জলদ গুপ্ত
জলদ গুপ্ত লেখেন না, ভাবেন। নিজেকে মনে করেন মুদির দোকানের মালিক। কোথায় কোন মশলা আছে শুধু সেটুকুই উনি জানেন, খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী কাগজে মুড়ে দিয়ে দেন...ব্যস। সিধুজ্যাঠার মত অনেক কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও অন্যদের অসুবিধা হবে বলে কিছুই করেন নি। কবিতা, নাটক লিখতে পছন্দ করেন আর পাগলের মত পছন্দ করেন সঙ্গীত। পাহাড়ি জঙ্গলের টিলায় বসে হেঁড়ে গলায় গান আর দিনে ১৫ কাপ চায়ের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। আদিখ্যেতাকে ঘেন্না করেন, তর্ক করতে ভালোবাসেন। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে কোন লেখক থাকবে না।

দোষটা আমারই। সবাই বারণ করেছিল, শুনি নি। দিলীপদাও বারবার বুঝিয়েছে, ‘জলদবাবু এত রাতে না ফিরলেই নয় ? রাস্তাটা ভাল নয়, ঘন জঙ্গল। বন্য জন্তুর ভয় আছে। বাঘ, বাঘরোল ছাড়াও সভ্য জন্তু মানে ডাকাত, ছিনতাইবাজ…আপনি আজ রাতটা থেকেই যান’। আমিও বুঝতে পারছিলাম কাজটা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। অফিসেরই কাজে একটা অজগ্রামে খবর করতে এসেছি, আমরা চারজন। শহর থেকে দূরে একেবারে জঙ্গলের মধ্যে একটা বাংলোয় থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। দারুন ব্যবস্থাপনা, অসাধারণ জায়গা কিন্তু আমার কিচ্ছু করার নেই, আমাকে ফিরতেই হবে। পরের দিন সকালে বাড়িতে সত্যনারায়ণের সিন্নি। আমাদের সুন্দরীর বাচ্চা হবে, সেই জন্য। ও গত বছরও একটা বাছুর দিয়েছে, আমিই মাঠে পাল খাইয়ে এনেছি। এবার সবাই একটা ষাঁড় চাইছে। তাহলে আর সুন্দরীকে পাল খাওয়াতে নিয়ে যেতে হবে না। ভোরবেলা পুরুত আসবে। আটা, কলা, খোয়াক্ষীর সব কিনে দিয়ে এসেছি কিন্তু সকাল থেকে উপস্থিত না থাকলে বউ আস্ত রাখবে না। এই ব্যাপারে মানে সুন্দরী এবং সিন্নির ব্যাপারে আমার বউ খুব কড়া। কিছু করি আর না করি ওই সময়টা উপস্থিত থাকতেই হবে।

এমনিতেই আমাদের বাড়িতে ধর্ম নিয়ে আমার একটু দুর্নাম আছে।  কোন বারেই উপোস করি না, কোন মুর্তির সামনে মাথা নোয়াই না, তীর্থ করতে বেরোই না … আমি ওদের বোঝাবার চেস্টা করেছি যে, আমি ধর্ম নিরপেক্ষ … মানে সব ধর্মকেই সমানভাবে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু ওরা উল্টো বুঝেছে। ওদের কাছে আমি বেশ জোরালো ভাবেই অধার্মিক। মা দুঃখ করে বলেছে, ‘যার বাবা, জ্যাঠা আহ্নিক না করে জল খায় না তাদের ছেলে এমন হল কী করে’! অবশ্য এই ভাবনার পিছনে ওদের তেমন দোষ নেই কারন এই মুহূর্তে আমাদের দেশে তিন ধরনের মানুষ আছে – ধার্মিক হিন্দু, ধার্মিক হিন্দু সমর্থক এবং ধার্মিক হিন্দু বিরোধী। যাই হোক, আমি ওদের বুঝিয়ে সুজিয়ে রাত ন’টা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম। বাইকে ঘন্টা দুই লাগবে। রাস্তা খুবই ভাল। কিন্তু মাঝখানে একটা ঘন জঙ্গল পেরোতে হয়, ওখানে তিরিশ মিনিটের মতো সময় লাগে। ভয় ওই তিরিশ মিনিটকেই। একটু জোরেই চালাচ্ছিলাম। চারদিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। হেডলাইটের আলো ছাড়া সব কুচকুচে কালো। পাশদিয়ে অন্য গাড়ি গুলো হুস হুস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমার মাথায় তখন সত্যনারায়ণ, খোয়াক্ষীর, পাঁচালি… হঠাৎই একটা বিশ্রী আওয়াজ করে গাড়িটা দাঁড়িয়ে গেল। স্টার্ট বন্ধ। রাস্তার পাশে এসে দাঁড়ালাম। এক ভয়ংকর অন্ধকার চারদিকে। মোবাইলের আলো জ্বেলে আমার বুদ্ধিতে গাড়িটাকে স্টার্ট করাবার চেষ্টা করলাম, পারলাম না। চারপাশের অন্ধকারের মতো আমার গাড়িও নিরুত্তর।

আরও পড়ুন:  সুন্দরী‚বীরাঙ্গনা উন্নিয়ারচাকে যুদ্ধে হারিয়ে বন্দি করে নিজের হারেমে রেখেছিলেন টিপু সুলতান ? পরে বিয়েও করেছিলেন ?

এবার আমারও নিরুত্তর হবার মতো অবস্থা। সময় আন্দাজ করে বুঝতে পারলাম আমি সেই তিরিশ মিনিটের রাস্তার ওপরই দাঁড়িয়ে। মনের সঙ্গে সারা শরীরটাও স্তব্ধ হতে শুরু করলো। প্রচণ্ড বেগে পাশ করে যাওয়া দুটো গাড়িকে থামাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তাতে তাদের বেগ আরও বেড়ে গেল। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি হঠাৎ দেখলাম আমার সামনে দুটো আগুনের গোলা। বুঝলাম মৃত্যু আমার শিয়রে। কিছু না পেয়ে সত্যনারায়ণের নামটাই মনে মনে জপতে শুরু করলাম। হঠাৎ সামনে থেকে কেউ হেঁড়ে গলায় পরিস্কার বাংলায় বললো, ‘আপনাকে আমি চিনি, আপনি সাংবাদিক জলদ গুপ্ত’? আমি চমকে উঠে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, ‘হ্যাঁ’। একটা বুনো মোষ আমার কাছে এগিয়ে এল। অন্ধকারে তখনও তার চোখ দুটো জ্বলছিল। তার পাশে একটা গোরু। মোষ আমাকে বলল, ‘আপনার গোয়ালে পোষা সুন্দরী আমাদের পরিচিত, আমাদের সভাপতির সন্তান। উনি চারপাশের খবর নিতে মাঝে মাঝেই লোকালয়ে, মাঠে যান তখনই কোনভাবে সুন্দরীর মায়ের সঙ্গে…। সেই সূত্রে আপনাকেও আমরা চিনি। এখন আমাদের সঙ্গে একটু যেতে হবে, চলুন। আপনার কোন ভয় নেই। আজ জঙ্গলে একটা জরুরী মিটিং আছে। এটা সম্পুর্ন পশুদের মিটিং। আজ ওদের (গোরুকে দেখিয়ে বলে) মানে গোরুদের নিয়ে কিছু আলোচনা আছে। তাই ও এখানে এসেছে। ও আজ এখানকার বিশেষ অধিবেশনে ওদের কথা বলবে। আমরা মোষরাও ওদের সাথে আছি’।   

আমাদের সুন্দরীর মতো দেখতে গোরুটা এবার আমাকে বলতে শুরু করলো , ‘আপনি যা দেখবেন সেটাই লিখবেন। এই প্রচারটুকু আমাদের দরকার। এতদিন আমাদের নিয়ে কেউ ভাবে নি, যা হয়েছে সব মানুষের জন্য হয়েছে, মানুষের কথা ভেবেই হয়েছে। আজ দিন বদলাচ্ছে, মানুষই আমাদের কথা ভাবছে। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ ভুলে গেছে যে শুধুমাত্র তাদের খাবার হওয়ার জন্য আর মাঠে লাঙ্গল টানার জন্য আমাদের জন্ম নয়। এতদিন আমরা কথা বলতে পারতাম না কিন্তু এখন ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরাও কথা বলতে পারি। আমাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা হচ্ছে। আগামী দিনে আমাদের জন্য থানা হবে, সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল হবে, সুলভ কমপ্লেক্স হবে… পুরাণ, ইতিহাস, ধর্মে আমরা সম্মানের সঙ্গে ছিলাম, ভবিষ্যতেও আমরা সসম্মানে বাঁচতে চাই। যাকগে, অনেক কথা বলে ফেললাম। আপনাকে এত কিছু বলার দরকার নেই, আপনি এ সব কিছুই জানেন, বোঝেন। মিটিংটা শুনলেই আপনার কাছে সব পরিস্কার হয়ে যাবে। চলুন…’

আরও পড়ুন:  সংগ্রহে ছিল প্রায় ২০০ টি‚ ব্যক্তিগত জীবনে এটাই খুশ করত মোগ্যাম্বোকে

একটাও প্রশ্ন না করে ওদের সঙ্গে এগিয়ে গেলাম। বেশ কিছুটা গিয়ে দেখলাম ঘন জঙ্গলের মধ্যে পরিষ্কার একটা জায়গা। ছোট একটা টিলার ওপর একটা বাঘ আয়েশ করে বসে আছে। চারপাশে শিয়াল, চিতা, শুয়োর, হরিণ প্রমুখ পশুরা। আমাকে একটা জায়গায় বসিয়ে আমার সঙ্গে আসা গোরুটি সভাস্থলের মাঝখানে গিয়ে বসলো। একটু দূরে আরও অনেক জন্তুরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। শুধুমাত্র পশুজাতির প্রতিনিধিরাই সভাস্থলের মধ্যে প্রবেশ করার অনুমতি পেয়েছে বলে মনে হলো। মিটিং শুরু হলো। শুরুর কিছু ছোটোখাটো সমস্যা এবং নিয়মকানুনের কথাবার্তা বাদ দিয়ে আমি এই মিটিংএর মুল এজেন্ডার কথোপকথন পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

বাঘ – বলো গোরু তোমার বক্তব্য বলো

গোরু – আপনাকে আগেও বলেছি এখনও বলছি, এবার আপনি রাজার সিংহাসন থেকে পদত্যাগ করুন। আগামী দিনে এই জঙ্গলের রাজা আমরা।

শিয়াল – ( এক গাল হেসে ) দামড়া…।  

বাঘ –গোরু, তুমি কিন্তু তোমার সীমানাটা ভুলে গেছো। তুমি ভুলে যাচ্ছ যে তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছো, কোথায় কথা বলছো…  

গোরু – ভুলিনি মহারাজ। আমি জানি আপনি এখনও এই জঙ্গলের রাজা… আমরা আপনার প্রাপ্য সম্মান এখনও আপনাকে দিচ্ছি, কিন্তু আপনি আর সিংহাসনে থাকবেন না। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই আপনার দিন ফুরিয়েছে। আপনার বীরত্ব, আপনার সৌন্দর্য, আপনার সাহস আমাদের গর্বিত করে। আমাদের সমাজ, আইন কানুন, আমাদের ইতিহাস আপনার কাছে ঋণী। এর জন্য পশুসমাজ আপনার কাছে কৃতজ্ঞ কিন্তু সব কিছুরই তো একটা শেষ আছে মহারাজ। সবাইকেই তো একদিন সরে যেতে হয়। ডাইনোসরের মতো শাসককেও তো সরে যেতে হয়েছিল।

বাঘ – (খুব উত্তেজিত, গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায়) তুমি কি বলতে চাইছো গোরু ? তুমি এসব কথা বলার সাহসটাই বা পেলে কী করে ?

শিয়াল – মাঠে ঘাটে চরে চরে ?   

গোরু – সাহস কেউ কাউকে দেয় না মহারাজ, সাহস অর্জন করতে হয়। যুগ যুগ ধরে আমরা অবহেলিত। আমরা আমাদের হাড়, মাংস, চামড়া আমাদের শক্তি সামর্থ দিয়ে সবাইকে সেবা করেছি। আপনিও আমাদের হাড় চিবিয়ে মহানন্দে ঢেঁকুর তুলেছেন। সেই দিন শেষ। আর আমাদের কেউ খেতে পারবে না, মারতে পারবে না, বাঁধতে পারবে না। আমাদের কেউ কিনতে বা বিক্রি করতে পারবে না।

আরও পড়ুন:  ববি‚ সাগর-এর সেই উচ্ছল নায়িকা সদ্য পা রাখলেন ষাটের কোঠায়

বাঘ – তোমার কি মাথার গণ্ডগোল হয়েছে? দেখ, এই সব কথা শুনে সময় নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। আমার রাজত্বে আরও অনেক সমস্যা আছে ।

গোরু – মাথার গণ্ডগোল আমার হয় নি মহারাজ, আমি বাস্তবটা বলছি। আর এই বলার সাহস জুগিয়েছে কিছু মানুষ। তারা আমাদের মুখে কথা ফুটিয়েছে। তারা আমাদের পাশে আছে। আমাদের খাওয়া তারা বন্ধ করে দিচ্ছে। তাদের মহামান্য বিচারক বলেছেন, আমাদের হত্যা করা পাপ, তিনি ছবি দেখিয়ে সবাইকে বুঝিয়েছেন যে আমাদের পেটে হেলান দিয়ে কেষ্ট ঠাকুর বাঁশি বাজাতেন, তাই আমরা পবিত্র, আমরা এখন মানুষের মা, গো-মাতা। আমরা জননী …।

শিয়াল – আর ময়ূরের চোখের জলে বীর্যের কেসটা তো বলো নি !    

হঠাৎই ইঁদুর চেঁচিয়ে ওঠে

ইঁদুর – মহারাজ, গণেশ স্যার আমাদের পিঠে চেপে রোজ মর্নিং ওয়াকে যান, এমনকি মহাভারত লেখার সময়ও…

বাঘ – এই দাঁড়াও তো… এবার কি তুমিও আমার পদত্যাগ চাইবে ?

গোরু – মহারাজ একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন আমাদের জন্য মানুষ মানুষকে মেরে ফেলছে, বড় বড় পণ্ডিতরা ঘেমে নেয়ে তর্ক করছে…এখন আপনাকে মারার চেয়েও অনেক বড় অপরাধ আমাকে মারা কারন আপনাকে মারা হলো বীরত্ব আর আমাকে মারা হল পাপ। আরও কিছু তথ্য আপনাকে জানিয়ে রাখি… এখন থেকে আমাদের গণনা মানে গো-গণনা হবে। আমাদের আধার কার্ড হচ্ছে। প্যান কার্ড করারও পরিকল্পনা চলছে। রেশন থেকে ভুসি, ঘাস, খড় পাবো আমরা। আমাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে… ব্যাঙ্কে আমাদের নামে টাকা রাখলে অতিরিক্ত সুদ দেওয়া হবে। আমাদের জন্য এ সব কিছু করছে যারা … তারাই এখন জীবকুলের শাসক … হত্তা , কত্তা, বিধাতা।

শিয়াল –আতা…

বাঘ – (বাঘের মুখে মৃদু হাসি, একটা আড়মোড়া ভাঙ্গে)  বুঝেছি, আমার কাছে সবটা পরিস্কার। আজ এই মিটিং থেকে এটাও পরিষ্কার হলো যে তোমার ডাকনাম কেন গোরু…, যাই হোক, যাও সবাই বাড়ি যাও, আজকের মিটিং এখানেই শেষ। আমি এ বিষয়ে এখন কোন কথা বলবো না। আমার যা বলার তা আমার প্রধানমন্ত্রী শিয়াল তোমাদের লিখিত ভাবে জানিয়ে দেবে। এখন আমি উঠছি।

ও হ্যাঁ… মহিষ… আজ রাতের ডিনারের বাছুরটা ঠিক সময়ে পাঠিয়ে দিও ।

শিয়াল – জিও…

- Might Interest You

1 COMMENT