বিশ্বদীপ দে
পেশা সাংবাদিকতা। পাশাপাশি নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করেন। আকাশবাণী কলকাতার আমন্ত্রিত গল্পকার। প্রথম সারির বহু পত্রপত্রিকায় ছোটগল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

খবরের কাগজ-টিভি-ইন্টারনেটের দৌলতে তাঁর মুখটা অনেকেই চেনেন। আর নতুন খবরটা? সেটাও মোটামুটি জেনে গেছেন সবাই। ফেসবুকের টাইমলাইনে শেয়ারও করেছেন কেউ কেউ। বাস-ট্রেন-চায়ের দোকানেও কি অল্পবিস্তর শোনা যাচ্ছে না? হাজার হোক বাঙালি মেয়ে। তাঁর এত বড় অ্যাচিভমেন্ট! কিন্তু ওই পর্যন্তই। ভুলে যেতে বেশিদিন লাগবে না। ভুলে যাওয়াই আমাদের নিয়তি। একের পর এক ঘটনাস্রোতে ভেসে যেতে যেতে ক’টা খবরই বা আমরা ঠিকমতো মনে রাখি। ঝুলন গোস্বামীর অসামান্য বিশ্বরেকর্ডটিও তাই আমরা ঠিক ভুলে যাব। কিন্তু তাতে ক্রিকেট খেলার কিছু এসে যাবে না। খেলার ইতিহাসে একইভাবে জ্বলজ্বল করবে তাঁর নাম ও বিশ্বরেকর্ডের কথা। নতুন যে সব মেয়েরা পারিবারিক ও সামাজিক বাধা-বিপত্তি সরিয়ে রেখে বাইশ গজের আঙিনায় আসতে চাইবে তাদের সামনে এক অসামান্য মাইল ফলকের মতো থেকে যাবে রেকর্ডটা।

কোনও রেকর্ডই চিরকালীন হয় না। এটাও হবে না। কিন্তু রেকর্ড একদিন মুছে গেলেও, সাফল্যটা ঠিকই থেকে যাবে। ইতিহাস মনে রেখে দেবে, কলকাতা থেকে ৮০ কিলোমিটার দূর থেকে রোজ ভোর সাতটার মধ্যে বিবেকানন্দ পার্কে পৌঁছে যেত যে মেয়েটি, সে শেষপর্যন্ত মহিলাদের একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হয়েছিল।     

একই রেকর্ড গড়েছিলেন কপিল দেবও। ১৯৮৮ সালে। সমপর্যায়ের রেকর্ড গড়েও ঝুলন খ্যাতিতে সেই অর্থে কোনওদিনই কপিলের সঙ্গে একই সারিতে থাকবেন না। এটাই নিয়ম পিতৃতান্ত্রিক সমাজের। কিন্তু অনুপ্রেরণা হিসেবে তাঁকে সামনে রেখে লড়াই করবেন অনেকেই। তাঁর মতো ক্রিকেটারের আগমনেই এদেশে মেয়েদের ক্রিকেটের ছবিটা আস্তে আস্তে বদলাতে শুরু করেছে। হয়তো আগামী দিনে আরও উজ্জ্বল অধ্যায় অপেক্ষা করে আছে মেয়েদের ক্রিকেটে। নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের সেই সব সাফল্যের দিনেও মনে রাখতে হবে আজকের ঝুলনদের কথা। একজন ক্রিকেট খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে আন্তর্জাতিক ময়দানে নিয়মিত করে তোলা কতটা কঠিন, সেটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। মাঠের সেই লড়াইয়ের পাশাপাশি রয়েছে মফস্‌সলের মেয়ে হয়ে ক্রিকেটার হওয়ার লড়াই। সমস্ত চ্যালেঞ্জকে উড়িয়ে দিয়ে আজ তিনি এই জায়গায়।  

আরও পড়ুন:  মাটির নিচের জলের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার – বিপদ ঘনাচ্ছে কলকাতায়

শুরুর দিনের লড়াই আজও তিনি মনে রেখে দিয়েছেন। ভোর সাড়ে চারটেয় ঘুম থেকে উঠে দৌড়ে আসা কলকাতায়। কড়া কোচ সাতটার পরে এলে আর মাঠে ঢুকতে দিতেন না। কিট ব্যাগ কাঁধে লোকাল ট্রেনের ভিড়ে মিশে থাকা ঝুলনকে তাই ট্রেন থেকে নেমেই বাস ধরতে হত তড়িঘড়ি। নাহলে আশি কিলোমিটার পথ পেরিয়ে এসে  প্র্যাকটিস না করেই যে ধরতে হবে ফেরার ট্রেন!  

চেয়েছিলেন ব্যাটসম্যান হতে। কিন্তু হয়ে গেলেন ফাস্ট বোলার। আসলে তাঁর উচ্চতাই (৫ ফুট ১১ ইঞ্চি) তাঁর মধ্যে বুনে দিয়েছিল ভবিষ্যতের দ্রুততম ফাস্ট বোলার হয়ে ওঠার বীজ। কোচ জানিয়ে দিয়েছিলেন, কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। ঝুলন ঘাবড়াননি। দাঁতে দাঁত চেপে নাগাড়ে শক্তি উগরে দিয়েছেন নেটে। ক্লান্ত হতে হতেও আবার শুরু করেছেন দৌড়। প্রয়োজনে ফাঁকা নেটেও। নিজেই কুড়িয়ে এনেছেন বল। ফুসফুসে ভরে নিয়েছেন বাতাস। তারপর আবার দৌড়।  

দৌড়! দৌড়! দৌড়! অবশেষে উনিশ বছরেই ভারতের হয়ে মাঠে নেমে পড়ার সুযোগ। তারপর একে একে মুকুটে যুক্ত হওয়া নানান পালকের। কখনও আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটার। কখনও বিশ্বের দ্রুততম বোলার। প্রায় বছর চারেক ভারতের অধিনায়কত্ব করা। এমনকী বিশ্বকাপেও। ২০১০-এ অর্জুন। ২০১২-এ পদ্মশ্রী। আর এবার ক্যাথরিন ফিৎজপ্যাট্রিককে টপকে সর্বোচ্চ উইকেটের শিখরে। বয়স ৩৪। স্বাভাবিকভাবেই সামনে এখনও নতুন সাফল্যের হাতছানি। চাকদার মেয়ের সোনালি দৌড় এখনও অনেক বাকি। শুধু তো বল নয়, ব্যাট হাতেও লম্বা শট খেলতে পারেন। জুটেছে অলরাউন্ডার তকমাও।  

কতটা কঠিন ছিল মেয়ে হয়ে বাইশ গজে এসে দাঁড়ানোটা। ঝুলন অবশ্য দাবি করেন, অন্য মেয়েদের তুলনায় তাঁকে কম চাপ নিতে হয়েছে। বাসে-ট্রেনে টুকটাক ব্যাঁকা কথা আর আত্মীয়-প্রতিবেশীদের প্রশ্নবাণ। একজন ফাস্ট বোলারের কাছে এটুকু চাপ কিছুই নয়। সবচেয়ে বড় কথা, বাড়ি থেকে মোটামুটি মেনেই নেওয়া হয়েছিল তাঁর ইচ্ছেকে। সেটাই ঝুলনকে ফোকাস করতে সাহায্য করেছিল।  

আরও পড়ুন:  সব সংস্কারের পিছনেই কি লুকিয়ে থাকে কোনও বাস্তব কারণ ?

১৯৯৭ সালে মহিলা বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখেছিলেন ইডেনে। অস্ট্রেলিয়া বনাম নিউজিল্যান্ড। সেই প্রথম ইডেনে প্রবেশ সুদূর মফস্‌সলের কিশোরী ঝুলনের। বল-গার্ল হিসেবে বাউন্ডারির ধারে দাঁড়িয়ে একেবারে সামনে থেকে দেখা বিশ্বসেরা খেলোয়াড়দের। দেখতে দেখতে চোখের সামনে ভেসে থাকা স্বপ্নে নতুন করে রঙের পোঁচ এসে লাগে। দৃঢ়তর হতে থাকে প্রতিজ্ঞা। এই জায়গায় আমাকেও পৌঁছোতে হবে। শোনা যায়, ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে নাকি শচীন তেন্ডুলকরও বল-বয় ছিলেন! দুই বিশ্বসেরার এমন মিল এক চমকপ্রদ সমাপতন বইকি।

লড়তে লড়তে এতদূর আসা। চলার পথে সঙ্গী বই। আগ্রাসী ফাস্ট বোলার তখন মগ্ন পাঠক। স্বামী বিবেকানন্দ থেকে ল্যান্স আর্মস্ট্রং—আত্মজীবনী পড়তে পড়তে অনুপ্রেরণা খুঁজে নেওয়া নতুন নতুন মাইলস্টোন টপকে যাওয়ার।  

ব্যক্তিগত শৃঙ্গজয়ের থেকেও তাঁর কাছে দলের সাফল্য আগে। তাই বিশ্বরেকর্ড গড়ার বেশি খুশি হয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে কোয়াড্র্যাঙ্গুলার ট্রফি জেতায়! ওখানকার বাউন্স ভরা পিচে যেভাবে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে এনেছে ভারতীয় দল সেটা তাঁর কাছে দারুণ তৃপ্তির। অবশ্য স্বীকার করছেন, রেকর্ডের খুব কাছে চলে আসায় সেটাও মাথায় ঘুরছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত সেটাকে সরিয়ে রেখেই মাঠে নামা। আর অনায়াসে সেটাকে ঝুলিতে পুরে ফেলা।   

২৪ জুন থেকে শুরু হচ্ছে মেয়েদের বিশ্বকাপ। আপাতত রেকর্ড-টেকর্ড মাথা থেকে সরিয়ে রেখে বিশ্বজয়ের লড়াই করতে প্রস্তুত হচ্ছেন ঝুলন। মাথার ভিতরে হয়তো ভিড় করে আসছে ’৯৭-এ চোখের সামনে দেখা বিশ্বকাপ ফাইনাল। ব্যক্তিগত কীর্তি নয়, দেশকে সাফল্যে এনে দেওয়াই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় মোটিভেশন। পনেরো বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার সেই স্বপ্নপূরণের পালা।

আপাতত সেই চাঁদমারি সামনে রেখেই নতুন করে দৌড় শুরু করতে চলেছেন বিশ্বসেরা ফাস্ট বোলার। আমাদের ঝুলন গোস্বামী।  

NO COMMENTS