দেবাশীষ দেব
স্বনামধন্য এই অঙ্কনশিল্পী নিজেই এক সম্পূর্ন প্রতিষ্ঠান | তাঁর হাত ধরে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে বাংলার কার্টুন শিল্প | সিগনেচার বেড়াল আর স্ব-নেচারটি কোমল, আত্মবিশ্বাসী, রসিক | বেড়ানো তাঁর নেশা | তাই ঝুলিতে রয়েছে বহু গল্প, সঙ্গে অসাধারণ সব স্কেচ | সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নিরলস সাধনার অমর ফসল ‘রঙ তুলির সত্যজিৎ’ |
জয়পুরের পুরোনো মহল্লা

সেবার রাজস্থানের সেই চরকিপাক ভ্রমণের আগেও একবার জয়পুর যাওয়া হয়েছিল, তবে একেবারে বুড়ি ছোঁওয়ার মত করে। আসলে বিয়ের ঠিক পরেই ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সস্ত্রীক এসেছিলাম আলওয়ার-এ জ্যাঠতুতো দাদা বৌদির কাছে দিন কয়েক কাটাবার জন্য। দাদা তখন ওখানকার জেলা অধিকর্তা – ঠাট-বাট-ই আলাদা। খাচ্ছি দাচ্ছি মজায় আছি। হঠাৎ ঠিক হল এই মওকায় টুক করে জয়পুর ঘুরে আসার – চারজনে মিলে গাড়ি করে day trip. বৌদির খুব ইচ্ছে একটু কেনাকাটি সেরে নেওয়ার। সেই ফাঁকে আমরা বর-বউ দু’জনে পায়ে হেঁটে সামান্য এদিক ওদিক করছিলাম। পুরোপুরি সম্বন্ধ করে বিয়ে আমাদের, ফলে বউ তখনও প্রায় অচেনা। হঠাৎ মনে হল একবার ওর হিন্দি ভাষার পরীক্ষাটা নেওয়া যাক। চারদিকে যত সাইন বোর্ড রয়েছে দেখিয়ে জানতে চাইলাম – ‘ পড়ে বলো তো কী লেখা।’

ছোটা চৌপারা

দেখি বেশ চটপট উত্তর দিয়ে দিল। যাক, হিন্দি পড়তে পারে তাহলে। পরে বউ বলেছিল, হিন্দি নয়, আসলে সংস্কৃতর বিদ্যেটা ছিল – সেটাই কাজে লাগিয়ে পরীক্ষায় উৎরেছে।

দ্বিতীয় বারের এই জয়পুর আসাটা ছিল প্রায় দশদিন ধরে একটানা ঘোরাঘুরির পর, ফলে গিন্নি আর ছেলে তখন প্রায় ফ্ল্যাট – হোটেলের ঘরে গড়াগড়ি খেয়ে কাটাতে ইচ্ছে করছিল আমারও। কিন্তু ছবি আঁকার তাগিদটা তার চেয়েও বড়, তাই প্রথম দিন দুপুরেই একটা অটো চেপে বেরিয়ে পড়লাম – হাওয়া মহলের চারপাশে কিছু পুরোনো মহল্লার কথা মনে ছিল – ওখানেই বসে স্কেচ করব। অত দূর অবশ্য যেতে হল না, তার আগেই হালকা গোলাপী রঙের সারি সারি ঘর বাড়ি – গম্বুজওয়ালা মন্দির, দোকানপাট আর থিকথিকে লোকজনের ভিড় দেখে নেমে পড়লাম।

হাতির পিঠে চেপে আমের ফোর্টের দরজা অবধি চলে আসে ট্যুরিস্টরা

এটাই তো আসল ‘পিঙ্ক সিটি জয়পুর’। কোথাও একটা গুছিয়ে বসে আঁকতে হবে। দু’পা এগোতেই একটা চার রাস্তার মোড় আর মজার ব্যাপার চারটে কোণাতেই একটা করে বেশ বড় মন্দির। জায়গাটার নাম, ‘ছোটা চৌপারা’। আমি সটান উঠে গেলাম একটা মন্দিরের তেতলার ছাদে। সীতারামজি কা মন্দির – চারদিকে অজস্র সব খুপরির মধ্যে নানারকম দেবদেবীর মুর্তি বসানো …… জোর পুজোআচ্চাও যে হয় সেটা বোঝা গেল, কিন্তু এই মুহূর্তে জায়গাটা একেবারে শুনশান। ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগার কথা। কিন্তু আমার তখন আঁকার দিকে মন, ফলে খেয়াল করি নি।

আরও পড়ুন:  বদ্রীনাথ ধাম ও দ্বিতীয় পাণ্ডবের কিসসা
সীতারামজীর মন্দিরের ‘রুঢ়মল’

একটা লোহার সিঁড়ির ওপর বসে সামনের রাস্তাটা আঁকছি, কানে মাকড়িওলা শক্ত পোক্ত চেহারার বৃদ্ধ এসে হাজির – কড়া সুরে বলল, ‘এখানে কী করছো? আগে দু’টাকা দাও ঢোকার জন্য।’

‘কে হে তুমি, টাকা চাইছ?’ জানাল, ওর নাম ‘রুঢ়মল’ – এই মন্দিরের হেড পান্ডা বা ওই রকম একটা কিছু। আমি ফালতু টাকা দেওয়ার পাত্র নই, সেও নাছোরবান্দা। ফলে তর্কাতর্কিটা ধীরে ধীরে জমে উঠল – যত বলছি আমি একজন কলাকার, আঁকা হলেই চলে যাব, রুঢ়মল কিছুতেই বসতে দেবে না। ততক্ষনে একজন, দুজন করে লোক জমতে শুরু করেছে। আমার উঠে যেতে ইচ্ছে করছিল না। এখান থেকে চমৎকার সব ভিউ পাওয়া যাচ্ছে। হঠাৎ দেখি নীচের বড় রাস্তায় খান তিনেক সাদা ঢাউস ট্যুরিস্ট কোচ এসে থামল। আর হুড়মুড়িয়ে বিশাল একদল সাহেব মেম নেমে পড়ে জায়গাটাকে সরগরম করে তুলল। পটাপট ক্যামেরা বার করে ছবি নিতে নিতে দেখলাম, সবাই ঢুকে আসছে এই মন্দিরে – মুহূর্তের মধ্যে রুঢ়মল ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে ওদের দিকে দৌড় লাগাল। আমি বেঁচে গেলাম।

মন্দিরের সামনে ঢোল বাজিয়ে ভজন চলছে

আগেই চোখে পড়েছিল মন্দির লাগোয়া একটা বিশাল লম্বা চাতালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে স্থানীয় বেশ কিছু সাধারণ লোকজন বাচ্চাকাচ্চা সমেত শুয়ে বসে ঝিমোচ্ছে – ভেবেছিলাম বেকার, আশ্রয়হীন গোছের হবে, তাই আর পাত্তা দিইনি। এই বিদেশীদের দেখে মুহূর্তের মধ্যে ঝিমন্ত লোকগুলো যেভাবে গা ঝেড়ে উঠে হুটোপাটি শুরু করল, মনে হল ঠিক যেন ‘গুগাবাবা’ সিনেমায় বরফির জাদুবলে জেগে ওঠা হাল্লারাজার সৈন্য দল। ছবি আঁকা ছেড়ে হাঁ করে দেখতে লাগলাম ছোট ছোট মেয়েগুলো রংচঙে ঘাগরা গলিয়ে কেমন ঘুরে ঘুরে নাচছে। কোথা থেকে ঢোল নিয়ে এসে একজন মহিলা তারস্বরে গান ধরেছে – দু’তিনজন ঝুলি থেকে রাবণহাতা বার করে চ্যাঁ চ্যাঁ শব্দে মেঠো সুর বাজাচ্ছে। একজন আবার ওরই মধ্যে মাথায় বিশাল পাগড়ি চাপিয়ে বিন বাজিয়ে দস্তুরমতো সাপের খেলা দেখাতে শুরু করে দিল। মানে, হট্টগোলের চূড়ান্ত যাকে বলে।

আরও পড়ুন:  ‘উত্তমকুমারের মহালয়া’ : সত্যিই কতটা খারাপ হয়েছিল? (সঙ্গে অনুষ্ঠানের অডিও লিঙ্ক)

ওদিকে সাহেবদের তখন এই হাতে গরম তামাশা দেখে উল্লাসে প্রায় ফেটে পড়ার অবস্থা। সবাই হুমড়ি খেয়ে ছবি তুলছে – টাকা ছড়াচ্ছে – ওদের গাইড বাবাজি কায়দা মেরে কী সব বোঝাবার চেষ্টা করছে, কেউ কানেই নিচ্ছে না। আর দেখলাম রুঢ়মলের হ্যাংলামি, সবাইকে মন্দির ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য …… কারণ সাহেবদের জন্য রেট-টা আবার আলাদা কিনা। সেদিন যেটুকু আঁকতে পেরেছিলাম, তাতে মন ভরেনি। ফলে পরদিন সকালেই আবার গেলাম রুঢ়মলের ডেরায়। এবার লোকটা কোনও ঝামেলা করল না। একটা খাটিয়াতে বসে আমার দিকে শুধু নজর রেখে গেল। সেই সুযোগে ওকে এঁকে ফেললাম।

রাস্তায় দেওয়ালির পসরা

সামনেই তখন দেওয়ালি, ফলে রাস্তার পর রাস্তা জুড়ে মাটির পিদিম আর অজস্র রকমের হাঁড়ি, কলসী, লন্ঠনের দোকান সাজিয়ে বসেছে সব মহিলারা। হাওয়া মহলের ঠিক উল্টো দিকেই রয়েছে এ অঞ্চলের মার্কামারা কাপড়ের তৈরী যাবতীয় পুতুলের দোকান। সুন্দর কারুকার্য করা – ঝলমলে রঙিন। ঘর সাজানোর জন্য একেবারে আদর্শ জিনিষ।

সপরিবারে কেনাকাটা করার আগে আমের ফোর্টটা ঘুরে এসেছিলাম। সঙ্গে জয়গড় আর নাহারগড়। সোনার কেল্লা সিনেমায় মুকুলের সেই দুষ্টু লোকটা যেখানে ভ্যানিশ হয়ে যাবে, অনেক খুঁজেও নাহারগড়ের সেই পাথর বিছানো রাস্তাটা আমরা খুঁজে পাইনি। মন্দার বোস এটাকেও ভ্যানিশ করে দিয়েছেন কিনা কে জানে। বাইরে থেকে ‘হাওয়া মহল’ দেখতে বেশ আকর্ষনীয় – নীচের একটা অংশ ভর্তি দোকানপাট। রাজস্থানী বিয়ের সাজ সরঞ্জাম সব বিক্রি হয়। জরির কাজ করা জোব্বা, টুপি, ঝালর আর চার হাত লম্বা বড় বড় তলোয়ার।

হাওয়া মহলের সেই অসম্পূর্ণ স্কেচ

উল্টোদিকের ছাদে বসে হাওয়া মহলটাকে আঁকতে শুরু করেছিলাম, শেষ পর্যন্ত ঠিকমত মনোযোগ দেওয়া গেল না – আধা খ্যাঁচড়া হয়ে রইল – অনেক শিল্প বোদ্ধাদের বলতে শুনেছি যে, এই ধরণের শেষ না হওয়া ছবির মধ্যে নাকি একটা আলাদা মজা থাকে। আমি মনে মনে আমার এই স্কেচটাকে ওঁদের প্রতি উৎসর্গ করে দিলাম। 

আরও পড়ুন:  শহুরে শারদীয়া অথবা নিছক আলোপাখির গল্প

1 COMMENT

  1. Osadharon bolle kom bola hoi. Shri Debasish Deb er chitrokolar songe porichoy amar ballokaal thekei. Kintu lekhar songe ei prothom. Eto chomotkar jhorjhore pranjol lekha pore mugdho holam. Aar songer sketch gulo to upri paona. Aaro onek lekha porar opekkhaye roilam.