বাহামা দ্বীপপুঞ্জের কাছে অতলান্তিক মহাসাগর দিয়ে এগোচ্ছিল গ্রীক পণ্যবাহী জাহাজ | ১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে | হঠাৎ ক্যাপ্টেনের দূরবীন থেমে গেল | বেশ দূরে ঢেউয়ের তালে তালে উঠছে নামছে একটা ডিঙি | আর তাতে বসে আছে এক বালিকা!

সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘোরালো জাহাজ | উদ্ধার করা হল বালিকাকে | জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গা | কথা বলার মতো অবস্থায় নেই | শুধু এটুকুই বলতে পেরেছিল গত চারদিন ধরে সে ওইভাবে ভেসে আছে ভেলায় !  

পরিচর্যায় সুস্থ হতে বালিকা যা বলেছিল হাড়হিম হয়ে গিয়েছিল অতি অভিজ্ঞ নাবিকেরও |

বালিকার নাম টেরিজো দুপেররোল | বাবা ছিলেন চোখের ডাক্তার আর্থার দুপেররোল | তাঁর ইচ্ছে ছিল পরিবারকে নিয়ে এমন কোথাও যাবেন যেখানে বেড়ানো আছে | অভিযানও আছে |

অনেকদিন ধরে টাকা জমিয়ে বেরিয়েছিলেন সেই অভিযানে | সঙ্গে স্ত্রী জেন | ১৪ বছরের ছেলে ব্রায়ান‚ ১১ বছরের মেয়ে টেরিজো আর ৭ বছরের মেয়ে রেনে |

ভাড়া করা হল ছোট্ট জাহাজ‚ ব্লুবেল | ক্যাপ্টেন জুলিয়ান হার্ভে | তিনি ভ্রমণে সঙ্গে নিলেন নিজের স্ত্রীকেও | ১৯৬১-র ৮ নভেম্বর যাত্রা শুরু | ফ্লোরিডা থেকে বাহামা দ্বীপপুঞ্জের দিকে |

প্রথম চারদিন কেটে গেল হৈহুল্লোড়ে | তখনও দুপেররোল পরিবার জানে না কী হতে চলেছে | ১২ নভেম্বর রাতে টেরিজোর ঘুম ভাঙল দাদার চিৎকারে | কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে দেখে রক্তের সাগরে ভাসছে তার বাবা‚ মা‚ দাদা আর বোন | একই অবস্থা ক্যাপ্টেনের স্ত্রীরও |

পরে পুলিশ জানতে পেরেছিল খুন করবে বলেই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েছিল জুলিয়ান | ভেবেছিল খুন করে জলে ফেলে দেবে | পরে কিছু একটা গল্প বানিয়ে বলবে |

কিন্তু সম্ভবত স্ত্রীর চিৎকারে সব ছক ভেস্তে যায় | তার কীর্তি দেখে ফেলে ডাক্তার‚ তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান | স্ত্রীকে মেরে এদেরকেও খুন করে সে | সাক্ষী লোপাট করতে |

কেবিন থেকে টেরিজো বেরোতেই জুলিয়ান দেখে অবশিষ্ট আছে আরও একজন !তাকেও মারতে চেয়েছিল সে | কিন্তু ওই অবস্থাতেও বিপদ আঁচ করে অসম সাহসের পরিচয় দেয় বালিকা |

জাহাজে বাঁধা ডিঙি সে জলে নামায় | তারপর দড়ি বেয়ে নামে ডিঙিতে | ডিঙি নামাতে দেখে তাকে ধরবে বলে আগেই জলে ঝাঁপ দিয়েছিল জুলিয়ান | কিন্তু টেরিজোর ডিঙির আর নাগাল পায়নি সে |

টেরিজোর চোখের সামনে ঢেউয়ের আড়ালে মিলিয়ে গিয়েছিল তাদের ভাড়া করা জাহাজ ব্লুবেল | এরপর চারদিন অনন্ত সমুদ্রে ভেসেছে টেরিজো | পায়নি একফোঁটা খাবার বা জল | শিকার হয়েছিল হ্যালুসিনেশনের | কিন্তু হারায়নি মনোবল | জানত একদিন তাকে উদ্ধার করা হবেই |

তাকে গ্রীক জাহাজ উদ্ধার করার আগে উদ্ধার হয়েছিল জুলিয়ানও | সেও একটা ডিঙিতে ভাসছিল | সঙ্গে রেনের মৃতদেহ | মিথ্যে গল্প বানিয়ে বলেছিল অসুস্থতায় মৃত্যু হয়েছে তার |

পরে যখন টেরিজোর অভিজ্ঞতা এল সংবাদপত্রের শিরোনামে‚ জুলিয়ান বুঝেছিল আর নিস্তার পাওয়ার উপায় নেই | হোটেলের ঘরে আত্মহত্যা করেছিল |

টেরিজো সাময়িক ভাবে শিরোনাম হয়েছিল | কিন্তু সময়ের সঙ্গে সব থিতিয়ে যায় | আত্মীয়দের পরামর্শে তিনি বলতেন না অভিজ্ঞতার কথা | দীর্ঘ কুড়ি বছর পর মুখ খুলেছিলেন | লেখা হয়েছিল বই |

এখন তিনি ৬৭ বছরের বৃদ্ধা | সবাইকে বলেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা | আর বলেন খুব বড় বিপদেও মনোবল না হারাতে | কেউ না কেউ ঠিক আসবে উদ্ধার করতে |

আরও পড়ুন:  কিশোরী কন্যা বিয়ে ভাঙায় শোকে মৃত বাবা...মায়ের ইস্ত্রির দোকানই ভরসা...তারপর যা হল
- Might Interest You

NO COMMENTS