Dooars Jayanti travelogue
তাল-সুপুরি গাছে ঘেরা জয়ন্তি গ্রাম

ফেসবুকের বন্ধু কৌশিক বিশ্বাসের বাড়ি আলিপুরদুয়ারে – সাদর আমন্ত্রণ জানাল – “দাদা, একবার চলে আসুন, জয়ন্তি, পাহাড়ের ওপর বক্সা ফোর্ট সব ঘুরিয়ে দেব | মার্চের গোড়ায় কাঞ্চনকন্যায় চেপে বসলাম – পরদিন সকাল আটটার মধ্যে এন জে পি এবং তারপর থেকেই ট্রেন ক্রমশ ধুঁকতে শুরু করল – সেই সঙ্গে দু’পাশের দৃশ্যগুলো কী ভীষণ মনোরম হয়ে উঠল – কখনো পাহাড়ের গা ঘেঁষে সরু নদী বয়ে চলেছে কখনো শালগাছের ঘন জঙ্গল | আলিপুরদুয়ার পৌঁছতে বেলা হলো – কৌশিক দু’জন বন্ধু নিয়ে স্টেশনে হাজির ছিল | রাজাভাতখাওয়া টাইগার রিজার্ভ-এর কাছে ওরা একটা রিসর্ট খুলেছে – আগে সেটা দেখাল – বসে চা আর আড্ডা হলো, তারপর পৌঁছে দিল জয়ন্তি – তখন তিনটে বেজে গেছে | ‘বনান্তে’ টুরিস্ট লজে ঘর রাখা ছিল, ব্যবস্থা মন্দ নয়, উলটো দিকেই চওড়া জয়ন্তি নদীর শুকনো খটখটে রিভার বেড – তারপরেই সারি সারি পাহাড় উঠে গেছে – ওপাশেই হলো ভুটান – এই দৃশ্য বহুবার বহু জায়গায় দেখেছি কিন্তু সামনে থেকে তেমন আহামরি লাগল না |

Dooars Jayanti River Bed
শুকনো খটখটে জয়ন্তি রিভার বেড

বড় বড় পাথরের চ্যাঙড় মাড়িয়ে মাড়িয়ে এদিক ওদিক করে সন্ধেটা কাটালাম | কাছেই জয়ন্তির মূল বসতি – পরদিন সকাল হতেই স্কেচ খাতা নিয়ে চলে গেলাম | ঢ্যাঙ্গা ঢ্যাঙ্গা তাল আর সুপুরি গাছে ঘেরা লোকেদের বাড়ি ঘর, বাজার, স্কুল ইত্যাদি | যখন তখন বন্যা হয় বলেই বোধহয় কাঠের বাড়িগুলো সব উঁচু মাচানের ওপর বসানো |

Jayanti Dooars House
কাঠের বাড়িগুলো উঁচু মাচানের ওপর বসানো

রবিবার বলে লোকজন ভর্তি, পাশের মাঠে ছেলেরা জোর ফুটবল খেলছে – ঘুরে ঘুরে এঁকে নিলাম | কথা ছিল কৌশিকের বন্ধু তমাল পরদিন সকালে নিয়ে যাবে ‘বক্সা’ – অথচ দুপুর গড়িয়ে গেল তার পাত্তা নেই – অবশেষে ফোনে নির্দেশ এল সান্ত্রাবাড়ি চলে যাবার – ওখান থেকেই হেঁটে উঠতে হয় বক্সা পাহাড়ে | অগত্যা গাড়ি ভাড়া করে রওনা দিলাম | রাজাভাতখাওয়ার জঙ্গলকে দু’পাশে রেখে রাস্তা চলে গিয়েছে | সান্ত্রাবাড়ি পৌঁছতে এক ঘন্টার বেশি লাগল না – তমাল একটা দোকানে বসে মোমো খাচ্ছিল – বলল আপনিও খেয়ে নিন, ওপরে পৌঁছতে সময় নেবে | সাড়ে পাঁচটার পর হাঁটা শুরু হলো – কিছুক্ষণের মধ্যেই চারদিক অন্ধকার – পুরোটাই জঙ্গলের রাস্তা মাঝে মাঝে এক-আধটা বসতি |

আরও পড়ুন:  দিলওয়ারা দেখতে মাউন্ট আবু
Jayanti Dooars Travelogue
বক্সা ফোর্ট থেকে আঁকা দিলচাকা গ্রাম

পাক্কা পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে যেখানে পৌঁছলাম, জায়গাটার নাম দিলচাকা – এখানে তমালের একটা ডেরা আছে – জিমি বলে একজন ভুটানি ছেলে দেখাশোনা করে, খাবার বানায় | রাতে আর কিছু করার ইচ্ছে ছিল না – খেয়ে সোজা শুয়ে পড়া |

বেশ খোলতাই চেহারার জিমি
বেশ খোলতাই চেহারার জিমি

খুব ছোট্ট এক ফালি গ্রাম এই দিলচাকা – নিচ থেকে রাস্তাটা ওপরের দিকে দু’ভাগ হয়ে উঠে গিয়েছে একটা ভুটান একটা লেপচাকা অবধি | সামনেই অনেকটা জায়গা জুড়ে বক্সা ফোর্টের ভগ্নাবশেষ | বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই প্রাচীন ফোর্ট-এ ১৯৫০-এর দশক অবধি রাজনৈতিক আসামীদের কয়েদ করে রাখা হতো | এখানে বড়সড় একটা সরকারি অতিথিশালাও আছে তবে যথেষ্ট বেহাল অবস্থায় – খাবারও পাওয়া যায় না ফলে লোকজন আসে কালেভদ্রে – এখানকার মাইনে করা কেয়ারটেকার ডুকপার তাই ভারি মজা – সারাক্ষণ নেশা করে পড়ে থাকে | ভোর হতে না হতেই ভূটানের দিক থেকে বহু মানুষ নেমে আসে ঝুড়ি ভর্তি শাকসব্জি আর মাছ নিয়ে – তুলনায় সস্তা বলে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে কিনতে শুরু করে |

ভাদরমন সুব্বা
ভাদরমন সুব্বা

বিকেলের দিকে ওই রাস্তা ধরে অনেকটা উঠেছিলাম – দু’পাশে ঠাসা জঙ্গল আর অজস্র পাখির কিচিরমিচির | ছোট্ট জায়গা তাই দু’দিনেই অনেকের সঙ্গে চেনা হয়ে গিয়েছিল | এখানকার সব থেকে ব্যস্ত জায়গাটিতে দোকান আর খাবার হোটেল চালায় ‘নিমাদা’ – মাঝবয়েসি গাঁট্টাগোঁট্টা লোকটির সবদিকে সজাগ দৃষ্টি – ঝরঝরে বাংলা বলে – কলকাতার বিস্তর লোকের সঙ্গে যোগাযোগ তার | আমি সবার স্কেচ করে নিচ্ছি – জিমিও বাদ যায়নি, বেশ খোলতাই একখানা চেহারা ওর |

গাঁওবুড়ো গোছের একজন এসে সামনের বারান্দায় চুপচাপ বসে থাকত – ‘ভাদরমন সুব্বা’ – ওকে এঁকে খাতাটা দেখালাম – এই প্রথম মুখে হাসি ফুটল |

শান্ত, নির্জন লেপচাকা
শান্ত, নির্জন লেপচাকা

ঠিক ছিল একবার ‘লেপচাকা’টাও ঘুরে আসব – জিমি নিয়ে চলল – দেড় ঘন্টার খাড়াই পথ পেরিয়ে পাহাড়ের ওপর একটা সমতল জায়গা – এটাই ‘লেপচাকা’ গ্রাম – একটা রাত থাকব – জিমি-ই সব বন্দোবস্ত করে দিল ওর চেনা শেরিং পিঞ্চোর বাড়িতে |

আরও পড়ুন:  মনের হাট পুকুরে : উষসী চক্রবর্তী
বি. বি. গুরুং আড্ডা জমিয়ে দিয়েছিল
বি. বি. গুরুং আড্ডা জমিয়ে দিয়েছিল

 

সারাদিন ঘুরে ঘুরে খোশমেজাজে ছবি আঁকলাম – সন্ধে হতেই পা ছড়িয়ে বসলাম পিঞ্চোর খাবার ঘরে – বাইরের লোকজন এলে এরাই ম্যাগি বা ভাত কিছু একটা বানিয়ে দেয়, সঙ্গে বড়জোর ডিম | ছোট বড় মিলিয়ে জমায়েত মন্দ ছিল না, আড্ডা জমিয়ে দিল ঈষৎ মত্ত হয়ে থাকা বি.বি.গুরুং নামের স্থানীয় একজন – লোকটা দেখলাম বেশ জনপ্রিয় | এ অঞ্চলে বিদ্যুত আসেনি – টর্চের আলোয় নিজের ঘরে পৌঁছে সোজা লেপের তলায় | পরদিন কাঠের সরু বারান্দায় দাঁড়িয়ে সূর্য ওঠার দারুণ একটা দৃশ্য দেখা বাড়তি পাওনা হয়ে রইল | এরপরে ধীরে ধীরে নেমে যাওয়ার পালা – কারণ দুপুরেই ফেরার ট্রেন |

Sponsored
loading...

NO COMMENTS