জলদ গুপ্ত
জলদ গুপ্ত লেখেন না, ভাবেন। নিজেকে মনে করেন মুদির দোকানের মালিক। কোথায় কোন মশলা আছে শুধু সেটুকুই উনি জানেন, খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী কাগজে মুড়ে দিয়ে দেন...ব্যস। সিধুজ্যাঠার মত অনেক কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও অন্যদের অসুবিধা হবে বলে কিছুই করেন নি। কবিতা, নাটক লিখতে পছন্দ করেন আর পাগলের মত পছন্দ করেন সঙ্গীত। পাহাড়ি জঙ্গলের টিলায় বসে হেঁড়ে গলায় গান আর দিনে ১৫ কাপ চায়ের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। আদিখ্যেতাকে ঘেন্না করেন, তর্ক করতে ভালোবাসেন। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে কোন লেখক থাকবে না।

খুব জমবে, মার খেলেই একেবারে জমে ক্ষীর। প্রমান হবে তুমি কাজ করেছো, মানে ফাটিয়ে দিয়েছো। তোমার মালিক খুশি, সহকর্মীরা খুশি, বন্ধুবান্ধবদের কাছে তো তুমি গর্বের বস্তু। বাড়িতে স্বজনের ঢল নামবে। আত্মীয়রা আপেল, কলা, মুসুম্বি আর কড়াপাকের সন্দেশ নিয়ে দেখতে আসবে আর সঙ্গে দু’দিনের নিঃশর্ত ছুটি। সকাল থেকে ফেসবুক আর হোয়াটস অ্যাপে ম্যাসেজের বন্যা। তোমার ফেটে যাওয়া রক্তাক্ত মুখের ছবিতে কয়েকশো লাইক পড়বে। তোমার বর, বউ বা প্রেমিক, প্রেমিকার কাছে তো তুমি রানা প্রতাপ বা লক্ষ্মী বাঈ। হাজার হাজার মানুষ তোমাকে বা তোমার নামটাকে চিনে যাবে। রাতারাতি তুমিও একজন সেলিব্রিটি। একবিংশ শতকের এই টি.আর.পি’ র জমানায় তুমি মহার্ঘ। তোমার জন্যই তোমার কোম্পানির সুনাম বেড়েছে, বিক্রিও বেড়েছে।  সবাই তোমাকে নিয়ে গর্ব করে বলবে, ‘ দেখেছিস, কীরকম মার খেয়েছে ! কি সাহস না ?’ যেন বাঘ মারতে গিয়ে আহত হয়েছো।  

তুমিও বেশ স্বস্তিতে … মুখে বীরত্বের হাসি, কাঁড়িখানেক আন্টিবায়োটিক আর মুঠো মুঠো পেন কিলার খেয়ে তুমি তোমার ছাঁটাই আটকেছো। আগামী তিনমাসের জন্য তুমি একেবারে নিশ্চিন্ত। কেউ তোমাকে ছাঁটতে পারবে না। কেউ তোমাকে বলবে না, যে কাল থেকে তোমাকে আর ওদের দরকার নেই। এই রোদে জলে পুড়ে তোমাকে আর অন্য বাড়ি থুড়ি অন্য কোম্পানি খুঁজতে হবে না। তোমার বসও তোমার সঙ্গে সমঝে কথা বলতে বাধ্য হবে। কতদিন ধরে এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করে ছিলে বলো তো ? … ওই লাঠির ঘায়েই তো তোমার উন্নতি। ধাঁই কিরি কিরি বলে পুরীর লাঠির ঘায়ে যেমন জগন্নাথের ছোঁয়া মেলে ঠিক তেমনিভাবে শাসকের পুলিশের লাঠির ঘা তোমাকে রক্তাক্ত করে তোমার পরিবারকে রক্ত দেয়… তোমার সঙ্গে ওরাও বেঁচে থাকার সাহস পায়। তোমার পেশায় এটাই তো নিয়ম। তবে মাথা বা হাতের ব্যান্ডেজটা দুম করে খুলো না। কাটা ফাটা শুকিয়ে গেলেও ওটাকে বেঁধে রেখো। ওটাই তোমার পৈতে। কর্মক্ষেত্রের ‘অভিযান যজ্ঞে’ তোমার নবজন্ম ঘটলো, তুমি দ্বিজ হলে।

আরও পড়ুন:  অন্ধ স্কুলে ঘণ্টা বাজে

 জেনে রেখো তুমি অনন্য, অসাধারণ কারণ তোমার রক্তের কোন সংগঠন নেই। তোমার পিছনে কোন দল নেই যারা তোমার জন্য লড়াই করবে।  তোমার জন্য কোন অবরোধ, বিক্ষোভ সমাবেশ হবে না, একটা অটোও পাঁচ মিনিটের জন্য বন্ধ হবে না, রাস্তার মোড়ে ভাঙ্গা বেঞ্চির ওপর দাঁড়িয়ে তোমার জন্য কেউ দু-লাইন বলবে না। এমনকি প্রত্যেকদিন সকালের পনেরো ষোল পাতার যে নিউজপ্রিন্ট তোমার লেখা দিয়েই ভর্তি করা হয় সেখানেও তোমার খবরটা থাকবে এক কোনায়, আলগোছে। সন্ধের দিকে যখন পাখিরা ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরে তখন কিছু বয়স্ক মানুষ তোমার জন্য দুটো লাইন বলবে,  বলবেই … ‘আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি’।

যাকগে, ছাড়ো অনেক জ্ঞান দিলুম। তবে একটা গুরুত্বপুর্ন কথা সবসময় মাথায় রেখো, মার খেতে গিয়ে কোনভাবে যেন মরে যেও না। মার খাওয়াটা প্রাকটিস করো। দরকার হলে পয়সা দিয়ে টিচার রাখো যে তোমাকে মার খাওয়া শেখাবে। সবসময় একটা কথা মনে রাখবে, মার খাওয়ারও একটা স্টাইল আছে, মার খেতে জানতে হয়। এমনভাবে মার খাও যাতে ফেটে চৌচির হয়ে যাবে, কেটে গলগল করে রক্ত বেরোবে কিন্তু কোনভাবেই মরে যাবে না, মানে বডি হবে না। আরে মরে গেলেই তো হয়ে গেল। ওই আলগোছে একটা পঞ্চাশ শব্দের খবর, একটা শোকসভা আর পাড়ার ক্লাবে একটা ছোট স্মরণ অনুষ্ঠান। তোমার বাড়ির পিছনের সাড়ে তিনফুটের অন্ধগলিটার নামও তোমার নামে হবে না, একটাও আবক্ষ মুর্তি বসবে না, লুকিয়ে চুমু খাওয়ার কোন পুকুর পাড়ের নামেও তুমি থাকবে না কারণ তুমি তো সাংবাদিক। সব জঞ্জালগুলো এক জায়গায় করে ডাস্টবিনে জড়ো করাই তোমার কাজ। ওর মধ্যে অমুল্য রতন থাকতেই পারে কিন্তু লোকে জঞ্জালের আসা যাওয়াটাই দেখে … দেখবে। তাই তুমি আছো আড়ালে থাকবেও তাই,  একা…একমেবদ্বিতীয়ম… ঈশ্বরের মত।

আরও পড়ুন:  প্রিয় প্রিয়, বিদায়

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ