ডাক বিভাগের সর্বস্তরের কর্মীদের মধ্যে পোস্টমাস্টার-এর গুরুত্বই আলাদা | যতটা বিভাগীয় তার থেকে অনেক বেশি সামাজিক | বিশেষত আমাদের দেশে যুগ্ম শব্দটির মধ্যে ‘মাস্টার’ অংশের উপস্থিতিই এর অন্যতম কারণ | এহেন পদাধিকারীকে কর্মক্ষেত্রে কিংবা অন্য যায়গায় চেনামুখে ‘মাস্টারমশাই’ বা ‘মাস্টামশাই’ রূপে সম্বোধন করতে শোনাটা (আজও‚ এই কলকাতা শহরেও ) মোটেই বিরল নয় | ডাকহরকরা বা পিওনদের মতো পোস্টমাস্টারের সঙ্গেও সাধারণ মানুষের কোথাও যেন একটা প্রাণের-মনের যোগ রয়েছে | নিছক ‘ঘরোয়া’ বা ‘আটপৌরে’ শব্দের ঘেরাটোপে যে সম্পর্কের সীমানা নির্ধারণ এক প্রকার অসম্ভব |

দিনকাল বদলেছে | মানুষে-মানুষে সম্পর্কে এসেছে এক ধরনের যান্ত্রিকতা | তাকে গ্রাস করেছে কেজো ভদ্রতা | তথাপি বিভিন্ন সূত্র এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা-অন্বেষণ থেকে দেখেছি‚ সাধারণ মানুষ আজও তাদের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের (কেবল অর্থনৈতিক নয়) অনুভূতি অকপটে ভাগ করে নেন পূর্বোক্ত দুই ডাককর্মীর সঙ্গে | এহেন সমাজবন্ধুদের মধ্যে কোনো কোনো পোস্টমাস্টার নিজেই খবর হয়ে ওঠেন তাঁদের কৃতকর্ম বা কর্মক্ষেত্রে নিজ ভূমিকা বিশেষের জন্যে |  

এমনই একজন নিউইয়র্ক সিটির পোস্টমাস্টার রবার্ট কে ক্রিসেনবেরি |

ফ্লোরেনটিন (১৯২৮)‚ প্যারিসের ফিনিক্স (১৯৪৪) প্রভৃতির পর ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’-এর গ্রোভ এডিন এডিসন সদ্য বেরিয়েছে (১৯৫৯) | বইয়ের লেখক ডি এইচ লরেন্স অবশ্য অনেক আগেই পরলোকে পাড়ি দিয়েছেন (১৯৩০) | যাই হোক‚ সেই বইয়ের রিডার্স সাবস্ক্রিপশনের ২০০০০ কপি সার্কুলার‚ বইটির বিজ্ঞপ্তিসহ পাঠানো চিঠি এবং বইটির জন্য যারা অগ্রিম দিয়েছিলেন সেইসব ক্রেতাদের কাছে বইটি পৌঁছে দেবার জন্য নিউইয়র্কের পোস্ট অফিসে জমা করা বইয়ের কপিগুলো আটক করা হয় নিউইয়র্ক এর পোস্টমাস্টারের এক নির্দেশে | দিনটা ছিল ১৯৫৯ সালের ৩০ এপ্রিল |

তারপরেই সমন পাঠানো হয় প্রকাশক এবং রিডার্স সাবস্ক্রিপশনের কাছে | তাতে বলা হয়‚ তাদেরকে ডাকঘরের বিচার বিভাগে হাজির হতে হবে নির্দ্ধারিত সময়ে | সেখানে তাদের বক্তব্য শোনার পর পোস্টমাস্টার জেনারেল রায় দিলেন (১১ জুন) : গ্রোভ এডিন থেকে প্রকাশিত বই এবং তার বিজ্ঞাপন কুরুচিকর এবং অশ্লীল | সুতরাং এসব ডাকে পাঠানো যাবে না |

আরও পড়ুন:  নীল তিমি, কিছু ‘অ’প্রাসঙ্গিক কথা

এতে না দমে গিয়ে প্রকাশক ও রিডার্স সাবস্ক্রিপশন মামলা করলেন ইউনাইটেড স্টেটস ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডে | নিউইয়র্ক সিটির পোস্টমাস্টার এবং ব্যক্তি রবার্ট কে ক্রিসেনবেরির বিরুদ্ধে | একদিকে বাদীপক্ষ‚ স্বনামধন্য প্রকাশক ও পরিবেশক | অন্যদিকে ভিক্টোরিয়ান নীতিবাগিশ ও রক্ষণশীল পোস্টমাস্টার – প্রতিবাদী |

মামলা চলাকালীন বাদীপক্ষ একে একে পেশ করলেন : (১) বইটি ছাপার কারণ | যা তাদের দীর্ঘকালের সুনাম ও ঐতিহ্যের অনুসারী | (২) বইটি সম্পর্কে ইউনাইটেড স্টেটস্-এর প্রথম সারির পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত আলোচনা‚ মন্তব্য‚ সম্পাদকীয় লেখা | (৩) বইটি পোস্ট অফিস কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় সংবাদপত্র-সাময়িকীতে প্রকাশিত বিরূপ প্রতিক্রিয়ার নজির এবং লেখাপত্তর | (৪) বইটি সম্পর্কে তখনকার দু’জন শ্রদ্ধেয় সমালোচক আলফ্রেড কাজিন ও ম্যালকম কাউলির লেখা | প্রসঙ্গত দুজনেই দেখিয়েছিলেন বইটির সাহিত্য-মূল্য কতখানি |

অন্যদিকে পোস্টমাস্টার জেনারেলের মূল বক্তব্য ছিল : বইটা আদ্যপান্ত আদিরসাত্মক | যৌনগন্ধী | পুরোটাই নরনারীর শরীরী সম্পর্কের আলোচনায় ভরপুর | সাহিত্য-মূল্য যদি কিছু থেকেও থাকে তা চাপা পড়ে গেছে চরম অশ্লীল আলোচনার নিচে | বইটা মানুষকে বিপথগামী করবে | ফলে সামাজিক ও নৈতিকভাবে এরকম নিম্নরুচির একটা বই কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না |

দু’তরফের বক্তব্য শোনার পর, অজস্র বই থেকে উদ্ধৃতি বা উল্লেখসহ বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক বিচারের নজির তুলে বিচারক ফ্রেডরিক ভ্যান পেল্টব্রিয়ান এক সারগর্ভ রায় দেন | তাতে তিনি স্পষ্ট জানান পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব কীরকম হওয়া উচিত | লক্ষণরেখা টেনে দেন পোস্টমাস্টারের ডাক পরিচালনা সংক্রান্ত আইনি অধিকার সম্পর্কে |

বিচারকের মতে ১) ডাক পরিচালনা আর অশ্লীলতা নির্ণয় কখনই এক ব্যাপার হতে পারে না | বইটিকে যেভাবে পোস্টমাস্টার অশ্লীল কুরুচিকর অভিধায় অভিহিত করেছেন, তার সঙ্গে তিনি সহমত পোষণ করেন না | ২) সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বইটি অশ্লীল নয় | বরং এর সাহিত্য-মূল্য আছে জানিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্র-সাময়িকীতে বিশিষ্ট সমালোচকেরা যে আলোচনা করেছেন তা ধর্তব্যের মধ্যেই আনেননি পোস্টমাস্টার জেনারেল | ৩) বইটির ভাষা যথাযথ, কিছু বর্ণনা বিরল-সুন্দর, ব্যঞ্জনা তাত্পর্যপূর্ণ, অর্থ মর্মগ্রাহী | সাহিত্যগুণের উপস্থিতি সম্পর্কে কোনো সংশয় থাকা উচিত নয় | ৪) বইটির মূল কাহিনি নিতান্ত সাধাসিধে | বইটির বৈশিষ্ট্য, প্রাকৃতিক সারল্যের আদর্শ এবং বর্তমান শিল্পযুগের বিরুদ্ধে লোখকের ক্ষোভ | অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে লরেন্স সেই ক্ষোভ-আদর্শকে লেখায় তুলে ধরতে চেয়েছেন | সেই ক্ষোভ-আদর্শ ভ্রান্ত হতে পারে, তা বলে তাকে ‘অশ্লীল’ বলা যায় না | কারণ বইখানায় ‘ডার্ট ফর ডার্টস সেক’ বলে কিছু নেই | ৫) যৌন প্রক্রিয়া বা আলোচনা এসেছে কাহিনীর চরিত্র রূপায়নের স্বার্থে | বিচ্ছিন্নভাবে বা নগ্নতা দেখানোর উদ্দেশ্যে নয় | ৬) যেকোনো বই থেকে শব্দ বা বাক্যাংশবিশেষ বেছে নিয়ে তাকে অশ্লীল বলা যেতেই পারে | এইভাবে অনেক চিরায়ত সৃষ্টি ও ধর্মগ্রন্থকেও অশ্লীল বলা যেতে পারে | অথচ লেখকের বক্তব্য এবং পুরো বইয়ের বিচারে সেগুলো অশ্লীল না হয়ে অবিচ্ছেদ্য বলে বিবেচিত হতে পারে | ৭) নিষিদ্ধ বই আটকের অধিকার পোস্টমাস্টার জেনারেলের আছে | কিন্তু কোন বই নিষিদ্ধ সেটা বিচারের যোগ্যতা বা অধিকার নেই | ৮) সামাজিক ও নৈতিকভাবে বইটি গ্রহণযোগ্য নয় – পোস্টমাস্টার জেনারেলের এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সমস্ত সংবাদপত্র-সাময়িকী এবং বিদগ্ধ সমালোচকদের মতামত বিবেচনাযোগ্য | লক্ষণীয়, গোটা দেশজুড়ে বইটার কদর, চাহিদা ও সপ্রশংস উন্মাদনা | সর্বপরি, এক্ষেত্রে পোস্টমাস্টার কথিত ‘সমাজ-মান’ বিচারেরও কোনো নির্দিষ্ট মাপ নেই | ৯) বাদীপক্ষের যুক্তিগুলোর প্রায় সবটাই দৃঢ়বদ্ধ, সারগর্ভ ও অখন্ডনীয় | ১০) আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘লেডি চ্যাটারলিজ লাভার’ অশ্লীল নয় | অতএব বইটি নিয়ে পোস্টমাস্টার জেনারেলের আদেশ বেআইনি ও বলবৎযোগ্য নয় |

আরও পড়ুন:  ‘সমালোচক’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কি স্ববিরোধী? (জন্মদিন উপলক্ষ্যে বিশেষ রচনা)

পোস্টমাস্টারদের অনেক অদ্ভুত কীর্তিকলাপের নজির আছে | যেমন, চার্লস কনেল বর্তমান কানাডার অন্যতম প্রদেশ নিউ ব্রানসউইকের পোস্টমাস্টার জেনারেল হয়ে আসেন ১৮৫৯ সালে | ১৮৬০-এর মে মাসে প্রকাশিত হবার ঠিক (এপ্রিল) আগে দেখা গেল নিউ ব্রানসউইকের ৫ সেন্ট দামের ডাকটিকিটে (বাদামি) ছাপা হয়েছে দাড়িওয়ালা সুদর্শন কনেলের ছবি | মহারানী ভিক্টোরিয়া ও ইংল্যান্ডের যুবরাজের ছবির সঙ্গে একজন রাজকর্মচারীর ছবি! সঙ্গে সঙ্গে প্রাদেশিক সচিব এম এল টিলে জরুরি মিটিং ডাকেন | সেই মিটিংয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টিলে কনেলকে টেলিগ্রাম করে জানিয়ে দেন, গভর্নর ও মন্ত্রী পরিষদের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত ডাকটিকিট যেন ডাকে ব্যবহার না করা হয় | শেষ পর্যন্ত, সেই স্ট্যাম্পটি আর দিনের আলোর মুখ দেখেনি | প্রসঙ্গত বর্তমানে অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য এই স্ট্যাম্পটি, সম্ভাব্য প্রকাশকালের ঠিক আগেই কনেল নিউইয়র্ক গেছিলেন স্ট্যাম্পটির নকশা সম্পর্কে ছাপার দায়িত্বে থাকা সংস্থার সঙ্গে কথাবার্তার জন্য |

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক (সিটি, নিউইয়র্ক) সহ বাল্টিমোর (মেরিল্যান্ড), আলেকজান্দ্রিয়া(ভার্জিনিয়া), সেন্ট লুইস (মিসৌরি) প্রভৃতি শহরের নিজস্ব ডাকটিকিট প্রকাশিত হয় ১৮৪৫ সালে | ডাকটিকিটগুলো প্রকাশিত হয়েছিল সংশ্লিষ্ট শহরের পোস্টমাস্টারদের উদ্যোগে, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ডাকবিভাগের উদ্যোগে নয় | অত্যন্ত মূল্যবান আমেরিকার প্রথম এই ডাকটিকিটগুলো এক ডাকে পরিচিত ‘পোস্টমাস্টারস স্ট্যাম্প’ নামে | এই স্ট্যাম্পগুলোর বেশিরভাগই ছিল হয় অতি সাধারণ পোস্টমার্ক (যাতে ডাকমাসুল লেখা আছে) নতুবা জরুরি ভিত্তিতে খুব বাজেভাবে ছাপা হয়েছিল | একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল নিউইয়র্কেরটি |  এতে ছাপা হয়েছিল সেদেশের ব্যাঙ্ক নোটে ছাপা রাষ্ট্রপতি ওয়াশিংটনের পোর্ট্রেট | এই প্রসঙ্গে স্মরণীয় দ্বীপরাষ্ট্র বারমুডার রাজধানী হ্যামিল্টনের পোস্টমাস্টার (১৮১৮-১৮৬২) উইলিয়াম বি পেরোট এবং সেন্ট জর্জের পোস্টমাস্টার (১৮৫০ -১৮৬০) জেমস এইচ থিস | এদের দু’জনের চালু করা ডাকটিকিট পরিচিত যথাক্রমে পেরোট (১৮৪৬ থেকে ১৮৪৮-এর মাঝে কোনো সময়) এবং থিস ডাকটিকিট নামে | পেরোটের সম্মানে বারমুডার ডাকবিভাগ এক শতবার্ষিকী স্মারক ডাকটিকিটও প্রকাশ করেছে |

এরকম আরো অনেক আছে, তবে রবার্ট কে ক্রিসেনবেরির মতো বই নিষিদ্ধ করার দুঃসাহস একেবারে নজিরবিহীন |

আরও পড়ুন:  কেন কখনো ‘বুড়ো’ হলেন না শিবরাম চক্রবর্তী ?

NO COMMENTS