে – প্রভু, এও কি ছিল কপালে?

‘জগগা জাসুস’ ছবিটা শুরু থেকে শেষ অবধি এরকম বিবিধ সব ঘাপলা দিয়ে ঠাসা। গাঁটের কড়ি খরচ করে সেটা দ্যাখার জন্যে টিকিট কাটবেন, নাকি মাস কয়েক পরে টিভি প্রিমিয়ার হ’লে ঘরেই আয়েস করে বসে বসে দেখে নেবেন, নিজেই না হয় সেটা এখন ঠিক করে নিন ভাই!

আরও পড়ুন:  ইছামতীর কোলে প্রাচীন এই জনপদের নাম 'বসিরহাট' হল কেন ?

একদম শুরুর থেকেই বলি। ফার্স্ট যে ফ্রেমটা ছবিতে দেখতে পেলাম, সেখানে লেখা, ছবিটা নাকি বাবা সুব্রত বোসের উদ্দেশে ডেডিকেট করছে পুত্র অনুরাগ। তখন কার্ডটা দেখে মনে হয় নি কিছু, পরে ছবি কিছুটা দ্যাখার পর মনে হচ্ছিল, শুরুর ওই কার্ডটায় বাবার সঙ্গে শিবরাম চক্রবর্তীর নামটাও থাকা উচিৎ ছিল বলে!

কেন জানেন? ছবির আসল মশলাটাই তো শিবরামের থেকে নেওয়া!

খুলেই লিখছি দাঁড়ান।

তোতলানো সারাতে যে গান গেয়ে কথা বলতে হয়, এই ইউনিক আইডিয়া প্রথম সম্ভবত শিবরাম চক্রবর্তীর মাথা থেকেই বেরয়

ছবিতে দ্যাখান হয়েছে, তোতলামি সারাতে গেলে সাধারণ কথাবার্তাও নাকি গান গেয়ে গেয়ে বলতে হবে! তো, এমন একটা উপায়ে তোতলামি যে সারতে পারে, সেটা অনুরাগের মাথায় এলটা কী করে শুনি?

হতে পারে তিনি একদম হালে মার্কিন দেশে এটা নিয়ে যে গবেষণা হয়েছে, সে সব বিষয়ে পড়াশুনো করেছেন বিস্তর। কিংবা এটাও হতে পারে যে প্রাথমিক ভাবে এরকম একটা দাওয়াই-য়ের আসল আইডিয়া তিনি পেয়েছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী’র থেকে। হ্যাঁ, এটা আজ থেকে বহু বছর আগে একটা গল্পে লিখে গেছিলেন তিনি স্বয়ং!

সেই ছোটগল্পটা মনে পড়ছে? ‘জাহাজ ধরা সহজ নয়’। ‘আমি’ ‘আমি’ ক’রে লেখা গল্পে নায়ক সেখানে তোতলা – চলেছে পদ্মার বুকের ওপর দিয়ে – পূর্ব বাংলার মুলুকে – খুড়তুতো দিদির শ্বশুরবাড়িতে – দিদি আর জামাইবাবুর সঙ্গে। তার তোতলামিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার পর জামাইবাবু তাকে কী বলছে শুনুন। ‘বাবা রে – বাবা! পাগল করে দেবে নাকি? … বলেছি না তোমাকে? কতবার তো বলেছি যে তোমার যা বলবার তা গান করে ব’ল – বেশ ক’রে সুরে ভেঁজে নিয়ে গাও? গানই হচ্ছে তোতলামির একমাত্র দাবাই। যদি সারাতে চাও তোমার এই তোতলামো তো গানের সাহায্য নাও। কেন, সুর খেলিয়ে বলতে কি হয়? আর সুর বার-করা এমন কিছু শক্তও না। স্বরটা নাকের ভেতর দিয়ে বার করলেই সুর হয়। আর কিছু না থাক, নাক তো আছে?’ (শিবরাম রচনাসমগ্র, অন্নপূর্ণা প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ আশ্বিন ১৩৯২, বানান মূলানুগ ও অবিকৃত)।

এই গল্পের বাকিটায় বিশদ বিবরণ রয়েছে যে, এরপর থেকে নিজের সব কথাবার্তা সংলাপে না বলে গান গেয়ে গেয়ে ছেলেটি বলতে লাগলো কী ভাবে। আর সেটা নিয়ে কী চরম কৌতুককর সিচুয়েশন তৈরি হল এক সময়।

বুঝতে পারছেন, কী ভাবে চুপচাপ এই গল্প থেকে এরকম মোক্ষম একটা আইডিয়া তুলে নিয়েছে এই ‘জগগা জাসুস’ ছবিটা? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, ছবির নায়কের ক্যারেক্টারে কপি-পেস্ট করে শিবরামের ওই ছোট গল্পের ছেলেটিকে এনে বসিয়ে দিয়েছেন অনুরাগ! এক্সট্রিম লেভেলে তোতলা ছেলে জগগাকে (এই ছোট্ট জগগা’র ভূমিকায় সর্বজিত তিওয়ারি) তো বলতে গেলে প্রথম আলাপেই বাদল বাগচি (শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়) এই উপদেশটাই দিচ্ছে যে তোতলামি কাটাতে গেলে নাকি কথা বলতে হবে গান গেয়ে গেয়ে! আর সেই থেকে নিজের পুরো বাকি জীবনটা জগগা কাটাচ্ছে গান গাইতে গাইতে,আর আস্ত ছবিটা হয়ে উঠছে পুরো গানে গানে মোড়া একটা মিউজিক্যাল ছবির মতো! ভাবুন একবার, শিবরাম থেকে এত বড় আইডিয়া নিয়ে নিলেন চুপচাপ অথচ পুরো ছবির কোথাও শিবরামের একটা কোন উল্লেখ অবধি রইলো না! ঋণস্বীকার-ফিকার তো বহুদূরের কথা!

জগগা রূপে রণবীরের চুলের স্টাইল ঠিক যেন টিনটিনের মতো!

অথচ ছবি জুড়ে কীসের রেফারেন্স না টেনেছেন ভদ্রলোক। ফেলুদা বা শার্লক-এর উল্লেখ তো গানের লিরিকে একেবারে নাম ক’রে ক’রে আছে। আফ্রিকায় বাদল বাগচি ডেরা বেঁধেছে ‘শুণ্ডি’ রাজ্যে গিয়ে, মানে সোজা গুপী-বাঘার রেফারেন্স অবধি আছে! বর্মা সীমান্তে কুড়ি কিমি লম্বা লুকনো সুড়ঙ্গ দিয়ে সুভাষ বোসের আজাদ হিন্দ সেনার ভারত অভিযানের গল্প শোনাচ্ছেন এই। তারপরেই আবার দু’জন মানুষের আকস্মিক দেখা হয়ে যাওয়া নিয়ে গৌতম বুদ্ধের রহস্যময় বৌদ্ধ দর্শন কপচে দিচ্ছেন কিছুটা! এত কিছু আছে, কিন্তু ছবির আঙ্গিকের আসল মেরুদণ্ডটা হাতসাফাই করলেন কোথা থেকে, সেটা বলতে গিয়েই চুপ মেরে গেলেন, ভাই?

যতদূর জানি, এখনও অবধি এটুকু দ্যাখা গেছে যে তোতলা মানুষেরা গান গাইতে গিয়ে যে রিল্যাক্সড থাকেন খুব আর সে সময় যে তাঁদের মধ্যে তোতলামি দ্যাখা যায় না, তার কারণ সেই গানের কথা-সুর সব তো ঠিক করা থাকে আগেই। কিন্তু তোতলা কোন মানুষ নিজে নিজে তাৎক্ষণিক ভাবে গুপীর মতো গান রচনা করে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে চলেছেন টানা, এবং তারপরেও ঠেক খাচ্ছেন না একটুও, এই ইউনিক আইডিয়া হানড্রেড পারসেন্ট শিবরামেরই ছিল!

আরও পড়ুন:  মহেন্দ্র কপূরের জন্য নিজের হাতে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়েছিলেন রাজ কপূর‚ জানেন সেই আশ্চর্য কাহিনি?

অনুরাগ কেরিয়ারের শুরুটাই করেছিলেন হলিউডের ছবি টুকতে টুকতে। প্রোডিউসার একতা কাপুরের সঙ্গে মতের মিল না হওয়ায় মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে এসেছিলেন ‘কুছ তো হ্যায়’ (২০০৩) ছবিটা, তারপর কমপ্লিট নিজের তৈরি প্রথম সিনেমা বলতে ‘সায়া’ (২০০৩)। সেটা ছিল হলিউডের ছবি ‘ড্রাগনফ্লাই’ (২০০২) থেকে টোকা। এরপরের ছবি ‘মার্ডার’ (২০০৪) টুকে মেরে দিলেন ‘আনফেথফুল’ (২০০২) থেকে। ‘লাইফ ইন আ… মেট্রো’ (২০০৭) টুকে দেওয়া হল ‘দ্য অ্যাপার্টমেন্ট’ (১৯৬০) থেকে। কিন্তু হলিউড থেকে কপি করতে সিদ্ধহস্ত ডিরেক্টর যে এবার একেবারে বাঙালি লেখকের ঝুলির মধ্যেও নিঃসাড়ে হাত ঢুকিয়ে দেবেন, বুঝতে পারি নি সেটা!

প্রায় ২ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের ছবিটায় শুরু থেকে শেষ অবধি এত রকমের মশলা, যে সব মিলিয়ে সেগুলো যেন তালগোল পাকিয়ে গেছে পুরো! একেকবার তো মনে হচ্ছিল, এটার নাম ‘জগগা জাসুস’ না রেখে ‘জগার খিচুড়ি’ রাখলেও তো ভুল হতো না কিছু! ক্যারেক্টারগুলোকে এই দেখছি এখানে, তো এই তারা চলে গেল পৃথিবীর পুরো উলটো প্রান্তে, অন্য মহাদেশের বুকে! বারবার নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছি এইটে বলে যে, আহা, ফ্যান্টাসি ফিলিম কিনা, অত লজিক মেপে ভাবতে যাওয়াটা ঠিক হবে না তাই!

কিন্তু যতই ফ্যান্টাসি হোক না কেন, গল্পের মিনিমাম মাথা-মুণ্ডু তো একটু থাকবে? একটা সময় সেগুলোরও কোন হদিশ মিলছিল না যে! জগগার পালক পিতা বাদল বাগচির কথাই ধরুন। ভদ্রলোকের আসল চাকরিটা কীসের, মানে মাসিক বেতনটা আসতো কোন সোর্স থেকে, লাস্ট সিন অবধি বুঝতে পারলাম না সেটা। পুরুলিয়ায় লোকনৃত্যের ডকুমেনটারি শুটে রিফ্লেকটর ধরাটাই কি ভদ্রলোকের কাজ ছিল, নাকি কলকাতায় একটা স্কুলে পড়ান ছিল তাঁর আসল পেশা? এসব ছেড়ে-ছুড়ে পুঁচকে জগগা’কে নিয়ে তাহলে মনিপুরের গ্রামে উঠলেন কেন সেই ভদ্রলোক? আর তারপর হঠাৎ ক’রে সেই তিনিই কিনা নেমে পড়লেন পুরুলিয়া অস্ত্র বর্ষণ মামলার রহস্যভেদে? আর কোথায় সেই মোমবাকা না কোন মুল্লুকে গিয়ে সেখান থেকে শুণ্ডি পৌঁছে, সেখানে নিজের ডেরা বেঁধে আর গায়ে মিলিটারির পোশাক চাপিয়ে একসময় ইন্টারন্যাশনাল অস্ত্র-ব্যবসার রহস্য ভেদও করে ফেললেন দিব্যি?

বা ধরুন শ্রুতির (ক্যাটরিনা কাইফ) ক্যারেক্টারটা। সে নাকি ‘ওয়ান ট্রুথ’ নামে কোন একটা কাগজের রিপোর্টার, গোপন অস্ত্র পাচার কেস নিয়ে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করতে তাঁর নর্থ-ইস্টে যাওয়া। কিন্তু তারপর? বলা নেই কওয়া নেই, সে জুড়ে গেল জগগা’র দেশ-বিদেশ ব্যাপী মহা-অভিযানের সঙ্গে? একটা সিনে আপনি জানতে পারবেন, এই শ্রুতির একজন বয়ফ্রেন্ড আছে – ওর কলিগ আকাশ বিদ্যার্থী। এরপর আবার আরেকটা সিকোয়েন্সে জানতে পারবেন, সেই আকাশের সঙ্গে ওর এনগেজমেন্ট অবধি নাকি হয়ে গেছে! এই এতদূর জেনে আপনি যখন মনের মধ্যে নিজের মতো স্কেলে শ্রুতির ক্যারেক্টার সাজিয়ে নিচ্ছেন, তখন ফের একটা সিনে আপনি জানতে পারছেন, ওই এনগেজমেন্টেই শেষ নয়, তারপর নাকি আরও আছে! সেই আকাশকে ওর সামনেই নাকি খুন করা হয়েছিল ভিলাই-তে আর ওর বডিটা কখনও খুঁজে পাওয়া যায় নি!

বোঝো কাণ্ড! খুব ভালো করে তাকিয়ে ছিলাম শ্রুতি ওরফে ক্যাটরিনার মুখের দিকে, এই প্রসঙ্গটা যখন এলো, তখনও দেখলাম ওর মুখটা পাথরের মতো স্থির আর অনুভূতিহীন পুরো। বিশ্বাস করুন কেমন বুঝ-ভোম্বলের মতো মনে হল নিজেকে। শ্রুতি ক্যারেক্টারটা সত্যি এত ইমোশনলেস, নাকি আকাশকে নিয়ে বলা আগের কথাগুলো জাস্ট ফেক কিছু বুকনি ছিল, ভাবতে গিয়ে কূল পাচ্ছিলাম না কিছু!

এরকম সময় একেকবার কী মনে হচ্ছিল জানেন? ফ্যান্টাসিটা আর ফ্যান্টাসি নেই, এখানে এখানে জাস্ট ফচকেমি হয়ে গেছে!

জগগা চরিত্রের হাব-ভাব অনেকটাই যেন ‘বরফি’ থেকে নেওয়া… কিন্তু সাফল্যকে কি ওভাবে ফর্মুলা বেঁধে রিপিট করা যায়!

আর ছবির পর ছবিতে ওই ‘আকাশ’ আর ‘শ্রুতি’ নাম দুটোকে আপনি রিপিট করতে করতে যান কেন অনুরাগ? এই নাম দুটোর সঙ্গে কি আপনার স্পেশ্যাল কিছু আছে? ‘আকাশ’ নামটা এর আগে এসে গেছিল ‘সায়া’ (জন আব্রাহাম), ‘গ্যাংস্টার’ (ইমরান হাসমি) আর ‘লাইফ ইন আ… মেট্রো’ (শাইনি আহুজা) ছবিতে। ‘শ্রুতি’ নামটাও তো এর আগে অন্তত দুটো ছবিতে পেয়েছি, ‘লাইফ ইন আ… মেট্রো’ (কঙ্কনা) আর ‘বরফি’ (ইলিয়ানা ডিক্রুজ)! ব্যাপারটা কী বলুন তো! নাম নিয়ে কি বিশেষ কোন সংস্কার আছে নাকি?

আরও পড়ুন:  অর্থের অভাবে নিজে পাননি তাই আব্রামকে রোজ একটা করে নতুন খেলনা দেন শাহরুখ!

থাকতেও পারে! খোঁজ নিয়ে দেখছি যে কেরিয়ারের গোড়ার দিকে অনুরাগ নিজের টাইটেল লিখতেন ‘বোস’, এরপর একটা সময় থেকে সেটা লিখতে শুরু করেন ‘বাসু’ বলে। ইন্টারেস্টিং না?

আর একটা জিনিষ কিছুতে বুঝতে পারছিলাম না যে, এর আগে এত বছর ধরে একটার পর একটা এমন সব মেগা লেভেলের সিনেমা বানিয়েছেন অনুরাগ। সেই ভদ্রলোক গল্প কিংবা স্ক্রিপ্ট লিখে ওঠার পর নিজে থেকে এটা বুঝতেই পারলেন না যে, এ ছবির ব্যাপারটা একদম দাঁড়াচ্ছে না ব’লে! নাকি ওই সেদিন অভিনেত্রী সায়নী গুপ্তের মুখে শুনতে পেলাম যেটা, সেটাই সত্যি, আগে থেকে স্ক্রিপ্ট লিখে কাজ করার ব্যাপারটা আসলে ধাতেই নেই অনুরাগের! ‘দাদার তো কোন চিত্রনাট্য থাকে না। পুরোটাই মাথায় থাকে। একমাত্র দাদাই জানে কী হবে, কীভাবে এগোবে ছবিটা। সেরকমই হয়েছে’ নিজের শুটিং এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছে ছবির ছোট্ট দুয়েকটা সিকোয়েন্সে কাজ করা এই অভিনেত্রী! (সূত্র – অন্য সময় ক্রোড়পত্র, এই সময়, ১৪ জুলাই)। সায়নীকে তো তাও খুঁজলে কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনে দেখতে পাবেন, কিন্তু ছবিতে গোবিন্দা’র কোন চিহ্ন মাত্র নেই। জানেন কিনা জানি না, গোবিন্দা’কে দিয়ে ছবির বড় একটা অংশ শুট করার পর পুরোটা ছবি থেকে জাস্ট কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। কতটা পরিকল্পনাহীন ভাবে তৈরি হয়েছে ছবিটা, এবার তার আঁচ পাচ্ছেন তো?

নিজের হারিয়ে যাওয়া পালক পিতার খোঁজ, আর তার সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল অস্ত্র ব্যবসার ভান্ডাফোঁড় করা। সাবজেক্ট হিসেবে এটা মন্দ কী? কিন্তু এর সঙ্গে ছবিটায় আরও কী কী এনে জোড়া হল শুনুন। যে বোর্ডিং স্কুলে ছোট্ট জগগা’র বড় হওয়া, সেখানে ইতিহাস ঘেঁটে কবেকার কোন এক জেরি আর মেরি’র পুরনো প্রেম-কাহিনীর সুলুক-সন্ধান করা। তার সঙ্গে আবার পরকীয়া প্রেমের জেরে সেই বোর্ডিং স্কুলের মিস মালা মৈত্রের খুন হয়ে যাওয়ার রহস্যভেদ!

সবটা মিলিয়ে ঘেঁটে ঘ!

পুরো ছবি জুড়ে নিরবচ্ছিন্ন গানের স্রোত দেখতে খারাপ লাগে না আমার, বিদেশি মিউজিক্যাল বা অপেরা-ধর্মী ছবিগুলো তো দেখতে বসলে নেশা ধরে যায় যেন! কিন্তু ‘জগগা জাসুস’ দেখতে গিয়ে গানের নেশায় মজবো কী করে বলুন, তথ্যের ভিড়ে নাকানি-চোবানি খেয়ে যাচ্ছিলাম যে পুরো। ছবিটা যেন একটা জিগ-স’ পাজলের মতো, হাঁফ ছাড়ার মোমেন্ট নেই আদৌ! একবার এটার সঙ্গে ওটা মিলিয়ে বুঝতে হচ্ছে, ওহ, তাহলে ওটার মানে এই, আবার তারপরেই মগজ খুঁড়ে ভাবতে হচ্ছে, এখন এই হচ্ছে মানে আগের ওই সিনটায় ঘটে যাওয়া ওই ঘটনার মানে তাহলে ওটা?

‘কাইট্‌স’ (২০১০)-এর মতো মেগা ফ্লপ ছবি বানিয়েছেন আগে, বানিয়েছেন ‘বরফি’র (২০১২) মতো ব্লকবাস্টার হিট। তবু কি এটা বুঝতে পারেন নি অনুরাগ, যে বেশির ভাগ পাবলিক একটু রিল্যাক্স করতে সিনেমা হল-এ যায়। শুরু থেকে শেষ অবধি এরকম অঙ্ক মিলিয়ে মাথা খাটানোর জন্যে কেউ এক কাঁড়ি টাকা দিয়ে সিনেমা দ্যাখার টিকিট কাটে না আদৌ!

এর সঙ্গে এখানে একটা সত্যি কথাও স্বীকার করে রাখি।

‘তুমসা নাহি দেখা’ (২০০৪) ছবিটা শুট করছেন যখন, সে সময় ধরা পড়লো অনুরাগের অ্যাকিউট প্রোমাইলোসাইটিক লিউকোমিয়া – সে সময় ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন ওঁর সারভাইভালের চান্স ফিফটি ফিফটি। ব্লাড ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ ক’রে ওঁর ঘুরে দাঁড়ানোর সেই জীবনটার কথা যত শুনতে পাই, তত শ্রদ্ধায় মাথা নিচু হয়ে আসে যেন। যুদ্ধ করে শুধু তো রোগটাকেই হারান নি, ভদ্রলোকের সেরা সেরা হিট ছবিগুলোও তো ওর পর থেকেই একের পর এক বানানো।

তুমুল পজিটিভ এনার্জি রাখা সেই মানুষটাই যখন অন্য কারুর থেকে আইডিয়া চুরি করেন, কিংবা সিনেমার নামে ভুলভাল সব জিনিষ বানান, চোখে ঘোর লেগে যায়, বুঝতে পারি না, দুয়ের মধ্যে কোন মানুষটা আসলে সত্যি মানুষ বলে!

এই লেখায় আপনার নতুন ছবির তুমুল নিন্দে করেছি অনুরাগ। কিন্তু এটা জেনে রাখবেন, আমি আপনার তৈরি বেশিরভাগ ছবির ফ্যান। আর আপনার ব্যক্তিগত অ-সুখ জয়ের গল্প তো আমার কাছে সুপারহিরোর স্টোরির মতো প্রায়!

কিন্তু তাই বলে আপনার খারাপ ছবিকে কিছু বলবো না, সেটা করতে পারবো না অনুরাগ। বড় বড় সিনেমা-বোদ্ধারা কী বলবেন জানি না, বাচ্চারা ছবি দেখতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে, আর আমার মতো মামুলি পাবলিকের বেজায় কনফিউজিং লাগছে ছবিটা – এটাই হল এ ছবির মোদ্দা কথা।

সুতরাং এবারের মতো, অনুরাগ আপনি ফেল।

- Might Interest You

6 COMMENTS

  1. dada satti ki apnar kheye deye kono kaaj aachhe? sab vulbhal katha chhapchhen. eto sundar adventure story ke aapni emon likhchhen kivabe? aamar to mone hoy apnar ei sab ulta palta katha karo mathai dhukbe kina? abaswa jara cinema ta dekhechhe. aapnara eto samalochhona koren kintu ekta valo cinema baniye dekhun kato dhane kato chaal. ei story tar modhdhe je sab cheye baro moral setai aapni eriye gelen. apni ki valor pokhkhe? naki sab valor moddhe kharap khuje ber karar jasusi karen? satti jadi sese arms er bodale troffy ba cake pawa jeto tabe world aro sundar hoto. aabaswa eta apnar chokhe porbe na.

  2. bhai abhilash…apni dhonyo..aj porjonto ekta chobikeo bhalo bolte shunlam na..apni cinema sombondhe kichhu janen na..koyekta bhalo chobi dekhun..cinema bujhun…suggest korbo naki koyekta?

  3. Seriously dada apnar ae ossomvob protiva k jokhon kau pochondo e kora na , takhon r ar jonno time noshto kora Kano. Bondho korun na Lekha bapu.

  4. probably one of the fewest reviewers with some balls. once again a to the point review. and the people in the comments section who are venting their anger, they should know that a reviewer’s job is not simply to like or dislike a movie.he made his points. but you guys didn’t come up with a single counter point why you loved the movie. and ms. doyel banerjee if he didn’t know about cinema he wouldn’t survive in this field for so long.so stop the personal attacks.

  5. yes i would agree please dont do personal attack….whatever he has reviewed based on that he had commented….you may disagree but write up and reply…rather doing personal attack….