অতনু ভট্টাচার্য
অবসরপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক | পাঠদানের মূল বিষয় সংস্কৃত ও বাংলা | পড়ানোর পাশাপাশি গভীর আগ্রহ ভারতীয় সংস্কৃতি এবং সনাতনী ধর্মের নানা শাখাপ্রশাখায়, ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ গড়ার ফাঁকে তাঁর অবসর যাপনের মূল উপজীব্য বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি |

বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের উৎসবগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে দোল ও জন্মাষ্টমীর পরই ঝুলনযাত্রার স্থান | বৃন্দাবনের কুঞ্জবনে গোপবালক ও গোপিনীদের মাঝে গোষ্ঠবিহারী কৃষ্ণ ও শ্রীরাধিকার পরকীয়া প্রেমঘটিত ঝুলনকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ঝুলনযাত্রা উৎসব | ভাগবতপুরাণ, হরিবংশ , গীতগোবিন্দ প্রভৃতি কৃষ্ণ-বিষয়ক গ্রন্থে ঝুলনযাত্রার উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় | শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত তেরো দিন ধরে এই উৎসব পলিত হয় | শেষ দিন রাখী বা রক্ষাবন্ধনে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে বলে এই পূর্ণিমাকে ঝুলন পূর্ণিমা বা রাখী পূর্ণিমা বলে |

উত্তর ভারতের মথুরা, বৃন্দাবন এবং পশ্চিমবঙ্গের মায়াপুর ছাড়াও বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকী, ইসকনের দৌলতে পৃথিবীর নানা স্থানেও ঝুলনযাত্রা পালন করা হয় মহা ধূমধামে | হাজার হাজার ভক্ত সমাগমে | এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য হল বৃন্দাবনের বাঁকেবিহারী মন্দির, রাধারমণ মন্দির, মথুরার দ্বারকাধীশ মন্দির, মায়াপুরের ইসকন মন্দির |

মায়াপুরে ইসকন মন্দিরে দশমী থেকে পাঁচদিন ধরে ঝুলনযাত্রা পালন করা হয় | রাধারমণকে জমকালো বসন ভূষণে সজ্জিত করে, নানা রং বেরঙের ফুল ও মালার সুশোভিত দোলনায় চাপানো হয় | ভক্তগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন ও দেখতে থাকেন | প্রথমে যুগলমূর্তির বিশেষ আরতি হয় ও পরে দু ঘণ্টা ধরে চলে ভজন ও কীর্তন | এরপর নিবেদন করা হয় ভোগ | এরই মাঝে ভক্তরা এক এক করে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে পুষ্পশোভিত রশিতে টান দিয়ে যুগলমূর্তিকে দোলা দিয়ে যায় | শেষ দিন চলে নগর সংকীর্তন | যুগলমূর্তিকে রথে বসিয়ে একজন চামর দিয়ে বাতাস করতে থাকে আর অন্যরা রথ টানতে টানতে সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে নগর পরিক্রমা করে | লক্ষণীয় বিষয় হল প্রতিদিনই যুগলমূর্তির বস্ত্র পরিবর্তন করা হয় |

প্রায় ৫ হাজার বছর আগের রাধাকৃষ্ণের ঝুলনযাত্রাকে স্মরণ করে আজও বৃন্দাবন মেতে ওঠে ঝুলনোৎসবে | গ্রাম গ্রামান্তর থেকে অগণিত লোক এই উৎসব প্রত্যক্ষ করে বা অংশ নেয় এই তেরো দিন ধরে | সমগ্র বৃন্দাবনের ৫০০০ মন্দিরের বেশির ভাগই রাধা-কৃষ্ণকে সুসজ্জিত দোলায় চাপিয়ে বৃন্দাবনের অন্যতম প্রধান এই উৎসবে সামিল হয় | এখানেও প্রথমে আরতি হয় | পরে ভজন | সারাদিন ধরে চলে সমবেত কণ্ঠে গান-‘হরে কৃষ্ণ’, ‘জয় রাধে জয় কৃষ্ণ জয় বৃন্দাবন,’ ‘জয় রাধে’, ‘জয় জয় মাধব’ ইত্যাদি | আর সেইসঙ্গে ভোগের পর প্রসাদ বিতরণ |

আরও পড়ুন:  ফুলকপির মালাইকারি

প্রকৃতপক্ষে শ্রাবণ মাসে এই সময়ে বাতাস এত বেশি পরিমাণ ভারী, ঘন জলীয় বাষ্পে পূর্ণ যে বাতাসের প্রবাহ খুব ধীর | মানুষ গরমে কষ্ট পায় | একমাত্র অঙ্গ প্রত্যঙ্গের নড়াচড়ায় গায়ে একটু হাওয়া লাগে | এই পরিস্থিতিতে শ্রীরাধার সখীরা গরমের হাত থেকে নিষ্কৃতি দেওয়ার জন্য ফুল লতাপাতার দোলনায় বসিয়ে দোল দিতে থাকে | তবে এই দোলনা টাঙানো হত তমাল গাছে, নয়, কদম গাছে | রাধিকার গায়ের রঙের সঙ্গে মিল করে | অন্যদিকে গ্রীষ্মের দাবদাহের পর বর্ষা এসে প্রকৃতিকে করে শান্ত শীতল | নতুন করে মেতে ওঠে কুঞ্জবনগুলো | যমুনার দু ধার বেলি, জুঁই, চামেলি আর মাধবী ফুলে সেজে ওঠে | অগণিত মানুষের সঙ্গে প্রকৃতিও দিকে দিকে সবুজের গালিচা নিয়ে যেন ঝুলনে সামিল হয় |

শহরে, গ্রামে গ্রঞ্জে দেখা যায় ছোট ছোট বালক-বালিকারা বাড়িতে ঝুলন সাজায় | সেখানে থাকে বাড়ি-ঘর, নদী, পাহাড়, রাস্তা, গোচারণক্ষেত্র, কুঞ্জ বন, শস্যক্ষেত্র ইত্যাদি | এসবের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে তাদের শিল্প ভাবনার প্রতিভা, তেমনি পাওয়া যায় মানসিক দিকের পরিচয় |

NO COMMENTS