Lesser Known bengali Songs Of Golden Era

বাংলা গানের স্বর্ণযুগ বলা হয় যে সময়কালকে, তা নিয়ে নাক বেঁকানোও হয় বিস্তর। চর্বিতচর্বনই হয়েছে শুধু। ওই আমি-তুমি আর তুমি-আমি। নিশি রাত আর বাঁকা চাঁদ। ন্যাকাবোকা কথা আর তেমন এলানো সুরারোপ ছাড়া গানকে একটু অন্যরকম করার দিকে কেউ নাকি মন দেয়নি । সে সময়ে তৈরি কিছু অন্য গতের গান, বলা ভালো গান নিয়ে কিছু অন্য কথা হোক।

বলা হয়, প্রেমের মৃত্যু বিয়েতে। দেখবেন, সিনেমার সাড়া ফেলে দেওয়া রোম্যান্টিক নায়কনায়িকা যদি বাস্তবে বিয়ের ছাদনাতলায় গিয়ে দাঁড়ায়, পর্দায় সে জুটির কেমিস্ট্রি হিস্ট্রি হয়ে যায়। পোস্ট-বিয়ে তারা অন্য নায়ক অন্য নায়িকার সঙ্গে জুটিতে আবির্ভূত হয় পর্দায়। বিয়ে পাত্রপাত্রীকে এমন আটপৌরে বানিয়ে দেয় যে রোমান্সের তাস খেলা যায় না। গানেতেও দেখুন, প্রেম আছে, বিরহ আছে। কিন্তু দাম্পত্য নো এন্ট্রি।

নির্মলা মিশ্রর ‘এই জীবন ছিল নদীর মত গতি হারা’ গানটা মনে পড়ে? এই গানে আগে থেকে পরিচিত, প্রেমে পড়া এক যুগল মিলিত হয়েছে বিবাহসূত্রে। আর তার পরে নিজেরা নিজেতে কেমন একাকার হয়ে গেছে। ‘আজ যখনই ডাকি জানি তুমি দেবে সাড়া…’ প্রেম যেখানে শুধু অটুটই নয়, নিত্য দৈনন্দিনতাকে ফুৎকারে উড়িয়ে নিশ্চিন্তে আলিঙ্গন করছে। তৃপ্তি আর বিশ্বাস জারানো যেন গানটিতে। অনেক পরে, স্বর্ণযুগের অবসান হয়ে গেছে ততদিনে, আরেকটি গান হয়েছিল একই থিমে। কুমার শানুর বাংলা গান, ‘বিয়ের আগে প্রেম ভালো না বিয়ের পরে প্রেম / আমি বাবা প্রথম দলে জানিয়ে দিলেম’। দুটি গানের মধ্যে তুলনা করার আর কিছুই নেই।

গানে প্রেম বা বিরহ তো বেশ কমন। কিন্তু তালাক? রিজেকশন? আছে। কিশোরকুমারের ‘ওগো নিরূপমা / করিও ক্ষমা / তোমাকে আমার / ঘরণী করিতে / আমার মনের / দোসর করিতে / পারিলাম না…’ বাপরে! কচি কোমল প্রেমের মাঝে কোনও মেয়েকে এমন মুখের ওপর শুনিয়ে দেওয়া যায়! হ্যাঁ, বিয়ে বাচ্চা হয়ে নাটাঝামটা খেয়ে অমন অনেক কথাই হয় দাম্পত্যে, বলা ভালো, আরও কড়া দাগেরই হয় সেসব। কিন্তু প্রেমের মধুবর্ষণে এ কেমন কাঁটার জ্বালা!

আরও পড়ুন:  ভূতনাথ ভূতনাদ

এক পরমাশ্চর্যর নাম সলিল চৌধুরি। বহু গান উনি বাংলা ও হিন্দি দুটি ভাষাতেই করেছেন। একই সুরে। অন্য ভাষাতেও করেছেন, কিন্তু সেসব আয়ত্তের বাইরে। আমার ভারি অবাক লাগে যখন একই সুর  হিন্দিতে চূড়ান্ত রোম্যান্টিক, বাংলায় গহীন বিরহের হয়ে বাজে! ‘তসবির তেরি দিল কি’ এবং ‘ওগো আর কিছু তো নাই’। এক সুর, অনেকটাই এক সঙ্গীতায়োজন, তথাপি কী অসম অবস্থান দুটি গানের। আরেকটি সুর আবার বাংলায় বর্ষাসঙ্গীত, হিন্দিতে সাধকের ধ্যানভঙ্গকারী। ‘গুরুগুরু মেঘের মন্দ্র বাহারে হল শুরু’ এবং ‘ও সন্যাসী তলাশি জিসকি হ্যায় ও তো কঁহি নহি’।

মান্না দে একবার এক সাক্ষাৎকারে শ্যামাসঙ্গীত গাইবেন কি না এই প্রশ্নে, অত বুড়ো হইনি এখুনি যে মা মা করব, বলেছিলেন। এই সাক্ষাৎকারের বছর কয়েক পরেই ওঁর শেষ বাণিজ্য-সফল ক্যাসেট প্রকাশিত  হয়। ‘আমায় একটু জায়গা দাও মায়ের মন্দিরে বসি’, ‘যখন এমন হয় / জীবনটা মনে হয় ব্যর্থ আবর্জনা / আমি গঙ্গায় ঝাঁপ দিই রেলের লাইনে মাথা রাখি’ গানগুলিতে আবিষ্কৃত হন রোম্যান্স-বিরহ-কালোয়াতির সম্রাট মান্না দে-কে এক অন্যরূপে। এই ক্যাসেট বের হবার এক বছরের আশেপাশেই গানগুলির রচয়িতা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় আত্মহত্যা করেন, আশ্চর্য কথা, গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়েই।

ভূপেন হাজারিকা আরেক উল্লেখযোগ্য শিল্পী। তিনি ঠিক ঝাঁকের কই ছিলেন না। ভূপেন হাজারিকা নামেই ‘সাগরসঙ্গমে সাঁতার কেটেছি কত’ মনে পড়ে, আবার পিঠোপিঠি মনে আসে, ‘একখানা মেঘ ভেসে এল আকাশে’। এই গানে সমস্ত যন্ত্রসঙ্গীত মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়, আর উচ্চারিত হয় – আমি এক যক্ষ মহানগরীর। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। নিজেকে মেঘ মনে হয়, গা ভারী লাগে। পাখির চোখ নিয়ে কলকাতা শহর, আমার জন্মস্থান হাওড়ার মফস্‌সল এলাকা, মাঝের গঙ্গা নদী সব যেন এক চালচিত্রে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। মহাশ্বেতা দেবীর কাহিনী রুদালি অবলম্বনে হিন্দি সিনেমা হল। সেই সিনেমায় সুর-আয়োজন করে নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে দেশ জুড়ে নতুন করে চর্চায় আসেন ভূপেন হাজারিকা এবং সেই গান – দিল হুম হুম করে ঘাবড়ায়েঁ। অনেক পরে জেনেছিলাম, ১৯৬২ সালের চীন ভারত যুদ্ধের প্রেক্ষিতে নাকি এই সুরে একটি বাংলা গান বেঁধেছিলেন উনি – চোখ ছলছল করে মা গো।

আরও পড়ুন:  ভূতের রাজার সঙ্গে কিছুক্ষণ

প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কি সাদামাটা গুমোরহীন ব্যক্তিত্ব। দূরদর্শনে সাক্ষাৎকারে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। একটি গান গাইতে অনুরোধ করেছেন হেমন্ত, সে গান খাতায় খুঁজে পাচ্ছেন না প্রতিমাদেবী। খাতার সামনের দিকে নেই, মাঝেও নেই, পিছনের দিকেই বা কই! ঘাবড়ে যাচ্ছেন তিনি। ‘কী হল রে তোর’ মার্কা স্নেহের দাবড়ানি দিয়ে হেমন্ত বললেন, যেটা পারিস সেটাই গা, শুরু কর। হাঁফ ছাড়লেন তিনি। কত স্মরণীয় গানই তো গেয়েছেন প্রতিমা, কিন্তু লোকগানের কাণ্ডারী নির্মলেন্দু চৌধুরির সুরে যখন গাইলেন, ‘আমার যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাবো না’, তখন নিজের সীমানা কি অনায়াসে পেরিয়ে গেলেন! লোকগানের সঙ্গে কীর্তন মিলেমিশে অনন্য এক ফর্মে এই গান একইভাবে চটুল, ব্যঙ্গাত্মক, সুরের সূক্ষ্ম কাজের এক মস্ত সমাহার।

গান নিয়ে কিছু অন্য কথায় মনে পড়ছে এক-দুটো বেঠিক উচ্চারণের কথা। ‘তারে আমি চোখে দেখিনি’ গানে বলতে পারে না কারও বিবশ মন, এই ‘বলতে’-টা হয়ে গেছে বইলতে। যদি শ্যামল মিত্র গাইতেন, এ বড় স্বাভাবিক ছিল। ওঁর ওটাই উচ্চারণ, আর সেটাই ওঁর ইউএসপি। কিন্তু কিশোরের এমন! বেগম আখতারের ‘ফিরায়ে দিও না’ গানে অশ্রু মাধুরী এনো এ আঁখিপাতে – এটা রিফ্রেন হচ্ছে, হঠাৎ, তৃতীয়বারে ‘অশ্রু’ হয়ে গেল অশ্রি! বেগম আখতারের মাতৃভাষা বাংলা ছিল না, তাই ভুল উচ্চারণ হতেই পারে। রি-টেক করা যেত না? আজকের মতো প্রযুক্তির উন্নতি না হলেও, প্রাগৈতিহাসিক কালের কথা তো বলছি না। নিবিড় শোনার মাঝে শব্দগুলির ভুল উচ্চারণ কানে লাগে। ভাববেন না যেন, ঐশ্বরিক প্রতিভা নিয়ে মশকরা করা হচ্ছে।

সংখ্যা ও সাফল্যের হিসেব কষলে চূড়ান্ত যে তিন নাম আসবে স্বর্ণযুগের বাঙালিয়ানায় ভরপুর কণ্ঠের, তাঁরা হেমন্ত-মান্না-শ্যামল। হেমন্তর কণ্ঠে প্রতিষ্ঠিত, উচ্চস্তরীয় প্রেমের আভাস পাওয়া যেত আর মান্নার কণ্ঠে বোহেমিয়ান তারুণ্যের প্রেম-বিরহের মূর্ছনা। কিন্তু যৌন আবেদনে মাখামাখা ‘টেনর’ কণ্ঠ বলতে শ্যামল মিত্র। আপাদমস্তক স্মার্ট গানে মিশছে ঈষৎ লোকগানের ঢঙে উচ্চারণ। তুমি তো ইয়ামার (আমার) কাছে নাই, সব শেষ হয়ে মন শূন্য এখন / সেইয়াগের (সেই আগের) মত / ফিরে দেখি যত / যেন হারিয়েছি সেই দেখার নয়ন, আপন নীড়ে ফিরে গেছে পাখি / নীড় হার‍্যায়ে (হারায়ে) আমি পথে থাকি / ভাবিয়ে (ভাবি এ) পথচলা কব্যে (কবে) যে শেষ হবে জানি না, যেথা অবহেলা সইয়ে (সয়ে) সইয়ে (সয়ে) কিছু ফুল শুকানো শুকানো হইয়ে (হয়ে)… এইরকম।

আরও পড়ুন:  শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সমীপে...

শ্যামল মিত্রর আরেকটি গান দিয়ে শেষ করি এই আখ্যান। সুধীরলাল চক্রবর্তী বাংলা আধুনিক গানের এক অন্যতম সূচনা-পুরুষ। কালজয়ী তাঁর গান, ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’। আইকনিক খ্যাতি ছিল তাঁর শিক্ষণের। চেয়েও গান শেখার জন্য যথেষ্ট যোগ্য বিবেচিত হননি পরবর্তীর অনেক তাবড় গাইয়ে। অভিন্নহৃদয় বন্ধু শ্যামল আর মানবেন্দ্রর মধ্যে শুধু শ্যামল পেরেছিলেন চৌকাঠ ডিঙোতে। সেই একদা শিষ্য শ্যামলকে দিয়ে এক অসাধারণ গান গাইয়েছিলেন সুধীরলাল। আক্ষেপ, গানটি একটু যেন কম জনপ্রিয় আজও – শেষ কথা আজি বলে যাও / ভালোবাসা না এ খেলা / সেদিন বিদায় বেলা।

NO COMMENTS