নৈনিতাল – পাহাড় ঘেরা জমজমাট শহর

ভরা গরমে পাহাড়ে বেড়ানোর পাট তুলে দিয়েছি বহুকাল – শেষবার গিয়েছিলাম ২০০৩ সালের মে মাসে – তাও আবার কুমায়ুন হয়ে গাড়োয়াল পর্যন্ত – প্রায় দশ দিনের লম্বা সফর | দু’রাত ট্রেনের ঝক্কি সামলে প্রথমে পৌঁছলাম নৈনিতাল – পাহাড় ঘেরা জমজমাট শহর – মাঝখানে পেল্লায় একটা লেক – রঙচঙে পালতোলা ছোট বড় সব নৌকো ভেসে বেড়াচ্ছে | দেখে চোখ জুড়োলো বটে তবে শরীর তেমন চাঙ্গা হলো না – ঠান্ডা কই? গরমজামা ছাড়াই লোকে দিব্যি রয়েছে – হোটেলের ঘরে পাখা টাঙানো ! আমরা উঠেছিলাম হোটেল ‘এলফিনস্টোন’-এ – সামনেই রাস্তা, বাঁদিকে তল্লিতাল থেকে চলে গিয়েছে ডানদিকে মল্লিতাল অবধি | ও পাশেই লেক | নৈনিতাল সম্পর্কে নস্টালজিয়া ছিল – বছর কুড়ি আগে এখানে এসেছিলাম ‘হনিমুন’ করতে – এলফিনস্টোনেই থেকেছি তবে এবার ঘরটা আলাদা – দলটাও বড় |

নৈনিতাল লেক-এ পালতোলা নৌকো

প্রথম দিনেই দুপুর থেকে মেঘলা করে এলো – সেই সঙ্গে ঝিরঝিরে বৃষ্টি – ফলে হোটেলের বারান্দায় বসে কাটালাম সবাই – আমার খুচখাচ স্কেচ হলো | পরের দু’দিন অবশ্য চুটিয়ে ঘুরলাম নৈনিতাল – লেকে নৌকোবিহার – মল্লিতালের খোলা বাজারে দেদার কেনাকাটা, নৈনাদেবীর মন্দির দর্শন, কিংবা শের-এ-পাঞ্জাব-এ ভুরিভোজ – বাদ গেল না কিছুই | ফাঁক পেলেই আমি আলাদা হয়ে স্কেচ করতে বসে যেতাম – ছুটির মরশুম তাই নির্জনতা কোথাও নেই – এটাই সমস্যা | চারপাশে লোকে ভিড় করে দেখছে এই অবস্থায় মাথা ঠিক রেখে ছবি আঁকার অভ্যাস তখনো সেভাবে রপ্ত ছিল না – তবু কাজের কাজ মন্দ হয়নি |

নৈনিতাল লেক-এ সুসজ্জিত শিকারা

নৈনিতাল থেকে সোজা কৌসানি – আগে থেকে হোটেল বুকিং ছিল না – সর্বত্র হাউসফুল – এখানকার গান্ধী আশ্রমের কথা খুব শুনেছিলাম – পজিশনের দিক থেকে দারুণ – ওঠার রাস্তাটাও মনোরম –

কৌসানি

তবে এ যাত্রায় আমাদের কপালে একটা ছাপোষা হোটেল জুটলো – ঘরের সামনে একফালি উত্তরমুখো বারান্দা – ভাবলাম অন্তত এখানকার বিখ্যাত সূর্যাস্ত দেখাতে পাবো – কিন্তু সারাক্ষণ চারদিক ঘোলাটে গোছের হয়ে রইলো – সূয্যিমামা গায়েব – অর্থাৎ কপালে স্রেফ লবডঙ্কা | সন্ধের পর অবশ্য কিছুক্ষণের জন্য পূর্নিমার চাঁদ উদয় হলেন – তাও একেবারে লোডশেডিং সঙ্গে নিয়ে তখন কৌসানি কেয়াবাত !

আরও পড়ুন:  আস্তা-লা-ভিসা নিয়ে চলুন সাত স্বর্গের খোঁজে, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায়
গান্ধী আশ্রমের দেওদার গাছ

গান্ধী আশ্রম একটা ছোটখাটো মিউজিয়াম বিশেষ – মাঝখানে বিশাল হল, দু’বেলা ভজন হয়, লোকে মাদুরে বসে শোনে গলা মেলায় | আশ্রম চত্বরে এক বিশাল দেওদার গাছ গোটা জায়গাটাকে প্রায় আগলে রেখেছে – আলাদা করে গাছটাকে আঁকার লোভ সামলাতে পারলাম না | একদিকে উঁচু পাহাড় আর জঙ্গল আর অন্য তিনদিক পুরো খোলা একের পর এক পাহাড়ের সারি যতদূর চোখ যায় – এই হলো কৌসানি | এখানে একটা ছোট বাজার এলাকা আছে – দুপুরে এর আশপাশটা ঘুরে ঘুরে স্কেচ করলাম, তারপর গিয়ে বসলাম সুরিন্দর সিং–এর চায়ের দোকানে – ওখানে আলাপ হলো এক মৃদুভাষী ভদ্রলোকের সঙ্গে নাম এম.এস কাতায়াত বা ওরকম একটা কিছু – কারণ বিকেল চারটেতেই উনি ঈষৎ মত্ত অবস্থায় ছিলেন – এবং তারই মধ্যে কায়দা মার্কা ইংরেজিতে নিজেকে একজন চা বাগানের মালিক বলে দাবি করলেন | সুরিন্দরকে দেখলাম কাউন্টারে বসে সিগারেট মুখে ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে – ভন্ডামিটা এখানকার সবাই জানে বোধহয় |

হোটেলের ম্যানেজার বলল “এতদূর এসেছেন একবার ‘চৌখরি’ ঘুরে যান তার পর রয়েছে ‘মুন্সিয়ারি’ – একেবারে স্বপ্নের জায়গা মশাই |” সেবার নয় গিয়েছিলাম বছর বারো বাদে – কথাগুলো মিথ্যে ছিল না | কৌসানি থেকে চলে এলাম ‘রুদ্রপ্রয়াগ’ – প্রায় গোটা দিন গাড়িতে, পথে বৈজনাথ মন্দির দর্শন করে গোয়ালদাম-এ চা-নাস্তা – চমত্কার দৃশ্য চারদিকে – শুনলাম এখান থেকে ট্রেকিং-এর সেরা কয়েকটা রুট আছে | রুদ্রপ্রয়াগের রাস্তাটা গেছে একেবারে খাস গাড়োয়াল হিমালয়ের মধ্যে দিয়ে – যেমন প্রকান্ড তেমনই ভয়ঙ্কর গুরুগম্ভীর দেখতে সব পাহাড় – মনে হলো আমাদের যেন গিলে ফেলার মতলব করছে |

রুদ্রপ্রয়াগের অলকানন্দা নদী

কর্ণপ্রয়াগ থেকে আমরা হৃষিকেশ-বদ্রীনাথ হাইওয়েতে পড়লাম – পাশে সমানে বয়ে চলেছে অলকানন্দা নদী – দুপুর দুটো নাগাদ এসে গেল রুদ্রপ্রয়াগ | গাড়োয়াল নিগম-এ যথারীতি ঘর নেই – আমরা অবশ্য খুঁজেপেতে নদীর দিকেই একটা হোটেল নিলাম – পাশের খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে দেখা যায় নদীর ওপারে দুটো পাহাড়ের গা দিয়ে চলে গেছে দুটো আলাদা রাস্তা – কেদারনাথ ও বদ্রীনাথের দিকে | পাশের ঘরের এক মহিলার সঙ্গে আলাপ হলো – উনি ফিরছেন কেদার হয়ে – ওখানে প্রচুর বরফ পড়েছে ক’দিন – বেশ কাবু করে ফেলেছে ওঁকে | তবে সব শুনে-টুনে আমরা ওখানে বসেই পরের বছর কেদার ভ্রমণটা নিশ্চিত করে ফেলেছিলাম |

আরও পড়ুন:  কালিম্পং – দু’দশক পেরিয়ে
রুদ্রপ্রয়াগে সাধুদের জটলা

কেদার যাতায়াতের পথে অনেকেই রুদ্রপ্রয়াগে থাকেন – ফলে সারাক্ষণ চারদিকে সাধু-সন্ন্যাসী গিজগিজ করছে – মোটা মোটা কম্বলে নাক অবধি মুড়ি দিয়ে যেখানে সেখানে বসে এরা গুলতানি করে – আগুন পোহায় আর মুখোমুখি হলেই একদল আরেক দলকে জিজ্ঞেস করে – “আ রহে হ্যাঁয় ইয়া যা রহে হ্যাঁয়?”

রুদ্রপ্রয়াগের এই ব্রিজ পেরিয়ে যেতে হয় কেদারনাথ

পরদিন খুব সকালে হরিদ্বারের গাড়ি ধরা হবে – বাকি অর্ধেক বেড়ানো তো এখনো বাকি – হঠাৎ মনে হলো অলকানন্দার আরেকটা স্কেচ না করলেই নয় – এ ক’দিনে যে কতটা চনমনে হয়ে উঠেছি – সেটা বুঝেছিলাম হরিদ্বারের পর থেকে – তবে সে কথা আসছেবার বলা যাবে |

NO COMMENTS