আরও কয়েকদিন পরে এই বিষয়ে লিখব মনস্থ করেছিলাম | কিন্তু বলা হল‚ অপেক্ষা না করে এখনই দিতে | তা-ই সই | দেবীপক্ষ শুরুর আগেই এমন এক ঋষির কথা‚ যাঁর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত বিজয়া দশমীতে পালিত এক রীতি | 

ঋষি বর্তন্তু হিন্দু পুরাণে বিশেষ প্রচলিত নাম নয় | তাঁর আবির্ভাব কাল ধরে নেওয়া হয় ৪৩৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ | আধুনিক গুজরাতে নর্মদা নদীর মোহনায় ভারুচে ছিল তাঁর তপোবন | রামচন্দ্রের পূর্বপুরুষরা তাঁর শিষ্য ছিলেন | তাঁকে নিয়ে একটা কাহিনী প্রচলিত আছে | যার সঙ্গে বিজয়া দশমীর সম্পর্ক প্রতীয়্মান |

আচার্য বর্তন্তুর এক শিষ্য ছিলেন কৌৎস | সুদূর পৈঠান থেকে এসেছিলেন গুরুগৃহে | অধ্যয়ন সমাপ্তে এই ব্রাহ্মণ-পুত্র চাইলেন গুরুদক্ষিণা নিবেদন করতে | কিন্তু ঋষি বরতন্তু বললেন তিনি শিষ্যের বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ | এর ভিন্ন কোনও দক্ষিণা চাই না তাঁর |

তথাপি কৌৎস মানতে চাইলেন না | বললেন গুরুদক্ষিণা না দিলে তাঁর শিক্ষা সম্পূর্ণ হবে না | তখন বর্তন্তু বললেন‚ তাঁর ১৪ কোটি স্বর্ণমুদ্রা চাই | সেটাই হবে গুরুদক্ষিণা | তবে কৌৎসকে একই স্থান থেকে সব মুদ্রা আনতে হবে |

এই আজ্ঞায় সমূহ বিপদে পড়লেন কৌৎস | কোথা থেকে তিনি এত মুদ্রা একসঙ্গে পাবেন ? এক ব্রাহ্মণ তাঁকে পরামর্শ দিলেন | অযোধ্যায় গিয়ে রাজা রঘুর সাহায্য প্রার্থনা করতে | পরম কারুণিক নৃপতি রঘু আবার মহা বলশালী | তাঁর থেকেই সূর্যবংশ পরিচিত হয় রঘুবংশ বলে | তাঁর উত্তরসূরী হলেন দশরথ‚ রামচন্দ্র প্রমুখরা | সবাই রঘুনন্দন |

দানশীল রাজা রঘু তখন অত স্বর্ণমুদ্রা একসঙ্গে দিতে অপারগ | তিনি সিংহলরাজ কুবেরের সহায়তা চাইলেন | রাবণের দাদা কুবের তখন লঙ্কাধিপতি | অশেষ তাঁর ধনসম্পদ ভাণ্ডার | তিনি সম্মত না হলে বাধ্য হয়ে রঘু তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন | যুদ্ধের দিন স্থির করতে বললেন কৌৎসকে | তিনি রাজাকে বললেন আশ্বিনের নবমী তিথি উপযুক্ত | 

কিন্তু সে যুদ্ধ হল না | তার আগেই দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্ণমুদ্রা বর্ষণ করলেন | অযোধ্যার উপান্তে শমী ও ডুমুর গাছের ডালে বর্ষিত হল স্বর্ণমুদ্রা | গাছের পাতা আবৃত হল স্বর্ণমুদ্রায় | দেখা গেল সেখানে ১৪ কোটির থেকে অনেক বেশি স্বর্ণমুদ্রা আছে |  

যেহেতু তাঁর রাজ্যসীমায় হয়েছে তাই সকল ধনসম্পদের মালিক রাজা রঘু | তাঁর কোষাগারে স্থান পাওয়ার কথা | কিন্তু তিনি সব দান করলেন কৌৎসকে | সেসব নিয়ে শিষ্য কৌৎস গেলেন আচার্য সমীপে | কিন্তু অত স্বর্ণমুদ্রা নিতে সম্মত হলেন না বর্তন্তু | নিজের যাচনা মতো নিলেন ১৪ কোটি স্বর্ণমুদ্রাই | বাকি সম্পদ ফিরিয়ে দিলেন |

সেসব নিয়ে রাজা রঘুর কাছে ফিরে গেলেন কৌৎস | কিন্তু একবার দান করে দেওয়া সামগ্রী আর ফেরাবেন না রঘুরাজ | দত্তাপহারী হয়ে নিজ ধর্ম থেকে বিচ্যুত হবেন | তিনি কৌৎসকে নিয়ে নিতে বললেন | কিন্তু বেদজ্ঞ কৌৎস রাজি হলেন না | বললেন বৈদিক জ্ঞানই তাঁর কাছে সব | তিনি ধনসম্পদ নিতে চান না |

এ বার রাজা রঘু পড়লেন ধর্ম সঙ্কটে | কী করবেন তিনি ? শেষে সব স্বর্ণমুদ্রা বন্টন করে দিলেন অযোধ্যাবাসীর মধ্যে | সেদিন ছিল আশ্বিনী দশমী তিথি | আজও দশমীতে অযোধ্যা নগরীতে ধনসম্পদের প্রতীকরূপে বৃক্ষপুজো হয়ে থাকে | দশেরা উৎসবে দানধ্যানের‚ কুশল বিনিময়ের যে রীতি প্রচলিত‚ তার নেপথ্যে যত কাহিনী আছে‚ তার মধ্যে বর্তন্তু-কৌৎস-রঘু আখ্যান অন্যতম | লোভ ত্যাগ করে সবার মধ্যে ধনসম্পদ বন্টনের শিক্ষা দেয় এই পৌরাণিক কাহিনী |

আরও পড়ুন:  উজান স্রোতে সাঁতার ! দেবী দুর্গার মুখ দেখেন না মহিষাসুরের বংশধররা

NO COMMENTS